আড়াই শ বছরের বাণিজ্যের সাক্ষী

· Prothom Alo

খুলনার ভৈরব নদের পূর্ব পাড়ের আকাশে যখন সূর্য উঁকি দেয়, তখনই পশ্চিম তীরে শুরু হয় ব্যবসায়ীদের প্রস্তুতি। সাজাতে শুরু করেন পণ্যের পসরা। সকালে ডাকবাংলোর মোড় থেকে ক্লে রোড ধরে পথ চললে প্রথমেই চোখে পড়ে দুই পাশে সারি সারি ফলের দোকান, যা স্থানীয়ভাবে ফলপট্টি নামে পরিচিত। সেখান থেকে অলিগলির পথ ধরে আরেকটু ভেতরে গেলেই বোঝা যায়, আড়াই শ বছরের প্রাচীন বাণিজ্যকেন্দ্রের বাস্তব রূপ।

Visit xsportfeed.life for more information.

এখানকার আড়ত বা পট্টিগুলোর মধ্যে সবার আগে চালু হয় ফলপট্টি আর মাছের আড়ত। এরপর একে একে খোলে সবজি, মাংস আর মসলাপট্টি। সূর্য একটু ওপরে উঠতে উঠতে যতক্ষণে প্রসাধনী আর কাপড়ের দোকানগুলো খুলতে শুরু করে, ততক্ষণে ফলপট্টির বেচাকেনা শেষ করে ব্যবসায়ীরা দোকান গুটিয়ে ফেলতে শুরু করেন। দিন গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে বাজারে ক্রেতা-বিক্রেতার ভিড়ও বাড়তে থাকে। বাজার খোলা থাকে রাত ৯-১০টা অবধি এবং ঈদ, পূজাসহ বিভিন্ন উৎসবের সময় গভীর রাত পর্যন্ত চলে বেচাকেনা।

খুলনা নগরীর প্রাণকেন্দ্রে, ভৈরব নদের পাশ ঘেঁষে দিনভর সরগরম থাকা বাণিজ্যকেন্দ্রটি বড় বাজার। দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সবচেয়ে বড় বাণিজ্যকেন্দ্র হিসেবে পরিচিত এই বাজার ক্রেতা-বিক্রেতাদের সমাগমে মুখর থাকে। চাল-ডাল, ফলমূল, খুচরা-পাইকারি মুদি, কাপড়, প্রসাধনী, মসলা, মাছ-মাংস, শাকসবজি, অলংকার—সবই মেলে এই বড় বাজারে।

এই বাজারের শুরু ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক আমলে। গবেষণাপ্রতিষ্ঠান খুলনা ইনস্টিটিউটের গবেষণা থেকে পাওয়া তথ্যে জানা যায়, প্রায় আড়াই শ বছর আগে ১৭৮৬ সালে ব্রিটিশ নীলকর চার্লি সাহেব তাঁর ব্যবসায়িক কাজের উদ্দেশ্যে ভৈরব নদের তীরে খুলনা অঞ্চলের প্রথম দালানবাড়ি (নীলকুঠি) নির্মাণ করেন। চার্লি সাহেবের তৈরি করা নীলকুঠির পাশে ভৈরব নদের তীরে তখন লবণের বাণিজ্য হতো। দক্ষিণের উপকূলীয় অঞ্চলগুলো থেকে নৌপথে ভৈরব নদ দিয়ে লবণ নিয়ে এসে এখানে কেনাবেচা করতেন বণিকেরা। এরপর নীলকর চার্লি সাহেবের হাত ধরে ধীরে ধীরে এখানে গড়ে ওঠে হাট। তখন চার্লি সাহেবের নামে এই এলাকার নাম হয় চার্লিগঞ্জ। আর হাটের নাম চার্লির হাট ও সাহেবের হাট নামে প্রসিদ্ধি লাভ করে। যদিও সেই নীলকুঠির ধ্বংসাবশেষ পরিত্যক্ত অবস্থায় এখনো বড় বাজারের পাশে দাঁড়িয়ে আছে। এলাকায় এখন কেউ কেউ এটাকে ভূতের বাড়ি বলেন।

খুলনার বড়বাজার

জাতীয় তথ্য বাতায়নের তথ্য মতে, ১৭৮১ সালে ব্রিটিশ সরকার রূপসা নদীর পাশে সুন্দরবনের বনজঙ্গল পরিষ্কার করে খুলনা অঞ্চলের প্রথম থানা নয়াবাদ স্থাপন করে। এরপর ১৮৪২ সালে ব্রিটিশ সরকার নয়াবাদ থানাকে খুলনা মহকুমায় উন্নীত করলে সাহেবের হাট খুলনা মহকুমার অধীনে চলে আসে। মহকুমায় পরিণত হওয়ায় এবং সরকারি দপ্তরগুলোর জন্য কর্মসংস্থান ও নাগরিক সেবা বৃদ্ধি পাওয়ায় এ অঞ্চলের জনসংখ্যা বাড়তে থাকে। জনসংখ্যা বাড়ার কারণে স্থায়ী বাজারের প্রয়োজনীয়তা দেখা দিলে হাটটি বাজারে পরিণত হয় এবং বাজার বিস্তৃতি লাভ করতে শুরু করে। তখন এই বাজারের নাম হয় সাহেবের বাজার। সেই সময়ে সাহেবের বাজার এ অঞ্চলের সবচেয়ে বড় বাজারে পরিণত হওয়ার কারণে লোকমুখে তা বড় বাজার নামে পরিচিত হতে শুরু করে।

বেঙ্গল ডিস্ট্রিক্ট গেজেটিয়ার: খুলনার তথ্য অনুযায়ী, ১৮৮২ সালে খুলনা মহকুমাকে জেলা হিসেবে ঘোষণা করে ব্রিটিশ সরকার। খুলনা জেলা হওয়ার পর প্রশাসনিক কর্মকর্তা হিসেবে ডব্লিউ এম ক্লে ১৮৮২ থেকে ১৮৮৭ সাল পর্যন্ত জেলা প্রশাসকের দায়িত্ব পালন করেন। তাঁর নামানুসারে ডাকবাংলোর মোড় থেকে ডেল্টা ঘাট পর্যন্ত রাস্তার নামকরণ হয় ‘ক্লে রোড’। শতাব্দীপ্রাচীন সেই ক্লে রোডের দুই ধারেই এখন সকালবেলায় বড় বাজারের ফলপট্টি বসে।

খুলনা জেলায় পরিণত হওয়ার পর এর প্রশাসনিক গুরুত্ব বাড়তে থাকে। জেলা শহর খুলনার জনসংখ্যার সঙ্গে দ্রুত বাড়তে থাকে বড় বাজারের পরিধিও। ১৮৮৪ সালে স্টিমারঘাট, রেলস্টেশন ও পৌরসভা চালু হয়। কলকাতা থেকে শিয়ালদহ-যশোর-খুলনা রুটের রেলপথের শেষ স্টেশন স্থাপন করা হয় বড় বাজারের পাশে। আর ভৈরব নদের তীরে বড় বাজারের পাশে তৈরি হয় স্টিমারঘাট, যার নাম হয় রকেট ঘাট। বরিশাল অঞ্চল থেকে সরাসরি নৌপথে খুলনায় এসে বড় বাজারের রেলস্টেশন থেকে ট্রেনে চড়ে মানুষ কলকাতায় যেত। ফলে কলকাতা থেকে খুলনায় চলাচলকারী ট্রেনের নাম হয় ‘বরিশাল এক্সপ্রেস’।

খুলনা ইনস্টিটিউটের গবেষক সুস্মিত সাইফ ও স্থানীয় সাংবাদিক গৌরাঙ্গ নন্দী জানান, কবি জীবনানন্দ দাশ কলকাতায় গিয়েছিলেন এ পথ ধরেই। তখন বড় বাজার আঞ্চলিক যোগাযোগের ট্রানজিট পয়েন্টে পরিণত হয়। যোগাযোগব্যবস্থার উন্নতির কারণে দেশের নানা অঞ্চল থেকে ব্যবসায়ীরা এসে জড়ো হতে থাকায় এটি বড় বাণিজ্যকেন্দ্রে পরিণত হয়। বরিশাল, যশোর, ফরিদপুর, কুষ্টিয়া, রাজশাহী, চাঁদপুর, কুমিল্লা, নোয়াখালী ও চট্টগ্রামের মতো দূরের জেলাগুলো থেকেও ব্যবসায়ীরা এ বাজারে আসতেন। রাজস্থানের মাড়োয়ার, কলকাতা ও আশপাশের এলাকা থেকে আসা মাড়োয়ারি ব্যবসায়ীরা এখানে রত্ন ব্যবসা, দোকানপাট, আড়ত, গুদামসহ নানা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন। পাঞ্জাব অঞ্চল থেকে আসা পাঞ্জাবি বণিকেরা শুরু করেন হোটেল ব্যবসা। বিহার অঞ্চল থেকে আসা হিন্দু বিহারিরা করতেন মুটে বা কুলির কাজ। আর ওডিশা অঞ্চল থেকে আসা ওডিয়ারা করতেন বাবুর্চির কাজ। এভাবে ধীরে ধীরে বড় বাজার দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রধান কেন্দ্র হয়ে ওঠে। মাড়োয়ারি ব্যবসায়ীদের স্মৃতি হিসেবে এখনো ওয়েস্ট মেকড রোডের দুই ধারে স্বমহিমায় দাঁড়িয়ে আছে বেশ কয়েকটি শতাব্দীপ্রাচীন ভবন। যেখানে বেশির ভাগ বর্ধিষ্ণু শহরের পুরোনো দালানকোঠার স্থানে নতুন সুউচ্চ আধুনিক দালানকোঠায় স্কাইলাইন ছেয়ে গেছে, সেখানে একটি বিভাগীয় শহরের সবচেয়ে বড় বাজারে প্রায় অক্ষত অবস্থায় থাকা, পুরোনো মাড়োয়ারি স্থাপত্যশৈলীতে নির্মিত এই শতবর্ষী দালানগুলো বড় বাজারকে অনন্য করে তুলেছে। তাই বড় বাজারে পা রাখলেই নিজ থেকেই জানান দেয় তার পুরোনো জৌলুশের কথা।

খুলনার বড়বাজার

বড় বাজারের সূচনালগ্ন থেকেই বাণিজ্যের প্রধান মাধ্যম ছিল নৌপথ। ফলে বড় বাজারকে কেন্দ্র করে ভৈরব নদের পাড়জুড়ে একে একে তৈরি হয়েছে নিমতলা ঘাট, ডেল্টা ঘাট, বলাকা ঘাট, সুন্দরবন ঘাট, মমিন ঘাট, দেইল্লার ঘাট, জুতাপট্টি ঘাট, চাইলাপট্টির ঘাট, হাসন সাহেবের ঘাট, ডাব ঘাট, রকেট ঘাট নামের বেশ কয়েকটি ঘাট। ঘাটগুলোর নাম বেশ মজার এবং অনেকগুলো ঘাটের নাম থেকেই তার অতীত সম্পর্কে জানা যায়।

৫০ বছর ধরে ওয়েস্ট মেকড রোডের মসলাপট্টিতে লেবার হিসেবে কাজ করা সিরাজুল ইসলাম বলেন, ডাব ঘাটে আগে বড় বড় নৌকায় করে ডাব এসে নামত, সেই থেকে এর নাম হয়েছে ডাব ঘাট। এ রকম জুতাপট্টির ঘাটে নামত জুতা, চাইল্লাপট্টির ঘাটে নামত চাল, আর রকেট ঘাটে দাঁড়াত রকেট (স্টিমার)। এখন আর ঘাটগুলোতে আগের মতো ব্যবসা নেই। আগে অনেক নৌকা ভিড়ত, সব মালামাল নৌকায় আসত। এরপর রাস্তাঘাট হওয়ার পর এখন বেশির ভাগ মালামাল আসে ট্রাকে করে। ট্রাকে মালামাল আসতে সময় কম লাগায় ব্যবসায়ীরা ট্রাকের ওপর বেশি ভরসা করে। তাই ঘাটগুলোতে এখন আর আগের মতো ব্যস্ততা নেই। তারপরও এখনো আশপাশের বেশ কিছু জেলায় নৌকায় করে মালামাল আনা-নেওয়া হয়।

তবে এখন বড় বাজারের পরিসর আরও বিস্তৃত হয়েছে। চার্লির নীলকুঠিতে যাত্রা শুরুর পর বাজারটি ওয়েস্ট মেকট রোড, ভৈরব স্ট্র্যান্ড রোড, কালীবাড়ি রোড, কে ডি ঘোষ রোড, ক্লে রোড, জিকজ্যাক রোড, স্যার ইকবাল রোডের একটি অংশ এবং স্টেশন রোডজুড়ে ছড়িয়ে আছে।

বর্তমানে বড় বাজার পরিচালিত হয় খুলনা সিটি করপোরেশনের (কেসিসি) অধীনে। কেসিসির তথ্য মতে, স্থায়ী-অস্থায়ী মিলে বড় বাজারের দোকান সংখ্যা পাঁচ হাজারের অধিক।

খুলনাসহ আশপাশের অঞ্চলে নতুন করে আরও অনেক বাজার তৈরি হওয়ায় এ অঞ্চলের বাণিজ্যের বিকেন্দ্রীকরণ ঘটেছে। ফলে বড় বাজারের গুরুত্ব ও জৌলুশও আর আগের মতো নেই। তবু ইতিহাস আর ঐতিহ্যের কারণে বড় বাজার এখনো সগৌরবে টিকে আছে।

Read full story at source