মরুভূমিতে মিলেছে মঙ্গল গ্রহের প্রাচীন উল্কা

· Prothom Alo

বিজ্ঞানীরা পৃথিবীতে পাওয়া মঙ্গল গ্রহের অন্যতম প্রাচীন একটি শিলা শনাক্ত করেছেন। শিলাটি লাল গ্রহের আদি ইতিহাস সম্পর্কে নতুন তথ্য উন্মোচন করছে। এর মধ্যে অন্তত ৪১০ কোটি বছর আগে পানির প্রভাবে গ্রহটির ভূত্বক পরিবর্তনের প্রমাণ রয়েছে।

Visit newssport.cv for more information.

তেঘাজা ০০১ নামে পরিচিত গোলাপি রঙের এ উল্কার অনন্য রাসায়নিক গঠন শিলাটিকে মঙ্গল গ্রহের পূর্বে অধ্যয়ন করা অন্যান্য নমুনা থেকে সম্পূর্ণ আলাদা করেছে। ক্যালিফোর্নিয়ার পাসাডেনায় অবস্থিত নাসার জেট প্রপালশন ল্যাবরেটরির প্ল্যানেটারি সায়েন্টিস্ট ইয়াং লিউ জানান, এটি মঙ্গল গ্রহের অত্যন্ত বিরল ও প্রাচীন একটি উল্কা। শিলাটি গবেষকদের মঙ্গল গ্রহের আদি ভূত্বক ও ম্যান্টল স্তর গভীরভাবে পর্যালোচনা করার সুযোগ করে দিচ্ছে। সে সময় পৃথিবীতে সবেমাত্র জীবনের সূচনা হয়েছিল। বিজ্ঞানীদের মতে, এ উল্কা গরম পাথরের অভ্যন্তরীণ স্তর ম্যান্টল থেকে উদ্ভূত ম্যাগমা দিয়ে গঠিত হয়েছিল। পরবর্তীকালে তা বাইরের ভূত্বকের অংশে পরিণত হয়। ইয়াং লিউ উল্লেখ করেন, এ নমুনার রসায়ন প্রমাণ করে যে এটি মঙ্গল গ্রহের এমন একটি ভূত্বকীয় অঞ্চল থেকে এসেছে যাকে আগে কখনো নমুনা হিসেবে সংগ্রহ করা হয়নি।

২০২২ সালে পশ্চিম আফ্রিকার দেশ মালির একটি লবণ সমভূমিতে উল্কাশিকারিরা তেঘাজা ০০১ আবিষ্কার করেন। উল্কাটির নাম রাখা হয়েছে সেই লবণ সমভূমির নামানুসারে। উল্কাটিতে মোট ৮টি খণ্ড রয়েছে যেগুলোর মোট ওজন ৭৯৮ দশমিক ৫ গ্রাম। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় খণ্ডের ওজন ৪৪২ গ্রাম। মঙ্গল গ্রহে কোনো গ্রহাণু বা ধূমকেতুর আঘাতের ফলে এ শিলা মহাশূন্যে ছিটকে পড়েছিল। লাল গ্রহের মাধ্যাকর্ষণ তুলনামূলক দুর্বল হওয়ায় এটি সহজেই মহাকাশে চলে যায়। উল্কাটি এরপর সূর্যের চারদিকে কক্ষপথে ঘুরতে শুরু করে। কয়েক মিলিয়ন বছর ধরে মহাশূন্যে ঘোরার পর এটি পৃথিবীর মাধ্যাকর্ষণের টানে বায়ুমণ্ডলে প্রবেশ করে। মঙ্গল গ্রহে মূল আঘাত কখন ঘটেছিল বা উল্কাটি কবে পৃথিবীতে এসে পড়েছিল, তা সঠিকভাবে নির্ধারণ করা কঠিন। তবে ইয়াং লিউ জানান, উল্কার পৃষ্ঠের বৈশিষ্ট্যগুলো থেকে বোঝা যায় যে এটি আবিষ্কারের আগে মরুভূমিতে বেশ কিছুদিন কাটিয়েছে।

ইম্পেরিয়াল কলেজ লন্ডনের আর্থ অ্যান্ড প্ল্যানেটারি সায়েন্সের অ্যাসোসিয়েট প্রফেসর ম্যাথিউ গেঞ্জ বলেন, মঙ্গল গ্রহ থেকে নতুন কোনো উল্কা আসা সব সময় রোমাঞ্চকর ঘটনা। এটি গ্রহটির অন্যতম প্রাচীন উল্কা এবং যেকোনো দেশীয় পাথরের চেয়ে পুরোনো। এ আবিষ্কার মঙ্গল গ্রহে ইতিহাসের প্রাথমিক পর্যায়গুলো উঁকি দিয়ে দেখার সুযোগ করে দেয়। সে সময় গ্রহটিতে পানির উপস্থিতি থাকার কথা ছিল। বিজ্ঞানীরা উল্কাটির খনিজ ও রসায়ন অধ্যয়নের জন্য এর একটি ছোট অংশ ব্যবহার করেছেন। প্রাথমিক বিশ্লেষণে শিলাটি যে অত্যন্ত প্রাচীন, তা সঙ্গে সঙ্গে ধরা পড়েনি। ইয়াং লিউ প্রথমে এটিকে শোরগটাইট হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ করেছিলেন। শোরগটাইট হলো পৃথিবীতে পাওয়া সবচেয়ে বেশি পরিমাণের মঙ্গলীয় উল্কা। ইয়াং লিউ এর আগে বেশ কয়েকটি শোরগটাইট বিশ্লেষণ করেছিলেন। এ ধরনের উল্কা সাধারণত ৬০ কোটি বছরের কম পুরোনো হয়।

নমুনার মধ্যে জিরকন দেখা যায়। গলিত শিলা ঠান্ডা হলে একধরনের স্ফটিক তৈরি হয়, যাকে জিরকন বলা হয়। ইয়াং লিউ জানান, জিরকন টাইম ক্যাপসুলের মতো কাজ করে। এটি গবেষকদের কোনো শিলার গঠনের বয়স নিখুঁতভাবে নির্ধারণ করতে সাহায্য করে। স্ফটিকগুলোর বয়স হিসাব করে অন্তত ৪ দশমিক ১ বিলিয়ন বছর পাওয়া গেছে। এর অর্থ হলো, উল্কাটি মঙ্গল গ্রহের অস্তিত্বের প্রথম ৪০ কোটি বছরের মধ্যে গঠিত হয়েছিল। ক্যালিফোর্নিয়া ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজির হেওয়ার্ড মেলটন তারিখ হিসাবের একটি নতুন পদ্ধতি তৈরি করেছেন। এ পদ্ধতির মাধ্যমে অনুমানের সঠিকতা যাচাই করা হয়। হেওয়ার্ড মেলটন জানান, এ পদ্ধতিতে বড় অংশ দ্রবীভূত করার পরিবর্তে লেজার ব্যবহার করে নমুনার খুব ছোট অংশ বাষ্পীভূত করা হয়। লেজার ব্যবহারের কারণে গবেষকেরা ঐতিহ্যগত কৌশলগুলোর তুলনায় অনেক দ্রুত তেঘাজা ০০১–এর মতো নমুনা পরিমাপ করতে পেরেছেন। গবেষক দল মানুষের চুলের ব্যাসের দশ ভাগের এক ভাগ আকারের একটি ছোট লেজার বিম ব্যবহার করে নমুনার ভেতরের ক্ষুদ্র কণা ও স্ফটিক বিশ্লেষণ করেন। এ নতুন কৌশল নমুনা ডেটিং করার জন্য প্রয়োজনীয় সময় এক মাস থেকে কমিয়ে এক দিনে নামিয়ে আনে। এর ফলে মূল উপাদানের বড় অংশ পরবর্তী গবেষণার জন্য সুরক্ষিত থাকে।

ম্যাথিউ গেঞ্জ জানান, উল্কাটি একটি ব্যাসল্ট শিলা। এটি পৃথিবীর মহাসাগরের তলদেশ এবং আইসল্যান্ড বা হাওয়াইয়ের আগ্নেয়গিরি থেকে অগ্ন্যুৎপাতের ফলে তৈরি পাথরের মতো। সায়েন্স জার্নালে প্রকাশিত নতুন বিশ্লেষণে দেখা গেছে, তেঘাজা ০০১–এর একটি অনন্য গঠন রয়েছে। এটি প্রাচীন মঙ্গল গ্রহের ভূত্বকে পানির সঙ্গে মিথস্ক্রিয়া করেছিল। হেওয়ার্ড মেলটন জানান, এ আবিষ্কার বিজ্ঞানীদের পৃথিবী সম্পর্কে গভীর ধারণা দিতে সাহায্য করবে। এর মাধ্যমে বোঝা সম্ভব হবে, কেন পৃথিবী শুষ্ক হয়নি, কিন্তু মঙ্গল গ্রহ শুষ্ক হয়ে গেল। এটি গ্রহের বাসযোগ্যতা বোঝার ক্ষেত্রেও বড় ভূমিকা রাখবে।

ভাইকিং ল্যান্ডার এবং কিউরিওসিটি ও পারসিভিয়ারেন্স রোভারের মাধ্যমে মঙ্গল গ্রহের পৃষ্ঠ থেকে সংগ্রহ করা উপাত্তের সঙ্গে তুলনা করে বিজ্ঞানীরা উল্কার উৎস নিশ্চিত করতে চান। তেঘাজা ০০১–এর ক্ষেত্রে গবেষকেরা আরও এক ধাপ এগিয়ে গেছেন। তাঁরা মঙ্গল গ্রহের দক্ষিণ উচ্চভূমির ১৩টি স্থান চিহ্নিত করেছেন, যেখান থেকে এ শিলা আসতে পারে।

সূত্র: সিএনএন

Read full story at source