নিজের ক্ষতি করিস না

· Prothom Alo

আম্মা সেই রাতে আমার কল পেয়েছিলেন, যখন আমি বলেছিলাম, আর বাড়ি যাব না। তাঁর গলায় যা শুনেছিলাম, সেই কণ্ঠ এর আগে কখনো শুনিনি। কঠোর আম্মা, যিনি সব সময় আদেশ করেন, সেই মানুষ শুধু বলেছিলেন, ‘তুই আমার একটা ছেলে। নিজের ক্ষতি করিস না।’ সেই বাক্য আমার কানে এখনো বাজে।

Visit cat-cross.com for more information.

জুলাইয়ের শুরুতে কারফিউ শুরু হওয়ার পর থেকে সবকিছু যেন থেমে গিয়েছিল। ভার্সিটি বন্ধ, নেটওয়ার্ক বন্ধ, বাইরে বের হওয়া অসম্ভব; কিন্তু আমাদের দরকার ছিল জানা—আমাদের সঙ্গীরা কোথায়, কতজন মারা গেছে, কতজন বন্দী। এই অজানা ভয় আর অসহায়বোধ থেকেই আমি লালবাগ কেল্লার পাশে বন্ধু রেদোয়ানের বাসায় উঠেছিলাম।

নাগরিক সংবাদে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: [email protected]

কারফিউর দ্বিতীয় দিন ২১ জুলাই সন্ধ্যায় আমরা আজিমপুর কলোনি দেখতে গিয়েছিলাম। রাতে ঘুমানোর আগে খবর পেলাম—প্রতিটি ফ্ল্যাটে পুলিশ যাচ্ছে, মুঠোফোন খুঁজছে, ছবি থাকলে জেল। তখন রাত তিনটা পর্যন্ত জেগে থেকে আমি সব ডিলিট করে দিয়েছিলাম।

রেদোয়ানকেও বলেছিলাম; তবে রেদোয়ান মেসেজ ডিলিট করলেও একটি জিনিস খেয়াল করেনি—গ্যালারি বা মেসেঞ্জার থেকে ডিলিট করলেও ফাইলগুলো স্থায়ীভাবে মোছার আগে ফোনের ‘Recently Deleted’ ফোল্ডারে বা ট্র্যাশে জমা থেকে যায়। ও ভেবেছিল সব মুছে গেছে; কিন্তু আসলে কিছুই পুরোপুরি ডিলিট হয়নি।

পরের দিন বিকেলের পর রেদোয়ানকে বললাম, ‘চল কোথাও থেকে হেঁটে আসি। আজ তোকে বাইরে খাওয়াব, আম্মা টাকা পাঠিয়েছে।’

রেদোয়ান বলল, ‘চল, আমরা এদিক দিয়ে ভেতর হয়ে হেঁটে বুড়িগঙ্গার পাড়ে যেতে পারি।’ কতক্ষণ আর চারদেয়ালের মধে৵ বন্ধ হয়ে থাকা যায়! বিকেলে দুজন গল্প করতে করতে বুড়িগঙ্গার পাড়ে গিয়ে উপস্থিত হলাম। অনেকক্ষণ পাড় ঘেঁষে হাঁটলাম, তারপর একটা ছোট্ট ডিঙিতে পার হয়ে ওপারে গেলাম বেল্লাল মামার বিখ্যাত মুড়ি খেতে।

ওখানে গিয়ে তো মাথা চড়কগাছ! এক প্লেট মুড়ি ১৪০ টাকা, তা–ও আবার আমাদের সিরিয়াল নম্বর ৩৫। অন্তত আধা ঘণ্টার আগে পাওয়া যাবে না। তাই ভাবলাম, অপেক্ষা না করে একটু সামনে থেকে হেঁটে আসি। হাঁটতে হাঁটতে বাবুবাজার ব্রিজ পর্যন্ত চলে এলাম।

ঠিক তার কিছুক্ষণ আগেই আম্মা ফোন দিয়ে টাকা পাঠানোর কথা জানিয়ে সতর্ক করেছিলেন, ‘বাইরে বের হইস না।’ খালামণিও ফোন দিয়ে উদ্বেগের সঙ্গে বললেন, ‘কি রে তুই কই? গাড়ির শব্দ কেন শোনা যায়? এখনই রুমে যা!’

এমনিতেই কারফিউর প্রচণ্ড ভয়, তাই আমরা দ্রুত আবার ডিঙি নিয়ে সদরঘাটে ফিরে এলাম। তাড়াতাড়ি রেদোয়ানের মেসে ফেরার জন্য একটি রিকশা ঠিক করে উঠে পড়লাম। বাবুবাজার ব্রিজের নিচে সিভিল ড্রেসে কয়েকজন পুলিশ তখন পথচারীদের চেক করছিল। আমাদের রিকশাটাও দাঁড় করাল।

আমার তো কোনো ভয় ছিল না। কারণ, ডিভাইসের সব ছবি আর মেসেজ আগেই ডিলিট করে রেখেছিলাম। রিকশা থেকে আমরা মাত্র নামলাম, অমনি দুজন এসআই এসে আমাদের ঘিরে ফেললেন। কোনো কিছু বুঝে ওঠার আগেই শুরু হলো তল্লাশি ও জিজ্ঞাসাবাদ। পকেটে সন্দেহজনক কিছু আছে কি না, দেখার পাশাপাশি আমাদের মুঠোফোন কাড়াকাড়ি করে দেখা শুরু করলেন।

আমার ফোনে সন্দেহজনক বা অবৈধ কিছুই পেলেন না। কিছু না পাওয়ায় পুলিশ কর্মকর্তা আমাকে রিকশায় বসা অবস্থাতেই যাওয়ার অনুমতি দিলেন। আমি রিকশায় বসে রইলাম; আর রেদোয়ানকে নিচে দাঁড় করিয়ে রাখা হলো।

কিন্তু রেদোয়ানের ফোনের চিত্র ছিল ভিন্ন। পুলিশ যখন স্ক্রল করছিল, তখনই ট্র্যাশে জমা থাকা আজিমপুরের সেই ছবি ভেসে উঠল—মাথায় পতাকা, হাতে লোহার পাইপ।

যার যা হওয়ার তা–ই হলো। পুলিশ সন্দেহজনক ছবি পেয়ে যাওয়ায় পরিস্থিতি মুহূর্তের মধ্যে পাল্টে গেল। প্রথমে বলেছিল, জিজ্ঞাসাবাদ করে ছেড়ে দেবে; কিন্তু প্রমাণ পাওয়ার পর এসআই সাহেবের মুখ শক্ত হয়ে গেল। রেদোয়ান তখন চরম ভয়ে কাঁপছে, আতঙ্কে গাড়িতে ওঠার পরেই অটোর ভেতরে বমি করে দিল।

পুলিশ রেদোয়ানকে আটক করে সোজা সদরঘাটের কোতোয়ালি থানায় নিয়ে গেল। যেহেতু আমার ফোন একেবারে পরিষ্কার ছিল এবং আমাকে আগেই ছেড়ে দেওয়া হয়েছিল, তাই আমাকে আর থানায় যেতে হয়নি। তবে থানায় নেওয়ার পর পুরো দিন প্রচণ্ড মানসিক চাপ ও নানা জিজ্ঞাসাবাদের মুখোমুখি হতে হয় রেদোয়ানকে।

সেদিন রিকশায় বসে প্রথম কাজ ছিল বাড়ি ফোন করা। আম্মার শ্বাস আমি শুনতে পেয়েছিলাম। আর অন্যদিকে সৌভাগ্যবশত বহু ধকল ও জিজ্ঞাসাবাদ শেষে পরিস্থিতি স্পষ্ট হলে সেদিন গভীর রাতে পুলিশ রেদোয়ানকেও শেষ পর্যন্ত ছেড়ে দেয়।

সেদিন নিজের ঠান্ডা মাথা ও ডিভাইসে কোনো প্রমাণ না রাখার কারণে যেমন আমি বেঁচে গিয়েছিলাম, তেমনই অনেক বড় এক ঝড় কেটে যাওয়ার পর রাতে রেদোয়ানও সুস্থভাবে বাড়ি ফিরে আসতে পেরেছিল। মেসে ফিরে এসে আমি ভাবছিলাম, এটাই হয়তো বড় হওয়া। সাহস দেখানো নয়, ঠান্ডা মাথায় সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়া। আম্মার কণ্ঠ এখনো কানে বাজছিল, ‘নিজের ক্ষতি করিস না।’

  • লেখক: ফারহান ইয়ামিন, শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

Read full story at source