জাতীয় উন্নয়নের অন্যতম পূর্বশর্ত অসংক্রামক রোগ প্রতিরোধ
· Prothom Alo

স্বাস্থ্যসম্মত জীবনযাপন ও অসংক্রামক রোগ প্রতিরোধ কীভাবে জাতীয় উন্নয়নের অন্যতম পূর্বশর্ত, তা নিয়ে লিখেছেন জিয়াউদ্দিন হায়দার
Visit freshyourfeel.com for more information.
বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাত গত কয়েক দশকে মাতৃমৃত্যু, শিশুমৃত্যু এবং সংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণে উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করেছে। এই সাফল্যের পেছনে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের দূরদর্শী উদ্যোগে প্রবর্তিত ‘গ্রাম ডাক্তার’ কর্মসূচির গুরুত্বপূর্ণ অবদান রয়েছে।
স্বাস্থ্যসেবাকে মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়া, প্রতিরোধমূলক স্বাস্থ্যসেবাকে গুরুত্ব দেওয়া এবং গ্রামীণ জনগোষ্ঠীকে মৌলিক স্বাস্থ্যসেবার আওতায় আনার মাধ্যমে এই উদ্যোগ বাংলাদেশের প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার একটি ভিত্তি গড়ে দেয়, যা পরবর্তী সময়ে শিশু ও মাতৃস্বাস্থ্যের উন্নয়নসহ বিভিন্ন স্বাস্থ্যসূচকে দেশের অগ্রগতিকে ত্বরান্বিত করে।
কিন্তু এখন উচ্চ রক্তচাপ বা হাইপারটেনশন বাংলাদেশের সামনে এক নতুন ও ক্রমবর্ধমান স্বাস্থ্য চ্যালেঞ্জ। অধিকাংশ ক্ষেত্রে কোনো দৃশ্যমান উপসর্গ ছাড়াই এই রোগ বছরের পর বছর মানুষের শরীরে নীরবে ক্ষতি করে চলে এবং শেষ পর্যন্ত হৃদ্রোগ, স্ট্রোক, কিডনি বিকলতাসহ নানা জটিলতার কারণ হয়। এ কারণেই উচ্চ রক্তচাপকে বিশ্বজুড়ে ‘নীরব ঘাতক’ বলা হয়।
বাংলাদেশে উচ্চ রক্তচাপ এখন আর কেবল শহুরে মধ্যবিত্তের রোগ নয়; এটি গ্রাম-শহর, ধনী-গরিব, নারী-পুরুষনির্বিশেষে সমগ্র দেশের জন্য একটি বড় জনস্বাস্থ্য চ্যালেঞ্জ। তবে উদ্বেগের বিষয় হলো, দেশে উচ্চ রক্তচাপের প্রকৃত ব্যাপ্তি, ভৌগোলিক বণ্টন, ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠী এবং চিকিৎসা ও নিয়ন্ত্রণের অবস্থা সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য ও নিয়মিত তথ্যের যথেষ্ট ঘাটতি রয়েছে।
জিয়াউদ্দিন হায়দারবিদ্যমান কিছু জরিপ থেকে ধারণা করা হয় যে দেশের প্রায় ২৮ শতাংশ প্রাপ্তবয়স্ক উচ্চ রক্তচাপে আক্রান্ত, অর্থাৎ কয়েক কোটি মানুষ এই রোগ নিয়ে জীবন যাপন করছেন। কিন্তু আক্রান্ত ব্যক্তিদের একটি বড় অংশ জানেন না যে তাঁদের উচ্চ রক্তচাপ রয়েছে, আর যাঁদের রোগ শনাক্ত হয়েছে তাঁদের মধ্যেও তুলনামূলকভাবে অল্পসংখ্যক মানুষের রক্তচাপ কার্যকরভাবে নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।
শক্তিশালী তথ্যব্যবস্থা ও নিয়মিত নজরদারির অভাবে সমস্যার প্রকৃত চিত্র নির্ধারণ, প্রয়োজন অনুযায়ী সম্পদ বরাদ্দ, উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোকে অগ্রাধিকার প্রদান এবং কার্যকর কর্মসূচি পরিকল্পনা ও ব্যবস্থাপনা করা কঠিন হয়ে পড়েছে। ফলে উচ্চ রক্তচাপ আজ শুধু একটি স্বাস্থ্য সমস্যা নয়, বরং স্বাস্থ্যব্যবস্থার তথ্য ও ব্যবস্থাপনা সক্ষমতার জন্যও একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
উচ্চ রক্তচাপ বাংলাদেশের রোগব্যাধির ধরনকে দ্রুত পরিবর্তন করছে এবং অসংক্রামক রোগের ক্রমবর্ধমান বোঝার অন্যতম প্রধান চালিকা শক্তিতে পরিণত হয়েছে। বর্তমানে দেশে মোট মৃত্যুর ৭০ শতাংশের বেশি অসংক্রামক রোগের কারণে ঘটে, যার মধ্যে হৃদ্রোগ, স্ট্রোক, কিডনির রোগ ও ডায়াবেটিসের অন্যতম প্রধান ঝুঁকির কারণ হলো অনিয়ন্ত্রিত উচ্চ রক্তচাপ। বিশেষ উদ্বেগের বিষয় হলো, বাংলাদেশে এখনো একটি সুসংগঠিত ও কার্যকর প্রি-হসপিটাল ইমার্জেন্সি মেডিক্যাল সার্ভিস ব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি। ফলে হঠাৎ স্ট্রোক, হার্ট অ্যাটাক বা উচ্চ রক্তচাপজনিত অন্যান্য জটিলতায় আক্রান্ত অনেক রোগী সময়মতো প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবা পায় না।
বাংলাদেশের মোট স্বাস্থ্য ব্যয়ের ৭০ শতাংশের বেশি সরাসরি রোগীর পরিবারের পকেট থেকে ব্যয় করা হয়,
যা দক্ষিণ এশিয়া এবং বিশ্বের অনেক দেশের তুলনায় অত্যন্ত বেশি।রোগের কার্যকর নিয়ন্ত্রণের জন্য হাসপাতালভিত্তিক চিকিৎসার চেয়ে প্রাথমিক পর্যায়ে শনাক্তকরণ, নিয়মিত পর্যবেক্ষণ এবং জনগণের নিকটবর্তী সেবার বিকল্প নেই।
অনেক ক্ষেত্রে রোগীকে হাসপাতালে পৌঁছাতে দীর্ঘ সময় লেগে যায়, আবার অনেক হাসপাতালেও জরুরি সাড়া দেওয়ার সক্ষমতা সীমিত। এর ফলে প্রতিরোধযোগ্য মৃত্যু ও স্থায়ী অক্ষমতার সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে। তাই উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণকে শুধু একটি রোগ ব্যবস্থাপনার বিষয় হিসেবে নয়, বরং হৃদ্রোগ ও স্ট্রোক প্রতিরোধ, জরুরি চিকিৎসাসেবা শক্তিশালীকরণ এবং সামগ্রিক স্বাস্থ্যব্যবস্থার সক্ষমতা বৃদ্ধির একটি জাতীয় অগ্রাধিকার হিসেবে বিবেচনা করা জরুরি।
প্রতিবেশী দেশগুলোর তুলনায় বাংলাদেশ কোথায়?
দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশেও উচ্চ রক্তচাপ একটি দ্রুত বিস্তারমান জনস্বাস্থ্য সমস্যা হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এবং বিভিন্ন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, ভারত, পাকিস্তান, নেপাল, শ্রীলঙ্কা ও বাংলাদেশের প্রাপ্তবয়স্ক জনগোষ্ঠীর এক-চতুর্থাংশ থেকে এক-তৃতীয়াংশ মানুষ উচ্চ রক্তচাপে আক্রান্ত।
বাংলাদেশে বিদ্যমান জরিপগুলো থেকে ধারণা করা হয়, দেশের প্রায় ২৫ থেকে ২৮ শতাংশ প্রাপ্তবয়স্কের উচ্চ রক্তচাপ রয়েছে, যা সংখ্যার হিসাবে দুই থেকে আড়াই কোটির বেশি মানুষ। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, নিয়মিত জাতীয় পর্যায়ের নজরদারি ব্যবস্থা ও নির্ভরযোগ্য তথ্যের ঘাটতির কারণে প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে।
স্বাস্থ্যব্যবস্থা পুনর্গঠন: রাষ্ট্র মেরামতের কেন্দ্রে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবাঅপরিকল্পিত নগরায়ণ, অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস, অতিরিক্ত লবণ ও প্রক্রিয়াজাত খাদ্য গ্রহণ, শারীরিক পরিশ্রমের অভাব, স্থূলতা, ডায়াবেটিস বৃদ্ধি, তামাক ব্যবহার এবং দীর্ঘস্থায়ী মানসিক চাপের পাশাপাশি পরিবেশগত কারণও উচ্চ রক্তচাপ বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। বায়ুদূষণ, শব্দদূষণ, জলবায়ু পরিবর্তনজনিত তাপমাত্রা বৃদ্ধি, সবুজ খোলা জায়গার সংকট এবং নিরাপদ হাঁটা বা শারীরিক কার্যক্রমের অনুকূল পরিবেশের অভাব মানুষের হৃদ্রোগজনিত ঝুঁকি বাড়িয়ে দিচ্ছে। বিশেষ করে ঢাকা ও অন্যান্য বড় শহরে ক্রমবর্ধমান বায়ুদূষণ এবং যানজটজনিত মানসিক চাপ উচ্চ রক্তচাপ ও অন্যান্য অসংক্রামক রোগের ঝুঁকি আরও বাড়িয়ে তুলছে।
এসব জীবনধারাগত ও পরিবেশগত ঝুঁকির সম্মিলিত প্রভাবে সামনের বছরগুলোতে বাংলাদেশে উচ্চ রক্তচাপের বোঝা আরও উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এ অবস্থাকে আরও জটিল করে তুলেছে দেশের দুর্বল প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবাব্যবস্থা, সীমিত এনসিডি স্ক্রিনিং কার্যক্রম এবং কার্যকর প্রি-হসপিটাল জরুরি চিকিৎসাসেবার অভাব। ফলে প্রতিরোধযোগ্য অসুস্থতা, অক্ষমতা এবং মৃত্যুর বোঝা প্রতিবছর আরও বাড়ছে।
সরকারি স্বাস্থ্যব্যবস্থার গোপন সত্যস্বাস্থ্যগত পরিণতি: হাসপাতালভিত্তিক চিকিৎসার দুষ্টচক্র
উচ্চ রক্তচাপকে অনেকেই একটি সাধারণ সমস্যা হিসেবে দেখেন। বাস্তবে এটি বাংলাদেশের হাসপাতালগুলোতে ক্রমবর্ধমান রোগীর চাপের অন্যতম কারণ। অনিয়ন্ত্রিত উচ্চ রক্তচাপ মানবদেহের প্রায় সব গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গপ্রত্যঙ্গের ওপর দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতিকর প্রভাব ফেলে। এটি স্ট্রোকের ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দেয় এবং হৃদ্রোগ, হার্ট অ্যাটাক ও হৃদ্যন্ত্রের অকার্যকারিতার (হার্ট ফেইলিউর) অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে কাজ করে। দীর্ঘদিন উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে না থাকলে কিডনির রক্তনালিগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে কিডনি বিকলতার ঝুঁকি তৈরি হয়।
একই সঙ্গে ডায়াবেটিসে আক্রান্ত ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে উচ্চ রক্তচাপ রোগের জটিলতা আরও বাড়িয়ে দেয় এবং চোখ, কিডনি ও হৃদ্যন্ত্রের ক্ষতির আশঙ্কা বৃদ্ধি করে। এর ফলে শুধু অকালমৃত্যু নয়, দীর্ঘমেয়াদি অক্ষমতা, কর্মক্ষমতা হ্রাস এবং পরিবারের ওপর উল্লেখযোগ্য আর্থিক ও সামাজিক বোঝা সৃষ্টি হয়। তাই উচ্চ রক্তচাপকে শুধু একটি রোগ হিসেবে নয়, বরং হৃদ্রোগ, স্ট্রোক, কিডনির রোগ এবং অকালমৃত্যুর অন্যতম প্রধান চালিকা শক্তি হিসেবে বিবেচনা করা উচিত।
জাতীয় হৃদ্রোগ ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালবাংলাদেশের জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট, মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল, জেলা সদর হাসপাতাল এবং অন্যান্য বিশেষায়িত স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানে আজ যে বিপুল রোগীর চাপ ও শয্যাসংকট দেখা যাচ্ছে, তার বড় একটি অংশ প্রতিরোধযোগ্য উচ্চ রক্তচাপ এবং এর ফলে সৃষ্ট অসংক্রামক রোগের সঙ্গে সম্পর্কিত। প্রতিদিন অসংখ্য রোগী স্ট্রোক, হার্ট অ্যাটাক, হৃদ্যন্ত্রের অকার্যকারিতা, কিডনির জটিলতা এবং অন্যান্য উচ্চ রক্তচাপজনিত সমস্যায় হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছেন।
অনেক হাসপাতালের মেডিসিন, কার্ডিওলজি, নিউরোলজি, নেফ্রোলজি এবং নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রের (আইসিইউ) শয্যাগুলো বছরের অধিকাংশ সময় পূর্ণ থাকে, ফলে নতুন রোগীদের জন্য শয্যা পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। অনেক ক্ষেত্রে একজন রোগী ছাড়পত্র না পাওয়া পর্যন্ত অন্য রোগীকে অপেক্ষা করতে হয় বা মেঝেতে চিকিৎসা নিতে হয়।
এই পরিস্থিতি শুধু রোগীদের দুর্ভোগই বাড়ায় না, বরং স্বাস্থ্যব্যবস্থার ওপরও বিশাল চাপ সৃষ্টি করে। যে রোগগুলোর একটি বড় অংশ নিয়মিত রক্তচাপ পরীক্ষা, সময়মতো ওষুধ গ্রহণ এবং প্রাথমিক পর্যায়ে কার্যকর ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে প্রতিরোধ করা সম্ভব, সেগুলোর জটিলতা মোকাবিলায় হাসপাতালগুলোকে বিপুল পরিমাণ মানবসম্পদ, শয্যা, ওষুধ এবং আর্থিক সম্পদ ব্যয় করতে হচ্ছে।
উচ্চ রক্তচাপ এবং অন্যান্য অসংক্রামক রোগের কার্যকর প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করা গেলে হাসপাতালে ভর্তির হার, শয্যা দখলের হার এবং ব্যয়বহুল বিশেষায়িত চিকিৎসার চাহিদা উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব হবে। এতে একদিকে যেমন রোগীদের অকালমৃত্যু ও অক্ষমতা কমবে, অন্যদিকে স্বাস্থ্যব্যবস্থার সীমিত সম্পদের আরও দক্ষ ব্যবহার নিশ্চিত করা যাবে।
স্বাস্থ্য খাতের স্বাস্থ্য ফেরাতে এই মুহূর্তে যা করতে হবেঅর্থনীতির ওপর নীরব আঘাত
উচ্চ রক্তচাপ শুধু একটি স্বাস্থ্য সমস্যা নয়; এটি বাংলাদেশের জন্য একটি বড় অর্থনৈতিক ও উন্নয়নগত চ্যালেঞ্জ। যখন একজন কর্মক্ষম ব্যক্তি স্ট্রোক, হার্ট অ্যাটাক, হার্ট ফেইলিউর বা কিডনির জটিলতায় আক্রান্ত হন, তখন শুধু তাঁর চিকিৎসা ব্যয়ই বৃদ্ধি পায় না, তাঁর কর্মক্ষমতা ও আয় করার সক্ষমতাও উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়। অনেক ক্ষেত্রে পরিবারের অন্য সদস্যদেরও রোগীর সেবাযত্নে সময় দিতে হয়, ফলে পরিবারের সামগ্রিক আয় ও উৎপাদনশীলতা ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
বাংলাদেশে এই সমস্যার প্রভাব আরও গভীর, কারণ দেশের স্বাস্থ্য ব্যয়ের একটি বড় অংশ এখনো জনগণকে নিজ পকেট থেকে বহন করতে হয়। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ও জাতীয় পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বাংলাদেশের মোট স্বাস্থ্য ব্যয়ের ৭০ শতাংশের বেশি সরাসরি পরিবারের পকেট থেকে (আউট অব পকেট এক্সপেন্ডেচার) ব্যয় করা হয়, যা দক্ষিণ এশিয়া এবং বিশ্বের অনেক দেশের তুলনায় অত্যন্ত বেশি।
উচ্চ রক্তচাপ বা রক্তচাপের বেশি পার্থক্য স্ট্রোকের অন্যতম কারণউচ্চ রক্তচাপের কারণে যখন কোনো ব্যক্তি স্ট্রোক বা হৃদ্রোগে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হন, তখন ওষুধ, পরীক্ষা-নিরীক্ষা, হাসপাতালে ভর্তি, অস্ত্রোপচার, আইসিইউ সেবা, পুনর্বাসন এবং দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসার ব্যয় অনেক পরিবারের জন্য অসহনীয় হয়ে ওঠে। ফলে অনেক পরিবারকে সঞ্চয় ভাঙতে, ঋণ নিতে, জমি বা সম্পদ বিক্রি করতে কিংবা সন্তানদের শিক্ষা ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় ব্যয় কমিয়ে দিতে বাধ্য হতে হয়। প্রতিবছর অসংখ্য পরিবার স্বাস্থ্য ব্যয়ের চাপে আর্থিক সংকটে পড়ে এবং অনেকেই দারিদ্র্যের দিকে ধাবিত হয়।
উচ্চ রক্তচাপের অর্থনৈতিক ক্ষতি শুধু পরিবার পর্যায়েই সীমাবদ্ধ নয়; এটি জাতীয় অর্থনীতির ওপরও বড় প্রভাব ফেলে। অকালমৃত্যু, দীর্ঘমেয়াদি অক্ষমতা এবং কর্মঘণ্টা হারানোর ফলে উৎপাদনশীলতা কমে যায়, স্বাস্থ্যসেবার ব্যয় বৃদ্ধি পায় এবং দেশের মানবসম্পদ উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হয়। এ কারণেই বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এবং অন্যান্য আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো দীর্ঘদিন ধরে উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণকে স্বাস্থ্য খাতের সবচেয়ে ব্যয়সাশ্রয়ী বিনিয়োগগুলোর একটি হিসেবে বিবেচনা করে আসছে।
নিয়মিত রক্তচাপ পরীক্ষা, কম খরচের কার্যকর ওষুধ, স্বাস্থ্যকর জীবনযাত্রা এবং প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার মাধ্যমে উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ করা গেলে ব্যয়বহুল স্ট্রোক, হার্ট অ্যাটাক, কিডনি বিকলতা এবং দীর্ঘমেয়াদি হাসপাতালে ভর্তির প্রয়োজনীয়তা উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব। অর্থাৎ উচ্চ রক্তচাপ প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণে আজ যে সামান্য বিনিয়োগ করা হবে, তা ভবিষ্যতে স্বাস্থ্য ব্যয়, দারিদ্র্য এবং উৎপাদনশীলতার ক্ষতি কমিয়ে বহুগুণ অর্থনৈতিক ও সামাজিক সুফল বয়ে আনতে পারে।
বিএনপি সরকারের স্বাস্থ্য অগ্রাধিকার এবং সম্ভাব্য সমাধান
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকারের স্বাস্থ্য সংস্কার কর্মসূচির অন্যতম প্রধান ভিত্তি হলো স্বাস্থ্যসেবাকে হাসপাতালকেন্দ্রিক ব্যবস্থা থেকে জনগণের দোরগোড়ায় নিয়ে যাওয়া এবং প্রতিরোধমূলক স্বাস্থ্যসেবাকে জাতীয় অগ্রাধিকার হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা।
শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের ‘গ্রাম ডাক্তার’ উদ্যোগের মাধ্যমে যে কমিউনিটিভিত্তিক স্বাস্থ্যসেবার ভিত্তি রচিত হয়েছিল, বর্তমান সরকার সেই দর্শনকে আধুনিক প্রযুক্তি ও শক্তিশালী স্বাস্থ্যব্যবস্থার মাধ্যমে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যেতে চায়। উচ্চ রক্তচাপসহ অন্যান্য অসংক্রামক রোগ মোকাবিলায় এই দৃষ্টিভঙ্গি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ; কারণ, এসব রোগের কার্যকর নিয়ন্ত্রণের জন্য হাসপাতালভিত্তিক চিকিৎসার চেয়ে প্রাথমিক পর্যায়ে শনাক্তকরণ, নিয়মিত পর্যবেক্ষণ এবং জনগণের নিকটবর্তী সেবার বিকল্প নেই।
এই লক্ষ্য বাস্তবায়নের জন্য সরকার স্বাস্থ্য খাতে বিনিয়োগ উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে এবং জাতীয় আয়ের (জিডিপি) ১ শতাংশের বেশি স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দের পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। একই সঙ্গে দেশের প্রতিটি ইউনিয়ন এবং প্রতিটি শহুরে ওয়ার্ডে একটি করে সমন্বিত প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা ইউনিট প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যাতে নাগরিকেরা নিজ এলাকার মধ্যেই মৌলিক স্বাস্থ্যসেবা, অসংক্রামক রোগের স্ক্রিনিং এবং নিয়মিত ফলোআপ সেবা পেতে পারেন।
এই সেবাকে আরও কার্যকর করার জন্য সারা দেশে এক লাখ নতুন কমিউনিটি স্বাস্থ্যকর্মী, ‘স্বাস্থ্য আপা’ ও ‘স্বাস্থ্য ভাই’ নিয়োগের পরিকল্পনা রয়েছে, যাঁরা পরিবারভিত্তিক স্বাস্থ্যসেবা, নিয়মিত রক্তচাপ ও ডায়াবেটিস পরীক্ষা, স্বাস্থ্য শিক্ষা, রোগ প্রতিরোধ এবং রোগী অনুসরণ কার্যক্রম পরিচালনা করবেন।
আলুকদিয়া ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণকেন্দ্রে এক শিশুকে চিকিৎসা দিচ্ছেন ‘ডাক্তার আপা’। মঙ্গলবারের ছবি।সরকারের পরিকল্পনায় আরও রয়েছে একটি জাতীয় ই-হেলথ কার্ড ব্যবস্থা, ইলেকট্রনিক স্বাস্থ্য রেকর্ড, ডিজিটাল রোগী রেফারেল ব্যবস্থা এবং স্বাস্থ্য তথ্যব্যবস্থার আধুনিকায়ন, যাতে একজন নাগরিকের স্বাস্থ্যসেবার ইতিহাস দেশের যেকোনো স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানে সহজে পাওয়া যায়। পাশাপাশি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোর সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বর্তমানে অধিকাংশ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ৩১ থেকে ৫০টি শয্যা থাকলেও সেগুলো পর্যায়ক্রমে ১০১ শয্যাবিশিষ্ট প্রতিষ্ঠানে রূপান্তর করা হবে, যাতে জটিল রোগের প্রাথমিক ব্যবস্থাপনা উপজেলা পর্যায়েই নিশ্চিত করা যায় এবং জেলা ও তৃতীয় স্তরের হাসপাতালের ওপর চাপ কমানো সম্ভব হয়।
এই সংস্কারগুলো কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হলে উচ্চ রক্তচাপসহ অন্যান্য অসংক্রামক রোগ ব্যবস্থাপনায় একটি মৌলিক পরিবর্তন আসতে পারে। মানুষকে আর স্ট্রোক, হার্ট অ্যাটাক বা কিডনির জটিলতা নিয়ে হাসপাতালে ছুটতে হবে না; বরং রোগটি প্রাথমিক পর্যায়েই শনাক্ত হবে, নিয়মিত পর্যবেক্ষণের আওতায় আসবে এবং সময়মতো চিকিৎসা ও পরামর্শ পাওয়ার মাধ্যমে জটিলতা ও অকালমৃত্যু উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব হবে। একই সঙ্গে এটি বাংলাদেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে চিকিৎসাকেন্দ্রিক মডেল থেকে প্রতিরোধ, প্রাথমিক সেবা ও জনস্বাস্থ্যকেন্দ্রিক একটি আধুনিক ও টেকসই ব্যবস্থায় রূপান্তর করার পথ সুগম করবে।
উপসংহার
বাংলাদেশ আজ এমন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে সংক্রামক রোগের পাশাপাশি অসংক্রামক রোগ মোকাবিলা করাও জাতীয় উন্নয়নের পূর্বশর্ত হয়ে উঠেছে। উচ্চ রক্তচাপ একটি স্বাস্থ্য সমস্যা হলেও এর প্রভাব অর্থনীতি, উৎপাদনশীলতা, দারিদ্র্য এবং মানবসম্পদের ওপর সরাসরি পড়ে। সুখবর হলো, এই রোগ প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। প্রয়োজন রাজনৈতিক অঙ্গীকার, শক্তিশালী প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা, প্রযুক্তিনির্ভর স্বাস্থ্যব্যবস্থা এবং জনগণের সক্রিয় অংশগ্রহণ।
যদি আমরা এখনই পদক্ষেপ না নিই, তাহলে উচ্চ রক্তচাপ আগামী দশকে বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাতের সবচেয়ে বড় বোঝা হয়ে উঠবে। আর যদি আমরা সময়মতো বিনিয়োগ করি, তাহলে লাখো মানুষের জীবন বাঁচানো, স্বাস্থ্য ব্যয় কমানো এবং একটি অধিক উৎপাদনশীল ‘নতুন বাংলাদেশ’ গড়ে তোলা সম্ভব হবে।
● ড. জিয়াউদ্দিন হায়দার প্রধানমন্ত্রীর স্বাস্থ্যবিষয়ক বিশেষ সহকারী (প্রতিমন্ত্রীর মর্যাদা), বিএনপি চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা এবং বিশ্বব্যাংকের সাবেক স্বাস্থ্য ও পুষ্টিবিশেষজ্ঞ
মতামত লেখকের নিজস্ব