চাকরি ছেড়ে মহিষের খামার গড়ে পাল্টে গেল মহসীনের জীবন
· Prothom Alo
ভোরের আলো ফোটার আগেই শুরু হয়ে যায় ব্যস্ততা। কেউ খড় কাটছেন, কেউ দানাদার খাদ্য মিশিয়ে পশুর খাবার প্রস্তুত করছেন। কৃত্রিম ঝরনার নিচে সারিবদ্ধভাবে গোসল করানো হচ্ছে একদল মহিষকে। পাশের শেডে নিশ্চিন্তে জাবর কাটছে গরুগুলো। কর্মীদের হাঁকডাক আর গবাদিপশুর ডাক মিলিয়ে যেন এক প্রাণচাঞ্চল্য কর্মযজ্ঞ। এরই মধ্যে আসছেন পাইকারেরা। খামার ঘুরে দেখছেন, দরদাম মিললে সেখানেই সম্পন্ন হচ্ছে বেচাকেনা।
দিনাজপুরের কাহারোল উপজেলার রামচন্দ্রপুর গ্রামের এই খামারের উদ্যোক্তা মীর মহসীন আলী চৌধুরী(৪৮)। একসময় তাঁর পরিচয় ছিল একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের চাকরিজীবী হিসেবে।
Visit umafrika.club for more information.
২০০৭ সালে দিনাজপুর সরকারি কলেজ থেকে অর্থনীতিতে স্নাতকোত্তর শেষ করে ঢাকায় একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মজীবন শুরু করেন মহসীন। প্রতিষ্ঠানটি বিভিন্ন এলাকায় প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর আত্মকর্মসংস্থানে কাজ করত। সেই সুবাদে তিনি ঘুরেছেন নানা জেলা। কাছ থেকে দেখেছেন সফল খামারি ও উদ্যোক্তাদের কাজ, শিখেছেন আধুনিক প্রাণিসম্পদ ব্যবস্থাপনা। সেই অভিজ্ঞতায় তাঁকে ফিরিয়ে আনে নিজের গ্রামে। ২০১৬ সালে মাত্র ১৩টি দেশি গরু নিয়ে খামারের যাত্রা শুরু করেন। এখন তাঁর খামারে রয়েছে দেশি-বিদেশি জাতের ৪৫টি গরু ও ভারতীয় সংকর জাতের ৫২টি মহিষ।
গত শনিবার সরেজমিন দেখা যায়, ১০৭ শতক জমির ওপর গড়ে উঠেছে বিশাল এই খামার। প্রবেশপথে লেখা ‘পৃথ্বী এগ্রো’। বাইরে থেকে বোঝার উপায় নেই ভেতরে কত বড় আয়োজন। ২৪০ ফুট দৈর্ঘ্য ও ৯০ ফুট প্রস্থের লাগোয়া তিনটি শেড। সেখানে চলছে গরু ও মহিষ মোটাতাজাকরণের কার্যক্রম।
গত শনিবার সরেজমিন দেখা যায়, ১০৭ শতক জমির ওপর গড়ে উঠেছে বিশাল এই খামার। প্রবেশপথে লেখা ‘পৃথ্বী এগ্রো’। বাইরে থেকে বোঝার উপায় নেই ভেতরে কত বড় আয়োজন। ২৪০ ফুট দৈর্ঘ্য ও ৯০ ফুট প্রস্থের লাগোয়া তিনটি শেড। সেখানে চলছে গরু ও মহিষ মোটাতাজাকরণের কার্যক্রম। শ্রমিকেরা খড়, ভুসি, খইল, সাইলেজ ও নেপিয়ার ঘাস মিশিয়ে নির্দিষ্ট চাড়িতে খাবার তুলে দিচ্ছেন। মহসীন নিজ হাতে পশুগুলোকে খাবার তুলে দিচ্ছেন, কখনো স্নেহভরে হাত বুলিয়ে দিচ্ছেন এদের গলায় ও মাথায়।
মহসীন বলেন, ‘পড়ালেখা শেষ করে কয়েক বছর চাকরি করেছি, কিন্তু মন বসছিল না। ছোটবেলা থেকেই বাবাকে গরু-ছাগল পালন করতে দেখেছি। তাই সাহস করে অল্প পুঁজি নিয়েই খামার শুরু করি। তখন জমি ছিল ৫০ শতক। এই কয়েক বছরে খামারের আয়ে ধীরে ধীরে আরও ৫৭ শতক জমি কিনেছি। নির্মাণ করেছি দুটি নতুন শেড ও একটি গুদামঘর। বর্তমানে খামারে মাসিক বেতন ও দৈনিক হাজিরার ভিত্তিতে নিয়মিত ১০ থেকে ১৫ জন কাজ করছেন। তাঁর ভাষ্য, ‘সারা দিন যত কাজই করি না কেন, খামারে এসে দাঁড়ালে একধরনের মানসিক প্রশান্তি পাই। পশুগুলোর সঙ্গে সময় কাটানোই আমার সবচেয়ে বড় আনন্দ।’
খামারে মহিষকে খাওয়াতে ব্যস্ত সময় পার করছেন মীর মহসীন আলী। গত শনিবার কাহারোলের রামচন্দ্রপুর গ্রামেখামারে গরু-মহিষকে খড়, ভুসি, খইল, নেপিয়ার ঘাস, প্রাকৃতিক ঘাস ও সাইলেজ (সাইলেজ হলো ভুট্টাগাছ কেটে বিশেষ প্রক্রিয়ায় দীর্ঘদিন সংরক্ষণ করা পশুখাদ্য) খাওয়ানো হয়।
সেখানে কথা হয় খামারের কর্মী দেবনাথ রায়ের সঙ্গেও। তিনি বলেন, প্রতিটি গরু ও মহিষকে দৈনিক ১২ থেকে ২২ কেজি পর্যন্ত খাদ্য দেওয়া হয়। খামারের গুদামে ড্রাম, হাউস ও বস্তায় দুই থেকে আড়াই মাসের খাদ্য সব সময় মজুত থাকে। প্রায় আট বিঘা জমিতে মহাজন নিজেই নেপিয়ার ঘাস চাষ করেন। পাশাপাশি স্থানীয় কয়েকজন নিয়মিত ঘাস সরবরাহ করেন।
বর্তমানে খামারের গরুগুলোর ওজন প্রায় ১০০ থেকে ৪০০ কেজি এবং মহিষগুলোর ওজন ২৫০ থেকে ৫০০ কেজির মধ্যে। তিন মাস পরপর স্থানীয় ব্যবসায়ীদের কাছে পশু বিক্রি করেন মহসীন। এরপর কুড়িগ্রাম, লালমনিরহাট, রাজশাহীর সিটি হাটসহ উত্তরাঞ্চলের বিভিন্ন এলাকা থেকে তুলনামূলক কম মূল্যে গরু-মহিষ কিনে এনে মোটাতাজ করে আবার বিক্রি করেন।
মহসীন বলেন, ‘খামারে লাভ করতে হলে মনোযোগ দিতে হবে। এখন এটা নেশা হয়ে গেছে। বিভিন্ন এলাকার পাইকারদের সঙ্গে ভালো সম্পর্ক তৈরি হয়েছে। অনেক সময় তাঁরা নিজেরাই যোগাযোগ করে পশু পাঠিয়ে দেন। একটা মহিষের সর্বনিম্ন দাম ৭০ হাজার থেকে ১ লাখ টাকা। বর্তমানে খামারের শুধু মহিষগুলো বিক্রি করলেই অন্তত সোয়া কোটি টাকা পাওয়া যাবে।’
একসময় চাকরিজীবী ছিলেন মহসীন আলী। আজ তিনি শুধু একজন সফল খামারিই নন; বরং কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও স্থানীয় তরুণদের উদ্যোক্তা হওয়ার স্বপ্ন দেখানো এক অনুপ্রেরণার নাম। তরুণদের উদ্দেশে তিনি বলেন, আজকাল পড়াশোনা শেষ করে সবাই চাকরির পেছনে ছুটছেন। চাকরি থেকে খামার করা অনেক লাভজনক। এই খাতে অনেক সম্ভাবনা রয়েছে। কিন্তু খামারে মনোযোগ দিতে হবে, সময় দিতে হবে, তাহলে ভালো আয় করা সম্ভব।
খামারের কর্মী সাদিকুর রহমান বলেন, ‘পড়াশোনার পাশাপাশি প্রায় এক বছর ধরে এখানে কাজ করছি। দুই শিফটে আমরা ১২ জন কাজ করি। আমার কাজ গরু-মহিষকে গোসল করানো। কাজটি করতে ভালোই লাগে। মাসিক যা বেতন পাই সংসার চলে যাচ্ছে।’
সরফরাজ আলী, উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা, কাহারোল, দিনাজপুরশুরু থেকেই আমাদের পরামর্শ নিয়ে মহসীন খামারটি গড়ে তুলেছেন। বয়স ও ওজনভেদে খাদ্য ব্যবস্থাপনা, নিয়মিত টিকাদান ও পরিচর্যার বিষয়ে তাঁকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। সবচেয়ে বড় বিষয় হলো তাঁর সাফল্য দেখে এলাকার অনেক মানুষ এখন ছোট পরিসরে গরু পালন শুরু করেছেন।মহসীনের সাফল্যে অনুপ্রাণিত হয়েছেন স্থানীয় অনেকেই। তাঁদের একজন জলিল আহমেদ। তিনি বলেন, ‘মহসীনের খামার দেখে স্থানীয় অনেকেই উদ্বুদ্ধ হয়েছেন। ছোট একটি খামার থেকে কয়েক বছরের মধ্যেই একটি বড় খামার হয়ে গেছে। তাঁর পরামর্শ নিয়ে তিনটি গরু দিয়ে খামার শুরু করেছি। এখন এলাকায় অনেকেই গরু পালন করছেন।’
মহসীনের বিষয়ে কাহারোল উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা সরফরাজ আলী বলেন, ‘উপজেলায় এটিই একমাত্র মহিষের খামার। শুরু থেকেই আমাদের পরামর্শ নিয়ে মহসীন খামারটি গড়ে তুলেছেন। বয়স ও ওজনভেদে খাদ্য ব্যবস্থাপনা, নিয়মিত টিকাদান ও পরিচর্যার বিষয়ে তাঁকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। আমরাও নিয়মিত খামার পরিদর্শন করি। সবচেয়ে বড় বিষয় হলো তাঁর সাফল্য দেখে এলাকার অনেক মানুষ এখন ছোট পরিসরে গরু পালন শুরু করেছেন।’