আপনার দুঃখের কথা কহিতে অনেক
· Prothom Alo

বাংলাদেশের মধ্যযুগের কবি আলাওল ষোলো শতকের হার্মাদ তথা পর্তুগিজ জলদস্যুদের হাতে বন্দী অবস্থায় আরাকানের রাজধানী রোসাঙ্গে প্রবেশ করেন। সেখানে তিনি জীবিকার জন্য প্রথমে ‘রাজ-আসোয়ার’ পদে যোগ দেন। পরে একসময় রসিকরাজ মাগন আলাওলের কবিসত্তার পরিচয় পান এবং তাঁকে কাব্য রচনায় উদ্বুদ্ধ করেন। মূলত তাঁর পৃষ্ঠপোষকতায় আলাওল ১৬৫১ খ্রিষ্টাব্দের দিকে পদ্মাবতী রচনা করেন। কিন্তু একপর্যায়ে অপবাদের শিকার হয়ে তিনি রোসাঙ্গ কারাগারে বন্দী হন। প্রায় ৫০ দিন কারাভোগের পর আলাওল মুক্তি পান। তারপর প্রায় ৯ বছর তিনি পৃষ্ঠপোষকহীন করুণ জীবন যাপন করেন। এই করুণ জীবনকথা আলাওল বর্ণনা করেছেন সিকান্দরনামা কাব্যে। তিনি লিখেছেন, ‘কারাগারে পৈলু আমি না পাই বিচার।/ যথ ইতি বসতি হইল ছারখার।।/ শালাসনে মৈল সেই দিল অপবাদ।/ অস্থানে পড়িয়া পাইলু বহু অবসাদ।।/ মন্দকৃতি ভিক্ষাবৃত্তি জীবন কর্কশ।/ পুত্র দারা সঙ্গে মুঞি হৈলু পরবশ।।/...আপনা দুঃখের কথা কহিতে অনেক।’ এই বিবরণী থেকে জানা যায়, কবি আলাওল রোসাঙ্গে অভিবাসী থাকাকালে জীবিকা নির্বাহের জন্য স্ত্রী-পুত্র নিয়ে ভিক্ষাবৃত্তিসহ কষ্টসাধ্য জীবন অতিবাহিত করেন।
Visit fishroad-app.com for more information.
আলাওলের অভিবাসী-জীবনের করুণ কাহিনির সঙ্গে সাম্প্রতিক কালের বাংলাদেশে আশ্রিত রোহিঙ্গা শরণার্থীদের করুণ জীবনের সাদৃশ্য দেখে চমকে উঠতে হয়। আসলে ২০২২ সালের দিকে যুক্তরাষ্ট্রের দ্য ইউনিভার্সিটি অব শিকাগো থেকে জানতে পারি, সেই বিশ্ববিদ্যালয়ের সংগীত বিভাগের একজন গবেষক তমাল হোসেন বাংলাদেশে অভিবাসী রোহিঙ্গাদের ‘তারানা’ গান নিয়ে পিএইচডি গবেষণারত। মূলত তাঁর সঙ্গেই রোহিঙ্গা শরণার্থীদের সংগীত-সংস্কৃতির চর্চা প্রত্যক্ষ করার লক্ষ্যে ২০২৪ সালের ৩ জুলাই কবিবন্ধু রাজীব দাশের সহযোগিতায় কক্সবাজার জেলার উখিয়া উপজেলার কুতুপালং রেজিস্টার্ড ক্যাম্পে প্রবেশ করি। সেদিন ছিল তুমুল বৃষ্টি। তবু সেই বৃষ্টির মধ্যেই ক্যাম্পের বিখ্যাত শিল্পী ওসমান গণির কেআরসি-ই-০০২৭-৩ নম্বর ঘরে বিভিন্ন ক্যাম্প থেকে আসা ১২ জন গুণী সংগীত, নৃত্য ও বাদ্যযন্ত্রশিল্পী একত্র হয়েছিলেন। তাঁরা হলেন ওসমান (গায়ক ও বাদক), আবদুল মান (জুড়িবাদক), আবদুল উম্মত (তবলাবাদক), আবদুল মজিদ (গায়ক ও বাদক), লিয়াকত আলী (ম্যান্ডোলিনবাদক), তাহের (ম্যান্ডোলিনবাদক), আলম (জুড়িবাদক), মো. সোবহান (বেহালাবাদক), মোস্তাফা কামাল (নারী বাদক ও কণ্ঠশিল্পী), রোজিনা (নারী বাদক ও কণ্ঠশিল্পী), ছেতারা (নারী কণ্ঠশিল্পী) ও রহিমুল্লা ওরফে কালেদা (তৃতীয় লিঙ্গের কণ্ঠ ও নৃত্যশিল্পী)।
অস্থানে পড়িয়া পাইলু বহু অবসাদ।।/ মন্দকৃতি ভিক্ষাবৃত্তি জীবন কর্কশ।।/ পুত্র দারা সঙ্গে মুঞি হৈলু পরবশ।।/...আপনা দুঃখের কথা কহিতে অনেক।’ এই বিবরণী থেকে জানা যায়, কবি আলাওল রোসাঙ্গে অভিবাসী থাকাকালে জীবিকা নির্বাহের জন্য স্ত্রী-পুত্র নিয়ে ভিক্ষাবৃত্তিসহ কষ্টসাধ্য জীবন অতিবাহিত করেন।
আমাদের স্বাগত জানিয়ে রোহিঙ্গা শরণার্থীশিবিরের তরুণ শিল্পী তাহের বলেন, ‘আজগা সাত বছর হয়াগি আরা আরকানাত আয়া রিফুজি জিন্দেগি। আর জিন্দেগি নিজ আরকানর মাঝে, নিজ দেশর মাঝে, হির নিগি আরা সুখ পাইয়ি, কাঙ্গাল না, আর ফিরত চাই। আর কোনো চিন্তা নাই।’ এ কথাগুলো বলে রোহিঙ্গা শিল্পী নিজে হাতে ম্যান্ডোলিন বাজিয়ে গান গেয়ে ওঠেন। গানটি হলো:
আরকানওর মনো পড়িলে/ ঝরে দুই চোখের পানি/ বুঝাইলে মানা ন অড়ে/ আই তাহের বুঝাই ন পারি।/ দুই চোখের পানি রাখিতে ন পারি।...
এই গানের বাণীতে রোহিঙ্গাদের জন্মভূমি আরাকানের প্রতি অকৃত্রিম আবেগ ও ভালোবাসার কথা প্রকাশ পেয়েছে। বাংলাদেশের শরণার্থীশিবিরে অবস্থান নিয়ে প্রতিদিন আরাকানের অধিবাসীরা কীভাবে স্বদেশের স্মৃতিচারণা করে কাঁদেন, তার বর্ণনা রয়েছে।
গানটি রচনার সময়কাল সম্পর্কে জানতে চাইলে শিল্পী তাহের জানান, এটা তিনি তাৎক্ষণিকভাবে মুখে মুখে রচনা করে গেয়ে শোনালেন।
প্রায় একই ধরনের অভিব্যক্তি প্রকাশিত হয় রোহিঙ্গা শরণার্থীশিবিরের আরেকজন শিল্পী লিয়াকত আলীর একটি গানে। গানটি হলো:
ওরে সোনালি আরকান, তোর মতন নাই আরেক্ষান/…তোর হতা মনত ফইল্লে থাই নফারি/ আরে তোর মনত হললে কললে হুড়ে মন করি/ মনে হদ্দি উরি যাইতাম সোনালি আরকান/ তুই অঈলি আরকান রোহিঙ্গার জানর জান/…আরকান আরার ইমাম আমল আরার জন্মস্থান/ আরকান আরে ভুলি রইলে অইবা না ফরমান…/ আরা রোহাইঙ্গা জাতি আরা আরকানের হাটি/ আরকান নইলে ন বঁচিবো রোহাইঙ্গা জাতি।
এই গানের বাণীতে রোহিঙ্গাদের জন্মভূমি আরাকানের প্রতি অকৃত্রিম আবেগ ও ভালোবাসার কথা প্রকাশ পেয়েছে। বাংলাদেশের শরণার্থীশিবিরে অবস্থান নিয়ে প্রতিদিন আরাকানের অধিবাসীরা কীভাবে স্বদেশের স্মৃতিচারণা করে কাঁদেন, তার বর্ণনা রয়েছে।
এই গানের বাণীতে লিয়াকত আলী তাঁর জন্মভূমি আরাকানকে তুলনাহীন একটি দেশ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। শুধু তা–ই নয়, অকৃত্রিম দেশপ্রেমে তিনি নিজের দেশকে ধর্মীয় প্রার্থনার মতো পবিত্র মনে করেছেন। স্বদেশে প্রত্যাগমন ছাড়া রোহিঙ্গাদের জীবন-মরণের মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই। এমন কথা স্পষ্টভাবে গানটিতে প্রকাশ করেছেন।
রোহিঙ্গা শিল্পী আবদুল মজিদ জানান, ১৯৯২ সালে তিনি বাংলাদেশে আসেন। তিনি আগে নাটক করতেন, গান গাইতেন। দু–একটা গান লিখেছেন, সুরও করেন। কারণ, তাঁদের দেশে কোনো সুরকার নেই। তাই তাঁরা নিজেরা চেষ্টা করে যতটুকু পারেন, ততটুকু করছেন। তিনি তাঁদের দেশের কথা মনে করে একটি তারানা লিখেছেন। তিনি চান, তাঁদের দেশের লোক যারা এখানে আছে, তাদের জাগিয়ে তুলতে। তাঁর গানটি হলো:
ওরে ও ভাই-বইন আরকানবাসী/ পরদেশত আই ন থাইক্কো বসি।/ গুরি আইলাম আরকান হালি?/ নও উড়ন্নে দেশোরিয়ালি?/ নিচিন্তা কেন রইয়ো রে ফরি/ রে ও আরকানবাসী।/ জ্ঞানীগুণী মানুষে হর/ পরের ঘরত ছেপর ডর/ দুইদিনল্লা আইলাম পরবাসী/ রে ও আরকানবাসী/ পরদেশত আই ন থাইক্কো বসি।
মো. সোবহান, আবদুল মজিদ ও লিয়াকত আলীগানটি সম্পর্কে আবদুল মজিদ বলেন, ‘একটা উদ্দেশ্য নিয়ে আমি গানটি গেয়েছি। আমরা ১৯৯২ সালে যারা রিফুজি হয়ে এখানে আসছি, আমাদের ৩০-৩২ বছর হয়ে গেছে এখানকার জীবনযাপনের।...আমার গানে বলেছি, আমাদের আরকানের লোক দেশ ছেড়ে যে এখানে এসেছি; কিন্তু চুপ করে ঘুমে থাকিও না। তোমাদের কিছু করা উচিত দেশের জন্য। এটাই এই গানের মাধ্যমে বোঝাতে চেয়েছি।’
গানটি অনেকটা উদ্দীপনামূলক। এতে মূলত রোহিঙ্গাদের স্বদেশে ফিরে যাওয়ার আকাঙ্ক্ষা রয়েছে। রোহিঙ্গা শরণার্থীশিবিরের সব শরণার্থীকে তিনি এই গানের মাধ্যমে দেশপ্রেমে দীক্ষা দিতে চেয়েছেন।
রোহিঙ্গাদের গানের সুরে অনেক সময় বাংলা গানের সুর ব্যবহৃত হয়। যেমন লিয়াকত আলীর গাওয়া একটি গানে বাংলাদেশের গায়ক মুজিব পরদেশীর বিখ্যাত একটি গানের সুর খুঁজে পাওয়া যায়। মুজিব পরদেশীর গাওয়া ‘আমার সোনাবন্ধু রে/ তুমি কোথায় রইলা রে’ গানটি ১৯৮০-এর দশকের শেষের দিকে অত্যন্ত জনপ্রিয় হয়েছিল। এই গানের সুর ব্যবহার করে লিয়াকত আলী একটি গান গেয়ে শোনান। গানটি হলো:
গানটি সম্পর্কে আবদুল মজিদ বলেন, ‘একটা উদ্দেশ্য নিয়ে আমি গানটি গেয়েছি। আমরা ১৯৯২ সালে যারা রিফুজি হয়ে এখানে আসছি, আমাদের ৩০-৩২ বছর হয়ে গেছে এখানকার জীবনযাপনের।...আমার গানে বলেছি, আমাদের আরকানের লোক দেশ ছেড়ে যে এখানে এসেছি; কিন্তু চুপ করে ঘুমে থাকিও না।
আদরের আরকান লে আরার ন ভুললুম তোরে/ কোনো দিন ন ভুলিউম জরমভূমি রে।।/ দেশের হতা রোহিঙ্গার মনত যদি উঠিলে/ চোখের পানি ঝরি পড়ি ছিনা ভরে।…আরা ন চাই তোর বদলে হীরামতি ধন/ আরা শুধু চাই তোরে প্রতি জন জন।।
এই গানের সুরের ব্যবহার নিয়ে প্রশ্ন করলে লিয়াকত বলেন, ‘আমার জানামতে রোহিঙ্গাদের মধ্যে আগে কোনো সুরকার ছিল না, সুরকার আমরা পাইনি। এখান থেকে আবদুল আলীম, শেফালী ঘোষ, সেলিম নিজামী, আশরাফ উদাস—এঁদের গানের সুর নিতাম, ভাষাটা আমাদের করে নিতাম।’
আবদুল আলীমের গান বাংলায় কখনো করতেন?
এর উত্তরে লিয়াকত আলী বলেন, ‘বাংলায় করলে [আমাদের কেউ] বুঝবে না। [তাই] আমরা মূলত সুরটা নিতাম। ভাষাটা, কথাগুলো আমরা রোহিঙ্গা তৈরি করে নিতাম।’
ইন্টারনেটের আগে এই গান ওখানে কেমন করে গেল?
লিয়াকত আলী বলেন, ‘আসলে এখানকার [বাংলাদেশের চট্টগ্রাম অঞ্চলের] লোকজন রেঙ্গুনে যেত। তাদের সঙ্গে ক্যাসেটের মাধ্যমে গানগুলো যেত। তখন ক্যাসেট নিয়ে যেত।’
রোহিঙ্গা গীতিকার, বাদ্যযন্ত্রী ও শিল্পী লিয়াকত আলীর ভাষ্যে রোহিঙ্গাদের গানের সুর যে মূলত বাংলাদেশের ঐতিহ্যগত সুর থেকে গৃহীত, সেই সত্য জানা যায়। একই সঙ্গে বাংলাদেশের লোকগানের সুরের ওপর রোহিঙ্গা ভাষার প্রয়োগে সংগীত ঐতিহ্যের নতুন একটি ধারা সৃষ্টির ইতিহাস ব্যক্ত হয়।
রোহিঙ্গা শিল্পীদের মধ্যে বহু নারী ও তৃতীয় লিঙ্গের মানুষের উপস্থিতি প্রত্যক্ষ করা যায়। আমাদের দেখা আসরে নারী শিল্পীদের মধ্যে ছিলেন রোজিনা, মোস্তাফা কামাল ও ছেতারা। তৃতীয় লিঙ্গের শিল্পী ছিলেন রহিমুল্লাহ ওরফে কালেদা। নারী শিল্পীদের মধ্যে প্রথম গান উপস্থাপন করেন মোস্তাফা কামাল। তিনি মূলত হারমোনিয়াম বাজিয়ে গান পরিবেশন করেন। তাঁর পরিবেশিত গানের মধ্যে অন্য শিল্পীরা তবলা, মন্দিরা প্রভৃতি বাজিয়ে সংগত করেন। মোস্তাফা কামাল গান পরিবেশনের আগে হারমোনিয়ামে সুর তুলে বলে নেন, ‘এখন জীবন কাল গৈ। ৩০ বছরের হানা হাইলাম, লাভ দুনিয়াত করলাম কি? লিয়াকত আলী কইলো, তুয়ারে হাওয়াই ন পারি কিছু।’ এরপর তিনি গান শুরু করেন:
ও জ্বালারে/ অল্প বয়সত হইলাম রাড়ি/ দুনঙ্গের গইয়াতু বাপোর বাড়ি/ তোর তু শুধু আর কাদাইবার বাসনা/ ওই কালা গো চাদ দুখিনী রে/ ও জ্বালারে/ ন মারিও ন ধরিও/ প্রেম যমুনাত আর ন ভাসাইও/ সুখে তু আর কাঁদাইবার বাসনা...
এই গানের সুরের ব্যবহার নিয়ে প্রশ্ন করলে লিয়াকত বলেন, ‘আমার জানামতে রোহিঙ্গাদের মধ্যে আগে কোনো সুরকার ছিল না, সুরকার আমরা পাইনি। এখান থেকে আবদুল আলীম, শেফালী ঘোষ, সেলিম নিজামী, আশরাফ উদাস—এঁদের গানের সুর নিতাম, ভাষাটা আমাদের করে নিতাম।’
রোহিঙ্গা বয়স্ক নারী শিল্পী মোস্তাফা কামালের আত্মকথা থেকে জানা যায়, তাঁর নামটি তাঁর দাদা রেখেছিলেন। আরাকানে তাঁর জন্ম। আরাকানে থাকার সময় মক্তবে গিয়ে তিনি ওস্তাদের কাছে কাওয়ালি শিখেছিলেন। এখনো তিনি বিভিন্ন অনুষ্ঠানে কাওয়ালি পরিবেশন করেন। তারপর বাংলাদেশে আসার পরে তাঁর মা–বাবার মৃত্যু হয়। মা–বাবার মৃত্যুর পর তিনি বেশ অসহায় হয়ে পড়েন। পরে রোহিঙ্গা শরণার্থীশিবিরের শিল্পীদের কাছে নতুন করে গানের শিক্ষা নেন। বিশেষ করে হারমোনিয়াম ও অন্যান্য বাদ্যযন্ত্র বাদন শেখেন। এখন তিনি হারমোনিয়াম বাজিয়ে গান গাইতে খুব পছন্দ করেন। তিনি তেমন কোনো প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা গ্রহণ করতে পারেননি। তাই খাতা-কলমে গান লিখতে পারেন না। তবে অন্তরে গান লিখে তা মুখে মুখে গেয়ে উপস্থাপন করেন।
রোহিঙ্গা শরণার্থীদের মধ্যে ছেতারা বেগম বিখ্যাত একজন শিল্পী। তিনি একটু দেরি করে এসে আমাদের সামনে নিজের পরিচয় দিয়ে কয়েকটি গান পরিবেশন করেন। তাঁর পরিবেশিত প্রথম গানেই রোহিঙ্গাদের পিছিয়ে পড়ার কারণ উল্লেখ করা হয়। এ ক্ষেত্রে তিনি মূলত শিক্ষাবঞ্চিত রোহিঙ্গাদের উদ্দেশে গানের সুরে বলেন:
ও পন্নার কি জানো নি তুয়ারা/ পন্না যে ন জানে চক্ষা আন্ধারা।/ ও গন্না বরি বরি ঘুরে আই চিনো/ পন্না বরি বরি এলোমেরে শিখো/ বুরা বুরা জন পন্নারে পরো/ ও ও ও পন্না পয়ে…/ ডাক্তার মাস্টার তুয়ারা বানাইবা/ পন্না যে ন জানে চক্ষা আন্ধারা।/ ও পন্নার কি জানো নি তুয়ারা…।
এই গানে তিনি উল্লেখ করেছেন, তাঁরা বার্মা থাকাকালীনও লেখাপড়া করতে পারেননি। হয়তো কোনো কষ্ট পেয়েছেন, সে জন্য দেশ থেকে বাংলাদেশে এসেছেন। এখানেও তাঁরা লেখাপড়া করতে পারছেন না। তাই তাঁদের মনের আবেগ কাউকে প্রকাশই করতে পারছেন না। এই মনের আবেগ প্রকাশের জন্য তিনি চান সবাই লেখাপড়া করুক। তাহলে হয়তো তাঁরা একটি আলোর দিশা পাবেন। এই গানের কথায় রোহিঙ্গা শরণার্থীদের শিক্ষা থেকে বঞ্চনার ইতিহাস প্রকাশ পেয়েছে।
পরিশেষে আমরা রোহিঙ্গা শরণার্থীশিবিরে বসবাসরত একজন তৃতীয় লিঙ্গ তথা হিজড়া শিল্পী রহিমুল্লার মুখোমুখি হই। তিনি আমাদের জানান, রোহিঙ্গা শরণার্থীশিবিরে ২০ জনের বেশি তৃতীয় লিঙ্গের শিল্পী রয়েছেন, যাঁরা নিয়মিত বিভিন্ন অনুষ্ঠানে গীতি-নৃত্য উপস্থাপন করে থাকেন।
একপর্যায়ে তাহেরের ম্যান্ডোলিনের ঐন্দ্রজালিক সুরের মধ্যে রহিমুল্লা ওরফে কালেদা একটি প্রেমের গান গেয়ে ওঠেন। গানটি হলো:
রোহিঙ্গা গীতিকার, বাদ্যযন্ত্রী ও শিল্পী লিয়াকত আলীর ভাষ্যে রোহিঙ্গাদের গানের সুর যে মূলত বাংলাদেশের ঐতিহ্যগত সুর থেকে গৃহীত, সেই সত্য জানা যায়। একই সঙ্গে বাংলাদেশের লোকগানের সুরের ওপর রোহিঙ্গা ভাষার প্রয়োগে সংগীত ঐতিহ্যের নতুন একটি ধারা সৃষ্টির ইতিহাস ব্যক্ত হয়।
আহা রে সুখের রাত ন গইজ্জো ফজর/ আদি আতো আইবো আর পরানো নাগর/ আইবো পরানো নাগর।/
তাজা ফুল দি সাজাইলাম রঙের বাসারি/ গোলাপ মালা সরগত রাকছি গলসত করি/ অরবা...গলি আহার দিলত লাগে.../ আইবো পরানো নাগর।...
গানের একটি পর্যায়ে কালেদা বসা থেকে উঠে দাঁড়ান এবং গাইতে গাইতে নাচতে শুরু করেন। তাঁর নৃত্য-তালের সঙ্গে তাল মিলিয়ে বাদ্যযন্ত্রীদের হাতের ভেতর বেজে ওঠে মন্দিরা। ম্যান্ডোলিনের সুর, মন্দিরা ঝংকারে যখন কালেদা মোহনীয় নৃত্য করতে থাকেন, তখন উপস্থিত অন্যরা হাতে তালি দিতে থাকেন। এতে কালেদার নৃত্যে প্রাণময় রূপ তৈরি হয়।
কালেদার এই নৃত্য পরিবেশন আমাদের সামনে রোহিঙ্গাদের নৃত্য–ঐতিহ্যের একটি দৃষ্টান্ত হাজির করে। শুধু তা–ই নয়, আমরা লক্ষ করি, তৃতীয় লিঙ্গের মানুষ রহিমুল্লা ওরফে কালেদার গানের বিষয়বস্তু অন্যদের থেকে একটু ব্যতিক্রম। তিনি মূলত নারীর বেশ ধারণের মাধ্যমে রোমান্টিক প্রেমের গান পরিবেশন করেই শ্রোতাদের মোহিত করতে পছন্দ করেন। তাঁর পরিবেশিত উপর্যুক্ত গানের বাণীতে মূলত প্রেমিকের উদ্দেশে প্রেমিকার প্রেমকথা ব্যক্ত হয়েছে।
আমরা জানি, অভিবাসীদের জীবন পৃথিবীর সব স্থানে সব সময় অত্যন্ত যন্ত্রণাকাতর ও অমর্যাদাকর। এই গ্লানিকর জীবনের মধ্যে সংগীত-সংস্কৃতি একধরনের উদ্দীপনা হয়ে প্রকাশ পায়। কেননা যে যন্ত্রণার কথা ভাষা–বাক্য বা কথায় প্রকাশ অসম্ভব, গানের সুরের আশ্রয়ে সেই অব্যক্তকে প্রকাশ করা সম্ভব। রোহিঙ্গা শরণার্থীদের গানের পাঠ বিবেচনায় নিলে এই সত্য নতুনভাবে উপলব্ধি করা যায়। রোহিঙ্গাদের গানের ভাষ্যে দেশহারা মানুষের বেদনার কথা যেমন আছে, তেমনি দেশে ফেরার ব্যাকুলতার কথা আছে। একই সঙ্গে তাদের সংগীত-সংস্কৃতির বৈচিত্র্য এবং চর্চার ধারাবাহিকতাও পরিলক্ষিত হয়। নর, নারী ও তৃতীয় লিঙ্গের রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে শুধু রোহিঙ্গাদের নিজস্ব সংগীত বিকশিত ও চর্চিত হচ্ছে না, তাদের গানের সঙ্গে মিশে থাকা বাংলার ঐতিহ্যগত সুরের ধারাও প্রবহমান রয়েছে।