কুকুর কি সত্যিই মানুষের কথা বুঝতে পারে
· Prothom Alo

আপনার পোষা কুকুরের চোখের দিকে তাকিয়ে কখনো কি মনে হয়েছে, ও আসলে কী বলতে চাইছে? বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে থাকা পোষা প্রাণীর মালিকদের মনে হয়তো মাঝেমধ্যেই এ প্রশ্ন উঁকি দেয়। কুকুর ঘেউ ঘেউ করে, বিড়াল মিউ মিউ করে বা টিয়া পাখি শিস দিয়ে আমাদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করে। এটিই প্রকৃতির নিয়ম। তবে এসব প্রাণী কোনো শব্দ ব্যবহার করে নিজেদের মনের ভাব প্রকাশ করছে কি না, তা জানতে আগ্রহী বিজ্ঞানীরা।
২০১৯ সালে ক্যালিফোর্নিয়ার সান ডিয়েগোতে ক্রিস্টিনা হাঙ্গার নামের এক স্পিচ থেরাপিস্ট তাঁর পোষা কুকুর স্টেলাকে একটি শব্দযন্ত্রের সাহায্যে প্রশিক্ষণ দেওয়া শুরু করেন। এই যন্ত্রে অনেকগুলো বোতাম থাকে যা চাপলে আগে থেকে রেকর্ড করা শব্দ যেমন ‘বাইরে যাওয়া’, ‘খাবার’ বা ‘পানি’ শোনা যায়। হাঙ্গার শিশুদের ভাষা শেখানোর ক্ষেত্রে এ ধরনের যন্ত্র ব্যবহার করতেন। তিনি কৌতূহলী ছিলেন যে একটি কুকুরও একইভাবে ভাষা শিখতে পারে কি না।
Visit chickenroad-game.rodeo for more information.
অবিশ্বাস্যভাবে স্টেলা ৫০টির বেশি শব্দ শিখে ফেলে, এমনকি কয়েকটি শব্দ মিলিয়ে বাক্য তৈরি করতেও শুরু করে। স্টেলার এই প্রতিভা প্রচারমাধ্যমে শোরগোল ফেলে দিলেও অনেক বিজ্ঞানী একে নিছক কাকতালীয় বলে সন্দেহ প্রকাশ করেন। ক্যালিফোর্নিয়া ইউনিভার্সিটির কগনিটিভ সায়েন্সের অধ্যাপক ফেদেরিকো রোসানো ছিলেন তাঁদের একজন। তিনি প্রশ্ন করেন, কুকুর কি সত্যিই শব্দ বোঝে নাকি এলোমেলোভাবে বোতাম চাপে?
বিজ্ঞানী রোসানো যখন ‘বানি’ নামের একটি শেপাডুডল প্রজাতির কুকুরের বুদ্ধিমত্তা সম্পর্কে জানতে পারেন, তখন তার প্রাথমিক সংশয় দূর হতে শুরু করে। দেখা যায় যে বানি অত্যন্ত সুচিন্তিতভাবে বোতাম ব্যবহার করছে। এরপরই রোসানো শুরু করেন ডগ কমিউনিকেশন প্রজেক্ট। বর্তমানে এই গবেষণায় ৪৭টি দেশের প্রায় ১০ হাজার কুকুর ও ৭০০টি বিড়াল অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। এটি মূলত একটি সিটিজেন সায়েন্স প্রকল্প যেখানে পোষা প্রাণীরা তাদের চিরচেনা ঘরোয়া পরিবেশেই গবেষণায় অংশ নেয়। মালিকেরা তাদের গতিবিধি ক্যামেরা ও অডিও ডিভাইসের মাধ্যমে রেকর্ড করে গবেষকদের কাছে পাঠান।
গবেষকদের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল ‘ক্লেভার হ্যান্স ইফেক্ট’ নামের একটি সমস্যা এড়ানো। বিংশ শতাব্দীর শুরুতে ‘হ্যান্স’ নামের একটি ঘোড়া ক্ষুর ঠুকে গণিত সমাধান করে সবাইকে তাক লাগিয়ে দিয়েছিল। পরে দেখা যায়, ঘোড়াটি আসলে গণিত জানত না। সে তার মালিকের সূক্ষ্ম শারীরিক ভাষা বা ইশারা বুঝে প্রতিক্রিয়া জানাত। কুকুরও কি মানুষের ইশারা বুঝে বোতাম টিপছে? এটি নিশ্চিত করতে বিজ্ঞানী রোসানো অত্যন্ত সতর্কভাবে পরীক্ষা সাজিয়েছেন। ভিডিও রেকর্ডিং ও মানুষের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ কমিয়ে দিয়ে দেখা হয়েছে, কুকুর একা থাকার সময় বা মানুষের সংকেত ছাড়া সঠিক বোতাম চাপতে পারে কি না।
গবেষণার প্রাথমিক ফল বেশ আশাব্যঞ্জক। দেখা গেছে, অনেক কুকুরই শব্দের অর্থ বুঝে বোতাম ব্যবহার করে। তারা যখন বাইরে, খাবার ও পানির বোতাম পরপর চাপে, তখন বোঝা যায়, এটি কোনো এলোমেলো ঘটনা নয়। গবেষণার প্রায় ৫২৬টি কুকুর এখন নিয়মিত একাধিক শব্দের সমন্বয় ঘটিয়ে মানুষের সঙ্গে ভাব বিনিময় করছে।
সবচেয়ে চমকপ্রদ ঘটনাটি ঘটেছিল বানি নামের কুকুরটির ক্ষেত্রে। একদিন বানি পর্যায়ক্রমে চারটি বোতাম চাপে। পরে দেখা যায়, তার পায়ের তালুতে একটি বিষাক্ত কাঁটা ফুটে ছিল যা থেকে অসহ্য যন্ত্রণা হচ্ছিল। এ ধরনের প্রতিক্রিয়া প্রমাণ করে যে তারা কেবল নির্দেশ মানছে না, অনুভূতিও প্রকাশ করছে। একটি কুকুর বাইরে যাওয়ার জন্য বোতাম চাপলে মালিক যখন পরে যাওয়ার কথা বলেন, তখন কুকুরটি সঙ্গে সঙ্গেই ‘এখন’ বোতাম চেপে আবার নিজের দাবি জানায়।
অধ্যাপক রোসানো বলেন, কুকুর তো আর মানুষ নয়, কিন্তু তার বুদ্ধিবৃত্তি একটি ছোট শিশুর সমপর্যায়ের হতে পারে। যদি তারা আমাদের কথা সত্যিই বুঝতে পারে, তাহলে তাদের লালন-পালন ও কল্যাণের বিষয়ে আমাদের নতুন করে ভাবার সময় এসেছে। শব্দ বোঝার এই সক্ষমতা কেবল কুকুর-মানুষের বন্ধনকেই দৃঢ় করবে না, পাশাপাশি তাদের মনের অস্থিরতা ও বিষণ্নতা কমাতেও সাহায্য করবে।
সূত্র: আর্থ ডটকম