ভিউর নেশায় বুঁদ: এই পরগণার অমানুষেরা!
· Prothom Alo

বাগেরহাটের সেই তথাকথিত ‘কনটেন্ট ক্রিয়েটর’ এবং পাশে দাঁড়িয়ে থাকা বিকারগ্রস্ত দর্শকেরা। তোমাদের নিন্দা জানাব, তেমন ভাষা তো সারাজাহানের পুরো লেক্সিকোন খুঁজেও পেলাম না। তোমরা সভ্যতার শত্রু! মানবতার দুশমন! শত ধিক তোমাদের!
Visit mchezo.life for more information.
খানজাহান আলীর মাজারের পুকুরে থাকা অনেক বয়সী নিরীহ কুমিরের সামনে একটি কুকুরকে বেঁধে রেখে সেটি ওই কুমিরকে খেতে প্রলুব্ধ করল ভিডিও করা ব্যক্তিরা। সেটি দাঁড়িয়ে দেখে বিকৃত মজা লুটল বেশ কয়েকজন। ওই ভিডিও সোশ্যাল মিডিয়ায় তুলে দিয়ে ভাইরাল করল ওই সব দুই পেয়ে কাপুরুষের দল।
ভাইরাল হওয়া রোমহর্ষক ঘটনাটির দিকে একবারের বেশি তাকিয়ে দেখা যায় না। কুকুরটি শেষ পর্যন্ত হন্তারকের দিকে তাকিয়ে ছিল ওকে বাঁচায় কি না, এই আশায়।
একটা অসুস্থ, অসহায় কুকুরকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিয়ে তোমরা প্রমাণ করলে যে বিবর্তনের ধারায় মানুষ হয়তো অনেক দূর এগিয়েছে, কিন্তু তোমাদের ভেতরে থাকা পশুটা এখনো গুহার যুগেই পড়ে আছে।
কি বীভৎস ব্যাপার। ক্যামেরা রেডি তো? রক্ত বেরোলে কিন্তু ভিউ বেশি পাওয়া যায়! যত জিঘাংসা তত তালি। কী মাৎস্যন্যায়ের যুগে এসে উপনীত হলাম আমরা?
আজকালকার ভাইরাল হওয়ার নেশাটা অনেকটা মাদকের মতো। তবে ড্রাগস নিলে মানুষ নিজের ক্ষতি করে, আর এই ‘ডিজিটাল সাইকোপ্যাথরা’ ভিউর জন্য অন্যের জান নিতেও দ্বিধা করে না। যাঁরা ভাবছেন, ‘আরে জাস্ট একটা কুকুরই তো’, তাঁদের জন্য করুণা হয়।
মনে রাখবেন: যে ব্যক্তি আজ একটা কুকুরের মৃত্যু ক্যামেরাবন্দী করে পৈশাচিক আনন্দ পায়, কাল সে তার পরিবারের কারও বিপদকেও ‘সিনেম্যাটিক শট’ হিসেবে দেখতে দ্বিধা করবে না। যারা পাশে দাঁড়িয়ে দাঁত বের করে এই তামাশা দেখছিল, তারা সমাজের জন্য হিংস্র কুমিরের চেয়েও বেশি বিপজ্জনক। কাল আপনার বিপদ হলেও তারা সাহায্য করবে না, বরং ফোনের ফ্ল্যাশ লাইট জ্বালিয়ে আপনার আর্তনাদ রেকর্ড করবে।
রক্তের দাগ ধুয়ে ফেলা যায়, কিন্তু বিবেকের পচন আড়াল করা যায় না। আমরা আসলে কোথায় যাচ্ছি?
মাজারের পুকুরে থাকা একটা নিরীহ শান্ত কুমিরকে মাংসের স্বাদ চিনিয়ে সমাজের জন্য ভয়ানক বিপদ ডেকে আনা হলো। এখন ওই পুকুরের পাশে যাওয়া কোনো মানুষকেই আর ছাড়বে না কলা-রুটি খেয়ে অভ্যাসের দাস হয়ে বেঁচে থাকা কুমিরটা। মাংসাশী প্রাণীর কাছে মানুষের রক্তের ঘ্রাণ সবচেয়ে প্রিয়। একবার চিনে গেলে সবার খবর আছে।
কী এক দয়া-মায়া, ভালোবাসাহীন সমাজ তৈরি করেছি আমরা। যেখানে গান, কবিতা, শিল্প, সাহিত্য, সংস্কৃতি ও সুকুমার বৃত্তি চর্চা বলে কিছুই আর অবশিষ্ট নেই। আছে শুধু অধর্মের বাড়াবাড়ি। আগাছায় বুঁদ হয়ে থাকার উদগ্র বাসনা।
ডিজিটাল বাংলাদেশের নাগরিক হতে গিয়ে কি আমরা মানবিকতার ন্যূনতম সংজ্ঞাটাও ভুলে গেলাম? এই অসুস্থ বিনোদনের যদি কঠোর বিচার না হয়, তবে পরবর্তী টার্গেট যে আপনি বা আপনার প্রিয়জন হবেন না, তার গ্যারান্টি কে দেবে?
ধিক্কার জানাই এই পৈশাচিক মানসিকতাকে। প্রশাসনের কাছে দাবি রইল, এই সব সস্তা ভিউ-লোভী অপরাধীদের এমন শাস্তি দেওয়া হোক, যেন ‘ভাইরাল’ হওয়ার ভূত ঘাড় থেকে চিরতরে নেমে যায়।
নাগরিক সংবাদে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: [email protected]