‘এক ছেলেকে কবরে শুইয়ে এসেছি, আরেক ছেলেও যদি চলে যায়, আমি কী নিয়ে থাকব’
· Prothom Alo
‘আমার ছেলেটা কষ্ট পাচ্ছে, লাইফ সাপোর্টে আছে। শুধু হার্টবিটটা (হৃৎস্পন্দন) আছে তার। ডাক্তাররা কোনো আশা দিতে পারতেছেন না। আজ সকালে ছেলেটাকে দেখাইছে। বুকটা কেঁপে উঠছে ভাই, আমার। এক ছেলেকে কবরে শুইয়ে এসেছি, আরেক ছেলেও যদি চলে যায়, আমি কী নিয়ে থাকব?’
Visit rouesnews.click for more information.
কথাগুলো বলছিলেন মোহাম্মদ কবির। তাঁর ১০ মাস বয়সী ছেলে মোহাম্মদ আবু বক্কর চট্টগ্রাম মা ও শিশু হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যাকেন্দ্রে (আইসিইউ) লাইফ সাপোর্টে রয়েছে। হাম, ডেঙ্গু ও নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত শিশুটিকে বাঁচাতে চিকিৎসা চলছে। একই তিন রোগে আক্রান্ত হয়ে মাত্র দুই দিন আগে মারা গেছে কবিরের বড় ছেলে নূর মোহাম্মদ আরাফাত (১০)। শুক্রবার সন্ধ্যায় তাকে কবরে শুইয়ে এসেছেন বাবা। এখন ছোট ছেলেকে বাঁচাতে প্রাণপণ চেষ্টা তাঁর।
আজ রোববার বেলা ১১টার দিকে কথা হয় মোহাম্মদ কবিরের সঙ্গে। তখনো হাসপাতালেই ছিলেন তিনি। কয়েক দিন ধরে দুই সন্তানের চিকিৎসা নিয়ে ছোটাছুটি, নির্ঘুম রাত আর বড় ছেলেকে হারানোর শোকে বিপর্যস্ত এই বাবা। কণ্ঠে ক্লান্তি। কথা বলছিলেন থেমে থেমে। কখনো শব্দ জড়িয়ে যাচ্ছিল, কখনো দীর্ঘক্ষণ নিশ্চুপ থাকছিলেন। একেকটি প্রশ্নের উত্তর দিতেও যেন কষ্ট হচ্ছিল তাঁর।
মোহাম্মদ কবির, শিশু আবু বক্করের বাবাআমার ছোট ছেলেটার জন্য সবাই দোয়া করেন ভাই। আল্লাহ ছাড়া আর কেউ বাঁচাতে পারবে না। আমার বুকের ধনটা এখন চুপ হয়ে গেছে।’কোনোমতে নিজেকে সামলে কবির জানান, গতকাল শনিবার সকালে ছোট ছেলেকে লাইফ সাপোর্টে নেওয়া হয়েছে। আজ সকালে চিকিৎসকেরা তাঁকে ছেলেকে দেখার সুযোগ দিয়েছেন। সন্তানের অবস্থা দেখে নিজেকে আর সামলাতে পারছিলেন না তিনি। চিকিৎসকেরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করছেন। কিন্তু ছেলেকে বাঁচানো যাবে কি না, সেই আশ্বাস পাচ্ছেন না। কবির বলেন, ‘আমার ছোট ছেলেটার জন্য সবাই দোয়া করেন ভাই। আল্লাহ ছাড়া আর কেউ বাঁচাতে পারবে না। আমার বুকের ধনটা এখন চুপ হয়ে গেছে।’
কবিরের সঙ্গে হাসপাতালে আছেন তাঁর মা। স্ত্রী আমেনা বেগম বাসায়। বড় ছেলের মৃত্যুর পর থেকে তিনি শারীরিক ও মানসিকভাবে বিপর্যস্ত। কবির বলেন, ‘হাসপাতালে আমি আর আমার মা আছি। স্ত্রী বাসায়। ওর শরীরের অবস্থাও ভালো না।’
এক ছেলেকে হারানোর শোক, আরেক ছেলের জীবন নিয়ে অনিশ্চয়তা। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে চিকিৎসার বিপুল খরচ। কবির একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে মালামাল ওঠানো-নামানোর কাজ করেন। মাসে আয় প্রায় ২০ হাজার টাকা। চট্টগ্রাম নগরের হিলভিউ এলাকার এক নম্বর সড়কে ভাড়া বাসায় থাকেন তিনি। মাসে বাসাভাড়া ছয় হাজার টাকা। বাকি টাকায় চলত চারজনের সংসার।
ইতিমধ্যে দুই সন্তানের চিকিৎসায় খরচ আড়াই লাখ টাকা ছাড়িয়েছে। নিজের সঞ্চয়, সহকর্মীদের সহযোগিতা ও আত্মীয়ের কাছ থেকে ঋণ নিয়ে সেই খরচ সামলাচ্ছেন তিনি। কিন্তু এত চেষ্টার পরও বড় ছেলেকে বাঁচাতে পারেননি। এখন ছোট ছেলের চিকিৎসা চলছে। সামনে কী অপেক্ষা করছে, জানেন না কবির।
আরাফাত এখন শুধুই স্মৃতি
কবিরের বড় ছেলে আরাফাত চট্টগ্রাম নগরের পাঁচলাইশ এলাকার হিলভিউ পাবলিক স্কুলের তৃতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিল। পড়ালেখায় ভালো ছিল ছেলেটি। আরাফাত ও তার ১০ মাস বয়সী ছোট ভাই আবু বক্করকে ঘিরেই ছিল বাবা কবির ও মা আমেনা বেগমের সংসার। সেই সংসারের সবকিছু বদলে গেছে কয়েক দিনের ব্যবধানে।
কবির জানান, ১৫ থেকে ২০ দিন আগে আরাফাতের জ্বর, বমি ও কাশি শুরু হয়। অসুস্থতা বাড়তে থাকলে তাকে প্রথমে চট্টগ্রামের সাউদার্ন হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে দুই দিন চিকিৎসার পর নেওয়া হয় বেসরকারি ইম্পেরিয়াল হাসপাতালে। অবস্থার অবনতি হলে তাকে আইসিইউতে রাখতে হয়।
ইতিমধ্যে দুই সন্তানের চিকিৎসায় খরচ আড়াই লাখ টাকা ছাড়িয়েছে। নিজের সঞ্চয়, সহকর্মীদের সহযোগিতা ও আত্মীয়ের কাছ থেকে ঋণ নিয়ে সেই খরচ সামলাচ্ছেন তিনি। কিন্তু এত চেষ্টার পরও বড় ছেলেকে বাঁচাতে পারেননি। এখন ছোট ছেলের চিকিৎসা চলছে। সামনে কী অপেক্ষা করছে, জানেন না কবির।
ইম্পেরিয়াল হাসপাতালে কয়েক দিন চিকিৎসার পরও আরাফাতের অবস্থার উন্নতি হয়নি। বরং শ্বাসকষ্ট বাড়তে থাকে। চিকিৎসার বিপুল খরচ সামলাতে না পেরে শেষ পর্যন্ত ছেলেকে চট্টগ্রাম মা ও শিশু হাসপাতালে নিয়ে আসেন কবির। সেখানেও তাকে আইসিইউতে রাখা হয়। বাবার ভাষ্য অনুযায়ী, হাম, ডেঙ্গু ও নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত আরাফাতের ফুসফুসের পাশাপাশি যকৃতেও জটিলতা দেখা দিয়েছিল।
গত বৃহস্পতিবার রাতেও বাবার ডাকে সাড়া দিয়েছিল আরাফাত। আইসিইউতে শুয়ে বাবাকে জানিয়েছিল, সে ভালো আছে। তবে সেখানে বেশিক্ষণ থাকার অনুমতি ছিল না। তাই ছেলের সঙ্গে বেশি কথা বলতে পারেননি কবির। সেটিই ছিল ছেলের সঙ্গে তাঁর শেষ কথোপকথন।
পরদিন শুক্রবার সকালে আরাফাতের অবস্থার আরও অবনতি হয়। চিকিৎসকেরা কবিরকে দ্রুত হাসপাতালে আসতে বলেন। শেষ পর্যন্ত আর বাঁচানো যায়নি তাকে। সেদিন সন্ধ্যায় নগরের মোমেনবাগ এলাকার কবরস্থানে ছেলেকে দাফন করে আসেন কবির।
বড় ছেলের কথা উঠতেই আবার ভেঙে পড়েন এই বাবা। দুই সন্তানের সঙ্গে কাটানো সময়, ছোট্ট ভাড়া বাসায় তাঁদের চারজনের সংসার—এসব প্রসঙ্গ টেনে চোখের পানি ফেলছিলেন তিনি। কবির বলেন, ‘কাজ শেষে ঘরে ফিরলে দুই সন্তান আমার বুকে এসে পড়ত। কত স্বপ্ন ছিল। কত পরিকল্পনা ছিল। বড় ছেলের মৃত্যুতে সব শেষ হয়ে গেল। আমার ছোট ঘরের প্রতিটি কোনায় দুই সন্তানের স্মৃতি। আমি সে ঘরে ফিরব কী করে। থাকব কী করে।’
কবিরের স্ত্রী আমেনা বেগমের বয়স ২৯ বছর। তিনি গৃহিণী। বড় ছেলের মৃত্যুর সময় হাসপাতালে ছিলেন। এরপর তাঁকে বাসায় রাখা হয়েছে। কবির জানান, ছেলের মৃত্যুতে মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছেন আমেনা। বারবার বড় ছেলেকে খুঁজছেন। সংজ্ঞা হারাচ্ছেন। পানি ছাড়া মুখে কিছুই তুলছেন না।
বাড়িতে বড় ছেলেকে খুঁজছেন মা। হাসপাতাল থেকে ছোট ছেলে সুস্থ হয়ে ফিরবেন সেই অপেক্ষায় বাবা। ক্লান্ত, বিপর্যস্ত মুখে তাঁর একটাই আকুতি, ‘আমার ছেলেটার জন্য দোয়া চাই ভাই।’