ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে আট পরামর্শ দিলেন চিকিৎসকেরা, অন্তঃসত্ত্বারা কী করবেন

· Prothom Alo

দেশে ডায়াবেটিসের প্রকোপ উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে। বর্তমানে প্রায় আড়াই কোটি মানুষ এই রোগে আক্রান্ত বলে জানিয়েছেন চিকিৎসকেরা। ২০৫০ সালের মধ্যে এই সংখ্যা দ্বিগুণ হতে পারে বলেও আশঙ্কা করছেন চিকিৎসকেরা।

বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকেরা বলছেন, দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় সাড়ে ৭ শতাংশ এখন ডায়াবেটিসে আক্রান্ত। অনিয়ন্ত্রিত খাদ্যাভ্যাস, শারীরিক পরিশ্রমের অভাব, স্থূলতা এবং অসচেতনতা এ রোগের ঝুঁকি বাড়ায়।

Visit likesport.biz for more information.

‘ডায়াবেটিসের ঝুঁকি মোকাবিলায় আগাম প্রস্তুতি ও দ্রুত পদক্ষেপ’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে এসব পরামর্শ দেন চিকিৎসকেরা। আজ রোববার রাজধানীর কারওয়ান বাজারে প্রথম আলো ভবনে এ বৈঠকের আয়োজন করা হয়। আয়োজক বাংলাদেশ এন্ডোক্রাইন সোসাইটি। প্রচার সহযোগী প্রথম আলো।

চিকিৎসকেরা বলেন, ডায়াবেটিস একবার হলে সাধারণত পুরোপুরি নিরাময় করা যায় না। তবে ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে স্বাস্থ্যকর খাবার, নিয়মিত হাঁটাচলা ও ব্যায়াম, সময়মতো পরীক্ষা, চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ওষুধ সেবন এবং জটিলতা শনাক্তে নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা—এই বিষয়গুলোতে ব্যক্তিকে গুরুত্ব দিতে হবে। পাশাপাশি ভুল চিকিৎসা ও ইনসুলিন নিয়ে ভ্রান্ত ধারণা থেকে দূরে থাকতে হবে।

কিন্তু রোগটি নিয়ন্ত্রণে না থাকলে হৃদ্‌রোগ, স্ট্রোক, কিডনি বিকল হওয়া এবং রক্তনালির জটিলতা দেখা দিতে পারে। চোখ ও স্নায়ুরও ক্ষতি হতে পারে। এতে রোগীর স্বাভাবিক জীবনযাপন ব্যাহত হয়। চিকিৎসার ব্যয় বাড়ে। পরিবার ও স্বাস্থ্যব্যবস্থার ওপরও বাড়তি চাপ তৈরি হয়। তাই ডায়াবেটিস হওয়ার আগেই সচেতনতা, দ্রুত রোগ শনাক্ত এবং আক্রান্ত ব্যক্তির নিয়মিত চিকিৎসা নিশ্চিত করা জরুরি।

গোলটেবিল আলোচনায় অংশ নেন বাংলাদেশ মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক এ এফ এম সিদ্দিকী, স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক নাজমুল হোসেন, বাংলাদেশ এন্ডোক্রাইন সোসাইটির সভাপতি ও বারডেম জেনারেল হাসপাতালের এন্ডোক্রাইনোলজি বিভাগের প্রধান ফারিয়া আফসানা, বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের এন্ডোক্রাইনোলজি বিভাগের পিএইচডি গবেষক আফসার আহমেদ, বাংলাদেশ মেডিকেল কলেজের গাইনোকোলজি ও অবস্টেট্রিকস বিভাগের চেয়ারম্যান সেহেরীন এফ সিদ্দিকা প্রমুখ। তাঁরা ব্যক্তিপর্যায়ে ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে আটটি পরামর্শ দিয়েছেন। অন্তঃসত্ত্বাদের জন্য দিয়েছেন বিশেষ পরামর্শ।

ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে ব্যক্তি পর্যায়ে ৮ পরামর্শ

১. স্বাস্থ্যকর ও পরিমিত খাবার: চিকিৎসকেরা স্বাস্থ্যকর ও পরিমিত খাবার গ্রহণের পরামর্শ দিয়ে বলেন, অস্বাস্থ্যকর ও অপুষ্টিকর খাবার ডায়াবেটিস ও স্থূলতার ঝুঁকি বাড়ায়। তাই খাবারের তালিকায় শাকসবজি, ফল, আঁশযুক্ত খাবার ও পুষ্টিকর উপাদান রাখতে হবে। অতিরিক্ত চিনি, মিষ্টি ও প্রক্রিয়াজাত খাবার এড়িয়ে চলতে হবে।

২. পরিমিত শর্করা: ভাত, রুটি ও অন্যান্য শর্করাজাতীয় খাবার শরীরে রক্তে শর্করার মাত্রা বাড়াতে পারে। তাই একবারে বেশি না খেয়ে পরিমিত খেতে হবে। ব্যক্তির শারীরিক অবস্থা ও রক্তে শর্করার মাত্রা বিবেচনায় পুষ্টিবিদের পরামর্শে খাবারের পরিমাণ ঠিক করা ভালো।

৩. ১৫০ মিনিট হাঁটা: নিয়মিত হাঁটাচলা শরীরের ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখে এবং রক্তে শর্করার মাত্রা কমাতে সাহায্য করে। সপ্তাহে অন্তত ১৫০ মিনিট হাঁটার পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। একসঙ্গে দীর্ঘ সময় হাঁটা সম্ভব না হলে প্রতিদিন ভাগ করে হাঁটা যেতে পারে।

৪. ব্যায়াম বাড়ানো: দীর্ঘ সময় বসে থাকা ও শারীরিক পরিশ্রমের অভাব স্থূলতার ঝুঁকি বাড়ায়। তাই নিয়মিত হাঁটার পাশাপাশি দৈনন্দিন কাজে সক্রিয় থাকতে হবে। নিজের বয়স ও শারীরিক সক্ষমতা অনুযায়ী ব্যায়াম বা শরীরচর্চা করা প্রয়োজন।

৫. আগেই পরীক্ষা করা: পরিবারে ডায়াবেটিসের ইতিহাস, অতিরিক্ত ওজন বা স্থূলতা থাকলে ঝুঁকি সম্পর্কে সচেতন হতে হবে। নিয়মিত পরীক্ষা করে প্রাথমিক পর্যায়ে প্রি-ডায়াবেটিস শনাক্ত করা গেলে জীবনযাপনে পরিবর্তন এনে রোগটি প্রতিরোধ বা বিলম্বিত করা সম্ভব। আক্রান্ত ব্যক্তিরও চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী নিয়মিত রক্তে শর্করা পরীক্ষা করা উচিত।

৬.নিয়মিত ওষুধ খাওয়া: অনেকে অনিয়মিতভাবে ওষুধ খান বা নিজের সিদ্ধান্তে ওষুধ বন্ধ করে দেন। এতে ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে। তাই চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী নির্ধারিত মাত্রায় ওষুধ সেবন করতে হবে। ইনসুলিন শুরু করলে তা আর বন্ধ করা যায় না—এ ধারণাও ঠিক নয়। ইনসুলিন প্রয়োজন কি না, তা চিকিৎসক রোগীর অবস্থা বিবেচনা করে ঠিক করবেন।

৭. অন্য জটিলতা নিয়ন্ত্রণে রাখা: ডায়াবেটিসের সঙ্গে উচ্চ রক্তচাপ, রক্তে চর্বির আধিক্য, কিডনি ও হৃদ্‌রোগের ঝুঁকি থাকতে পারে। চোখ, স্নায়ু ও পায়েরও ক্ষতি হতে পারে। তাই শুধু রক্তে শর্করা পরীক্ষা করলেই হবে না। চিকিৎসকের পরামর্শে রক্তচাপ, কিডনি, হৃদ্‌যন্ত্র, চোখ ও পায়ের অবস্থাও নিয়মিত পরীক্ষা করতে হবে।

৮. বিজ্ঞাপনের ফাঁদে না পড়া: ডায়াবেটিস সারানোর নামে প্রচারিত হারবাল বা অবৈজ্ঞানিক চিকিৎসা এবং চমকপ্রদ বিজ্ঞাপনে বিভ্রান্ত হওয়া যাবে না। এসব চিকিৎসার ওপর নির্ভর করলে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা ব্যাহত হতে পারে। তাই ওষুধ বা চিকিৎসাপদ্ধতি পরিবর্তনের আগে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে।

চিকিৎসকেরা ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে স্বাস্থ্যকর খাবার, নিয়মিত হাঁটাচলা ও ব্যায়াম, সময়মতো পরীক্ষা, চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ওষুধ সেবন এবং জটিলতা শনাক্তে নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা—এই বিষয়গুলোতে ব্যক্তিকে গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলেন। পাশাপাশি ভুল চিকিৎসা ও ইনসুলিন নিয়ে ভ্রান্ত ধারণা দূর করার ওপর জোর দেন।

গর্ভাবস্থায় ডায়াবেটিস

গর্ভাবস্থায় ডায়াবেটিস মা ও অনাগত সন্তানের জন্য জটিলতা তৈরি করতে পারে। এ ঝুঁকি কমাতে সন্তান নেওয়ার আগেই মায়ের রক্তে শর্করা পরীক্ষা ও নিয়ন্ত্রণ করার কথা বলেন বাংলাদেশ মেডিকেল কলেজের গাইনোকোলজি ও অবস্টেট্রিকস বিভাগের চেয়ারম্যান সেহেরীন এফ সিদ্দিকা।

সেহেরীন এফ সিদ্দিকা বেশকিছু পরামর্শ দেন অন্তঃসত্ত্বাদের জন্য। সন্তান নেওয়ার আগেই মায়েদের ডায়াবেটিস শনাক্ত ও নিয়ন্ত্রণ করে নিরাপদ, ডায়াবেটিসমুক্ত গর্ভধারণ নিশ্চিতের পরামর্শ দিয়ে অধ্যাপক সেহেরীন এফ সিদ্দিকা বলেন, গর্ভাবস্থায় ডায়াবেটিস মা ও সন্তান—দুজনের জন্যই ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। এ কারণে সন্তান নেওয়ার পরিকল্পনা করার সময় থেকেই ব্লাড সুগার নিয়ন্ত্রণ রক্তে শর্করার মাত্রা পরীক্ষা (ব্লাড সুগার টেস্ট) করা প্রয়োজন।

প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবায় ডায়াবেটিস পরীক্ষা প্রসব ও প্রসব-পরবর্তী পরীক্ষা খাদ্যাভ্যাস ও হাঁটাচলায় নিয়ন্ত্রণ সন্তান নেওয়ার আগেই প্রস্তুতির কথা বলেন সেহেরীন এফ সিদ্দিকা।

গর্ভাবস্থায় ঝুঁকিপূর্ণ মায়েদের দ্রুত শনাক্ত করে ডায়াবেটিস পরীক্ষা, নিয়মিত ব্লাড সুগার নিয়ন্ত্রণ, সঠিক খাদ্যাভ্যাস ও হাঁটাচলার ব্যবস্থা করতে হবে উল্লেখ করে সেহেরীন এফ সিদ্দিকা বলেন, গর্ভধারণের পর ঝুঁকিপূর্ণ মায়েদের দ্রুত শনাক্ত করে প্রয়োজনীয় পরীক্ষা করতে হবে। বিশেষ করে গর্ভাবস্থার শুরুতে এবং ২৪ থেকে ২৮ সপ্তাহের মধ্যে ওজিটিটি পরীক্ষা করা জরুরি। ডায়াবেটিস শনাক্ত হলে চিকিৎসক ও পুষ্টিবিদের পরামর্শে চিকিৎসা নিতে হবে। প্রয়োজন হলে ওষুধ ও ইনসুলিন দিতে হবে। পাশাপাশি ইনসুলিন ব্যবহার ও রক্তে শর্করা মাপার নিয়ম শেখাতে হবে।

ঝুঁকি অনুযায়ী প্রসবের স্থান নির্ধারণ এবং জটিলতা থাকলে উন্নত হাসপাতালে পাঠানোর ব্যবস্থা রাখতে হবে। প্রসবের ৪ থেকে ১২ সপ্তাহের মধ্যে মায়ের আবার ডায়াবেটিস পরীক্ষা করতে হবে। এ সেবা কমিউনিটি ক্লিনিক থেকে উপজেলা ও জেলা হাসপাতাল পর্যন্ত নিশ্চিত করার পরামর্শ দেন সেহেরীন এফ সিদ্দিকা।

সেহেরীন এফ সিদ্দিকা বলেন, গর্ভাবস্থায় ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে না থাকলে মায়ের উচ্চ রক্তচাপ, প্রসবকালীন জটিলতা ও মাতৃমৃত্যুর ঝুঁকি বাড়ে। সন্তানের গর্ভপাত, জন্মগত ত্রুটি, অতিরিক্ত ওজন নিয়ে জন্ম এবং নবজাতকের মৃত্যুর ঝুঁকিও তৈরি হতে পারে। তাই আগাম প্রস্তুতি ও নিয়মিত পরীক্ষা জরুরি।

Read full story at source