সমুদ্র, পাহাড় আর পথের মায়া

· Prothom Alo

প্রিয় পাঠক, প্রথম আলোয় নিয়মিত প্রকাশিত হচ্ছে আপনাদের লেখা। আপনিও পাঠান। গল্প-কবিতা নয়, বাস্তব অভিজ্ঞতা। আপনার নিজের জীবনের বা চোখে দেখা সত্যিকারের গল্প; আনন্দ বা সফলতায় ভরা কিংবা মানবিক, ইতিবাচক বা অভাবনীয় সব ঘটনা। শব্দসংখ্যা সর্বোচ্চ ৬০০। দেশে থাকুন কি বিদেশে; নাম, ঠিকানা, ফোন নম্বরসহ পাঠিয়ে দিন এই ঠিকানায়: [email protected]

Visit freshyourfeel.org for more information.

আমার বোন, তার পরিবার এবং আমার নিজের পুত্র, কন্যার অস্ট্রেলিয়ায় বসবাসের সুবাদে দেশটিতে যাওয়া হয় মাঝেমধ্যে। এবার পুত্র ও পুত্রবধূর উদ্যোগে গ্রেট ওশান রোড ভ্রমণের পরিকল্পনা করা হলো। সমুদ্র ছুঁয়ে চলা এই সড়কের দৈর্ঘ্য ২৪৩ কিলোমিটার, অবস্থান ভিক্টোরিয়া অঙ্গরাজ্যের দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলে। এটি বিশ্বের অন্যতম সামুদ্রিক ড্রাইভ। ১৯১৯ সালে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ থেকে ফিরে আসা সৈন্যরা সড়কটির খননকাজ শুরু করেন। কাজ শেষ হতে সময় লেগেছিল ১৩ বছর।

২০২৪ সালের জানুয়ারির এক রৌদ্রকরোজ্জ্বল সকালে আমাদের যাত্রা হলো শুরু। মেলবোর্ন থেকে প্রথমে টর্কি। এখান থেকেই শুরু গ্রেট ওশান রোড। টর্কি পেরিয়ে কিছুটা এগোতেই চোখে পড়ল রাস্তার দুই পাশে বিশাল–বিস্তৃত গোচারণ ভূমি। হাজার হাজার অস্ট্রেলিয়ান গরুর এক প্রদর্শনী যেন! প্রায় এক শ কিলোমিটার বেগে গাড়ি ছুটে চলেছে। আর দুচোখ ভরে দেখছি বিস্তীর্ণ ভূমিতে ধেনুকুলের শান্ত চলাচল, মাথা নুইয়ে কোথাও একাকী, কোথাও দলবদ্ধভাবে তাদের ঘাস খাওয়ার দৃশ্য।

গাড়ির গতি কিছুটা কমল। আমরা প্রবেশ করলাম ঘন জঙ্গলপথে। দুই পাশে রেইন ফরেস্টের মধ্যে আঁকাবাঁকা সরু পথ। বৃক্ষরাজির ভেতর দিয়ে যাচ্ছি আমরা। ঘন সবুজ বনাঞ্চল যেন চারপাশে পাতার চাঁদোয়া তৈরি করে রেখেছে। গাড়ির গ্লাস নামাতেই শুনলাম বাতাসে পাতার শোঁ শোঁ শব্দ আর মাঝেমধ্যে অজানা পাখির কলকাকলি।

বৃক্ষরাজ্য পেরিয়ে এবার দূর থেকে দেখা যাচ্ছে সফেদ সমুদ্রের মাথায় ঢেউয়ের
খেলা। দেখা মিলল সেই বহুল কাঙ্ক্ষিত সমুদ্রপাড় ধরে প্রশস্ত, মসৃণ গ্রেট ওশান রোড! কী মোহময়; প্রকৃতি ও মানুষের যুগল সৃষ্টি! গাঢ় নীল আকাশ থেকে নীল রং যেন চুইয়ে পড়ছে নীল সাগরে। কান পাতলে শোনা যাচ্ছিল সমুদ্রের গান।

আমরা পৌঁছে গেলাম অ্যাপোলো বে নামক সমুদ্র উপকূলবর্তী একটি ছোট শহরে। চারপাশে পাহাড়ে ঘেরা অপূর্ব সুন্দর অ্যাপোলো বের সমুদ্রসৈকত। এই সৈকত সার্ফিং, হাইকিং, বন্য পশুপাখি অন্বেষণ আর ড্রাইভের জন্য সেরা। সৈকতের আশপাশে সামুদ্রিক খাবারের জন্য গোটা কয়েক রেস্টুরেন্ট। আমরা সৈকতের কাছাকাছি একটা রেস্টুরেন্টে বসলাম। সমুদ্রপাড়ে এসে কাগজে মোড়ানো গরম ধোঁয়া ওঠা ফিশ অ্যান্ড চিপসের চেয়ে উপাদেয় খাবার আর কী হতে পারে!

সমুদ্রতীর ঘেঁষে গাড়ি এগোচ্ছে অন্যান্য পর্যটনস্থলের দিকে। এ রাস্তায় যেতে যেতে যেমন অসংখ্য সৈকতের দেখা মেলে, তেমনি তৈরি করা আছে পর্যটকদের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগ করার জন্য নির্দিষ্ট স্থান। এগুলো স্থানীয়ভাবে লুকআউট নামে পরিচিত। সময়স্বল্পতার কারণে প্রতিটি জায়গায় যাওয়া সম্ভব হলো না।

এবার যেখানে গাড়ি পার্ক করা হলো, তার সামনেই লন্ডন ব্রিজ। অস্ট্রেলিয়ায় লন্ডন ব্রিজের নাম শুনে খানিকটা অবাক হলাম। এটি একটি প্রাকৃতিক পাথরের সেতু। সমুদ্রের মাঝখানে একটি বিশাল পাহাড়ের স্তম্ভ এটির মূল আকর্ষণ। পাহাড়ের ভেতর দিয়ে জল বয়ে যাচ্ছে আর পাহাড়ের ওপরটা দেখতে সেতুর মতো বলে এ পাহাড়ের নাম হয়েছে লন্ডন ব্রিজ। এটি অবশ্য এখন লন্ডন আর্চ নামেও পরিচিত।

লন্ডন ব্রিজ থেকে ১০–১৫ মিনিট পরই দেখা মিলল আরেকটি দারুণ ট্যুরিস্ট স্পট, বে অব আইল্যান্ডের। এখানকার ঘন সবুজ বনানীবেষ্টিত সমুদ্রে দাঁড়িয়ে আছে অতিকায় বড় চুনাপাথরের স্তম্ভ। বড় বড় ঢেউ বিশাল পাহাড়গুলোকে কেটে স্তম্ভে পরিণত করে দিয়েছে! এসব স্তম্ভের বিশেষত্ব হলো, এদের রং তুলনামূলক হালকা হওয়ায় সূর্যচ্ছটায় বিভিন্ন সময় এরা বিভিন্ন রং ধারণ করে, যা আলোকচিত্রীদের জন্য বিশেষ আকর্ষণ। এখানকার শান্ত সমাহিত জলধারা মন ভালো করে দেয়।

এবার আমাদের গন্তব্য গ্রেট ওশান রোডের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ বিশ্ববিখ্যাত টুয়েলভ অ্যাপোসল। শুধু এটা দেখার জন্য প্রতিদিন এখানে গড়ে প্রায় ১২ হাজার পর্যটক ভিড় করেন। এগুলোকে টুয়েলভ অ্যাপোসল বলা হলেও এখানে কখনোই বারোটি চূড়া ছিল না। আগে আটটি চূড়ার তথ্য পাওয়া গেলেও বর্তমানে সাতটি চূড়া দাঁড়িয়ে আছে সমুদ্রবক্ষে। ছয়টি চূড়ার অবস্থান পাশাপাশি, গায়ে গা মিলিয়ে, আরেকটি কিছুটা দূরে—একা, বিষণ্ন। এগুলো প্রথমে পাহাড়ের সঙ্গে জড়িয়ে ছিল। কিন্তু সমুদ্রের ক্ষয়কার্যের ফলে খাড়া পাহাড় থেকে ধীরে ধীরে বিচ্যুত হয়ে যায়। জলের সঙ্গে পাথরের সাংঘর্ষিক প্রতিক্রিয়ার ফলে প্রতিদিন দুই সেন্টিমিটার ক্ষয় হচ্ছে এই পাথুরে সৌন্দর্য। বাইরে বোর্ডের মধ্যে সুন্দর করে ব্যাখ্যা করা আছে কীভাবে এসব পিলার বা চূড়া সমুদ্রজলের অবক্ষয়ের ফলে ছোট থেকে ছোট হতে হতে শেষ হয়ে যাচ্ছে।

এবার ফেরার পালা। কোনো এক শিল্পী যেন গাঢ় লাল আর গাঢ় কমলা রঙের মিশেল ছড়িয়ে দিয়েছেন পশ্চিমাকাশে। আর তার ফাঁক দিয়ে সূর্য ক্রমেই নেমে যাচ্ছে নিচের দিকে। ফিরতে ফিরতে অনুভব করছিলাম, প্রকৃতির যে সৌন্দর্য আজ চোখের সামনে উন্মোচিত হলো, অন্তর্দৃষ্টি দিয়ে তা অনুধাবন করা আর অন্তরে ধারণ করা নেহাতই সহজ নয়।

Read full story at source