সিইসি জ্ঞানেশের পদত্যাগের দাবিতে বিরোধীরা কি সত্যিই একজোট, কী ইঙ্গিত দিচ্ছেন তাঁরা

· Prothom Alo

ভারতের নির্বাচন কমিশনের পরিচালনা ঘিরে বিরোধীরা উত্তাল। ‘কর্তৃত্ববাদী চরিত্র’ ও একতরফা অগণতান্ত্রিক আচরণের দরুন মুখ্য নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) জ্ঞানেশ কুমারের অপসারণের দাবিতে বিরোধী মহল সরব। বিরোধী বয়ানে জ্ঞানেশ কুমার ‘বিজেপির হাতের পুতুল’। তিনি যন্ত্রী, নরেন্দ্র মোদি ও অমিত শাহরা যন্ত্র। তাঁর অপসারণ ও এসআইআর খারিজের দাবিতে বিরোধী জোট ‘ইন্ডিয়া’–এর বৈঠকে দেশজোড়া লাগাতার আন্দোলনের রূপরেখাও তৈরি।

Visit betsport.cv for more information.

তবে প্রশ্ন জাগছে, বিজেপির বিরোধিতায় সবাই একজোট কি না, তা নিয়ে। কংগ্রেসের মধ্যে যে তাগিদ অনুভূত, অন্য অনেকের মধ্যে তা কতটা সঞ্চারিত, সেই সংশয় এখনো কাটানো যায়নি।

এ কথা অনস্বীকার্য, অনেক দিন পর বিরোধীদের কাছে এমন এক বিষয় উপস্থিত, যা বিজেপিকে কিছুটা হলেও অস্বস্তিতে রেখেছে। কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধী অনেক দিন ধরেই কমিশনের বিরুদ্ধে ভোটচুরির অভিযোগ আনলেও তা এমন শোরগোল ফেলতে পারেনি।

অভিযোগটিকে এভাবে সর্বজনীন করে তোলার কৃতিত্ব অবশ্যই ইংরেজি দৈনিক দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের সাংবাদিক ঋতিকা চোপড়ার। রীতিমতো তথ্য দাখিলের মধ্য দিয়ে কমিশনের অভ্যন্তরীণ অসন্তোষের যে ছবি তিনি তুলে ধরেছেন, যেভাবে জানিয়ে দিয়েছেন, ১০ মাস ধরে দুই কমিশনার সুখবীর সিং সান্ধু ও বিবেক যোশির আপত্তি অগ্রাহ্য করে একতরফা সিদ্ধান্ত নিচ্ছিলেন—জ্ঞানেশ কুমার আজ পর্যন্ত তা খণ্ডন করতে পারেননি; বরং কমিশনের পরবর্তী আচরণ প্রমাণ করেছে, প্রতিটি অভিযোগই নির্ভেজাল, অকাট্য সত্য।

দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের ওই প্রতিবেদনই বিজেপি বিরোধীদের নতুন করে জমাট হতে সাহায্য করেছে। যে অভিযোগ এত দিন পর্যন্ত খণ্ড খণ্ডভাবে উঠে আসছিল—কখনো রাহুল, কখনো উদ্ধব, কখনো তেজস্বী কিংবা কখনো মমতা নিজের মতো করে সরব হচ্ছিলেন—ওই প্রতিবেদনের পর হঠাৎই সবাই সমস্বরে প্রতিবাদী হয়ে উঠলেন। গত বুধবারের ইন্ডিয়া জোটের বৈঠক তারই ফল।

প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও জ্ঞানেশ কুমার

বৈঠকে ২০টি দল অংশ নিয়েছে। একগুচ্ছ রাজনৈতিক কর্মসূচি গৃহীত হয়েছে। আপাতদৃষ্টিতে সবাইকে জোটবদ্ধ মনে হচ্ছে। তবু প্রশ্ন জাগছে জোট শরিক বিভিন্ন দল ও শক্তির অন্তর্লীন চোরাস্রোত নিয়ে। সত্যিই কি সবাই জোটবদ্ধ? বজ্র আঁটুনির মধ্যে ফসকা গেরো কি নেই? সবাই কি সত্যিই জ্ঞানেশ অপসারণে এককাট্টা?

বুধবারের বৈঠকে ডিএমকে যোগ দেয়নি। তামিলনাড়ুর এই দলের নেতা এম কে স্ট্যালিনের সঙ্গে কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধীর আমে–দুধের সম্পর্কটা মে মাস পর্যন্ত অমলিন ছিল। ভোটের ফলে যে–ই দেখা গেল, নেপো সেজে অজ্ঞাতকূলশীল জোসেফ বিজয়ের দল টিভিকে পুরো দই খেয়ে নিল এবং রাজ্যে বিজেপিকে রুখতে কংগ্রেস তাদের সরকার গড়তে সমর্থন দিল, সেই আমে–দুধের সম্পর্ক অহিনকুলের রূপ নিল।

কংগ্রেসের পাশাপাশি বামপন্থী ও মুসলিম লীগও টিভিকেকে সমর্থন দেওয়ায় মুখ্যমন্ত্রী হয়ে গেলেন জোসেফ বিজয়। স্ট্যালিন সেই যে গোস্‌সা করে ঘরে খিল দিয়েছেন, বিজেপির বিরোধিতা হওয়া সত্ত্বেও আজও খিল খোলেননি। অথচ তিনি ছিলেন ইন্ডিয়া জোটের এক পোক্ত শরিক।

এবার স্ট্যালিনকে ইন্ডিয়া জোটের বৈঠকে হাজির করাতে সচেষ্ট ছিলেন মমতা ও সিপিএম সাধারণ সম্পাদক এম এ বেবি, কিন্তু সফল হননি। এর চেয়েও বিস্ময়, বিজেপিবিরোধী রাজনীতি করে ক্ষমতাসীন বিজয়ও বুধবারের বৈঠকে এলেন না। কাউকে পাঠালেনও না। কেন? উত্তর অজানা।

আম আদমি পার্টিও (আপ) বিজেপি বিরোধিতার রাশ আলগা করছে না। অরবিন্দ কেজরিওয়াল ও তাঁর দলের নেতারা জ্ঞানেশ কুমারকে নিত্য শূলেও চড়াচ্ছেন। অথচ এই ইস্যুতে তিনিও কংগ্রেসের পাশে দাঁড়াতে রাজি হননি। একজোট হয়ে মাঠে নামতে অস্বীকার করেছেন। কারণটি সহজবোধ্য। পাঞ্জাব ধরে রাখতে হবে। বিজেপির কাছে তাঁদের দিল্লি হারাতে হয়েছে। আর কারও কাছে পাঞ্জাব হারাতে রাজি নন তিনি। পাঞ্জাবে তাঁর প্রধান প্রতিপক্ষ কংগ্রেস। দ্বিতীয় প্রতিপক্ষ বিজেপি। রাজ্য ধরে রাখা তাঁর বড় চিন্তা।

একই চিন্তায় বিভোর উত্তর প্রদেশের সমাজবাদী নেতা অখিলেশ যাদবও। নতুন বছরের গোড়ায় তাঁর রাজ্যেও ভোট। দুবারের মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথকে সরিয়ে লক্ষ্ণৌয়ের তখতে বসার স্বপ্নে তিনিও বিভোর। বৈঠকে তিনি না এলেও প্রতিনিধি পাঠিয়েছেন। কিন্তু তাতে কী? তাঁর দলের নেতারা বারবার মনে করিয়ে দিতে ভুলছেন না, রাজ্যে কংগ্রেসের স্থান তাঁদের অনেক নিচে।

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও রাহুল গান্ধী

সমাজবাদী পার্টির (এসপি) মর্জি মেনেই কংগ্রেসকে সীমিত আসন নিয়ে সন্তুষ্ট থাকতে হবে। নির্বাচন কমিশন খারাপ। একচক্ষু হরিণ। তার বিরুদ্ধে আন্দোলনেও প্রস্তুত দল। কিন্তু কংগ্রেসকে মনে রাখতে হবে, পঞ্চাশের বেশি আসন চেয়ে তারা যেন জোট দুর্বল না করে।

অর্থাৎ দলীয় স্বার্থের ওপরে দেশকে স্থান দিতে ইন্ডিয়া জোটে অনেকেরই তীব্র অনীহা। কমিশন খারাপ। তার পুনর্গঠন প্রয়োজন। সে জন্য আইন বদলানোও দরকার। কিন্তু তা করতে গিয়ে নিজের রাজ্যে নিজের দলের স্বার্থ বিন্দুমাত্র যেন হানি না হয়। সত্যি বলতে কী, ইন্ডিয়া জোটের কোনো কোনো শরিকের মনে বিষয়টি এতই জোরালো যে দলের স্বার্থে বিজেপির সঙ্গে কোনো কোনো ক্ষেত্রে আপসেও তাদের আপত্তি নেই।

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ও ক্ষমতায় থাকাকালে এই মনোভাব দেখিয়ে এসেছেন। নিজের রাজ্যে তো বটেই, অন্যত্রও কংগ্রেসকে জমি ছাড়তে তাঁর অনীহা ছিল প্রবল। রাহুল গান্ধীকে বিরোধী জোটের নেতাও তিনি মানতে চাননি। বিরোধিতা করে গেছেন, যা পরোক্ষে সুবিধা দিয়েছে বিজেপিকে। এখন ক্ষমতাচ্যুত মমতা বিজেপির বিরুদ্ধাচরণের জন্য কংগ্রেসকে আঁকড়ে ধরেছেন। বুধবারের বৈঠকে জানিয়েও দিয়েছেন, রাহুলকে পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দেখতে চান।

ইন্ডিয়া জোটের আরেকটি ব্যর্থতা জোটের পরিধি বৃদ্ধি করতে না পারা। আঞ্চলিক দলগুলোর প্রধান ও প্রাথমিক স্বার্থ নিজেদের খাসতালুকে ক্ষমতা বা প্রভাব ধরে রাখা। তারা এ–ও জানে, অঞ্চলের গণ্ডি পেরিয়ে দেশের অন্যত্র বিকশিত হওয়ার ক্ষমতা তাদের নেই।

ভারতের সিইসি জ্ঞানেশের অনুষ্ঠান স্থগিত

বিজেপির পর কংগ্রেসই দ্বিতীয় দল, যার সর্বভারতীয় উপস্থিতি ও প্রভাব আছে। বিজেপির বিরোধিতা করতে গিয়ে কংগ্রেসের পাশে দাঁড়ানো তাদের পক্ষে কতটা লাভের, সেই চিন্তা এখনো জোটের অনেক নেতাকে দোলাচলে রেখেছে।

যদিও এই নেতারা জানেন, বিজেপি সেই শক্তি, যারা শরিকের পাশে থেকে শরিককেই গিলে ফেলে। মহারাষ্ট্রে এভাবে তারা শিবসেনাকে শেষ করেছে। এনসিপিকে গিলে ফেলেছে। পশ্চিমবঙ্গে তৃণমূল কংগ্রেসকে পথে বসিয়েছে। বিহারে নীতীশ কুমারকে কোণঠাসা করে ছড়ি ঘোরাচ্ছে।

এই দোলাচল এখনো দ্বিধায় রেখেছে তেলেঙ্গানার বিআরএসকে, অন্ধ্র প্রদেশের ওয়াইএসআর কংগ্রেসকে, ওডিশার বিজু জনতা দলকে এবং অবশ্যই কিছুটা টিডিপি ও জেডিইউকে। শেষের এই দুই দল এনডিএর শরিক। এদেরই মতো শরিক বিহারের লোকজনশক্তি পার্টির নেতা চিরাগ পাসোয়ান, উত্তর প্রদেশের রাষ্ট্রীয় লোক মোর্চার নেতা উপেন্দ্র কুশওয়া, মহারাষ্ট্রের শরিক রিপাবলিকান পার্টির রামদাস আটওয়ালে, কর্ণাটকে জেডিএসের কুমারস্বামী।

নির্বাচন কমিশনকে ‘সব সন্দেহ দূর করার’ দাবি জানিয়ে এসব নেতার প্রত্যেকেই বিবৃতি দিয়েছিলেন। বিজেপি দ্রুত তাদের সামলেছে। ইসিও বিবৃতি দিয়েছে। যদিও সেই বিবৃতিতে প্রকারান্তরে মেনে নেওয়া হয়েছে, ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের প্রতিটি তথ্য ১০০ ভাগ সত্য।

দিল্লির যন্তর মন্তরে ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) অভিজিৎ দীপকে

যারা এনডিএর জোটের শরিক, এখনই জোট ভেঙে বেরিয়ে আসার মতো কোনো কারণ তারা দেখছে না। জাহাজ ডোবার আগে কেই–বা সমুদ্রে লাফ দেয়? এরা প্রত্যেকেই জল মাপছে। কিন্তু যারা শরিক নয়, যেমন বিজেডি, ওয়াইএসআর কংগ্রেস, বিআরএস—তাদেরও কাউকে তো ইন্ডিয়া এখনো জোটে টানতে পারল না!

জোটের পরিধি আগে যা ছিল, ডিএমকে ছাড়া প্রায় তেমনই থাকল। সংবিধান ও গণতন্ত্রের বিপদও পরিধি বৃদ্ধিতে ব্যর্থ। এর অর্থ, বিজেপির প্রতি শরিকদের ভরসা টাল খেলেও খেতে পারে, তারা সন্দিহান বা সংশয়ী হলেও হতে পারে। কিন্তু এখনই তাকে ত্যাগ করতে রাজি নয়।

ভারতের প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের অপসারণ ও মোদি-শাহর পদত্যাগ দাবি কংগ্রেসের

নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে রাস্তায় নামার সিদ্ধান্ত নিয়েছে ইন্ডিয়া জোট। আগামীকাল শুক্রবার গান্ধীজয়ন্তীর দিন থেকে। ওই দিন থেকেই আন্দোলনে নামছে ককরোচ জনতা পার্টিও (সিজেপি)। তেলাপোকারা মোদি সরকারকে বাধ্য করেছিল শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানকে মন্ত্রিসভা থেকে ছেঁটে ফেলতে। জ্ঞানেশ কুমারের অপসারণ তাদেরও দাবি।

সরকারকে দ্বিতীয়বার নতজানু করতে কারা সফল হবে, ইন্ডিয়া জোট নাকি জেন–জি—এই প্রতিযোগিতাও শুরু হতে চলেছে আগামীকাল শুক্রবার থেকে। এই জোড়া আন্দোলন থেকে নতুন কোনো জোট বিন্যাসের জন্ম হয় কি না, সেদিকে দেশবাসীর নজর থাকবে।

ভারতে ইসি বিতর্ক, সরকার ও বিরোধী পক্ষ সবাই জল মাপছেসিইসি জ্ঞানেশ পদত্যাগ না করলে ২ অক্টোবর থেকে আন্দোলন, হুঁশিয়ারি সিজেপির

Read full story at source