প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ইংরেজি শিক্ষা: বাস্তব চিত্র ও উত্তরণ ভাবনা
· Prothom Alo

আমাদের দেশের প্রাথমিক শিক্ষাব্যবস্থার মানোন্নয়নে বর্তমান সরকার নানামুখী পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে, তবে ইংরেজি ভাষা শিক্ষার ক্ষেত্রে এখনো বড় ধরনের একটা ঘাটতি রয়েছে। প্রাথমিক সমাপনী বা পঞ্চম শ্রেণি পাস করার পরও অধিকাংশ শিক্ষার্থী সাবলীলভাবে ইংরেজি পড়তে বা বলতে পারে না।
Visit casino-promo.biz for more information.
জাতীয় ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন শিক্ষাবিষয়ক গবেষণা ও বিশ্বব্যাংকের ‘লার্নিং পভার্টি’ (Learning Poverty) সংক্রান্ত প্রতিবেদনের তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী পর্যায়ে পৌঁছানো প্রায় ৬৫ থেকে ৭০ শতাংশ শিক্ষার্থীই তাদের বয়স বা শ্রেণি-উপযোগী সহজ ইংরেজি বাক্য ঠিকমতো পড়তে বা অর্থ বুঝতে পারে না। মাত্র ৩০ থেকে ৩৫ শতাংশ শিক্ষার্থী আংশিক বা পূর্ণাঙ্গভাবে সাধারণ ইংরেজি পাঠে সক্ষমতা অর্জন করে।
একটি শিশু পাঁচ বছর প্রাথমিক বিদ্যালয়ে কাটানোর পরও কেন ভিত্তিগত এই ইংরেজি শিক্ষায় পিছিয়ে থাকছে? এর গভীরে প্রবেশ করলে কিছু বাস্তব ও অনস্বীকার্য প্রতিবন্ধকতা চোখে পড়ে।
শিক্ষকের কর্মক্ষেত্রে সমস্যা ও তার সমাধানবিদ্যমান সংকট ও প্রতিবন্ধকতা—
১. শিক্ষকের দক্ষতা, বর্তমান প্রেক্ষাপট ও স্ব-চর্চার ঘাটতি
শিক্ষাপদ্ধতির মূল চালিকা শক্তি হলেন শিক্ষক। তবে বাস্তব চিত্র হলো, অনেক প্রাথমিক বিদ্যালয়েই দক্ষ ইংরেজি শিক্ষকের অভাব রয়েছে। বিভিন্ন সময়ে জাতীয়করণের মাধ্যমে প্রাথমিক শিক্ষাব্যবস্থায় যুক্ত হয়েছেন অনেক শিক্ষক, যাঁদের অনেকেরই শিক্ষাগত যোগ্যতা ছিল এসএসসি বা দাখিল সমমান। তাঁদের সবার ক্ষেত্রে না হলেও, একটি বড় অংশের মধ্যেই প্রয়োজনীয় ইংরেজি দক্ষতার ঘাটতি রয়েছে।
এর পাশাপাশি শিক্ষকদের মধ্যে বই পড়া এবং স্ব-চর্চার মারাত্মক অভাব লক্ষ করা যায়। অনেক শিক্ষক পাঠ্যবইয়ের অনেক কঠিন অংশ, উচ্চারণের নিয়ম বা ভাষাগত অ্যাকটিভিটি এড়িয়ে বা ‘স্কিপ’ করে চলে যান। যেহেতু শিক্ষকদের নিজেদেরও ফ্লুয়েন্টলি ইংরেজি বলা বা চর্চা করার সুযোগ ও অভ্যাস কম, তাই শ্রেণিকক্ষে তাঁরা স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন না। শিক্ষকের এই ঘাটতি ও চর্চাহীনতা সরাসরি শিক্ষার্থীর ওপর গিয়ে পড়ে।
২. পারিবারিক প্রেক্ষাপট: অভিভাবকের সহায়তার অভাব—
গ্রামের প্রত্যন্ত অঞ্চলের প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোর শিক্ষার্থীদের সামাজিক-অর্থনৈতিক পটভূমি অত্যন্ত করুণ। দেখা গেছে ২০০–২৫০ জন শিক্ষার্থীর একটি বিদ্যালয়ে যেখানে দু-একজন শিক্ষার্থীর অভিভাবক হয়তো চাকরিজীবী, কিন্তু বাকি প্রায় সবার মা–বাবা খেটে খাওয়া মানুষ কিংবা পোশাক কারখানার শ্রমিক। অনেক পরিবারে মা-বাবা দুজনকেই জীবিকার তাগিদে বাইরে থাকতে হয়। এসব শিক্ষার্থীর পরিবারে এমন কোনো সহায়ক বা ‘হেল্পিং হ্যান্ড’ নেই, যিনি বাড়িতে তাঁকে ইংরেজিতে একটু সাহায্য করবেন। ফলে শিশুরা শতভাগ শ্রেণিকক্ষনির্ভর হয়ে পড়ে।
তাই তাদের এই ভাষা অর্জনের কাজটি স্কুলেই সম্পন্ন করতে হবে।
৩. ৪০ মিনিটের সীমাবদ্ধতা এবং ‘শোনা’র দক্ষতার অভাব—
যেকোনো ভাষা শেখার স্বাভাবিক নিয়ম হলো চারটি দক্ষতার বিকাশ: শোনা (Listening), বলা (Speaking), পড়া (Reading) এবং লেখা (Writing)। প্রখ্যাত ভাষাবিদ স্টিফেন ক্র্যাশনের (Stephen Krashen) ‘Comprehensible Input’ তত্ত্ব অনুযায়ী, পর্যাপ্ত ভাষা না শুনলে ভাষা শেখা অসম্ভব। অথচ আমাদের শিশুরা ২৪ ঘণ্টার মধ্যে কেবল স্কুলেই ইংরেজি শেখার সুযোগ পায়, যেখানে একটি ইংরেজি পিরিয়ডের স্থায়িত্ব মাত্র ৪০ মিনিট। এই স্বল্প সময়ে একজন শিক্ষককে রিডিং পড়ানো, অর্থ বোঝানো, বোর্ডের কাজ ও মূল্যায়ন শেষ করতে হয়। ফলে শিশুরা শ্রেণিকক্ষে পর্যাপ্ত ইংরেজি শোনার সুযোগ পায় না।
৪. বিষয় বনাম ভাষা: মাতৃভাষার সংমিশ্রণহীন পাঠ্যবই—
আমাদের শিক্ষাক্রমের বড় একটি সমস্যা হলো—ইংরেজিকে একটি ‘ভাষা’ হিসেবে না দেখা। প্রথম শ্রেণি থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত পুরো পাঠ্যবইটি পুরোপুরি ইংরেজিতে লেখা। শ্রেণিকক্ষেও শিক্ষকেরা ইংরেজি শেখাতে গিয়ে মাতৃভাষার (বাংলা) বৈজ্ঞানিক সংমিশ্রণ ঘটানোর সুনির্দিষ্ট সুযোগ পান না। আন্তর্জাতিক শিক্ষা সাময়িকীগুলোতে বহুল আলোচিত ‘Translanguaging’ বা ‘Scaffolding’ ধারণার অভাব এখানে স্পষ্ট—যেখানে বলা হয়, দ্বিতীয় কোনো ভাষা শেখাতে হলে প্রাথমিক পর্যায়ে মাতৃভাষাকে সেতু বা সহায়ক মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করাই সবচেয়ে কার্যকর।
উত্তরণের কৌশল ও শিক্ষা–দর্শনের আলোকে প্রস্তাবনা:
১. নিয়মিত রুটিনে বাধ্যতামূলক ‘শ্রেণিভিত্তিক ল্যাঙ্গুয়েজ ক্লাব’
ইংরেজি চর্চার সময় বাড়াতে প্রতিটি প্রাথমিকে শ্রেণিভিত্তিক ‘ল্যাঙ্গুয়েজ ক্লাব’ চালু করা জরুরি।
ল্যাঙ্গুয়েজ ক্লাবকে সপ্তাহের অন্তত দুই বা তিন দিনের নিয়মিত ক্লাস রুটিনের ভেতরে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। আন্তর্জাতিক পঠন-পাঠন মডেলে দেখা গেছে, রুটিনভুক্ত ভাষা ক্লাব শিক্ষার্থীদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ বাড়ায়।
২. বিদ্যালয়ে ‘ভাষাগত পরিবেশ’ ও শিক্ষকদের Continuous Professional Development (CPD)
ইউনেসকো ও ব্রিটিশ কাউন্সিলের আন্তর্জাতিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, কেবল ট্র্যাডিশনাল ট্রেনিংয়ের চেয়ে বিদ্যালয়ের ভেতরেই শিক্ষকদের পারস্পরিক চর্চা বেশি ফলপ্রসূ।
* শিক্ষকদের জন্য বিদ্যালয়ে সপ্তাহের নির্দিষ্ট দিনে ‘Peer Learning Session’ বা টিচার্স ল্যাঙ্গুয়েজ ক্লাব চালু করা, যেখানে শিক্ষকেরা নিজেরা ইংরেজি চর্চা করবেন ও জড়তা কাটাবেন।
* শিক্ষকদের প্রতিদিনের শ্রেণি পরিচালনায় সহজ ইংরেজি নির্দেশিকা (Classroom English) ব্যবহারের মাধ্যমে বিদ্যালয়ের সামগ্রিক ভাষাগত পরিবেশ (Language Environment) উন্নত করা।
৩. অডিও-ভিজ্যুয়াল ও কম খরচের সহায়ক সামগ্রীর (Low-Cost Teaching Learning Materials) ব্যবহার
আন্তর্জাতিক উন্নয়নশীল দেশগুলোর সফল মডেল অনুসরণ করে শ্রেণিকক্ষে স্বল্পমূল্যের অডিও প্লেয়ার, পোস্টার, পিকচার কার্ড বা ফ্ল্যাশ কার্ড ব্যবহার বাড়ানো দরকার। যে শিশুর বাড়িতে অভিভাবকের সহায়তা নেই, সে শ্রেণিকক্ষে এসব দৃশ্যমান ও অডিও উপাদান থেকে সহজেই বিষয়গুলো অনুধাবন করতে পারবে।
৪. মাতৃভাষার বৈজ্ঞানিক প্রয়োগ ও গবেষণা
সম্পূর্ণ ইংরেজি বইয়ের জটিলতা কমাতে বাংলা ও ইংরেজির সুষম সমন্বয় বা ‘দ্বিভাষিক পদ্ধতি’ (Bilingual Method) কীভাবে প্রাথমিকে সফলভাবে প্রয়োগ করা যায়, তা নিয়ে গবেষকদের কার্যকর ফ্রেমওয়ার্ক তৈরি করতে হবে।
পরিশেষে বলা যায় বিশ্বায়নের যুগে প্রত্যন্ত অঞ্চলের খেটে খাওয়া মানুষের সন্তানদের প্রতিযোগিতায় টিকিয়ে রাখতে হলে ইংরেজি ভাষাকে ভীতি নয়, আনন্দের মাধ্যম করতে হবে। শ্রেণিকক্ষের ৪০ মিনিটের সীমাবদ্ধতা ডিঙিয়ে রুটিনভুক্ত ল্যাঙ্গুয়েজ ক্লাব, শিক্ষকদের নিজস্ব চর্চা, আন্তর্জাতিক গবেষণাভিত্তিক টিচিং স্ট্র্যাটেজি এবং মাতৃভাষার সুষম প্রয়োগ নিশ্চিত করতে পারলে প্রাথমিক স্তরেই একটি শিশুর ইংরেজি ভাষার মজবুত ভিত্তি গড়ে তোলা সম্ভব।
মো. মোকাদ্দেছ উর রহমান, শিক্ষক, ভালুকা, ময়মনসিংহ। [email protected]