অস্ট্রেলিয়ায় ওয়ান নেশন দলের উত্থান কেন
· Prothom Alo

অস্ট্রেলিয়ার রাজনীতিতে এ মুহূর্তে যা ঘটছে, তা একটু চমকে দেওয়ার মতো। পলিন হ্যানসনের ‘ওয়ান নেশন’ দলটি হঠাৎ জনমত জরিপে দেশের প্রধান দলগুলোকে পেছনে ফেলে দিচ্ছে। ২০২৫ সালের ফেডারেল নির্বাচনে এই দল মাত্র সাড়ে ৬ শতাংশ প্রথম পছন্দের ভোট পেয়েছিল।
কিন্তু ২০২৬ সালের মে মাসে পরিচালিত ডেমোসএইউ জরিপে দেখা যাচ্ছে, তাঁদের সমর্থন বেড়ে ২৮ শতাংশে পৌঁছে গেছে। এটি ক্ষমতাসীন লেবার পার্টির ২৬ শতাংশকে ছাড়িয়ে গেছে।
Visit afnews.co.za for more information.
তবে এই সংখ্যা দেখে বিভ্রান্ত হওয়ার কারণ নেই। মেয়াদের মাঝামাঝি সময়ের জনমত জরিপ আর আসল নির্বাচন এক জিনিস নয়।
অস্ট্রেলিয়ার রাজনৈতিক ব্যবস্থায় সরকার গঠন হয় নিম্নকক্ষ থেকে, যেখানে ওয়ান নেশনের উপস্থিতি এখনো সীমিত। এই দল মূলত সিনেটে আসন পেয়ে থাকে। কিন্তু জনমত জরিপের এই চিত্র যে বার্তা দিচ্ছে, সেটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এটি অস্ট্রেলিয়ার দ্বিদলীয় রাজনীতির গভীরে একটি ফাটলের সংকেত।
বাংলাদেশের পাঠকের কাছে বিষয়টি একটু সহজ করে বলতে গেলে একটি তুলনা দেওয়া যায়।
অস্ট্রেলিয়ায় লেবারই টিকে যাবে না নতুন কেউ আসবেধরুন, প্রধান দুটি দলের বাইরে কোনো তৃতীয় দল হঠাৎ দেশের এক-চতুর্থাংশ মানুষের সমর্থন পেয়ে যাচ্ছে। এর মানে শুধু এই নয় যে সেই দল জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। বরং এর মানে হলো, বড় দুটি দলের প্রতি মানুষের বিশ্বাস ভেঙে পড়েছে। অস্ট্রেলিয়ায় ঠিক এটাই হচ্ছে।
প্রশ্ন হলো, কেন এই পরিস্থিতি তৈরি হলো? উত্তরটা কেবল রাজনৈতিক নয়, এর শিকড় আছে সাধারণ মানুষের ঘরে ঘরে। গত কয়েক বছরে অস্ট্রেলিয়ায় জীবনযাত্রার খরচ হুঁ হুঁ করে বেড়েছে।
মুদ্রাস্ফীতি, বাড়িভাড়া, মুদিদোকানের বাজার সব মিলিয়ে সাধারণ মধ্যবিত্ত মানুষ চাপে পড়েছে। মজুরি বেড়েছে, কিন্তু সেই হারে জীবনযাত্রার মান বাড়েনি। অনেক পরিবার মাস শেষে দেখছে, তাদের হাতে আগের চেয়ে অনেক কম টাকা থাকছে।
এই কষ্ট যখন দীর্ঘ হয়, মানুষ প্রতিবাদ খোঁজে। আর সেই প্রতিবাদের পথ হয়ে উঠেছে ওয়ান নেশনের ভোটবাক্স।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আবাসনসংকট। সিডনি ও মেলবোর্নে বাড়ির দাম এতটাই বেড়ে গেছে যে সাধারণ তরুণদের পক্ষে নিজের একটি ঘর কেনার স্বপ্ন ক্রমশ দূরে সরে যাচ্ছে।
আরব দেশগুলোকে যুদ্ধে জড়ানোর যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের কূটকৌশল কতটা সফল হবেমানুষের একটি বড় অংশ মনে করছে, সরকার বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ রক্ষা করতে গিয়ে সাধারণ মানুষের ঘরের স্বপ্নকে বলি দিচ্ছে। এই ক্ষোভও ওয়ান নেশনের পালে হাওয়া জুগিয়েছে।
পলিন হ্যানসনের রাজনীতি নতুন নয়। ১৯৯৬ সালে যখন তিনি প্রথম জাতীয় রাজনীতিতে আসেন, তখনো তিনি অভিবাসন ও ‘অস্ট্রেলিয়া প্রথম’ এই বার্তা নিয়েই এসেছিলেন।
তাঁর বক্তব্য সহজ-সরল, কখনো কখনো অতি-সরলীকৃত; অভিবাসীরা চাকরি নিচ্ছে, বাড়ির দাম বাড়াচ্ছে, সংস্কৃতি বিপন্ন করছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আবাসনসংকটের আসল কারণ অভিবাসী নয়, বরং নতুন বাড়ি নির্মাণে দীর্ঘদিনের অবহেলা এবং জমি ব্যবহারের কঠোর নিয়মকানুন।
কিন্তু যে মানুষটি প্রতি মাসে চাপে আছেন, তাঁর কাছে সহজ ব্যাখ্যাই বেশি গ্রহণযোগ্য মনে হয়। হ্যানসন সেই সুযোগই কাজে লাগাচ্ছেন।
বাংলাদেশের নির্বাচনে ব্রিটিশ বাংলাদেশি ভোটারদের প্রভাব কতটাএই রাজনৈতিক পটপরিবর্তনে সবচেয়ে বেশি সংকটে পড়েছে প্রধান বিরোধী জোট লিবারেল কোয়ালিশন। তারা মূলত দুই দিক থেকে ভোটার হারাচ্ছে। শহরের শিক্ষিত ও মধ্যবিত্ত ভোটাররা চলে যাচ্ছেন পরিবেশ ও সামাজিক বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়া নির্দলীয় প্রগতিশীল প্রার্থীদের দিকে।
আর শহরতলি ও গ্রামীণ অঞ্চলের ক্ষুব্ধ ভোটাররা ঝুঁকছেন ওয়ান নেশনের দিকে। ফলে এই জোট রীতিমতো দুই নৌকায় পা দিয়ে থাকার চেষ্টা করছে এবং কোনো নৌকাতেই ভালো জায়গা পাচ্ছে না।
লেবার সরকারও নিজেদের বিপদ নিজেরাই তৈরি করেছে। প্রধানমন্ত্রী অ্যান্টনি আলবানিজ নির্বাচনের আগে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, বিনিয়োগকারীদের জন্য বিশেষ করসুবিধা, যাকে বলা হয় নেগেটিভ গিয়ারিং এবং মূলধন লাভের ওপর করছাড় পরিবর্তন করা হবে না।
কিন্তু ২০২৬ সালের বাজেটে তিনি সেই অঙ্গীকার থেকে সরে এলেন। পুরোনো বাড়িতে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে এই সুবিধা সীমিত করা হলো।
অস্ট্রেলিয়া এর ব্যতিক্রম নয়। ডিসেম্বর ২০২৫ সালে বন্ডাই সৈকতে একটি সন্ত্রাসী হামলার পর ওয়ান নেশনের জনপ্রিয়তা আরও লাফিয়ে বেড়েছে, যা দেখিয়ে দিচ্ছে, নিরাপত্তা ও জাতীয় পরিচয়ের প্রশ্নে মানুষ কতটা সংবেদনশীল। আলবানিজ সরকারের সামনে এখন দুটি পথ। প্রথমটি হলো চাপের মুখে পিছু হটা এবং স্বল্প মেয়াদে জনপ্রিয়তা ধরে রাখার চেষ্টা করা। দ্বিতীয় পথটি হলো কঠিন সংস্কারের পথে দৃঢ়ভাবে এগিয়ে যাওয়া এবং সময়ের সঙ্গে মানুষকে ফল দেখানো।
বিশেষজ্ঞরা এই পদক্ষেপকে সাহসী বলছেন, কারণ এই করকাঠামোই দীর্ঘদিন ধরে আবাসন বাজারকে সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে রেখেছে। তবে সংস্কারের প্রভাব পড়তে সময় লাগবে। আর সেই ফাঁকেই মানুষের মধ্যে হতাশা জমছে।
এখানে একটি বৃহত্তর সত্য আছে, যা শুধু অস্ট্রেলিয়ার নয়, গোটা পশ্চিমা বিশ্বের রাজনীতির ছবি। যখন মানুষ মনে করে প্রতিষ্ঠিত দলগুলো তাদের কথা শুনছে না, তখন তারা প্রতিবাদ হিসেবে এমন দলকে ভোট দেয়, যারা সরল ভাষায় ক্ষোভের কথা বলে।
এই প্রবণতা আমেরিকায় ট্রাম্পের উত্থানে দেখা গেছে, ইউরোপে দেশে দেশে ডানপন্থী জাতীয়তাবাদী দলগুলোর উত্থানে দেখা গেছে।
অস্ট্রেলিয়া এর ব্যতিক্রম নয়। ডিসেম্বর ২০২৫ সালে বন্ডাই সৈকতে একটি সন্ত্রাসী হামলার পর ওয়ান নেশনের জনপ্রিয়তা আরও লাফিয়ে বেড়েছে, যা দেখিয়ে দিচ্ছে, নিরাপত্তা ও জাতীয় পরিচয়ের প্রশ্নে মানুষ কতটা সংবেদনশীল।
আলবানিজ সরকারের সামনে এখন দুটি পথ। প্রথমটি হলো চাপের মুখে পিছু হটা এবং স্বল্প মেয়াদে জনপ্রিয়তা ধরে রাখার চেষ্টা করা। দ্বিতীয় পথটি হলো কঠিন সংস্কারের পথে দৃঢ়ভাবে এগিয়ে যাওয়া এবং সময়ের সঙ্গে মানুষকে ফল দেখানো।
ইতিহাস বলে, রাজনৈতিক সাহস দীর্ঘ মেয়াদে পুরস্কৃত হয়। কিন্তু সেই দীর্ঘ মেয়াদ পর্যন্ত টিকে থাকার ধৈর্য রাজনীতিবিদদের সব সময় থাকে না। ওয়ান নেশনের এই উত্থান আসলে অস্ট্রেলিয়ার মূলধারার রাজনীতিবিদদের জন্য একটি বড় সতর্কবার্তা।
জনগণের মৌলিক চাহিদা ও জীবনযাত্রার সংকট দূর করতে না পারলে রাজনীতির চাবিকাঠি যেকোনো সময় চরমপন্থীদের হাতে চলে যেতে পারে। অস্ট্রেলিয়া এখন সেই ধৈর্যের পরীক্ষার মুখে দাঁড়িয়ে আছে।
কাউসার খান, প্রথম আলোর সিডনি প্রতিনিধি।
ই–মেইল: [email protected]