মৃত্যু দীর্ঘজীবী হোক: ফ্যাসিবাদের সঙ্গে সহিংসতার সম্পর্ক

· Prothom Alo

সারকথা

Visit forestarrow.rest for more information.

এই প্রবন্ধের আলোচনার কেন্দ্রে রয়েছে ফ্যাসিবাদের সঙ্গে সহিংসতা ও মৃত্যুর গভীর সম্পর্ক। ইতিহাস, দর্শন, মনোবিশ্লেষণ ও উত্তর-ঔপনিবেশিক তত্ত্বের আলোকে লেখাটি দেখায়, ফ্যাসিবাদ কেবল ক্ষমতা দখল বা বিরোধীদের দমন করতে সহিংসতার আশ্রয় নেয় না; বরং সহিংসতাকে মহৎ, নৈতিক ও সৃজনশীল শক্তি হিসেবে তুলে ধরে। একইভাবে, মৃত্যুকেও জাতীয় পুনর্জন্ম, আত্মত্যাগ ও রাজনৈতিক আনুগত্যের চূড়ান্ত নিদর্শনে পরিণত করে। প্রবন্ধটির একটি গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য হলো, ফ্যাসিবাদী সহিংসতার বীজ ইউরোপীয় উপনিবেশবাদের মধ্যেই নিহিত ছিল। উপনিবেশে গড়ে ওঠা বর্ণভিত্তিক বিভাজন, মানুষকে অমানবিক করে তোলা, সামরিক নিয়ন্ত্রণ, জরুরি আইন ও বিচারবহির্ভূত দমন পরে ইউরোপে ফিরে এসে ফ্যাসিবাদী রাষ্ট্রকাঠামোকে শক্তিশালী করে। সোরেল, জেন্টাইলে, রেইক, আরেন্ট, ফুকো, আগামবেন ও এমবেম্বের ভাবনার সূত্র ধরে লেখাটি ব্যাখ্যা করে, কীভাবে ব্যক্তি ও জনগোষ্ঠীকে শত্রু, অমানুষ বা হত্যাযোগ্য জীবনে পরিণত করা হয়। ফ্যাসিবাদ আইন ভেঙেই শুধু কাজ করে না; আইন, আমলাতন্ত্র, প্রযুক্তি, নজরদারি ও জনসংখ্যা ব্যবস্থাপনাকেও মৃত্যুর রাজনীতির হাতিয়ার বানায়। জাতীয় বিশুদ্ধতার আকাঙ্ক্ষা, পুনর্জন্মের পৌরাণিক প্রতিশ্রুতি, নেতার প্রতি আবেগময় আনুগত্য এবং সহিংসতার প্রকাশ্য প্রদর্শন মানুষকে এই ধ্বংসাত্মক রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত করে। ফলে হত্যা ব্যক্তিগত বিদ্বেষের বিষয় না থেকে প্রশাসনিক দায়িত্ব, ঐতিহাসিক প্রয়োজন বা জাতির নিরাপত্তার নামে বৈধতা পায়। প্রবন্ধের শেষ কথা হলো, ফ্যাসিবাদ শুধু বিংশ শতকের ইউরোপে সীমাবদ্ধ কোনো অতীত অধ্যায় নয়; আধুনিক রাষ্ট্র, সাম্রাজ্যবাদ, বর্ণবাদী পুঁজিবাদ, নিরাপত্তা-রাজনীতি ও বৈশ্বিক বৈষম্যের ভেতরেও এর যুক্তি নতুন রূপে টিকে আছে। সামরিকীকৃত পুলিশি ব্যবস্থা, বিচারবহির্ভূত হত্যা, দখলদারত্ব, শিবির, সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ, গণনজরদারি ও উদ্বাস্তু ব্যবস্থাপনায় তার প্রতিধ্বনি স্পষ্ট। তাই ফ্যাসিবাদ প্রতিরোধ করতে হলে সহিংসতার মহিমাকীর্তন ও মৃত্যুর স্বাভাবিকীকরণ প্রত্যাখ্যান করে মানবমর্যাদা, নৈতিক বিচার, আইনি জবাবদিহি এবং প্রতিটি জীবনের সমান মূল্য প্রতিষ্ঠা করতে হবে।

- জঁ-পল সার্ত্র, ‘অন দ্য এক্সিকিউশন অব জুলিয়াস অ্যান্ড ইথেল রোসেনবার্গ’, লিবারেশন, ২২ জুন ১৯৫৩"কতজন মানুষ ফ্যাসিবাদের শিকার হয়েছে, সে সংখ্যা দিয়ে ফ্যাসিবাদকে সংজ্ঞায়িত করা হয় না, বরং তাদেরকে কীভাবে হত্যা করা হয়েছে, তা দিয়ে ফ্যাসিবাদ সংজ্ঞায়িত হয়।"

ভূমিকা

৩০ জানুয়ারি ১৯৩৯, ইউরোপীয় ইহুদিদের পরিকল্পিত গণহত্যা ব্যাপকভাবে শুরু হওয়ার প্রায় দুই বছর আগে, অ্যাডলফ হিটলারের দেওয়া সেই কুখ্যাত দাম্ভিক ও উদ্ধত ভবিষ্যদ্বাণীটির কথা চিন্তা করুন, ‘আজ আমি আবারও ভবিষ্যতের একজন পরিত্রাতা হয়ে উঠব: যদি ইউরোপের ভেতরে ও বাইরের আন্তর্জাতিক ইহুদি অর্থদাতারা জাতিগুলোকে আবারও একটি বিশ্বযুদ্ধের দিকে ঠেলে দিতে সফল হয়, তাহলে তার ফল পৃথিবীকে বলশেভিকীকরণ করা হবে না এবং এর মাধ্যমে ইহুদি জাতির বিজয় হবে না; বরং ইউরোপে ইহুদি জাতির বিনাশ হবে!’ (আরাদ, গুটম্যান ও মার্গালিয়ট, ১৯৯৯: ১৩৪)। হিটলার সমীকরণের শর্তগুলো উল্টে দিয়েছিলেন এবং বিশ্বকে এমন একটি যুদ্ধের দিকে ঠেলে দেওয়ার জন্য অন্যদের অভিযুক্ত করেছিলেন, যা তিনি নিজেই শুরু করতে চেয়েছিলেন।

৩ জুলাই ২০২০, মাউন্ট রাশমোরেতে, বর্তমান মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প (সে সময়ও তিনি প্রথম দফায় প্রেসিডেন্ট ছিলেন) এক নতুন ধরনের ফ্যাসিবাদের হুমকি সম্পর্কে সতর্ক করেছিলেন, ‘আমাদের স্কুলগুলোতে, আমাদের সংবাদ কেন্দ্রগুলোতে, এমনকি আমাদের করপোরেট সভাকক্ষগুলোতেও এক নতুন উগ্র-বামপন্থী ফ্যাসিবাদ রয়েছে, যা সম্পূর্ণ আনুগত্য দাবি করে। যদি আপনি এর ভাষায় কথা না বলেন, এর আচার-রীতি পালন না করেন, এর মন্ত্র উচ্চারণ না করেন এবং এর আদেশ-নির্দেশ অনুসরণ না করেন, তাহলে আপনাকে সেন্সর করা হবে, নির্বাসিত করা হবে, কালোতালিকাভুক্ত করা হবে, নির্যাতন করা হবে এবং শাস্তি দেওয়া হবে। এটা আমাদের সঙ্গে ঘটতে দেওয়া হবে না।’

আমরা এক বিভ্রান্তিকর সময়ে বাস করছি, যখন ফ্যাসিবাদী হয়ে উঠতে চাওয়া ব্যক্তিরা নিজেদেরকে গণতন্ত্রপন্থী হিসেবে চিত্রিত করেন, অথচ মিথ্যাভাবে ফ্যাসিবাদকে বামপন্থী ভাবাদর্শ হিসেবে উপস্থাপন করেন। মাউন্ট রাশমোরে ট্রাম্প তেমনটাই করেছিলেন, ব্রাজিলের উগ্র-ডানপন্থী সাবেক প্রেসিডেন্ট জইর বলসোনারো বছরের পর বছর ধরে যেমনটা করে আসছেন এবং হিটলার-মুসোলিনিও যেমনটা করেছিলেন। অতীতের ফ্যাসিবাদী নেতাদের মতোই ট্রাম্প অব্যাহত মিথ্যাচার করেছেন এবং অদৃশ্য স্বৈরাচারী শক্তির প্রতি নিন্দা জানিয়েছেন, যা তাঁর কর্তৃত্ববাদী ও সহিংসতামুখী রাজনৈতিক প্রবণতাকে তুলে ধরে। বস্তুত ট্রাম্প একটি চিরায়ত কৌশলেরই পুনরাবৃত্তি করেছেন: ফ্যাসিবাদীরা নিজেদের পরিচয় অস্বীকার করে এবং তাদের নিজেদের বৈশিষ্ট্য ও স্বৈরাচারী রাজনীতিকে শত্রুদের ওপর চাপিয়ে দেয়। এই বৈশিষ্ট্যগুলোর মধ্যে প্রথম ও প্রধান হলো সহিংসতার হুমকি। ক্ষেত্রবিশেষে এ ধরনের রাজনীতি সামরিক হুমকি, অর্থনৈতিক অবরোধ ও বলপ্রয়োগের নীতিতেও প্রকাশ পায়; ট্রাম্প প্রশাসনের ভেনেজুয়েলা ও ইরানবিষয়ক নীতিতে এমন প্রবণতা দেখা গেছে।

এই প্রবন্ধের বিশ্লেষণী কাঠামোতে চরম মিথ্যাচার, অপরের প্রতি বিদ্বেষপ্রসূত ভীতির রাজনীতি, একনায়কতন্ত্র ও সহিংসতাকে ফ্যাসিবাদের চারটি প্রধান উপাদান হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। ফ্যাসিবাদ সহিংসতাকে একটি সুন্দর ও নৈতিক শক্তি এবং মহত্ত্ব, পবিত্রতা ও ক্ষমতার উৎস হিসেবে উপস্থাপন করে। রাজনীতির সামরিকীকরণের মাধ্যমে এটি সহিংসতাকে বিস্তৃত করে, যার চূড়ান্ত পরিণতি যুদ্ধ ও গণহত্যা পর্যন্ত গড়াতে পারে। একটি ভাবাদর্শ, আন্দোলন ও শাসনব্যবস্থা হিসেবে ফ্যাসিবাদের ঐতিহাসিক বিকাশে সহিংসতা কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালন করেছে। ফ্যাসিবাদী প্রচারণা প্রায়ই নিজের সহিংসতাকে কাল্পনিক বা অতিরঞ্জিত হুমকির বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় প্রতিরক্ষা হিসেবে তুলে ধরে। ট্রাম্প, বলসোনারো বা নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক ভাষ্য ও নীতির বিশ্লেষণে এই পূর্বপ্রস্তুতিমূলক যুক্তির ব্যবহার শনাক্ত করা যায়। নাৎসি নিপীড়ন ও হলোকাস্টের ক্ষেত্রেও ইহুদি ও অন্যান্য জনগোষ্ঠীকে অস্তিত্বগত হুমকি হিসেবে নির্মাণ করে সহিংসতা ও গণহত্যাকে বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছিল। সমকালীন ইসরায়েলি সহিংসতার পক্ষে উপস্থাপিত কিছু যুক্তিতেও একই ধরনের নিরাপত্তা ও পূর্বপ্রতিরোধের ভাষা দেখা যায়।

ড্যানিয়েল উডলি তাঁর ফ্যাসিজম অ্যান্ড পলিটিক্যাল থিওরি (২০১০: ১০৫-১০৬) বইয়ে ফ্যাসিবাদী সহিংসতার তিনটি উৎস চিহ্নিত করেন। প্রথমত, ফ্যাসিবাদ জাতিরাষ্ট্র সংগঠিত করার জন্য সহিংসতাকে সুস্পষ্টভাবে বিস্তৃত ও তীব্র করে তোলে। বাউম্যানের বরাত দিয়ে উডলি উল্লেখ করেন, আমাদের পাশ্চাত্য সমাজে বিদ্যমান আত্মচেতনার গভীরে প্রোথিত কারণতাত্ত্বিক পৌরাণিক কাহিনিটি হলো প্রাক্‌-সামাজিক বর্বরতা থেকে মানবতার উত্থান হয়েছে, যা নৈতিকভাবে অনুপ্রেরণামূলক। এই পৌরাণিক কাহিনিটি বেশ কিছু প্রভাবশালী সমাজতাত্ত্বিক তত্ত্ব ও ঐতিহাসিক আখ্যানকে উদ্দীপনা জুগিয়েছিল ও জনপ্রিয় করে তুলেছিল এবং ফলশ্রুতিতে তা পণ্ডিতদের দ্বারা পরিশীলিত সমর্থন লাভ করেছিল (বাউম্যান, ১৯৮৯: ১২)। জাতিরাষ্ট্রের ভিত্তি স্থাপন ও সুসংহতকরণের জন্য অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক উভয় অর্থেই সহিংসতা একটি অবিচ্ছেদ্য উপকরণ। কিন্তু আধুনিকীকরণের অনুসারী তাত্ত্বিকেরা যেখানে গণতন্ত্র, আন্তর্জাতিক সংহতি ও অর্থনৈতিক নির্ভরশীলতার মধ্যে পারস্পরিক সম্পর্ক শক্তিশালী করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন, সেখানে জাতিরাষ্ট্রগুলোতে জবরদস্তিমূলক ক্ষমতার বিস্তার একদিকে আন্তর্জাতিক সম্পর্কের বাহ্যিক রাজনৈতিক ও সামরিক ব্যবস্থাপনা এবং অন্যদিকে নিজ দেশ ও জনসংখ্যার মধ্যে রাজনৈতিক ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে শক্তি প্রয়োগকে মূর্ত করে তোলে। আধুনিক রাষ্ট্রগুলোতে সামরিক ও আমলাতান্ত্রিক সংগঠনগুলোর জবরদস্তিমূলক ক্ষমতা প্রয়োগ ক্রমাগত সরকার কর্তৃক আরোপিত প্রাতিষ্ঠানিক বাধাগুলোকে ছাপিয়ে যাওয়ার হুমকি দেয়।

দ্বিতীয়ত, ফ্যাসিবাদ উপনিবেশবাদে প্রতিষ্ঠিত সামরিক ও বর্ণবাদী সহিংসতাকে প্রসারিত করে। যদিও উদারপন্থী ও রক্ষণশীল ঐতিহাসিকেরা ফ্যাসিবাদী সামরিকবাদ এবং সাম্রাজ্যবাদী যুগে ব্রিটেন, রাশিয়া, ফ্রান্স ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কর্তৃক সংঘটিত ‘বৈধ’ সামরিকবাদের মধ্যে পার্থক্য করেন। কিন্তু নির্জলা বাস্তবতা হলো আধিপত্যবাদী প্রকল্প হিসেবে ফ্যাসিবাদ ও উপনিবেশবাদ একই গতিপথে চলে। উপনিবেশবাদের অধীনে, অঞ্চল জয় করতে এবং এশিয়া ও আফ্রিকার অশ্বেতাঙ্গ মানুষকে (তথাকথিত অর্থে) ‘সভ্য’ করতে সহিংসতা ব্যবহৃত হয়েছিল। কিন্তু সমান্তরালভাবে এটি ক্ষমতার একটি নিজস্ব রূপ হিসেবেও বিকশিত হয়। কারণ, বসতি স্থাপনকারী উপনিবেশবাদের সহিংসতা উন্নত দেশগুলোতেই নাগরিক নিপীড়নের জন্য একটি নজির তৈরি করে। সমকালে বুর্জোয়া রাজনৈতিক সমাজে ঔপনিবেশিক বর্ণবাদ ও শ্রেণিগত বর্ণবাদের মধ্যে উদ্বেগজনক সাদৃশ্য পরিলক্ষিত হয়। তৃতীয়ত, ফ্যাসিবাদে সহিংসতার নান্দনিকীকরণ সহিংস কার্যকলাপের এমন এক ব্যতিক্রমী মহত্ত্ব তুলে ধরে, যা বুর্জোয়া নৈতিকতাকে ছাড়িয়ে যায়। ফ্যাসিবাদী সহিংসতার প্রচলিত ব্যাখ্যাগুলো ফ্যাসিবাদ ও সামাজিক ডারউইনবাদের মধ্যকার সংযোগের ওপর জোর দেয়। এখানে হিটলারের সেই বিশ্বাসই মুখ্য হয়ে ওঠে, যেখানে তিনি যুদ্ধকে ‘সমগ্র জীবনের এক অপরিবর্তনীয় বিধান’ হিসেবে উল্লেখ করেন। এই অনন্য অযৌক্তিক দাবিটিই ফ্যাসিবাদী সামরিকবাদের ধ্বংসাত্মক ও গণহত্যামূলক যুক্তিকে ব্যাখ্যা করতে পারে। ফ্যাসিবাদী সামরিকবাদে সহিংসতার নান্দনিকীকরণ ‘অন্তহীন সংগ্রাম’-এর ধারণার ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু সুনির্দিষ্ট অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক উপাদান থেকে বিচ্ছিন্ন করলে এই ধরনের ধারণাকে আর ব্যাখ্যার আওতার মধ্যে নিয়ে আসা যায় না।

বিশ শতকের খুব কম রাজনৈতিক ঘটনাই ফ্যাসিবাদের মতো সহিংসতা ও মৃত্যুকে এত নিবিড়ভাবে একসূত্রে বাঁধতে পেরেছে। ফ্যাসিবাদী আন্দোলনগুলোর প্রথম দিকের রাস্তার আনুষ্ঠানিক সহিংসতা থেকে শুরু করে নাৎসি মৃত্যুশিবিরগুলোর পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড পর্যন্ত ফ্যাসিবাদ নিজেকে কেবল একটি রাজনৈতিক ভাবাদর্শ হিসেবে নয়, বরং একটি স্বতন্ত্র রাজনৈতিক সত্তাতত্ত্ব হিসেবে উপস্থাপন করে। এখানে সহিংসতাকে একটি সৃজনশীল নীতিতে উন্নীত করা হয় এবং মৃত্যু অর্থপূর্ণতার একটি কেন্দ্রীয় প্রকরণে পরিণত হয়। সহিংসতা ও মৃত্যু ফ্যাসিবাদী চিন্তা ও চর্চার গঠনমূলক উপাদান হিসেবে কাজ করে। ফ্যাসিবাদ কেবল ক্ষমতা দখল বা বজায় রাখার জন্য সহিংসতা ব্যবহার করে না; এটি সহিংসতাকে একটি নবজীবনদানকারী শক্তি হিসেবে মহিমান্বিত করে তোলে এবং মৃত্যুকে রাজনৈতিক অন্তর্ভুক্তির সর্বোচ্চ অভিব্যক্তি হিসেবে নান্দনিক রূপ দেয়। এই অর্থে ফ্যাসিবাদ উদারনৈতিক এবং গণতান্ত্রিক ঐতিহ্য থেকে একটি আমূল বিচ্যুতির প্রতিনিধিত্ব করে। কিন্তু এর আপাত অভিব্যক্তি হলো এটি আদর্শগতভাবে সহিংসতা সীমিত করতে এবং জীবন রক্ষা করতে চায়।

রাজনৈতিক দর্শন, সুবিচার তত্ত্ব, মনোবিশ্লেষণ ও অবভাস তত্ত্বের ওপর ভিত্তি করে এখানে ফ্যাসিবাদী সহিংসতার একটি বহুস্তরীয় ব্যাখ্যা তুলে ধরার চেষ্টা করা হয়েছে। প্রসঙ্গক্রমে অনুসৃত প্রধান চিন্তাবিদদের মধ্যে রয়েছেন জর্জ সোরেল, জিওভানি জেন্টাইলে, ভিলহেলম রাইখ, হানা আরেন্ট, ওয়াল্টার বেঞ্জামিন, মিশেল ফুকো, জর্জো আগামবেন ও এশিলে এমবেম্বে। ফ্যাসিবাদের তাত্ত্বিক ও প্রায়োগিক অভিমুখের সঙ্গে নিবিড়ভাবে জড়িয়ে আছে সার্বভৌমত্ব, জৈবরাজনীতি ও নিদানরাজনীতি (নেক্রোপলিটিকস)। ফ্যাসিবাদ রাষ্ট্রক্ষমতা ও মানবমৃত্যুর মধ্যকার সম্পর্ককে একটি নতুন মাত্রায় উন্নীত করে। তিনটি কেন্দ্রীয় প্রতিপাদ্য সামনে রেখে এখানে আলোচনা এগিয়ে নেওয়া হবে। প্রথমত, ফ্যাসিবাদ সহিংসতাকে একটি ভিত্তিগত কল্পকথন হিসেবে ধারণা করে, যা রাজনৈতিক ঐক্য তৈরি করে। দ্বিতীয়ত, ফ্যাসিবাদ মৃত্যুকে একটি ইতিবাচক রাজনৈতিক মূল্যবোধ হিসেবে পুনঃসংজ্ঞায়িত করে, যা হত্যা ও আত্মত্যাগকে সত্যতা ও আনুগত্যের পরিচায়ক হিসেবে রূপান্তরিত করে। তৃতীয়ত, ফ্যাসিবাদী শাসনব্যবস্থা আমলাতন্ত্র, প্রযুক্তি ও আইনি ব্যবস্থার মাধ্যমে মৃত্যুকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেয়, যার চূড়ান্ত রূপকে একটি ‘সংগঠিত মৃত্যুর রাজনীতি’ হিসেবে অভিহিত করা যেতে পারে।

উপনিবেশবাদের প্রভাব: ফ্যাসিবাদী সহিংসতার আঁতুড়ঘর

উপনিবেশবাদ ও ফ্যাসিবাদী সহিংসতার মধ্যে ঐতিহাসিক, আদর্শগত ও কাঠামোগত সম্পর্ক রয়েছে বলে মনে করা হয়। ফ্যাসিবাদকে প্রায় ক্ষেত্রেই বিশ শতকের একটি অনন্য ইউরোপীয় ব্যাধি হিসেবে গণ্য করা হয়। তবে এই ব্যাখ্যা এর গভীরতর ঐতিহাসিক শিকড়কে আড়াল করে। নিবিড় পর্যবেক্ষণে যে বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে ওঠে, তা হলো ফ্যাসিবাদী সহিংসতা কোনো ব্যতিক্রম নয়; বরং ঔপনিবেশিক প্রথারই গৃহে প্রত্যাবর্তন অর্থাৎ ইউরোপে পুনঃভুক্তি। উত্তর-ঔপনিবেশিক তত্ত্ব, ঐতিহাসিক সমাজতত্ত্ব ও রাজনৈতিক দর্শনের ওপর ভিত্তি করে যুক্তি দেওয়া যায় যে ফ্যাসিবাদ ইউরোপীয় আধুনিকতার মধ্যে একটি ব্যত্যয় হিসেবে আবির্ভূত হয়নি, বরং ঔপনিবেশিক প্রথার ধারাবাহিকতা ও অন্তর্নিহিতকরণ হিসেবেই উদ্ভূত হয়েছে। ফ্রাঞ্জ ফানোঁ, আইমে সেজেয়ার, হানা আরেন্ট-এর কাজ ও সমসাময়িক গবেষণার আলোকে এটি সুস্পষ্ট যে উপনিবেশবাদ বর্ণগত স্তরবিন্যাস, বিমানবিকীকরণ ও সর্বাত্মক আধিপত্যের মতো বস্তুগত কৌশল ও আদর্শগত কাঠামো সরবরাহ করেছিল, যা পরবর্তীকালে ইউরোপে ফ্যাসিবাদী শাসনব্যবস্থায় স্ফটিকের মতো রূপ লাভ করে। অর্থাৎ উপনিবেশবাদই ফ্যাসিবাদী সহিংসতার ভিত্তিগত ল্যাবরেটরি গঠন করেছিল বলে মনে করা হয়।

উপনিবেশবাদকে কেবল একটি অর্থনৈতিক শোষণ হিসেবে বিবেচনা করলে দখলদারেরা স্থানীয় মানুষের ওপর যে নিপীড়ন, নির্যাতন ও বঞ্চনা সৃষ্টি করেছিল, তা আড়াল হয়ে যায়। উপনিবেশবাদ ছিল মূলত সহিংসতার ওপর ভিত্তি করে প্রতিষ্ঠিত আধিপত্যের একটি ব্যাপক ও সমন্বিত নকশা। ফ্রাঞ্জ ফানোঁ তাঁর দ্য রেচেড অব দ্য আর্থ (২০০৪) বইয়ে ঔপনিবেশিক বিশ্বকে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণভাবে ‘বিচ্ছিন্নকরণ’ (compartmentalised) হিসেবে বর্ণনা করেছেন, যা উপনিবেশ স্থাপনকারী ও উপনিবেশিতদের কঠোর শ্রেণিবিন্যাসে বিভক্ত ছিল। বিভাজিত এ ব্যবস্থাটি জবরদস্তি ও বিমানবিকীকরণের মাধ্যমে টিকিয়ে রাখা হতো। সহিংসতা আকস্মিক ছিল না, বরং ঔপনিবেশিক শাসনের একটি গঠনমূলক অংশ ছিল। ঔপনিবেশিক সমাজগুলোতে জাতিগত শ্রেণিবিন্যাস, দৈশিক বিচ্ছিন্নতা, আইনি বৈষম্য ও পদ্ধতিগত দমন প্রাতিষ্ঠানিক রূপ গ্রহণ করেছিল। এই কাঠামোগুলো ফানোঁর ভাষায় একটি ‘ম্যানিকিয়ান বিশ্ব’ তৈরি করেছিল, যেখানে মানবতা নিজেই স্তরীভূত ছিল (ফানোঁ, ২০০৪)। ঔপনিবেশিক সহিংসতার লক্ষ্য ছিল কেবল নিয়ন্ত্রণ করাই নয়, বরং উপনিবেশিতদের ব্যক্তিসত্তাকে মুছে ফেলা এবং তাদেরকে শাসনের বিষয়বস্তুতে পরিণত করা। ফানোঁ তাঁর ব্ল্যাক স্কিন, হোয়াইট মাস্কস (১৯৬৭) বইয়ে উল্লেখ করেন যে উপনিবেশবাদীরা উপনিবেশিতদেরকে কেবল একটি বিষয়ী (subject) হিসেবে স্বীকৃতি দিতে ব্যর্থ হন না, বরং সম্পূর্ণরূপে মানুষ হিসেবে তাদের অস্তিত্বকে সক্রিয়ভাবে অস্বীকার করেন (ফানোঁ, ১৯৬৭: ৮৮)।

জঁ-পল সার্ত্র একইভাবে যুক্তি দিয়েছিলেন যে উপনিবেশবাদ উপনিবেশিত জনগোষ্ঠীকে ‘বিমানবিক’ করতে চেয়েছিল। উপনিবেশবাদ এমন একটি ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করে, যেখানে সহিংসতাকে শাসনের একটি স্বাভাবিক অংশ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল। রোজেনবার্গ দম্পতির মৃত্যুদণ্ড প্রসঙ্গে সার্ত্রের বহুল উদ্ধৃত মন্তব্য—ফ্যাসিবাদকে তার শিকারের সংখ্যা দিয়ে নয়, হত্যার ধরন দিয়ে চেনা যায়—ফ্যাসিবাদী সহিংসতার পরিকল্পিত বিমানবিকীকরণ ও মানবমর্যাদার বিলোপের প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করে। তিনি ফ্যাসিবাদকে চূড়ান্ত ‘বর্বরতা’ হিসেবে বিবেচনা করতেন, যা ব্যক্তিক স্বাধীনতাকে দমন করার জন্য একটি মনগড়া গণ–উন্মাদনার ওপর নির্ভর করে। তিনি মনে করতেন যে ফ্যাসিবাদী সহিংসতা হলো একটি সত্তাগত আক্রমণ। ব্যক্তিদেরকে একটি সমষ্টিগত, জৈব রাষ্ট্রকাঠামোর বিনিময়যোগ্য যন্ত্রাংশে পরিণত করার মাধ্যমে এটি চরম আনুগত্য বলবৎ করে। তাঁর সমসাময়িক আইমে সেজেয়ারের মতো সার্ত্রও বিশ্বাস করতেন যে পশ্চিমারা ফ্যাসিবাদী সহিংসতাকে ততক্ষণ পর্যন্ত সহ্য করে ও প্রশ্রয় দেয়, যতক্ষণ তা প্রান্তিক বা অ–ইউরোপীয় জনগোষ্ঠীর ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয়; কিন্তু পরিহাসের বিষয় হলো, অবশেষে তা খোদ ইউরোপের দিকেই বাঁক নেয়। সেজেয়ার তাঁর ডিসকোর্স অন কলোনিয়ালিজম (২০০০) বইয়ে ফ্যাসিবাদকে ‘ইউরোপে প্রয়োগকৃত উপনিবেশবাদ’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন (সেজেয়ার, ২০০০: ৩৯)। এই ভাষ্যটি ফ্যাসিবাদকে আধিপত্যের এক বৃহত্তর বিশ্বব্যবস্থার অংশ হিসেবে নতুনভাবে উপস্থাপন করেছে। উপনিবেশবাদের ক্ষেত্রে প্রাতিষ্ঠানিক সহিংসতা এমন একটি রাজনৈতিক পরিবেশ তৈরি করেছিল, যেখানে চরম নৃশংসতা একটি নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনায় পরিণত হয়। এই ধরনের স্বাভাবিকীকরণ পরবর্তীকালে ফ্যাসিবাদী শাসনব্যবস্থার একটি প্রধান বৈশিষ্ট্য হয়ে ওঠে।

উপনিবেশবাদের সহিংস যুক্তি কেবল তখনই বোঝা সম্ভব হয়ে ওঠে, যদি আমরা ঔপনিবেশিক শাসনের বিচারবহির্ভূত কাঠামো ও গঠন এবং ইউরোপীয় রাজনীতি ও সমাজের ওপর এর পশ্চাৎমুখী প্রভাবের দিকে মনোযোগ দিই। আরেন্ট উল্লেখ করেন যে সাম্রাজ্য গঠন ও উপনিবেশবাদ বহু শতাব্দী ধরেই পতনের দিকে ছিল, ‘এগুলো কেবল সেইসব সরকার দ্বারাই সফলভাবে পরিচালিত হয়েছিল, যারা রোমান প্রজাতন্ত্রের মতো প্রাথমিকভাবে আইনের ওপর ভিত্তি করে প্রতিষ্ঠিত ছিল, যাতে বিজয়ের পর সবচেয়ে ভিন্নধর্মী জনগোষ্ঠীগুলোর ওপর একটি সাধারণ আইন চাপিয়ে দিয়ে তাদের একীভূতকরণ সম্ভবপর হয়ে উঠেছিল’ (আরেন্ট, ১৯৫১: ১৬৯-১৭০)। কিন্তু তিনি আরও যোগ করেন, উনিশ শতকে, একটি সমজাতীয় জনগোষ্ঠীর সরকারের প্রতি সক্রিয় সম্মতির ওপর ভিত্তি করে গঠিত জাতিরাষ্ট্রের মধ্যে এই ধরনের ঐক্যবদ্ধ করার নীতির অভাব প্রবল ছিল এবং বিজয়ের ক্ষেত্রে, তাকে অন্তর্ভুক্ত করার পরিবর্তে আত্মীকরণ করে নেওয়া হতো, ন্যায়বিচারের পরিবর্তে সম্মতি বলবৎ করা হতো; অর্থাৎ জবরদস্তিমূলক প্রজাপীড়ন বাস্তবায়ন করা হতো (আরেন্ট, ১৯৫১: ১৬৯-১৭০)। কার্যত, সাম্রাজ্যের সম্প্রসারণ ক্ষমতার জন্য ক্ষমতার এক বিপজ্জনক যুক্তি তৈরি করেছিল, যা ‘রাষ্ট্রনিযুক্ত সহিংসতার প্রশাসক’ নামে এক নতুন শ্রেণির জন্ম দিয়েছিল, যাদের কাজ ছিল উপনিবেশগুলোতে ইউরোপীয় শাসন বলবৎ করা এবং দেশের অভ্যন্তরে সাম্রাজ্যবাদের জন্য সমর্থন জোগাড় করা। এখানেই উপনিবেশবাদের নির্দিষ্ট চরিত্রটি স্পষ্ট হয়ে ওঠে, যা উপনিবেশিত সমাজের স্থায়ী রূপান্তরের ওপর ভিত্তি করে গঠিত একটি শাসনব্যবস্থা।

ঔপনিবেশিকতাকে আধুনিক আন্তর্জাতিক আইন তৈরির একটি ভিত্তিপ্রস্তর হিসেবেও দেখা যেতে পারে, যা ইউরোপীয় ও স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে সহিংসতার মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত আধিপত্যের সম্পর্ককে ন্যায্যতা প্রদান ও বিধিবদ্ধ করার একটি আনুষ্ঠানিক ব্যবস্থা হিসেবে আবির্ভূত হয়েছিল। আন্তর্জাতিক আইন অ–ইউরোপীয় বিশ্বে ‘পূর্ণাঙ্গভাবে গঠিত’ হয়ে আসেনি, বরং ঔপনিবেশিক অভিজ্ঞতার প্রতিক্রিয়ায় ইউরোপীয়দের দ্বারা এটি তৈরি হয়েছিল। অ্যান্টনি অ্যাংঘি তাঁর ইম্পেরিয়ালিজম, সভেরেইন্টি ও দ্য মেইকিং অব ইন্টারন্যাশনাল ল (২০০৪) বইয়ে উল্লেখ করেন যে আন্তর্জাতিক আইন গঠনে উপনিবেশবাদ কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালন করেছিল। আন্তর্জাতিক আইনের অনেক মৌলিক মতবাদের মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো সার্বভৌমত্বের মতবাদ, যা ঔপনিবেশিক সংঘাতের প্রেক্ষাপটে ইউরোপীয় ও অ–ইউরোপীয় বিশ্বের মধ্যকার সম্পর্ককে ব্যাখ্যা করতে পারে, এমন একটি আইনি ব্যবস্থা তৈরির প্রচেষ্টা থেকেই গড়ে উঠেছিল (অ্যাংঘি, ২০০৪: ৩)। আন্তর্জাতিক আইনে প্রত্যক্ষবাদের প্রসারের প্রধান পরিণতি ছিল ইউরো–আমেরিকান জাতিসমূহের ‘সভ্য’ সম্প্রদায়ের মধ্যে জন–আইনকে সীমাবদ্ধ করে দেওয়া এবং এর বিপরীতে, একটি অভিন্ন আন্তর্জাতিক আইনের বিশ্বজনীন আদর্শকে দুর্বল করে দেওয়া। অ–ইউরোপীয় সংস্কৃতির স্বতন্ত্র ঐতিহাসিক ঐতিহ্যকে পাশ কাটিয়ে কেবল বলপূর্বক চাপিয়ে দেওয়া ইউরোপীয় আইনকেই আন্তর্জাতিক আইন হিসেবে গণ্য করা।

উপনিবেশবাদের ভাবাদর্শগত মূল ভিত্তি ছিল জাতিগত শ্রেষ্ঠত্ব ও সভ্যতার স্তরবিন্যাস। সাম্রাজ্যবাদী আধিপত্যকে বৈধতা দেওয়ার জন্য এই ধারণাগুলো অপরিহার্য ছিল। ইউরোপীয় ঔপনিবেশিক শক্তিগুলো এমন একটি বিশ্বদৃষ্টিভঙ্গি তৈরি করেছিল যেখানে অ–ইউরোপীয় জনগোষ্ঠী নিকৃষ্ট ছিল, যার মাধ্যমে তারা বিজয় ও শোষণকে ন্যায্যতা প্রদান করেছিল। এই জাতিগত শ্রেষ্ঠত্বের যুক্তি সরাসরি ফ্যাসিবাদী আদর্শকে প্রভাবিত করেছিল। বিশুদ্ধতা, সমরূপতা ও আরোপিত স্তরবিন্যাসের প্রতি ফ্যাসিবাদের মোহ ঔপনিবেশিক বয়ানকেই প্রতিফলিত করে। আইমে সেজেয়ার বিশেষভাবে উল্লেখ করেন যে নাৎসিদের জাতিগত নীতিগুলো পূর্ববর্তী ঔপনিবেশিক কার্যকলাপ ও ভাবাদর্শ দ্বারা গভীরভাবে প্রভাবিত হয়েছিল। তিনি যুক্তি দিয়েছিলেন যে পরবর্তীতে ইউরোপ ফ্যাসিবাদের যে বিষয়গুলোকে নিন্দা করেছিল, বিশেষ করে হিটলারের শাসনামলের যে মন্দ দিকগুলোকে, তা উপনিবেশগুলোতে দীর্ঘদিন ধরেই চর্চা করা হচ্ছিল। সেজেয়ারের মতে, ফ্যাসিবাদ ছিল ঔপনিবেশিক সহিংসতারই একটি রূপ, যা ইউরোপের দিকেই ফিরে এসেছিল (সেজেয়ার, ২০০০: ৩৭-৩৮)।

উপনিবেশবাদ ও ফ্যাসিবাদের মধ্যে সম্পর্কটি কেবল ভাবাদর্শগতই ছিল না, বরং কাঠামোগতও। ঔপনিবেশিক শাসনব্যবস্থাগুলো আদি-ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থা হিসেবে কাজ করত, যার বৈশিষ্ট্যগুলো ছিল স্বৈরাচারী শাসন, ভিন্নমতের দমন, সামরিক নিয়ন্ত্রণ ও সাম্রাজ্যবাদী উচ্চাকাঙ্ক্ষা। নিবিড়ভাবে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে ফ্যাসিবাদী শাসনব্যবস্থাগুলো সুস্পষ্টভাবে ঔপনিবেশিক মডেলগুলোর ওপর নির্ভর করেছিল। উদাহরণস্বরূপ আমরা উল্লেখ করতে পারি যে আফ্রিকান উপনিবেশগুলোতে যেসব স্বৈরাচারী নীতি প্রয়োগ করা হয়েছিল, তা ইতালীয় ফ্যাসিবাদে অভ্যন্তরীণ দমনপীড়নের প্রতিরূপ হয়ে ফিরে এসেছিল, নাৎসি সম্প্রসারণবাদ (Lebensraum) ছিল পূর্ববর্তী সাম্রাজ্যবাদী সম্প্রসারণবাদের অনুসরণ। এই ধারাবাহিকতাগুলো এটিই সুস্পষ্ট করে যে ফ্যাসিবাদ কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং সাম্রাজ্যবাদী শাসনেরই একটি সম্প্রসারণ হিসেবে উদ্ভূত হয়েছিল।

আলবার্ট মেমি তাঁর ‘ঔপনিবেশিক ফ্যাসিবাদ’ ধারণাটি এই সংযোগকে আরও সুস্পষ্ট করে দেয়। তিনি অত্যন্ত জোর দিয়ে উল্লেখ করেন যে ঔপনিবেশিক ব্যবস্থাগুলোর মধ্যেই সহজাতভাবে ফ্যাসিবাদী প্রবণতার বীজ নিহিত থাকে। মেমি তাঁর দ্য কলোনাইজার অ্যান্ড দ্য কলোনাইজড (১৯৬৭) বইয়ে বলেন, ...ঔপনিবেশিক ফ্যাসিবাদ সহজে উপনিবেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। ক্যানসারের কেবল ছড়িয়ে পড়ারই প্রবণতা থাকে। উপনিবেশবাদীরা কেবল নিপীড়নমূলক ও প্রতিক্রিয়াশীল অথবা অন্তত রক্ষণশীল সরকারকেই সমর্থন করতে পারে। সে সেদিকেই ঝুঁকবে, যা তার স্বদেশের বর্তমান অবস্থা বজায় রাখবে, অথবা বলা ভালো, যা নিপীড়নের কাঠামোকে আরও জোরালোভাবে নিশ্চিত করবে। যেহেতু তার জন্য নিরাময়ের চেয়ে প্রতিরোধ করাই শ্রেয়, তাহলে সে ঔপনিবেশিক সরকারের জন্মকে উৎসাহিত করতে প্রলুব্ধ হবে না কেন? (মেমি, ১৯৬৭: ৬৩)।

‘বুমেরাং প্রভাব’ (boomerang effect) ধারণাটি দ্বারা বিষয়টিকে আরও নির্জলাভাবে উপস্থাপন করা যায়। এই ধারণাটি বলে যে ঔপনিবেশিক প্রেক্ষাপটে বিকশিত দমনমূলক কৌশলগুলো অবশেষে উপনিবেশ স্থাপনকারী রাষ্ট্রের অভ্যন্তরেই প্রয়োগ করা হয়। মূলত সেজেয়ার দ্বারা উপস্থাপিত এবং পরে হান্না আরেন্ট দ্বারা বিশদভাবে ব্যাখ্যা করা এই তত্ত্বটি বলে যে ঔপনিবেশিক সহিংসতা বিদেশে রপ্তানি করা হয়। এরপর উপনিবেশগুলোতে দমনমূলক পদ্ধতিগুলো পরিমার্জিত হয়ে মূল ভূখণ্ডে ফিরে আসে এবং অভ্যন্তরীণ রাজনীতিকে নতুন এক রূপ দেয়। আরেন্টকে অনুসরণ করে ওয়েন যুক্তি দেন, উপনিবেশবাদ ‘সহিংস ও বর্ণবাদী চরম পন্থার একটি গতিশীলতাকে উন্মোচন করেছিল’ (উডলি, ২০১০: ১১৩)। সুতরাং ইউরোপে ফ্যাসিবাদের উত্থানকে উপনিবেশবাদ প্রক্রিয়ার চূড়ান্ত পরিণতি হিসেবে বোঝা যেতে পারে। ফ্যাসিবাদী নিয়ন্ত্রণের কৌশলগুলো, বিশেষ করে নজরদারি, সামরিকীকরণ, জাতিগত স্তরবিন্যাস প্রভৃতি নতুন কোনো আবিষ্কার ছিল না, বরং ঔপনিবেশিক প্রথারই অভিযোজন ছিল।

ফ্যাসিবাদ ইউরোপের অভ্যন্তরে ঔপনিবেশিক যুক্তির আত্তীকরণের প্রতিনিধিত্ব করে। এই প্রক্রিয়ায় ইউরোপের ধর্মীয় সংখ্যালঘু, পিছিয়ে পড়া সম্প্রদায় ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীগুলোর ওপর ঔপনিবেশিক পদ্ধতি প্রয়োগ করা হয়েছিল। ফ্যাসিবাদী শাসনের অধীনে সংখ্যালঘুদের ‘অভ্যন্তরীণ উপনিবেশ’ হিসেবে গণ্য করা হতো, বর্ণভিত্তিক আইনগুলো ঔপনিবেশিক স্তরবিন্যাসেরই প্রতিফলন হিসেবে কাজ করত এবং সহিংসতা সামাজিক প্রকৌশলের একটি হাতিয়ারে পরিণত হয়েছিল। কোনো কোনো পণ্ডিত হলোকাস্টকে এই কাঠামোর মধ্যেই বোঝা যেতে পারে বলে মনে করেন, যা ঔপনিবেশিক আধুনিকতার চরম যুক্তির একটি প্রকাশ।

ক্ষমতা, সহিংসতা ও আধুনিকতা

মানবসমাজ যেহেতু প্রকৃতির লঙ্ঘনের ওপর নির্ভরশীল, তাই উদ্দেশ্যমূলক সহিংসতাকে নৃবিজ্ঞানীরা একটি স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য হিসেবেই বুঝতে চান। প্রকৃতির নিরন্তর পরিবর্তন এবং একটি জটিল আনুষঙ্গিক অবকাঠামোর মধ্যে শ্রমের বস্তুগতকরণের ওপর শিল্পায়ন প্রতিষ্ঠিত, যা মানবজাতির বিশেষায়িত জৈবিক উপকরণের অভাব পূরণ করে। যদিও নির্মাতা—মানুষ (homo faber) কেবল একটি ‘যন্ত্র ব্যবহারকারী প্রাণী’ নয় (আন্তব্যক্তিক বিকাশ ও সাংস্কৃতিক অগ্রগতির জন্য বাক্‌শক্তিও সমানভাবে একটি পূর্বশর্ত), মানুষের কর্মতৎপরতা ও নৈপুণ্য বস্তুগত পরিবেশের উদ্দেশ্যমূলক হেরফের ও প্রকৃতিকে শোষণ করার কৌশলের বিকাশের ওপর নির্ভরশীল। এই অর্থে সহিংসতাকে ‘উসিলা’ বা ‘কৌশল—উপকরণ’ (instrumentality) হিসেবে সংজ্ঞায়ন করা যায়। প্রকৃতির ওপর প্রযুক্তিগত আধিপত্য হলো সামাজিক আধিপত্যের একটি শর্ত, যা একটি ইতিবাচক সমাজবিজ্ঞানের জন্য জ্ঞানতাত্ত্বিক ভিত্তি প্রদান করে এবং পৃথকীকৃত ক্ষেত্রসমূহের নিয়ন্ত্রণমূলক জ্ঞানের উদ্দেশ্যমূলক প্রয়োগের ওপর নির্ভরশীল। জ্ঞান ও নিয়ন্ত্রণের এই দ্বান্দ্বিকতা শিল্প–সভ্যতার একটি মূল বৈশিষ্ট্য: মুক্তি কেবল স্বশাসন বৃদ্ধির ওপরই নির্ভরশীল নয়; বরং মানব প্রকৃতির স্বতঃস্ফূর্ত বিশৃঙ্খলাকে দমন করার জন্য যৌক্তিক সংগঠন ও নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার প্রসারের ওপরও নির্ভরশীল।

প্রাকৃতিক শক্তির ওপর আধিপত্য মানব সম্প্রদায়ের টিকে থাকার জন্য একটি পূর্বশর্ত, অপর দিকে সম্পদের ওপর নিয়ন্ত্রণ সামাজিক ক্ষমতার একটি শর্ত। সানচেজ ভাস্কুয়েজ তাঁর দ্য ফিলোসফি অব প্রাক্সিস (১৯৭৭) বইয়ে যুক্তি উপস্থাপন করেন যে সহিংসতা সেখানেই প্রকাশিত হয়, যেখানে মানুষের কর্মকাণ্ডের বিষয়বস্তুর প্রাকৃতিক বা মানবিক উপাদান মানুষের প্রতি প্রতিরোধ গড়ে তোলে; সুতরাং এটি সেই সব কার্যকলাপের বৈশিষ্ট্য, যার লক্ষ্য একটি নির্দিষ্ট প্রাকৃতিক বা সামাজিক বাস্তবতাকে ঠেকিয়ে রাখা, পরিবর্তন করা বা উৎখাত করা। এই অর্থে, সহিংসতা কেবল মানুষেরই বৈশিষ্ট্য, কারণ সে-ই একমাত্র সত্তা, যাকে তার নিজের মানবিক বৈধতা বজায় রাখার জন্য একটি বাহ্যিক বৈধতার (প্রকৃতির) ওপর ক্রমাগত সহিংসতা প্রদর্শন করতে হয় বা প্রকৃতির স্বাভাবিকতাকে লঙ্ঘন করতে হয় (ভাস্কুয়েজ, ১৯৭৭: ১৮০)।

ভাস্কুয়েজ সহিংসতাকে প্রাক্সিস বা চর্চার বিষয় হিসেবে বোঝেন, যাকে তিনি নির্দিষ্ট লক্ষ্য অর্জনের জন্য ব্যক্তিদের সচেতন ব্যবহারিক কার্যকলাপ হিসেবে সংজ্ঞায়িত করেন। প্রায়োগিক কার্যকলাপ সর্বদা একটি বিচারমূলক রূপান্তরকামী কর্মকাণ্ড, যা নির্দিষ্ট ঐতিহাসিক পরিস্থিতিতে তার যৌক্তিক উদ্দেশ্যের একটি তাত্ত্বিক ধারণাকে অন্তর্ভুক্ত করে। উৎপাদনশীল বা শৈল্পিক প্রায়োগিক কার্যকলাপের বিপরীতে রাজনৈতিক প্রায়োগিক কার্যকলাপ সামাজিক বাস্তবতার রূপান্তরের দিকে পরিচালিত হয়, অর্থাৎ একটি প্রদত্ত সামাজিক কাঠামো এবং তার সম্পর্ক ও প্রতিষ্ঠানসমূহের ধ্বংস বা পরিবর্তনের দিকে। এ প্রসঙ্গে আরেন্ট উল্লেখ করেন যে রাজনৈতিক ক্রিয়া স্বয়ংক্রিয় ও অনুমানযোগ্য প্রক্রিয়াকে ব্যাহত করে নতুন সূচনার সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে (আরেন্ট, ১৯৬৯: ৩০-৩১)। তবে তিনি ক্ষমতা ও সহিংসতাকে বিপরীত ধারণা হিসেবে পৃথক করেন: ক্ষমতা মানুষের সম্মিলিত ক্রিয়া ও সমর্থন থেকে উদ্ভূত হয়, আর সহিংসতা মূলত উপকরণনির্ভর এবং ক্ষমতা বিপন্ন হলে ব্যবহৃত হতে পারে। সহিংসতা ক্ষমতাকে ধ্বংস করতে সক্ষম হলেও নিজে ক্ষমতা সৃষ্টি করতে পারে না। ফলে আধুনিক সামাজিক ও রাজনৈতিক ব্যবস্থায় সহিংসতার উপস্থিতি গুরুত্বপূর্ণ হলেও তাকে আরেন্টের ধারণায় রাজনৈতিক ক্রিয়ার অবিচ্ছেদ্য বা গঠনমূলক ভিত্তি হিসেবে উপস্থাপন করা যায় না।

আধুনিক যুগে আধুনিক জাতিরাষ্ট্রের ক্ষেত্রে সামরিক ও শিল্প সমাজের মধ্যে পার্থক্য করার প্রচেষ্টা অপ্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে। কারণ, উন্নত জাতিরাষ্ট্রগুলো সর্বাত্মকভাবে পুঁজির নিরাপত্তা বিধান করে এবং যুদ্ধ চালনার সক্ষমতা ধারণ করে। অর্থাৎ আধুনিক রাষ্ট্র ব্যবস্থাপনার মূল চালিকা শক্তি হলো সহিংসতা ঘটানোর সক্ষমতা। এ ক্ষেত্রে পুঁজির নিরাপত্তা বিধানের সঙ্গে যখন ক্ষমতা যুক্ত হয় তখন সহিংসতা নিজ জনগণের বিরুদ্ধেও ব্যবহৃত হয়। গিডেন্স তাঁর দ্য নেশন-স্টেট অ্যান্ড ভায়োলেন্স (১৯৮৫) বইয়ে যুক্তি দেন, বেশির ভাগ উন্নত জাতিরাষ্ট্রই ‘সামরিক সমাজ’, এর কারণ এই নয় যে সেনাপতিদের সহিংসতার উপকরণের ওপর একচেটিয়া অধিকার রয়েছে বা তারা রাজনীতিতে আধিপত্য করে; বরং শিল্পায়িত যুদ্ধ পরিচালনার উপকরণের বিস্তারের ফলেই এমনটা হয়েছে। শিল্পায়ন ও জাতিরাষ্ট্র ব্যবস্থার সম্মিলিত বিস্তার এটি নিশ্চিত করেছে যে বিশ্বজুড়ে কার্যত প্রতিটি রাষ্ট্রেরই এখন যেকোনো ঐতিহ্যবাহী সাম্রাজ্যের চেয়ে অনেক বেশি সশস্ত্র শক্তি রয়েছে (গিডেন্স, ১৯৮৫: ২৫৪)।

বস্তুনিষ্ঠ অর্থে, বলপ্রয়োগ সমাজের প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর মধ্যে প্রশাসনিক/অর্থনৈতিকভাবে অনুমোদিত সহিংসতার রূপে প্রোথিত থাকে, যা এক ‘প্রাক্‌-রাজনৈতিক’ প্রাকৃতিক অবস্থায় ব্যক্তিনিষ্ঠ ইচ্ছার লাগামহীন সংগ্রামকে প্রতিস্থাপন করে। ফলে রাজনীতি হয়ে ওঠে অন্য উপায়ে একধরনের যুদ্ধের ধারাবাহিকতা। ফুকো উল্লেখ করেন, ‘এটা ভাবা ভুল হবে’ যে সর্বাত্মক যুদ্ধ তার নিজস্ব দ্বন্দ্বের মধ্যেই নিঃশেষ হয়ে যায় এবং সহিংসতা ত্যাগ করে ও নাগরিক আইনের কাছে আত্মসমর্পণ করে শেষ হয়ে যায়।...মানবতা ক্রমান্বয়ে এক সংঘাত থেকে আরেক সংঘাতে অগ্রসর হয়ে সর্বজনীন পারস্পরিকতায় পৌঁছায় না, যেখানে আইনের শাসন অবশেষে যুদ্ধের স্থান নেয়; বরং মানবতা তার প্রতিটি সহিংসতাকে একটি নিয়ম-কানুনের ব্যবস্থার মধ্যে স্থাপন করে এবং এভাবেই এক আধিপত্য থেকে আরেক আধিপত্যের দিকে এগিয়ে যায় (ফুকো, ১৯৮৪: ৮৫)। এর চূড়ান্ত পরিণতি ঘটে ফ্যাসিবাদী সর্বগ্রাসীবাদে। অর্থাৎ ফ্যাসিবাদী সহিংসতার কাঠামোগত সম্ভাবনা আধুনিকতার শৃঙ্খলামূলক যুক্তির বাইরে নয়; বরং ভেতরেই নিহিত। ফ্যাসিবাদী সহিংসতার ভিত্তি সরকারি কার্যকলাপের এক আমূল তীব্রতা বৃদ্ধি করে, যা নাগরিকদের শ্রেণিবিন্যাস ও নজরদারির মুখে ফেলে দেয় এবং উদারনীতিবাদের ‘অভ্যন্তরীণ বর্ণবাদ’ ও সাম্রাজ্যবাদের ‘বাহ্যিক বর্ণবাদ’কে এক নতুন ধরনের অভ্যন্তরীণ উপনিবেশবাদে রূপান্তরিত করে।

ক্ষমতার সর্বাত্মকবাদিতা ব্যক্তির অনন্যতা ও স্বাতন্ত্র্যকে বিলুপ্ত করে দেয় এবং শৃঙ্খলামূলক সহিংসতার পক্ষে যুক্তি তৈরি করে। অভ্যন্তরীণ মানব অর্থনীতির উন্নয়নের নামে একধরনের সর্বব্যাপী নিয়ন্ত্রণমূলক ব্যবস্থা তৈরি করা হয়। সহিংসতা দিয়ে ‘সহিংসতার প্রবাহ’ সংযত করার চেষ্টা করা হয় এবং সহিংসতার মধ্য দিয়েই শান্তির আবহ তৈরি করা হয়। ফ্যাসিবাদে রাষ্ট্রের ছদ্মবেশে ক্ষমতাসীন ব্যক্তিবর্গ সার্বভৌম ক্ষমতার অধিকারী হয়ে ওঠে এবং জনগণের কাছে এই সার্বভৌম সত্তার একমাত্র প্রত্যাশিত বিষয় হলো সম্মতিমূলক আত্মসমর্পণ। তাহলে সমাজের যে আইনি কাঠামো, তা সম্মতি প্রদানকারী ব্যক্তিদের হবসীয় সার্বভৌমত্বের প্রতি স্বেচ্ছাকৃত আত্মসমর্পণের ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠে না, সমান ক্ষমতার অধিকারী ব্যক্তিদের মধ্যে সহিংসতার অবিরাম সম্ভাবনার স্বীকৃতির ওপর ভিত্তি করেই গড়ে ওঠে। ফুকো যুক্তি দেন, ‘আইন শান্তি প্রতিষ্ঠার প্রক্রিয়া নয়; কারণ আইনের আড়ালে ক্ষমতার কার্যপ্রণালিতে, এমনকি সবচেয়ে নিয়মিত কার্যপ্রণালিতেও, যুদ্ধ চলতে থাকে। যুদ্ধই প্রতিষ্ঠান ও শৃঙ্খলার চালিকা শক্তি। এমনকি এর ক্ষুদ্রতম অংশে শান্তিকে এক অবিরাম গোপন যুদ্ধ চালিয়ে যেতে হয় (ফুকো, ১৯৮৪: ৫০)। ফুকোর এই যুক্তি কিছু ক্ষেত্রে বেঞ্জামিনের পর্যবেক্ষণের সঙ্গে মিলে যায়: যা আইন হিসেবে প্রতিষ্ঠিত, তাকে অনুসরণের মধ্য দিয়ে আইন প্রণয়ন তার লক্ষ্য অর্জনের জন্য সহিংসতাকেই উপায় হিসেবে ব্যবহার করে। আবার তা কার্যকর করার মুহূর্তে সহিংসতাকে আশ্রয় করে। আইন প্রণয়নের মুহূর্ত থেকে বাস্তবায়ন পর্যন্ত তা ক্ষমতার নামে সহিংসতার সঙ্গে আবশ্যিকভাবে ও ঘনিষ্ঠভাবে আবদ্ধ (বেঞ্জামিন, ১৯৯৭: ১৪৯)।

ফুকো আধুনিক জাতিরাষ্ট্রের ক্ষেত্রে সহিংসতার নিয়ম–সৃষ্টিকারী ভূমিকা তুলে ধরেন। নিষেধাজ্ঞা ও শাস্তি সহিংসতার একটি অর্থনীতি তৈরি করে, যা ‘বিদ্যমান ব্যবস্থার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ সামাজিক আচরণের ধরনগুলোকে প্রথাগত করে তোলে এবং সামাজিক নম্রতাকে উৎসাহিত করে। অনুবর্তিতা হলো প্রতিষ্ঠিত ব্যবস্থার প্রতি নমনীয় থাকার এক বদ্ধমূল সামাজিক অভ্যাসের ফল। আইনি কাঠামো, ক্ষমতা সংহতকরণ ও রাজনৈতিক চর্চা ফ্যাসিবাদ ও আধুনিকতাকে সমতুল্য করে তোলে। অর্থাৎ ফ্যাসিবাদে সহিংসতা আধুনিকতার ভাবকাঠামোর সঙ্গে দূরবর্তী সম্পর্কে জড়িত নয়; বরং অন্তর্জাতভাবে এর ভেতরেই নিহিত।

দর্শন বীক্ষণে ফ্যাসিবাদী সহিংসতা ও মৃত্যুর রাজনীতি

ফ্যাসিবাদ সহিংসতা ও মৃত্যুর মধ্যকার সম্পর্ককে পুনর্গঠন করে। সহিংসতাকে একটি আকস্মিক উপকরণ এবং মৃত্যুকে একটি দুঃখজনক অবশেষ হিসেবে বিবেচনা করার পরিবর্তে, ফ্যাসিবাদ উভয়কেই তার মূল আদর্শিক ও সত্তাতাত্ত্বিক অঙ্গীকারের সঙ্গে একীভূত করে নেয়। ফ্যাসিবাদকে কেবল একটি কর্তৃত্ববাদী শাসনব্যবস্থার ধরন হিসেবে নয়; বরং রাজনৈতিক যুক্তির একটি স্বতন্ত্র পদ্ধতি হিসেবে বুঝতে হবে, যেখানে ধ্বংস একটি ইতিবাচক মূল্য অর্জন করে। অভ্যন্তরীণ বিরোধিতার নির্মূলের মাধ্যমে, সাংস্কৃতিক সমরূপীকরণের মাধ্যমে ও ভূরাজনৈতিক লক্ষ্য সাধনে সার্বভৌম ক্ষমতার প্রদর্শনের মাধ্যমে, ফ্যাসিবাদ সাম্রাজ্যবাদের সহিংসতার ধরনগুলোকে চর্চা ও তীব্রতর করে। একই সঙ্গে, যুদ্ধকে পৌরাণিক রূপ দেওয়ার মাধ্যমে, ফ্যাসিবাদ উনিশ শতকে প্রতিষ্ঠিত এবং প্রথম বিশ্বযুদ্ধে তীব্রতর হওয়া একধরনের সামরিকবাদকে প্রসারিত করে। তবু ফ্যাসিবাদী সহিংসতার একটি উদ্বৃত্ত মাত্রা রয়েছে, যা আমলাতান্ত্রিক-সামরিকবাদী নীতি এবং প্রথাগত ‘উর্দি রাষ্ট্র’-এর সঙ্গে যুক্ত সহিংসতার ব্যবহারিক ন্যায্যতাকেও ছাড়িয়ে যায়। উদাহরণস্বরূপ, আপনি কখনোই হিটলারের শাসনব্যবস্থার গতিপ্রকৃতি সম্যকভাবে বুঝতে পারবেন না, যতক্ষণ না আপনি সেই সময়ের সশস্ত্র বাহিনীর পেশাদারদের সঙ্গে শিল্পকারখানার ব্যবস্থাপকগণ, দলীয় কর্মী, স্থপতি ও অন্যান্য উচ্চ প্রশিক্ষিত বিশেষজ্ঞরা যে উৎসাহ-উদ্দীপনা ও নিষ্ঠা নিয়ে একটি প্রযুক্তিগত ও কৌশলগত সামরিকবাদের সুষ্ঠু বাস্তবায়ন নিশ্চিত করার জন্য কাজ করে গেছেন, তা বুঝতে পারবেন।

ফ্যাসিবাদী সহিংসতার তিনটি প্রধান কাজ রয়েছে: শারীরিক সংঘর্ষের মাধ্যমে বিরোধী আন্দোলনগুলোর শক্তি দুর্বল করা, ক্যাডারদের মধ্যে সংগ্রাম ও সংহতির অভিজ্ঞতা জাগিয়ে তোলা এবং শক্তি ও শৃঙ্খলার প্রদর্শন করা (উডলি, ২০১০: ১২১)। এ ছাড়া ফ্যাসিবাদী সহিংসতা জনগণের মনোযোগ আকর্ষণ করে, দেশপ্রেমিক ‘শহীদ’ তৈরি করে এবং উত্তেজনা সৃষ্টি করে। এই অর্থে ফ্যাসিবাদী সহিংসতা নিজেই একটি শনাক্তযোগ্য পণ্যে পরিণত হয়, একটি প্রতিশোধমূলক বিরোধী-বিদ্রোহ শক্তি যেখানে বিরোধীদের কেবল নির্মূল করার মতো শত্রু হিসেবেই বিবেচনা করা হয়। আতঙ্ক তৈরি করার এবং চুপ করিয়ে দেওয়ার একটি উপায় হিসেবে ফ্যাসিবাদ একটি শক্তিশালী কিন্তু চূড়ান্তভাবে কল্পকথনভিত্তিক বা পৌরাণিক প্রকল্প গঠন করে, যা বিপুল শক্তির মাধ্যমে নির্ধারণ করে যে সামাজিক সম্পর্কের একটি ব্যবস্থার মধ্যে কোন ধরনের পরিচিতি বৈধভাবে পুনরুৎপাদন করা যায়। ফ্যাসিবাদী সহিংসতা এভাবে একটি অবাঞ্ছিত ও অনাকাঙ্ক্ষিত ফলাফল (anti-praxis) উৎপাদন করে, যা রাজনীতির আসল উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য থেকে সম্পূর্ণ আলাদা এবং রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের একটি আনুষ্ঠানিক রূপ, যা তার নিজস্ব উদ্দেশ্যের একটি প্রতিফলনমূলক ধারণা থেকে বিচ্ছিন্ন। এ ধরনের সহিংস কর্মকাণ্ড ভাড়াটে পেশাদারিত্ব ও পৌরাণিক সন্ত্রাসের মাধ্যমে রাজনীতির মুক্তিদাতা হিসেবে আবির্ভূত হওয়ার ভান করে, যদিও প্রকৃত মুক্তিমূলক কার্যকারিতাকে নির্মূল করে অগ্রসর হয়। ফ্যাসিবাদী আধা সামরিক বাহিনীগুলো শিল্পপতি, সমাজপতি ও কৃষি অভিজাতদের সঙ্গে জোট গঠন করেছিল এবং তাদেরই নির্মূল করার উদ্যোগ নিয়েছে; যারা প্রান্তিক, ভিন্ন মতাবলম্বী ও ক্ষমতার জন্য হুমকিস্বরূপ ছিল।

‘পুনর্জন্মমূলক অতি জাতীয়তাবাদ’ হিসেবে রজার গ্রিফিনের ফ্যাসিবাদের সংজ্ঞাটি আমরা পূর্বেই উল্লেখ করেছি। এই সংজ্ঞাটি বিশ্লেষণাত্মকভাবে ফ্যাসিবাদের ভাবাদর্শিক মূলকে ধারণ করার অন্যতম নির্ভুল উপায় হিসেবে রয়ে গেছে (গ্রিফিন, ১৯৯১: ২৬-২৮)। পুনর্জন্মের ধারণা, ধ্বংসের একটি পর্যায়ের পর আবার জন্ম নেওয়া, অবিলম্বে ফ্যাসিবাদকে একটি কালিক ও বলিদানমূলক যুক্তির মধ্যে স্থাপন করে। পুনর্জন্মের জন্য মৃত্যু একটি পূর্বশর্ত; পুনরুজ্জীবনের জন্য ধ্বংসের প্রয়োজন। যা কিছু অধঃপতিত, পরজীবী বা বহিরাগত বলে বিবেচিত হয়, তার বিনাশের মাধ্যমেই ফ্যাসিবাদী রাষ্ট্রের জন্ম হতে পারে। গ্রিফিনের এই সূত্রায়নে যা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ তা হলো, পুনর্জন্ম একটি সুনির্দিষ্ট রাজনৈতিক কর্মসূচির চেয়ে বরং একটি পৌরাণিক দিগ্‌বলয় হিসেবে বেশি কাজ করে। ফ্যাসিবাদী আন্দোলনগুলোতে রাষ্ট্রের পুনর্জন্মের যথাযথ প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নির্দিষ্ট করে দেওয়ার প্রয়োজন হয় না; যা গুরুত্বপূর্ণ তা হলো ভাঙনের মাধ্যমে নবায়নের প্রতিশ্রুতি। সহিংসতা সেই বিশেষ মাধ্যম হয়ে ওঠে, যার দ্বারা এই ভাঙন সংঘটিত হয়। এটি অভ্যন্তরীণ শত্রুদের নির্মূল করে জাতীয় সত্তাকে পরিশুদ্ধ করে এবং একটি নতুন ঐতিহাসিক সূচনার জন্য ক্ষেত্র প্রস্তুত করে।

এই যুক্তি ফ্যাসিবাদকে রক্ষণশীলতা থেকে সুস্পষ্টভাবে আলাদা করে দেয়। যেখানে রক্ষণশীল রাজনীতি একটি বিদ্যমান সামাজিক ব্যবস্থাকে সংরক্ষণ বা পুনরুদ্ধার করতে চায়, সেখানে ফ্যাসিবাদ ধ্বংসকে সৃজনশীলতা হিসেবে গ্রহণ করে। পুরোনো ব্যবস্থাকে মেরামত করতে হবে না, বরং নিশ্চিহ্ন করতে হবে। তাই ফ্যাসিবাদী সহিংসতা প্রতিক্রিয়াশীল নয়, বরং সক্রিয়। এর লক্ষ্য হলো ইতিহাসকে ত্বরান্বিত করা, নিয়তিকে অস্তিত্বে আনতে বাধ্য করা। গ্রিফিন যেমন জোর দিয়ে বলেন, ফ্যাসিবাদের বিপ্লবী চরিত্র ঠিক পুনর্জন্মের নামে ধ্বংস করার ইচ্ছার মধ্যেই নিহিত (গ্রিফিন, ১৯৯১: ৩২-৩৫)। এই দৃষ্টিকোণ থেকে, ফ্যাসিবাদী সহিংসতাকে কেবল রাষ্ট্রীয় দমন–পীড়ন বা স্বৈরাচারী নিয়ন্ত্রণ বলে বিবেচনা করা যায় না। এটি কেবল ক্ষমতা বজায় রাখার একটি হাতিয়ার নয়; এটি ফ্যাসিবাদী রাজনীতির মূল ভিত্তি। সহিংসতা রাজনৈতিক অভিব্যক্তির একটি রূপ হয়ে ওঠে, ‘fascination with naked violence’, যার মাধ্যমে জাতি তার অস্তিত্বের ইচ্ছাকে প্রতিষ্ঠা করে।

নোল্টে তাঁর থ্রি ফেইসেস অব ফ্যাসিজম (১৯৬৫) বইয়ে ফ্যাসিবাদী সহিংসতার মূল্যায়নে দ্ব্যর্থহীনভাবে বলেন, ফ্যাসি দাই কম্বাত্তিমেন্তো-এর সহিংসতা তার প্রকৃতি ও প্রয়োগ পদ্ধতি উভয় দিক থেকেই সক্রিয় ছিল। তিনি পর্যবেক্ষণ করেন, কয়েক মাসের মধ্যেই, সমাজের প্রায় সব প্রতিষ্ঠিত শক্তির সমর্থনে কয়েক শ যুবকের দল, এক নির্মম, নগ্ন শ্রেণিসংগ্রামে, ইতালির প্রধান অঞ্চলগুলোতে আগুন ও তরবারি দিয়ে ধ্বংস করে দেয় সেই সব কষ্টার্জিত প্রতিষ্ঠানসমূহকে, যেখানে জনগণের আত্মশিক্ষার প্রক্রিয়া সংঘটিত হয়েছিল। কিন্তু সেই অসম্ভব বিপ্লবের প্রচেষ্টার পর, বিষয়টি মধ্যবিত্ত শ্রেণির বৃহৎ অংশের কাছে এক অসহনীয় হুমকি বলে মনে হয়েছিল (নোল্টে, ১৯৬৫: ১৯৮)। নোল্টে জোর দিয়ে বলেন, এই সহিংসতা ছিল ‘নিম্ন–মধ্যবিত্ত থেকে অভিজাত শ্রেণি পর্যন্ত বিদ্যমান উচ্চবিত্ত শ্রেণির প্রতি নিন্দার প্রকাশ, পদ্ধতিগত ও ক্রোধান্ধ এবং নিজ জনগণের প্রতি যেকোনো মানবিকতাবিবর্জিত (নোল্টে, ১৯৬৫: ২০১)। তবে তিনি সতর্ক করেন, যদিও এই সহিংসতা তার সামাজিক কার্যকারিতার দিক থেকে আত্মরক্ষামূলক ছিল, সমাজতাত্ত্বিক বা মনস্তাত্ত্বিক ব্যাখ্যাগুলো ফ্যাসিবাদী সহিংসতার প্রকৃতিকে সম্পূর্ণরূপে প্রকাশ করতে পারে না। এর মধ্যে রয়েছে আদিম অশুভের কিছু অংশ, মানুষের প্রতি একধরনের বিদ্রুপাত্মক অবজ্ঞা, এবং অন্য একজন মানুষকে অপমান করার মধ্যে এক পৈশাচিক আনন্দ, এবং কেবল শক্তির জন্যই শক্তির প্রতি এক অন্ধ ভালোবাসা (নোল্টে, ১৯৬৫: ২০২)।

এরিক ফ্রোম তাঁর দ্য অ্যানাটমি অব হিউম্যান ডেস্ট্রাকটিভনেস (১৯৭৩) বইয়ে ‘ক্ষতিকর আগ্রাসন’-এর চিত্রটি বিশ্লেষণ ও বিকশিত করেন, যেখানে তিনি ফ্যাসিবাদী সামরিকবাদের মধ্যে নিহিত সহজাত পরপীড়নবাদ ও মৃত্যুর প্রতি এক স্বগোত্রীয় মোহের ওপর আলোকপাত করেন।

ধ্রুপদি রাজনৈতিক তত্ত্ব প্রায় ক্ষেত্রেই আইনি বা নৈতিক লক্ষ্যের অধীন একটি উপায় ধরে নিয়ে সহিংসতাকে একটি যন্ত্রকৌশল হিসেবে বিবেচনা করে। রাষ্ট্রকে নির্দিষ্ট ভূখণ্ডের মধ্যে বৈধ শারীরিক বলপ্রয়োগের একচেটিয়া অধিকার সফলভাবে দাবি করা মানবসমাজ হিসেবে সংজ্ঞায়িত করার ক্ষেত্রে ম্যাক্স ওয়েবার স্বীকার করেন যে সহিংসতা রাজনৈতিক ব্যবস্থার একটি গঠনমূলক উপাদান। তবু ওয়েবার সহিংসতা ও বৈধতার মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য বজায় রাখেন—শক্তির প্রয়োগকে বৈধ বলে গণ্য করার জন্য শাসিতদের মধ্যে তার বৈধতার বিশ্বাস বা স্বীকৃতি প্রয়োজন। ফ্যাসিবাদ এই পার্থক্যকে ভেঙে দেয়। বৈধতা আর সহিংসতার আগে আসে না; এটি সহিংসতা থেকে উদ্ভূত হয়। যা সহিংস, তা বৈধ ঠিক এ কারণেই যে এটি একটি জৈব এবং একীভূত সত্তা হিসেবে বিবেচিত জাতির ইচ্ছাকে প্রকাশ করে। এই অর্থে, ফ্যাসিবাদ ওয়েবারের বর্ণনামূলক অন্তর্দৃষ্টিকে একটি আদর্শিক নীতিতে রূপান্তরিত করে। সহিংসতার প্রয়োগের বাইরে তার আর কোনো যৌক্তিকতার প্রয়োজন হয় না।

এই রূপান্তরের ক্ষেত্রে জর্জ সোরেলের পরিণামবাদী ও মানবতাবাদী নীতিশাস্ত্রের সমালোচনা একটি নির্ণায়ক ভূমিকা পালন করে। তবে সোরেলের পরিভাষায় শ্রমিকশ্রেণির বিপ্লবী ‘সহিংসতা’ এবং রাষ্ট্রের দমনমূলক ‘বল’ এক বিষয় নয়। তাঁর মতে, সর্বহারা সহিংসতার মূল্য কেবল তাৎক্ষণিক ফলাফলে নয়; শ্রমিকদের শ্রেণিচেতনা, নৈতিক তীব্রতা ও স্বাধীন কর্মক্ষমতা জাগিয়ে তোলার সামর্থ্যেও নিহিত (সোরেল, ১৯৯৯: ৮৫-৮৭)। ফ্যাসিবাদ এই ধারণার কিছু অংশ গ্রহণ করলেও তার লক্ষ্যবস্তু ও রাজনৈতিক অর্থ আমূল বদলে দেয়। সোরেলের শ্রেণিসংগ্রাম ও সাধারণ ধর্মঘটের জায়গায় ফ্যাসিবাদ জাতিগত ও জাতীয় সংগ্রামকে বসায় এবং রাষ্ট্রীয় বলপ্রয়োগকে জাতীয় ঐক্য ও স্তরবিন্যাস প্রতিষ্ঠার উপায় করে তোলে। ফলে সহিংসতার নৈতিক মূল্য আর মুক্তিদায়ক সম্ভাবনা দিয়ে নয়, জাতিকে একীভূত করা ও কথিত শত্রুকে নির্মূল করার ক্ষমতা দিয়ে পরিমাপ করা হয়। এই রূপান্তরে সহিংসতা স্বয়ং বৈধ বলে বিবেচিত হতে শুরু করে এবং তাকে সংযত করার অভ্যন্তরীণ মানদণ্ড দুর্বল হয়ে পড়ে। ফ্যাসিবাদী রাজনীতি তখন নৈতিক তীব্রতা ও বৈধতা বজায় রাখতে ক্রমবর্ধমান সংঘাত ও সহিংসতার দিকে ধাবিত হয়।

এই কাঠামোর মধ্যে মৃত্যু একটি স্বতন্ত্র রাজনৈতিক তাৎপর্য লাভ করে। ফ্যাসিবাদী ভাষ্যে মৃত্যু আকস্মিক বা নিছক নেতিবাচক নয়; এটি অর্থপূর্ণতার একটি বিশেষ ক্ষেত্রে পরিণত হতে পারে এবং মরার বা মারার ইচ্ছা রাজনৈতিক বিশ্বাসযোগ্যতার প্রমাণ হিসেবে উপস্থাপিত হয়। আর্নস্ট ইয়ুঙ্গারের যুদ্ধস্মৃতিকথা এই বৃহত্তর যুদ্ধসংস্কৃতির একটি প্রভাবশালী সাহিত্যিক প্রকাশ। স্টর্ম অব স্টিল (২০০৩) বইয়ে তিনি প্রথম বিশ্বযুদ্ধের রণাঙ্গনকে কেবল কৌশলগত বিজয়ের ক্ষেত্র হিসেবে নয়, তীব্র অভিজ্ঞতা, সহনশীলতা ও প্রযুক্তিনির্ভর ধ্বংসের পরিসর হিসেবেও চিত্রিত করেন (ইয়ুঙ্গার, ২০০৩: ১১-১৫)। তাঁর রচনাকে যুদ্ধের মহিমাকীর্তন হিসেবে পড়া হয়েছে, আবার এর সংযত ও আবেগবিচ্ছিন্ন ভঙ্গিকে যুদ্ধের দ্ব্যর্থক সাহিত্যিক উপস্থাপন হিসেবেও ব্যাখ্যা করা হয়। তাই মৃত্যুর মুখোমুখি হয়ে ভয়, হিসাবনিকাশ ও নৈতিক দ্বিধা সম্পূর্ণ বিলীন হয়ে যায়—এমন সিদ্ধান্তকে ইয়ুঙ্গারের সরাসরি মত হিসেবে না দেখে তাঁর রচনার একটি নির্দিষ্ট ব্যাখ্যা হিসেবে চিহ্নিত করা প্রয়োজন। একইভাবে, তাঁর যুদ্ধভাবনাকে ফ্যাসিবাদী মৃত্যুর ধারণার সরল পূর্বসূরি না বলে আন্তযুদ্ধকালীন উগ্র জাতীয়তাবাদ ও যুদ্ধের নান্দনিকীকরণের বৃহত্তর প্রেক্ষাপটে স্থাপন করা অধিক যথাযথ।

ফ্যাসিবাদ এই অস্তিত্ববাদী অন্তর্দৃষ্টিকে সমষ্টিগত রূপ দেয়। রণাঙ্গনে ইয়ুঙ্গার যা এক ব্যক্তিগত উপলব্ধি হিসেবে অনুভব করেন, তা এক গণরাজনৈতিক নীতিতে রূপান্তরিত হয়। ব্যক্তিগত নশ্বরতা জাতীয় নিয়তির সঙ্গে মিশে যায়; জাতির জন্য মৃত্যুবরণ করা রাজনৈতিক জীবনে অংশগ্রহণের সর্বোচ্চ রূপ হয়ে ওঠে। মৃত্যুকে আর ক্ষতি হিসেবে শোক করা হয় না; বরং জাতীয় প্রাণশক্তির প্রমাণ হিসেবে উদ্‌যাপন করা হয়। এই রূপান্তরের সুদূরপ্রসারী পরিণতি রয়েছে। একবার মৃত্যুকে ইতিবাচক অর্থ প্রদান করা হলে, হত্যার বিরুদ্ধে প্রচলিত নৈতিক নিষেধাজ্ঞাগুলো তাদের শক্তি হারিয়ে ফেলে। মৃত্যু আর রাজনীতির চূড়ান্ত সীমায় থাকে না; বরং এর অন্যতম প্রধান হাতিয়ারে পরিণত হয়। ফ্যাসিবাদী রাজনীতি এভাবে সার্বভৌমত্বকে কেবল জীবিতদের শাসন করার ক্ষমতাই নয়; বরং মৃত্যুকে অর্থবহ করে তোলার ক্ষমতা হিসেবে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করে। এই ধারণাগত পুনর্গঠন পরবর্তী বিশ্লেষণগুলোর জন্য ক্ষেত্র প্রস্তুত করে। সোরেলের সহিংসতার নীতিশাস্ত্র, জেন্টাইলের রাষ্ট্রের পরাতত্ত্ব (metaphysics), আরেন্টের সর্বাত্মক আধিপত্যের তত্ত্ব এবং এমবেম্বের নিদানরাজনীতির বিবরণ—সবই ফ্যাসিবাদী এই মৌলিক বিপরীতকরণকে পূর্বানুমান করে। অর্থাৎ সহিংসতা ও মৃত্যুকে রাজনৈতিক ব্যর্থতা থেকে রাজনৈতিক গুণে উন্নীত করে।

কল্পকথন, সহিংসতা ও পুনরুজ্জীবন

জর্জ সোরেলের কল্পকথন তত্ত্ব বিপ্লবী চিন্তাধারা ও ফ্যাসিবাদী রাজনৈতিক কল্পনার মধ্যে একটি প্রভাবশালী, যদিও বিতর্কিত, ধারণাগত সেতুবন্ধ তৈরি করে। সোরেল তাঁর রিফ্লেকশনস অন ভায়োলেন্স (১৯৯৯) গ্রন্থে মিথকে কোনো মিথ্যা বিশ্বাস বা ভাবাদর্শগত বিভ্রম হিসেবে নয়; বরং এমন একগুচ্ছ চিত্রকল্প হিসেবে সংজ্ঞায়িত করেন, যা প্রাক্‌–যৌক্তিক স্তরে সম্মিলিত শক্তিকে উদ্বুদ্ধ করতে সক্ষম। তিনি যুক্তি দেন যে কল্পকথনগুলো অভিজ্ঞতালব্ধ যাচাইকরণ বা যৌক্তিক সংগতির পরিবর্তে আবেগ, স্বজ্ঞা ও নৈতিক তীব্রতার মাধ্যমে কাজ করে (সোরেল, ১৯৯৯: ২৮-৩০)। এদের কাজ বাস্তবতাকে বর্ণনা করা নয়, বরং কাজের জন্ম দেওয়া। সোরেলের প্রধান রাজনৈতিক কল্পকথন হলো সাধারণ ধর্মঘটের মিথ। সাধারণ ধর্মঘটকে কোনো সুনির্দিষ্ট রাজনৈতিক কর্মসূচি বা কৌশলগত নীলনকশা হিসেবে বোঝা উচিত নয়; এর শক্তি ঠিক এর অনির্দিষ্টতার মধ্যেই নিহিত। একটি কল্পকথন হিসেবে এটি আশা, ভয় ও বৈরিতাকে সর্বাত্মক সংঘাতের একটি একক চিত্রে ঘনীভূত করে, যা তাৎক্ষণিক সাফল্য না পেলেও বিপ্লবী অঙ্গীকার টিকিয়ে রাখতে সক্ষম (সোরেল, ১৯৯৯: ৩২-৩৪)। এই অর্থে, কল্পকথন যুক্তিনির্ভর বিচার–বিবেচনাকে নৈতিক উদ্দীপনা দিয়ে প্রতিস্থাপন করে।

কল্পকথনের এই ধারণা রাজনৈতিক সহিংসতার ক্ষেত্রে সুদূরপ্রসারী প্রভাব তৈরি করে। যেহেতু কল্পকথন অভিজ্ঞতালব্ধ অস্বীকৃতির প্রভাবের বাইরে থাকে, তাই এটি ফলাফলের ভিত্তিতে ন্যায্যতা প্রতিপাদনের প্রয়োজন ছাড়াই কার্যকলাপকে উদ্বুদ্ধ করতে পারে। কল্পকথন দ্বারা অনুপ্রাণিত সহিংসতার মূল্যায়ন কেবল তার তাৎক্ষণিক সাফল্যের নিরিখে নয়, নৈতিক তীব্রতা ও সম্মিলিত অঙ্গীকার বজায় রাখার সামর্থ্যের নিরিখেও করা হয়। এখানে বিজয়ের পাশাপাশি বৈরিতা ও সংহতি রক্ষা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। ফ্যাসিবাদী আন্দোলনগুলো সোরেলের এই যুক্তির কিছু দিক গ্রহণ ও রূপান্তর করেছে। জাতীয় পুনর্জন্মের ফ্যাসিবাদী কল্পকথন সোরেলের সাধারণ ধর্মঘটের মিথের মতোই শুদ্ধকরণ ও নবায়নের একটি ভবিষ্যৎ মুহূর্তের ছবি এঁকে সম্মিলিত আবেগকে উদ্দীপ্ত করে; তবে এর শ্রেণিগত, নৈতিক ও রাজনৈতিক লক্ষ্য সম্পূর্ণ ভিন্ন। রজার গ্রিফিনের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, পুনর্জন্ম একটি সুনির্দিষ্ট রাজনৈতিক লক্ষ্যের চেয়ে বরং একটি কল্পকথনভিত্তিক দিগ্‌বলয়, যা নিরন্তর সংগ্রামকে ন্যায্যতা দেয় (গ্রিফিন, ১৯৯১: ৩৩-৩৫)। ফ্যাসিবাদে এই কল্পকথন বস্তুগত সংকটের অনুপস্থিতিতেও সংঘাত ও সহিংসতা টিকিয়ে রাখার স্থায়ী চালিকাশক্তিতে পরিণত হতে পারে।

সোরেলের চিন্তাধারার দ্বিতীয় একটি নির্ণায়ক উপাদান হলো মানবতাবাদের ওপর তাঁর ধারাবাহিক আক্রমণ। সোরেল মানবিক নীতিশাস্ত্রকে বুর্জোয়া অবক্ষয়, সংসদীয় আপস ও নৈতিক দুর্বলতার সঙ্গে যুক্ত করেন। তিনি যুক্তি দেন, মানবতাবাদ সংগ্রামের পরিবর্তে করুণা ও সমঝোতাকে স্থান দিয়ে নৈতিক প্রাণশক্তির জন্য প্রয়োজনীয় তীব্র বৈরিতাকে বিলীন করে দেয় (সোরেল, ১৯৯৯: ৫২-৫৪)। সোরেলের মতে, সহিংসতা একটি শুদ্ধীকরণমূলক ভূমিকা পালন করে। এটি বন্ধু ও শত্রু, পুণ্য ও দুর্নীতির মধ্যে চূড়ান্ত বিভাজনরেখা টেনে নৈতিক স্বচ্ছতা পুনরুদ্ধার করে। সহিংসতা ব্যক্তি ও শ্রেণিকে তাদের প্রকৃত অঙ্গীকার প্রকাশ করতে বাধ্য করে। এই অর্থে সহিংসতা কেবল ধ্বংসাত্মক নয়; এটি উদ্‌ঘাটনকারী ঘটনাও। এটি ভণ্ডামিকে উন্মোচন করে এবং নৈতিক গাম্ভীর্য অর্জনে বাধ্য করে। এটি সরাসরি ফ্যাসিবাদীদের অনুকূলে নৈতিক যুক্তির পূর্বাভাস দেয়।

ফ্যাসিবাদ শ্রেণিগত বৈরিতাকে জাতিগত ও জাতীয় বৈরিতায় রূপান্তরিত করে সোরেলের মানবতাবাদ–বিরোধিতাকে আরও চরম রূপ দেয়। যেখানে সোরেল সর্বহারা নৈতিকতার নামে বুর্জোয়া মানবতাবাদের বিরোধিতা করেন, সেখানে ফ্যাসিবাদ জাতীয় নিয়তির নামে সর্বজনীন মানবাধিকারের বিরোধিতা করে। সহানুভূতি রাষ্ট্রদ্রোহে পরিণত হয়; দয়া দুর্বলতায় পরিণত হয়। এখানে একটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ যে সোরেল নির্বিচার নিষ্ঠুরতার পক্ষে কথা বলেন না। তাঁর সহিংসতা নৈতিক পুনর্জন্মের দিকে অভিমুখী হওয়ায় নৈতিকভাবে সীমাবদ্ধ। তবু তাঁর যুক্তির কাঠামো ঠিক সেই নৈতিক সীমাগুলোকেই দুর্বল করে দেয়। একবার মানবিক উদ্বেগকে অবক্ষয় হিসেবে খারিজ করে দিলে, চরম সহিংসতার বিরুদ্ধে কোনো নীতিগত বাধা অবশিষ্ট থাকে না। ফ্যাসিবাদ নৈতিক শুদ্ধীকরণকে জাতিগত ও জৈবিক পরিভাষায় নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করে এই সুযোগটি কাজে লাগায়।

ফ্যাসিবাদী সহিংসতাকে কল্পকথনভিত্তিক একটি প্রকল্প হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করা হয়। এই কল্পকথনভিত্তিক সহিংসতা একটি ধারাবাহিক প্রতিক্রিয়ার মাধ্যমে গণতন্ত্রের আমূল পরিবর্তনকে থামিয়ে দেয় এবং এটি একটি সাধারণ ভাবাদর্শিক ধর্মযুদ্ধের স্তরে পুনর্গঠিত হয়। ফ্যাসিবাদ রক্ষণশীল বিপ্লবী ঐতিহ্যের একটি আমূল পরিবর্তনকে প্রতিনিধিত্ব করে, যা আইনের গঠনমূলক শক্তির মাধ্যমে একটি স্থায়ী ব্যতিক্রমী অবস্থা প্রতিষ্ঠা করে। কার্ল শ্মিট কল্পকথনভিত্তিক সহিংসতাকে ‘একটি নতুন আইনি ও সাংবিধানিক ব্যবস্থার শূন্যতা থেকে সৃষ্টি’ হিসেবে কল্পনা করেছিলেন, যা একটি মৌলিক, গঠনকারী শক্তি এবং যা কেবল একটি ‘আইনি ও ভাবাদর্শিক শূন্যতায়’ উপলব্ধি করা যেতে পারে। শ্মিটের মতে, এই গঠনকারী শক্তিকে অধিবিদ্যাগতভাবে ‘জনমানুষের রূপদানকারী শক্তি’ হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা হয় (উডলি, ২০১০: ১২৫)। অন্যদিকে বেঞ্জামিন সোরেলের কল্পকথনভিত্তিক তত্ত্বের প্রাসঙ্গিকতা স্বীকার করেন। তবে বেঞ্জামিন আইন প্রণয়নকারী সহিংসতার গঠনকারী শক্তি ও প্রতিষ্ঠিত ক্ষমতার আইন সংরক্ষণকারী সহিংসতার মধ্যে পার্থক্য করেন এবং একটি ‘বিশুদ্ধ’ সহিংসতাকে চিহ্নিত করেন। বেঞ্জামিনের মতে, আইন প্রণয়ন সর্বদাই ক্ষমতা প্রণয়নেরই নামান্তর—‘ন্যায়বিচার হলো সব ঐশ্বরিক উদ্দেশ্য সাধনের মূলনীতি, ক্ষমতা হলো সব কল্পকথনভিত্তিক বা পৌরাণিক আইন প্রণয়নের মূলনীতি’ (বেঞ্জামিন, ১৯৯৭: ১৪৯)।

পরিবর্তনের বিভ্রম সৃষ্টি করা সত্ত্বেও ভিত্তিগত সহিংসতার কল্পকথনভিত্তিক বা পৌরাণিক প্রকৃতি এক নতুন আধিপত্যবাদী যৌক্তিকতা হিসেবে প্রকাশিত হয়। এই কল্পকথনভিত্তিক সহিংসতা ‘একটি বিশুদ্ধতর পরিমণ্ডলের সূচনা করা’ তো দূরের কথা, বরং নিজেকে মৌলিকভাবে সব আইনগত সহিংসতার সঙ্গে অভিন্ন হিসেবে প্রদর্শন করে। এ ক্ষেত্রে আগামবেন যুক্তি দেন, ‘শ্মিট যেখানে প্রতিবার সহিংসতাকে একটি আইনি প্রেক্ষাপটে পুনঃস্থাপন করার চেষ্টা করেন, বেঞ্জামিন সেখানে এই পদক্ষেপের জবাবে প্রতিবারই এটিকে একটি বিশুদ্ধ সহিংসতা হিসেবে আইনের বাইরে একটি অস্তিত্ব হিসেবে নিশ্চিত করতে চান। (আগামবেন, ১৯৯৮: ৫৯)।’ জিজেক যেমনটি পর্যবেক্ষণ করেছেন, কল্পকথনভিত্তিক সহিংসতাই বলিদানের দাবি করে এবং নগ্ন জীবনের ওপর ক্ষমতা রাখে। কিন্তু অপর দিকে, ঐশ্বরিক সহিংসতা বলিদানহীন ও প্রায়শ্চিত্তমূলক। কল্পকথনভিত্তিক সহিংসতার ক্ষেত্রে কোনো ধরনের অপরাধবোধ, ত্যাগ বা প্রায়শ্চিত্ত ছাড়াই বিপ্লবী সন্ত্রাসের মাধ্যমে পবিত্র বা অভিশপ্ত মানুষকে হত্যা বা বিনাশ করা যায় (জিজেক, ২০০৮: ১৬৮)।

তবে এখানে সোরেল প্রসঙ্গে একটি বিষয় উল্লেখ করা জরুরি যে তিনি নিজে রাষ্ট্রীয় সহিংসতাকে প্রত্যাখ্যান করেন। তিনি রাষ্ট্রকে সহজাতভাবে দুর্নীতিগ্রস্ত বলে মনে করেন এবং আশঙ্কা করেন যে আমলাতান্ত্রিক জবরদস্তি শ্রমজীবী মানুষের নৈতিক স্বশাসনকে ধ্বংস করে দেবে (সোরেল, ১৯৯৯: ১২০-১২৩)। সোরেলের মতে, বিপ্লবাত্মক সহিংসতাকে প্রশাসনিক না হয়ে প্রতিষ্ঠান–বহির্ভূত ও ভাব প্রকাশমূলক হতে হবে। ফ্যাসিবাদ চূড়ান্তভাবে এই সীমাবদ্ধতাকে ছিন্ন করে। নৈতিক তীব্রতার উৎস হিসেবে সহিংসতার সোরেলীয় মূল্যায়ন বজায় রেখেও ফ্যাসিবাদ সহিংসতাকে বিপ্লবাত্মক স্বতঃস্ফূর্ততার ক্ষেত্র থেকে সার্বভৌম ক্ষমতার ক্ষেত্রে স্থানান্তরিত করে। সহিংসতা কেবল কল্পকথনভিত্তিক বা পৌরাণিকই নয়, প্রাতিষ্ঠানিকও হয়ে ওঠে। রাষ্ট্র নৈতিক পুনরুজ্জীবনের একচেটিয়া অধিকার লাভ করে। জিভ স্টার্নহেল তাঁর দ্য বার্থ অব ফ্যাসিস্ট ইডিওলজি (১৯৯৪) বইয়ে যেমনটা দেখিয়েছেন, এই রূপান্তর আকস্মিক নয়, বরং কাঠামোগত। ফ্যাসিবাদ সোরেলের এই বিশ্বাসকে উত্তরাধিকার সূত্রে গ্রহণ করে যে সহিংসতা অর্থ তৈরি করে, কিন্তু একে সমাজতান্ত্রিক বন্ধন থেকে মুক্ত করে পুনরায় জাতীয়তাবাদ ও বর্ণবাদের সঙ্গে যুক্ত করে (স্টার্নহেল, ১৯৯৪: ১৬৩-১৬৮)। এর ফলস্বরূপ এমন এক রাজনৈতিক কল্পভিত্তিক কাহিনি তৈরি হয়, যেখানে সহিংসতা স্বয়ং মৃত্যুকে পবিত্র করে তোলে।

ফ্যাসিবাদে মৃত্যু আর সংগ্রামের কোনো অন্তর্নিহিত ঝুঁকি থাকে না; এটি হয়ে ওঠে সত্যতার প্রমাণ। এই পরিবর্তনের সুদূরপ্রসারী পরিণতি রয়েছে। সোরেলের দর্শনে, সহিংসতার লক্ষ্য ছিল একটি ভবিষ্যৎ নৈতিক ব্যবস্থা; ফ্যাসিবাদে, সহিংসতা নিজেই একটি লক্ষ্যে পরিণত হয়। নৈতিক তীব্রতা বজায় রাখার জন্য ক্রমাগত শত্রু তৈরি করা অপরিহার্য হয়ে পড়ে। ফলস্বরূপ, ফ্যাসিবাদী রাজনীতি স্থায়ী সংহতি ও চিরস্থায়ী যুদ্ধের দিকে ধাবিত হয় এবং এমন পরিস্থিতি তৈরি করে, যেখানে মৃত্যুকে স্বাভাবিক, নান্দনিক ও পরিশেষে আমলাতান্ত্রিক করে তোলা হয়। বিচারমূলক দৃষ্টিকোণ থেকে, সোরেলের চিন্তাধারা প্রকাশ করে যে সর্বজনীন নৈতিক সীমাবদ্ধতা থেকে বিচ্ছিন্ন হলে তীব্রতার নীতিশাস্ত্র কত সহজে ধ্বংসের রাজনীতিতে পর্যবসিত হতে পারে। ফ্যাসিবাদ কেবল সোরেলের অপব্যবহারই করে না; এটি এমন এক দর্শনের অন্তর্নিহিত বিপদকে উপলব্ধি করে, যা নৈতিক সীমার চেয়ে নৈতিক শক্তিকে বেশি প্রাধান্য দেয়। এই অর্থে সোরেল একজন ফ্যাসিবাদী চিন্তাবিদ হিসেবে নন, বরং ফ্যাসিবাদের সম্ভাবনার অন্যতম প্রধান দার্শনিক হিসেবে গণ্য হন।

ফ্যাসিবাদী মৃত্যুর পরাতত্ত্ব

জিওভানি জেন্টাইলের বাস্তবতাতত্ত্বের (attualismo, actualism) দর্শন ফ্যাসিবাদী সহিংসতা ও মৃত্যুর সবচেয়ে সুসংবদ্ধ পরাতাত্ত্বিক ভিত্তি প্রদান করে। দ্য থিওরি অব মাইন্ড অ্যাজ পিওর অ্যাক্ট (২০০৭) গ্রন্থে জেন্টাইলে চিন্তার নিজস্ব কর্মের বাইরে যেকোনো ধরনের অতীন্দ্রিয়তাকে, তা অধিবিদ্যামূলক, নৈতিক বা আইনগত যা–ই হোক না কেন, প্রত্যাখ্যান করেন। তিনি যুক্তি দেন, বাস্তবতা কেবল তখনই বিদ্যমান থাকে, যখন তাকে সক্রিয়ভাবে চিন্তা করা হয়; হয়ে ওঠার ঊর্ধ্বে কোনো সত্তা নেই এবং যে কর্ম তাকে গঠন করে, তার ঊর্ধ্বে কোনো বস্তু নেই (জেন্টাইলে, ২০০৭: ২১-২৪)। এই চরম অন্তর্নিহিতবাদ (immanentism) কর্তা ও কর্ম, ব্যক্তি ও সমষ্টি এবং নীতিশাস্ত্র ও রাজনীতির মধ্যকার পার্থক্যকে বিলীন করে দেয়। এই কাঠামোর মধ্যে রাষ্ট্র ব্যক্তির ওপর চাপিয়ে দেওয়া একটি বাহ্যিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে নয়, বরং সমষ্টিগত স্বচেতনার সর্বোচ্চ রূপ হিসেবে আবির্ভূত হয়। রাষ্ট্র হলো সেই নৈতিক সত্তা, যেখানে এক উচ্চতর ঐক্যের মধ্যে ব্যক্তির ইচ্ছাশক্তিকে বাতিল করা হয় (aufgehoben) অর্থাৎ অস্বীকার ও সংরক্ষণ করা হয়।

জেন্টাইলে রাষ্ট্র ও ব্যক্তি, ক্ষমতা ও নৈতিকতা এবং কর্তৃত্ব ও স্বাধীনতার মধ্যকার উদারনৈতিক দ্বৈতবাদকে স্পষ্টভাবে প্রত্যাখ্যান করেন। তিনি যেমন লিখেছেন, ‘রাষ্ট্রের বাইরে কোনো মানবিক বা আধ্যাত্মিক মূল্যবোধের অস্তিত্ব নেই’ (জেন্টাইলে, ২০০২: ১৫)। এর অন্তর্নিহিত অর্থ হলো রাষ্ট্রের বাইরে এমন কোনো নৈতিক দৃষ্টিকোণ থাকতে পারে না, যেখান থেকে রাষ্ট্রীয় সহিংসতার বিচার বা সীমাবদ্ধতা আরোপ করা যেতে পারে। এভাবে অ্যাকচুয়ালিজম একধরনের সম্পূর্ণ অন্তর্নিহিত সত্তা তৈরি করে, যেখানে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড নিজেই বৈধতা লাভ করে। যেহেতু রাষ্ট্র হলো নৈতিক আত্মোপলব্ধির এক জীবন্ত কর্ম, তাই রাষ্ট্র যা-ই করুক না কেন, সংজ্ঞানুসারে তা নৈতিক। সহিংসতা তখন আর কোনো আকস্মিক উপকরণ থাকে না; বরং তা নৈতিক জীবনের এক অভ্যন্তরীণ মুহূর্তে পরিণত হয়। প্রশ্নটি আর এমন থাকে না যে সহিংসতা ন্যায্য কি না, বরং তা রাষ্ট্রের প্রকৃত ইচ্ছাকে প্রকাশ করে কি না।

মুসোলিনির সঙ্গে জেন্টাইলের সহযোগিতার গুরুত্বপূর্ণ প্রকাশ ঘটে ১৯৩২ সালে এনচিক্লোপেদিয়া ইতালিয়ানায় প্রকাশিত ‘দ্য ডকট্রিন অব ফ্যাসিজম’ নিবন্ধে, যা মুসোলিনির নামে প্রকাশিত হলেও এর প্রথম অংশ ‘ফান্ডামেন্টাল আইডিয়াস’ জেন্টাইলের রচনা এবং দ্বিতীয় অংশ ‘পলিটিক্যাল অ্যান্ড সোশ্যাল ডকট্রিন’ মুসোলিনির সঙ্গে সম্পর্কিত। এই যৌথ ও জটিল লেখকত্বের মধ্যে অ্যাকচুয়ালিস্ট দর্শনের বিভিন্ন উপাদান একটি সুস্পষ্ট রাজনৈতিক ভাষ্য লাভ করে। নিবন্ধটি রাষ্ট্রকে একটি নৈতিক সামগ্রিকতা হিসেবে উপস্থাপন করে এবং উদারনৈতিক ব্যক্তিবাদ ও সমাজতান্ত্রিক বস্তুবাদ উভয়কেই প্রত্যাখ্যান করে (জেন্টাইলে, ২০০২: ১৮-২০)। এই কাঠামোয় স্বাধীনতা রাষ্ট্রের পূর্ববর্তী নয়; রাষ্ট্রের ঐতিহাসিক লক্ষ্যের সঙ্গে ব্যক্তির একাত্মতার মধ্যেই তার অর্থ নির্ধারিত হয়। ফলে রাষ্ট্রীয় বলপ্রয়োগকে নৈতিকতার বাহ্যিক লঙ্ঘন হিসেবে নয়, রাষ্ট্রের ঘোষিত নৈতিক ঐক্য রক্ষার উপায় হিসেবে ব্যাখ্যা করার সুযোগ সৃষ্টি হয়। তবে যুদ্ধ, দমনপীড়ন ও মৃত্যুদণ্ডকে শর্তহীনভাবে নৈতিক কাজ বলে ঘোষণা করা জেন্টাইলের পাঠের একটি কঠোর ব্যাখ্যা; একে সরাসরি উদ্ধৃত মত হিসেবে নয়, এই রাষ্ট্রদর্শনের সম্ভাব্য রাজনৈতিক পরিণতি হিসেবে উপস্থাপন করা অধিক নির্ভুল।

জেন্টাইলে এই যুক্তিকে ত্যাগ এবং শৃঙ্খলাবিষয়ক তাঁর চিন্তাভাবনায় স্পষ্টভাবে সমর্থন করেন। তিনি যুক্তি দেন যে ফ্যাসিবাদী রাষ্ট্র নিষ্ক্রিয় আনুগত্য নয়; বরং তার নৈতিক জীবনে সক্রিয় অংশগ্রহণ দাবি করে, এমনকি মৃত্যু পর্যন্ত। যে ব্যক্তি রাষ্ট্রীয় সহিংসতার প্রতিরোধ করে, সে নৈতিক স্বশাসন রক্ষা করে না; বরং একটি বিমূর্ত ও অলীক আত্মসত্তাকে আঁকড়ে ধরে থাকে। এই অর্থে, রাষ্ট্রের নামে হত্যা করা একটি দুঃখজনক প্রয়োজনীয়তা থেকে নৈতিক কর্তব্যে রূপান্তরিত হয়। জেন্টাইলের চিন্তার অধিবিদ্যাগত পরিণতি মৃত্যুর একটি স্বতন্ত্র ফ্যাসিবাদী ধারণায় চূড়ান্ত রূপ লাভ করে। মৃত্যু আর এমন কোনো ঘটনা নয়, যা রাজনৈতিক অর্থকে অস্বীকার করে; এটি সেই মুহূর্ত, যেখানে রাজনৈতিক অর্থ পূর্ণতা লাভ করে। যে সৈনিক রাষ্ট্রের জন্য মৃত্যুবরণ করে, সে তার জীবন হারায় না; এর মধ্য দিয়ে সে তার জীবনকে মহিমান্বিত করে। জেন্টাইলের মতে, ব্যক্তি তার সসীম অস্তিত্বকে রাষ্ট্রের অনন্ত জীবনে বিলীন করে দিয়ে নৈতিক অমরত্ব লাভ করে (জেন্টাইলে, ২০০২: ২১-২৩)।

এ ধারণা মৃত্যুর সঙ্গে ঐতিহ্যগতভাবে যুক্ত দুঃখজনক মাত্রাটিকে বিলীন করে দেয়। দুঃখজনক ঘটনা সমানভাবে বৈধ নৈতিক দাবিগুলোর মধ্যে একটি সংঘাতকে পূর্বানুমান করে। জেন্টাইলের সামগ্রিক অন্তর্নিহিততা এ ধরনের কোনো সংঘাতের অবকাশ রাখে না। নৈতিক দিকবলয় একটাই: রাষ্ট্র। ফলস্বরূপ, শিকার ও নায়কের মধ্যকার পার্থক্য বিলীন হয়ে যায়। নিহত সৈনিক ও মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত শত্রু—উভয়ে একই নৈতিক আখ্যানে বিলীন হয়ে যায়; একজন পরিপূর্ণতা হিসেবে, অন্যজন পরিপূর্ণতার জন্য অনিবার্য নেতিবাচকতা হিসেবে। দার্শনিকভাবে এ পদক্ষেপ গণমৃত্যুকে বোধগম্য এবং এমনকি অপরিহার্য করে তোলে। যদি রাষ্ট্রই নৈতিক বাস্তবতার কেন্দ্রস্থল হয়, তবে ব্যক্তিজীবনের বিনাশ কোনো নৈতিক কেলেঙ্কারির জন্ম দেয় না। মৃত্যু এমন একটি মাধ্যমে পরিণত হয়, যার মাধ্যমে নৈতিক সমগ্রতা নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করে। ফ্যাসিবাদী অধিবিদ্যা এভাবে এমন একটি বিশ্বদৃষ্টি প্রদান করে, যাকে হানা আরেন্ট পরবর্তী সময়ে সর্বাত্মক আধিপত্যের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ শর্ত হিসেবে চিহ্নিত করেছেন: এমন একটি বিশ্বদৃষ্টি, যেখানে হত্যাকে আর খুন হিসেবে নয়; বরং ঐতিহাসিক অপরিহার্যতা হিসেবে অনুভব করা হয় (আরেন্ট, ১৯৭৩: ৪৫৭-৪৫৯)। জেন্টাইলের দর্শন স্বয়ং অতীন্দ্রিয়তাকেই বিলুপ্ত করার মাধ্যমে রাজনৈতিক ক্ষমতার সীমা বিলোপ করার অন্যতম চরম প্রচেষ্টাগুলোর একটিকে প্রতিনিধিত্ব করে। নীতিশাস্ত্রকে রাজনীতির মধ্যে এবং জীবনকে রাষ্ট্রচেতনার মধ্যে বিলীন করে দিয়ে, বাস্তবতাতত্ত্ব এমন এক রাজনৈতিক সত্তাতত্ত্বের জন্ম দেয়, যেখানে মৃত্যু সার্বভৌমত্বের সীমা নয়; বরং তার চূড়ান্ত পরিণতি। এ ব্যাখ্যা অনুসারে, ফ্যাসিবাদী সহিংসতা দর্শনের প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা নয়; বরং তার অন্যতম গুরুতর বাস্তবায়ন।

মনোবিশ্লেষণ, সহিংসতা ও মৃত্যুর তাড়না

উইলহেলম রাইখের দ্য মাস সাইকোলজি অব ফ্যাসিজম (১৯৭০) বইটি ফ্যাসিবাদী সহিংসতাকে প্রাথমিকভাবে ভাবাদর্শ বা রাজনৈতিক অর্থনীতির মাধ্যমে নয়; বরং এর গণভিত্তির মনস্তাত্ত্বিক কাঠামোর মাধ্যমে ব্যাখ্যা করার অন্যতম প্রথম ও সবচেয়ে পদ্ধতিগত একটি প্রচেষ্টা। যেসব ব্যাখ্যা ফ্যাসিবাদকে সম্পূর্ণরূপে ওপর থেকে চাপিয়ে দেওয়া একটি বিষয় হিসেবে দেখে, তার বিপরীতে রাইখ জোর দিয়ে বলেন যে ফ্যাসিবাদ তার শক্তি আহরণ করে সাধারণ মানুষের আবেগগত ও কামমূলক প্রবণতা থেকে (রাইখ, ১৯৭০: ৩-৬)। রাইখের বিশ্লেষণের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে কর্তৃত্ববাদী পারিবারিক কাঠামো। কঠোর শৃঙ্খলা, যৌন দমন ও প্রশ্নাতীত পিতৃতান্ত্রিক কর্তৃত্ব দ্বারা চিহ্নিত পিতৃতান্ত্রিক পরিবারগুলোতে শিশুরা আনুগত্যকে নিরাপত্তার সঙ্গে এবং ইচ্ছাকে অপরাধবোধের সঙ্গে যুক্ত করতে শেখে। এটি এমন একটি চারিত্রিক কাঠামো তৈরি করে, যা একই সঙ্গে কর্তৃত্বের প্রতি বশ্যতা স্বীকারকারী এবং নিয়ন্ত্রণাধীন অধস্তন বা বহিরাগতদের প্রতি আক্রমণাত্মক (রাইখ, ১৯৭০: ২৯-৩৫)। রাইখ যুক্তি দেন যে ফ্যাসিবাদ সফল হয়; কারণ, এটি এই পূর্বগঠিত মনস্তাত্ত্বিক অর্থনীতির সঙ্গে অনুরণিত হয়।

এখানে যৌন দমন একটি নির্ণায়ক ভূমিকা পালন করে। রাইখ যুক্তি দেন যে যৌন আকাঙ্ক্ষার দমন দীর্ঘস্থায়ী উদ্বেগ ও ক্ষোভের জন্ম দেয়। অন্তরঙ্গ সম্পর্কের মাধ্যমে প্রকাশিত হওয়ার পথ খুঁজে না পেয়ে কামশক্তি সামাজিকভাবে অনুমোদিত পথগুলোতে, যেমন জাতীয়তাবাদ, সামরিকবাদ ও শত্রুর প্রতি ঘৃণায় স্থানান্তরিত হয়। ফলে রাজনৈতিক সহিংসতা কোনো অস্বাভাবিকতা হিসেবে নয়; বরং মনস্তাত্ত্বিকভাবে তৃপ্তিদায়ক এক মুক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়। এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, রাইখ ফ্যাসিবাদকে কোনো ব্যক্তিগত মানসিক বিকারের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখেন না। বরং তিনি চরিত্রের সামাজিক উৎপাদনের ওপর জোর দেন। কর্তৃত্ববাদী ব্যক্তিত্ব কোনো ব্যক্তিগত ত্রুটি নয়; বরং এটি ঐতিহাসিকভাবে নির্দিষ্ট সামাজিক প্রতিষ্ঠান, যেমন পরিবার, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, বিদ্যালয় প্রভৃতির ফল, যা মানুষকে আনুগত্য ও আগ্রাসনের জন্য প্রস্তুত করে। ফ্যাসিবাদ এই কাঠামোগুলোকে শূন্য থেকে তৈরি না করে বরং সেগুলোকে পুঁজি করে।

রাইখের সবচেয়ে মৌলিক অবদান হলো ফ্যাসিবাদী রাজনীতির কামশক্তিজাত অর্থনীতির বিশ্লেষণ। তিনি যুক্তি দেন যে ফ্যাসিবাদী আন্দোলনগুলো সফল হয়; কারণ, তারা প্রতীকী ও আনুষ্ঠানিক আনন্দের উৎস সরবরাহ করে। গণসমাবেশ, ইউনিফর্ম, পতাকা, সুশৃঙ্খল পদযাত্রা ও পরিকল্পিত প্রদর্শনী বশ্যতা ও উত্তেজনার সংমিশ্রণের মাধ্যমে ক্ষমতাকে কামোত্তেজক করে তোলে (রাইখ, ১৯৭০: ৪৫-৪৮)। এই কামমূলক অর্থনীতিতে সহিংসতার একটি বিশেষ স্থান রয়েছে। আগ্রাসনের কাজগুলো দমন–পীড়ন থেকে সাময়িক মুক্তি দেয় এবং প্রাণশক্তি, আপনত্ব ও ক্ষমতার অনুভূতি তৈরি করে। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো এ আনন্দের সঙ্গে মৃত্যু অবিচ্ছেদ্যভাবে যুক্ত। ফ্যাসিবাদী আচার-অনুষ্ঠানগুলো ধ্বংসের নৈকট্যকে নান্দনিক রূপ দেয় এবং ভয়কে উল্লাসে রূপান্তরিত করে। মৃত্যুর সম্ভাবনা কামমূলক উত্তেজনাকে হ্রাস না করে বরং আরও তীব্র করে তোলে।

রাইখ ফ্রয়েডের পরবর্তীকালের ‘মৃত্যুতাড়না’ (Todestrieb) ধারণাটি প্রত্যাখ্যান করেছিলেন এবং ধ্বংসাত্মক প্রবণতাকে কোনো সহজাত জৈবিক তাড়নার বদলে যৌন দমন, উদ্বেগ ও সামাজিক চরিত্রগঠনের ফল হিসেবে ব্যাখ্যা করেন। তাঁর মতে, কর্তৃত্ববাদী সামাজিক পরিবেশে দমিত কামশক্তি ও জমে থাকা ক্ষোভ জাতীয়তাবাদ, সামরিকবাদ এবং সামাজিকভাবে অনুমোদিত শত্রুর প্রতি আগ্রাসনে স্থানান্তরিত হতে পারে। এই কাঠামো ব্যাখ্যা করতে সাহায্য করে কেন ফ্যাসিবাদী রাজনীতিতে অতিরিক্ত নিষ্ঠুরতা, প্রতীকী অপমান ও আনুষ্ঠানিক সহিংসতা আবেগগত তৃপ্তির উৎস হয়ে ওঠে। তবে অন্যকে হত্যা করাকে ‘মৃত্যুর সঙ্গে নিজের সম্পর্ক নিয়ন্ত্রণের উপায়’ বলা বা ফ্যাসিবাদী ব্যক্তির ধ্বংসের প্রতি আকর্ষণকে মৃত্যুতাড়নার পূর্বাভাস হিসেবে ব্যাখ্যা করা রাইখের নিজস্ব তত্ত্ব নয়; এগুলো তাঁর বিশ্লেষণের একটি পরবর্তী মনোবিশ্লেষণমূলক সম্প্রসারণ হিসেবে চিহ্নিত করা উচিত।

রাইখ আরও যুক্তি দেন যে ফ্যাসিবাদী নেতারা কর্তৃত্ববাদী পিতার আবেগগত বিকল্প হিসেবে কাজ করেন। নেতার সঙ্গে একাত্মতা ব্যক্তিকে বাধ্য থাকার পাশাপাশি পরোক্ষভাবে ক্ষমতার অভিজ্ঞতা লাভ করার সুযোগ করে দেয়। নেতা সুরক্ষা ও হুমকি, ভালোবাসা ও শাস্তি—উভয়েরই প্রতিমূর্তি। এই বিন্যাসে, মৃত্যু আনুগত্যের একটি পরীক্ষায় পরিণত হয়: নেতার জন্য হত্যা করার এবং মৃত্যুবরণ করার ইচ্ছা জাতির প্রতীকী পরিবারের মধ্যে একজন ব্যক্তির অনন্য স্থানকে নিশ্চিত করে (রাইখ, ১৯৭০: ৬১-৬৪)। এই গতিশীলতা ফ্যাসিবাদী আত্মত্যাগের আপাত অযৌক্তিকতা ব্যাখ্যা করতে সাহায্য করে। উদারনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে, রাষ্ট্রের জন্য মৃত্যুবরণ করাকে ক্ষতিপূরণহীন ক্ষতি বলে মনে হয়। কিন্তু ফ্যাসিবাদী কামপ্রবৃত্তির জগৎ থেকে দেখলে, মৃত্যু আবেগগত সমাধানের প্রতিশ্রুতি দেয়: উদ্বেগ থেকে মুক্তি, কর্তৃত্বের সঙ্গে একাত্মতা এবং এক অতীন্দ্রিয় সমষ্টিতে অংশগ্রহণ।

রাইখের বিশ্লেষণ কিছু প্রায়োগিক অন্তর্দৃষ্টি ধারণ করলেও এর কিছু সুস্পষ্ট সীমাবদ্ধতা চিহ্নিত করা যায়। মনোযোগ আকর্ষণ করার মতো বিষয় হলো, তিনি ভাবাদর্শ, প্রতিষ্ঠান ও কৌশলগত স্বার্থের ভূমিকাকে অবমূল্যায়ন করেছেন। শুধু যৌন নিপীড়ন দিয়ে ফ্যাসিবাদী সহিংসতাকে সম্পূর্ণরূপে ব্যাখ্যা করা যায় না। তদুপরি রাইখের প্রাথমিক মনোবিশ্লেষণমূলক কাঠামো মাঝেমধ্যে জীববিজ্ঞানবাদকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলে দেয়। বিশেষত যৌনতাকে প্রাথমিক চালিকা শক্তি হিসেবে গুরুত্ব দেওয়ার ক্ষেত্রে। তবু রাইখের অবদান অপরিহার্য। আবেগ, আকাঙ্ক্ষা ও দমনকে প্রাধান্য দিয়ে তিনি ফ্যাসিবাদী সহিংসতার এমন সব দিক উন্মোচন করেন, যা কাঠামোগত ও ভাবাদর্শগত বিশ্লেষণে প্রায় ক্ষেত্রেই উপেক্ষা করা হয়। দার্শনিক দৃষ্টিকোণ থেকে রাইখ দেখান যে ফ্যাসিবাদ কেবল বল প্রয়োগের মাধ্যমেই টিকে থাকে না। এটি টিকে থাকে আনন্দের মধ্য দিয়ে এক মারাত্মক উপভোগের দ্বারা, যা মানুষকে সহিংসতা ও মৃত্যুর সঙ্গে বেঁধে রাখে। রাইখ সহিংসতার নৈতিকতা ও নিদানরাজনীতির ক্ষমতাকেন্দ্রিক কামমূলক ভিত্তির মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোগ স্থাপন করেন। তাঁর কাজ আরেন্টের সর্বাত্মক আধিপত্যের তত্ত্ব বা ফুকোর  জৈবরাজনীতির বিশ্লেষণের মতো ব্যাখ্যাগুলোকে প্রতিস্থাপন না করে বরং পরিপূরক হিসেবে কাজ করে।

 

সর্বাত্মকবাদী নিয়ন্ত্রণ ও মৃত্যুর নির্মিতি

সর্বাত্মকবাদ নিয়ে আরেন্টের বিশ্লেষণ রাজনৈতিক সহিংসতার দার্শনিক ধারণায় একটি যুগান্তকারী পরিবর্তন নিয়ে আসে। সর্বাত্মক আধিপত্য সহিংসতাকে চিরায়ত স্বৈরাচার বা কর্তৃত্ববাদী দমন–পীড়নের মতো শত্রুদের বিরুদ্ধে ব্যবহৃত একটি আকস্মিক হাতিয়ার হিসেবে বিবেচনা করে না; বরং এ ক্ষেত্রে সন্ত্রাস স্থায়ী, পদ্ধতিগত ও আইনস্বীকৃত হয়ে ওঠে (আরেন্ট, ১৯৭৩: ৩২৩-৩২৬)। এ পরিবর্তনে ভাবাদর্শ একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। আরেন্টের মতে, ভাবাদর্শ কেবল একগুচ্ছ বিশ্বাস নয়; বরং এটি একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ যৌক্তিক ব্যবস্থা, যা একটিমাত্র নীতির ভিত্তিতে সর্বাত্মকবাদী ইতিহাসকে ব্যাখ্যা করার দাবি করে, যেমন নাৎসিবাদে বর্ণ, স্তালিনবাদে শ্রেণি। অলঙ্ঘনীয় আইন দ্বারা পরিচালিত একটি অবশ্যম্ভাবী প্রক্রিয়া হিসেবে একবার যদি ইতিহাসকে ব্যাখ্যা করা যায়, তাহলে আর সহিংসতা অপরাধ হিসেবে নয়; বরং ঐতিহাসিক আবশ্যকতার বাস্তবায়ন হিসেবে আবির্ভূত হয়। এই ভাবাদর্শগত যুক্তি নৈতিক সীমাকে বিলীন করে দেয়। সন্ত্রাস আর কোনো সুনির্দিষ্ট কাজ বা ব্যক্তিগত অপরাধের প্রতিক্রিয়া হিসেবে কাজ করে না; এটি এমন সব শ্রেণির মানুষকে লক্ষ্যবস্তু বানায়, যাদের অস্তিত্বকেই ইতিহাসের গতির সঙ্গে বেমানান বলে মনে করা হয়। এই অর্থে ফ্যাসিবাদী ও সর্বাত্মকবাদী সহিংসতা হলো পূর্বপ্রস্তুতিমূলক ও সত্তাগত। মানুষকে হত্যা করা হয় তারা যা করেছে তার জন্য নয়; বরং তারা কিসের প্রতিনিধিত্ব করে বলে কথিত আছে, তার জন্য। এভাবে মৃত্যু ভাবাদর্শের একটি প্রশাসনিক অনুষঙ্গে পরিণত হয়, যা হত্যাকাণ্ডকে রাজনৈতিক যুক্তির একটি আকারে রূপান্তরিত করে।

আরেন্টের মৌলিকত্ব নিহিত রয়েছে এ দাবিতে যে সর্বাত্মক আধিপত্য প্রথাগত সার্বভৌমত্বকে প্রশাসন দ্বারা প্রতিস্থাপন করে। বন্দিশিবির ও নির্মূল শিবিরগুলো কেবল চরম নিষ্ঠুরতার স্থান নয়; এগুলো হলো সেই পরীক্ষাগার, যেখানে ক্ষমতার এক নতুন রূপকে নিখুঁত করা হয় (আরেন্ট, ১৯৭৩: ৪৩৭-৪৪১)। শিবিরগুলোতে হত্যাকাণ্ড আমলাতান্ত্রিক হয়ে ওঠে, যা বিভিন্ন পদ্ধতি, কর্মপ্রণালি ও দপ্তরে বিভক্ত। কোনো একক ব্যক্তি নিজেকে হত্যাকারী হিসেবে অনুভব করে না; দায়ভার একটি ব্যবস্থার মধ্যে ছড়িয়ে থাকে। এই আমলাতান্ত্রিকীকরণ মৃত্যুর অর্থকে মৌলিকভাবে পরিবর্তন করে দেয়। ভুক্তভোগীদের থেকে কেবল আইনি ও রাজনৈতিক মর্যাদাই কেড়ে নেওয়া হয় না; বরং তাদের স্বতঃস্ফূর্ততা ও ব্যক্তিত্বও কেড়ে নেওয়া হয়। আরেন্ট মনে করেন যে ব্যক্তির আইনগত সত্তা, নৈতিক সত্তা এবং পরিশেষে তার ব্যক্তিত্বের বিনাশ ঘটে তার মৃত্যুর আগেই। শারীরিক মৃত্যু ঘটার আগেই তার কর্তাসত্তাটি অপ্রয়োজনীয় হয়ে পড়ে। সুতরাং ফ্যাসিবাদী সহিংসতার লক্ষ্য শুধু দেহ হত্যা করা নয়; বরং সেই পরিস্থিতিগুলোকে মুছে ফেলা, যার অধীনে মানবজীবন অর্থপূর্ণ ও প্রকাশিত সত্তা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হতে পারে। এখানে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এ ধরনের হত্যাকাণ্ড আবেগ বা নিষ্ঠুরতার ওপর নির্ভর করে না। বরং এর কার্যকারিতা নির্ভর করে আবেগগত বিচ্ছিন্নতার ওপর। শিবিরের দারোয়ান ও পাহারাদার, দাপ্তরিক কেরানি, পরিবহনকর্মী—সবাই এমন সব কাজ সম্পাদন করেন, যা প্রশাসনিক কাঠামোর মধ্যে নৈতিকভাবে নিরপেক্ষ বলে মনে হয়। মৃত্যু তখন একটি যুক্তিসিদ্ধ ফলাফলে পরিণত হয়, যা গণনা করা হয়, সময়সূচিবদ্ধ করা হয় এবং মহিমান্বিত করা হয়।

আইখম্যান বিচার নিয়ে আরেন্টের প্রতিবেদন এই অন্তর্দৃষ্টিকে আরও চরম রূপ দেয়। আইখম্যান ইন জেরুজালেম (২০০৬) গ্রন্থে তিনি যুক্তি দেন যে ইহুদিদের নির্বাসন ও গণহত্যার প্রশাসনিক ব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালনকারী আইখম্যানকে শুধু পৈশাচিক দানব বা ধর্মান্ধ ভাবাদর্শী হিসেবে ব্যাখ্যা করলে তার অপরাধের আমলাতান্ত্রিক চরিত্র আড়াল হয়ে যায়। আরেন্টের বিশ্লেষণে তিনি ছিলেন এমন একজন উচ্চাকাঙ্ক্ষী আমলা, যিনি সমালোচনামূলক বিচারবোধ স্থগিত রেখে আদেশ, আইন ও দাপ্তরিক ভাষার আশ্রয়ে নিজের দায় এড়িয়ে গিয়েছিলেন (আরেন্ট, ২০০৬: ২৭৬-২৭৯)। তাঁর অংশগ্রহণ আনুগত্য, নিয়ম অনুসরণ ও পেশাগত উচ্চাকাঙ্ক্ষার মাধ্যমে পরিচালিত হয়েছিল। তবে এর অর্থ এই নয় যে তাঁর ব্যক্তিগত উদ্যোগ, মতাদর্শগত সম্পৃক্ততা বা অপরাধের দায় অনুপস্থিত ছিল। ফ্যাসিবাদী ও সর্বাত্মকবাদী সহিংসতার ভয়াবহতা এখানেই যে গণহত্যায় অংশগ্রহণের জন্য প্রত্যেক অপরাধীর পৈশাচিক নিষ্ঠুরতা প্রয়োজন হয় না; বিচারবিবেচনা ত্যাগ, দায়িত্বের খণ্ডীকরণ এবং প্রশাসনিক স্বাভাবিকতাও ভয়াবহ অপরাধকে সম্ভব করে তুলতে পারে। সহিংসতা তখন প্রতিষ্ঠান ও দৈনন্দিন অভ্যাসের মধ্যে স্বাভাবিক হয়ে ওঠে। নৈতিক বিপর্যয়ের বিষয়টি শুধু পরপীড়নে নয়; চিন্তা ও বিচারের দায়িত্ব পরিত্যাগের মধ্যেও নিহিত।

দার্শনিক দৃষ্টিকোণ থেকে, আরেন্টের বিশ্লেষণ প্রকাশ করে যে কীভাবে ফ্যাসিবাদী মৃত্যু রাজনৈতিক দায়বদ্ধতার পতনকে প্রতিনিধিত্ব করে। যখন কর্ম কেবল বাস্তবে পরিণত করার বিষয় হয়ে ওঠে এবং বিচারবুদ্ধির স্থান নেয় আনুগত্য, তখন ব্যক্তিরা নিজেদের নৈতিক কর্তা হিসেবে অনুভব করা বন্ধ করে দেয়। উদ্দেশ্য, অপরাধবোধ বা চিন্তাভাবনা ছাড়াই মৃত্যু সংঘটিত হয়। এই অর্থে ফ্যাসিবাদী সহিংসতা তার সবচেয়ে চরম রূপ লাভ করে; এমন এক জগৎ, যেখানে গণহত্যা ঘটে অথচ হত্যার জন্য কেউ নিজেকে দায়ী বলে মনে করে না। আরেন্টের অবদান এভাবে পূর্ববর্তী ব্যাখ্যাগুলোকে পরিপূরক ও সংশোধন করে। জেন্টাইলের নৈতিক হত্যার অধিবিদ্যার বিপরীতে তিনি দেখান যে বিচারবুদ্ধি বিলুপ্ত হয়ে গেলে নৈতিক ভাষার অন্তঃসারশূন্যতা প্রকাশ পায়। সোরেলের নৈতিক তীব্রতার মহিমান্বয়নের বিপরীতে তিনি প্রমাণ করেন যে সবচেয়ে বিধ্বংসী সহিংসতা আবেগ ছাড়াই ঘটতে পারে। রাইখের কামশক্তির ওপর জোর দেওয়ার বিপরীতে তিনি এক শীতলতর, আরও ভয়ংকর সম্ভাবনা উন্মোচন করেন এমন এক নিদানরাজনীতি, যা আকাঙ্ক্ষা দ্বারা নয়; বরং প্রশাসনিক স্বাভাবিকতা দ্বারা টিকে থাকে।

জৈবরাজনীতি ও বর্ণান্ধ রাষ্ট্র

ফুকোর আলোচনা রাজনৈতিক সহিংসতার বিশ্লেষণকে মৌলিকভাবে নতুন দিকে চালিত করে, সার্বভৌমত্ব হিসেবে জীবনের নিজস্বতা থেকে মনোযোগ সরিয়ে জীবনকে ক্ষমতার বস্তু হিসেবে বিবেচনা করে তার দিকে নিয়ে আসে। তাঁর ১৯৭৫-৭৬ সালের বক্তৃতাগুলোতে, যা পরবর্তী সময়ে সোসাইটি মাস্ট বি ডিফেন্ডেড (২০০৩) নামে প্রকাশিত হয়, ফুকো যুক্তি দেন যে আধুনিক ক্ষমতা ক্রমবর্ধমানভাবে জীবন কেড়ে নেওয়ার অধিকারের মাধ্যমে নয়; বরং জীবনপ্রক্রিয়ার পরিচালন, সর্বোত্তমকরণ ও নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে কাজ করে, যার অন্তর্ভুক্ত হলো জন্ম, স্বাস্থ্য, প্রজনন ও জনসংখ্যা (ফুকো, ২০০৩: ২৩৯-২৪৪)। এই জৈবরাজনৈতিক যৌক্তিকতা হত্যাকে নির্মূল করে না; বরং এটি সেই পরিস্থিতিগুলোকে রূপান্তরিত করে, যার অধীনে হত্যা বৈধতা পায়। ধ্রুপদি সার্বভৌমত্বকে যেখানে ‘জীবন কেড়ে নেওয়া বা বাঁচতে দেওয়া’—এই সূত্র দ্বারা সংজ্ঞায়িত করা হয়েছিল, সেখানে জৈবরাজনৈতিক ক্ষমতা এই যুক্তিকে উল্টে দিয়ে ‘বাঁচিয়ে রাখো এবং মরতে দাও’-এ পরিণত করে। মৃত্যু আর সার্বভৌম ইচ্ছার প্রত্যক্ষ প্রকাশ হিসেবে আবির্ভূত হয় না; বরং জনসংখ্যার জীবনীশক্তি সর্বাধিক করার লক্ষ্যে গৃহীত নীতির একটি অবশেষ, পরোক্ষ ফলাফল হিসেবে দেখা দেয়। এই রূপান্তর ফ্যাসিবাদী সহিংসতা বোঝার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, যা কেবল প্রাচীন সার্বভৌমত্বকে পুনরুজ্জীবিত করে না; বরং এটিকে জনসংখ্যা ব্যবস্থাপনার আধুনিক কৌশলের সঙ্গে একীভূত করে।

ফুকোর মতে, বর্ণবাদ হলো সেই অপরিহার্য প্রক্রিয়া, যা জৈবরাজনৈতিক শক্তিকে হত্যা করার সুযোগ করে দেয় (ফুকো, ২০০৩: ২৫৪-২৫৬)। মানবজাতির জৈবিক ধারাবাহিকতাকে শ্রেণিবদ্ধ জাতিতে বিভক্ত করার মাধ্যমে বর্ণবাদ খোদ প্রজাতির মধ্যেই একটি মারাত্মক বিভেদ সৃষ্টি করে। জাতিগতভাবে চিহ্নিত ‘অপর’-এর মৃত্যুকে আর জীবন লালনের আবশ্যিকতার পরিপন্থী হিসেবে দেখা হয় না; বরং একে সমগ্র জনগোষ্ঠীর জীবনকে শক্তিশালী, পরিশুদ্ধ ও উন্নত করার একটি উপায় হিসেবে ন্যায্যতা দেওয়া হয়। এই কাঠামোতে হত্যা একটি ইতিবাচক জৈবিক অর্থ লাভ করে। মৃত্যুকে একটি অনুকূল হস্তক্ষেপ হিসেবে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করা হয়, যা সামাজিক শরীর থেকে রোগ নির্মূল করার অনুরূপ। এভাবে বর্ণবাদ একটি গুরুত্বপূর্ণ ভাবাদর্শিক ও কৌশলগত ভূমিকা পালন করে; এটি জীবনকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক যুক্তির সঙ্গে গণহত্যাকে সমন্বয় সাধন করে। এই জাতিগত যুক্তি ছাড়া ফ্যাসিবাদী সহিংসতাকে বোঝা কষ্টসাধ্য হয়ে ওঠে, যা নির্মূলকে একটি জৈবরাজনৈতিক আবশ্যিকতায় রূপান্তরিত করে।

ফুকো অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণভাবে নাৎসিবাদকে এমন একটি পর্যায় হিসেবে বর্ণনা করেছেন, যেখানে জৈবরাজনৈতিক ক্ষমতা তার সবচেয়ে চরম এবং কূটাভাষিক রূপ লাভ করে (ফুকো, ২০০৩: ২৫৯-২৬৩)। ফ্যাসিবাদ হত্যা করার সার্বভৌম অধিকার পরিত্যাগ করে না; বরং এটি সার্বভৌম সহিংসতাকে একটি জৈবরাজনৈতিক কাঠামোর মধ্যে পুনঃসংহত করে। এর ফলস্বরূপ এমন একটি শাসনব্যবস্থা তৈরি হয়, যেখানে রাষ্ট্র একই সঙ্গে নিবিড়ভাবে জীবন পরিচালনা করে এবং অভূতপূর্ব ধ্বংসযজ্ঞ চালায়। ফলে ফ্যাসিবাদের অধীনে মৃত্যু উৎপাদনশীল হয়ে ওঠে। যুদ্ধ, নির্মূলকরণ ও আত্মত্যাগকে জাতির জৈবিক ভবিষ্যতের জন্য বিনিয়োগ হিসেবে ন্যায্যতা দেওয়া হয়। জনগণকে লালনযোগ্য বস্তু ও ব্যয়যোগ্য উপাদান—উভয় হিসেবেই সক্রিয় করা হয়। ব্যক্তিদের স্বাস্থ্যকরভাবে বাঁচতে, বংশবৃদ্ধি করতে ও আনুগত্য করতে আহ্বান জানানো হয় এবং একই সঙ্গে জাতিগত অস্তিত্ব রক্ষার নামে মরতে বা হত্যা করতে প্রস্তুত থাকতে বলা হয়। লালন করা ও ধ্বংসের এই সংমিশ্রণ ফ্যাসিবাদকে সহিংসতার একটি অনন্য আধুনিক রূপ হিসেবে চিহ্নিত করে।

ফুকোর বিশ্লেষণ থেকে বোঝা যায়, ফ্যাসিবাদী মৃত্যু অযৌক্তিকও নয়, আবার নিছক ভাবাদর্শগতও নয়। এটি এমন এক যুক্তিবাদে প্রোথিত, যা জীবনকে সর্বোত্তম ব্যবহারের জন্য সম্পদ ও মৃত্যুকে একটি গ্রহণযোগ্য, এমনকি প্রয়োজনীয় মূল্য হিসেবে গণ্য করে। পরিসংখ্যানগত চিন্তাভাবনা, জনস্বাস্থ্যবিষয়ক আলোচনা ও জৈবিক রূপকের মাধ্যমে সহিংসতাকে স্বাভাবিকীকরণ করা হয়। এই অর্থে ফ্যাসিবাদ বর্বরতায় পশ্চাদপসরণ নয়, বরং স্বয়ং আধুনিক রাজনৈতিক যুক্তিবাদের এক বিপর্যয়কর তীব্রতার সম্প্রসারণ। ফুকোর বিবরণ বর্ণবাদ, জৈবরাজনীতি ও গণহত্যার মধ্যকার সংযোগকে জোরালোভাবে আলোকিত করলেও এটি তার গবেষণামূলক মনোযোগের অভিমুখ মূলত ইউরোপকেন্দ্রিকই থেকে যায়। ঔপনিবেশিক পরিসরগুলো এখানে প্রান্তিকভাবেই উপস্থিত; যদিও ইউরোপে ফিরে আসার অনেক আগে থেকেই সাম্রাজ্যিক প্রেক্ষাপটে বর্ণবাদী জৈবরাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড পদ্ধতিগতভাবে চর্চিত হতো। এই সীমাবদ্ধতা ফুকোর কাঠামোর একটি উত্তর-ঔপনিবেশিক সম্প্রসারণকে অপরিহার্য করে তোলে। তবু ফুকো ফ্যাসিবাদের ধ্রুপদি তত্ত্ব ও নিদানরাজনীতির সমসাময়িক বিশ্লেষণের মধ্যে ধারণাগত সেতুবন্ধ তৈরি করেন। রাষ্ট্র কীভাবে জীবনের নামে হত্যা করতে পারে, তা দেখানোর মাধ্যমে তিনি ফ্যাসিবাদী নির্মূল, ঔপনিবেশিক সহিংসতা ও জাতিগত রাষ্ট্রীয় মৃত্যুর আধুনিক রূপগুলোর ধারাবাহিকতাকে বোধগম্য করে তোলেন। এ সংযোগকেই পরবর্তীকালে এশিলে এমবেম্বে তাঁর রাজনৈতিক মৃত্যুর বিশ্লেষণে ব্যবহার করেন।

নগ্ন জীবন ও ন-মানুষ

জর্জো আগামবেনের কাজ পশ্চিমা রাজনীতির একটি মৌলিক কাঠামো হিসেবে নগ্ন জীবনের উৎপাদন শনাক্ত করার মাধ্যমে জৈবরাজনৈতিক সমস্যাটিকে আমূল পরিবর্তন করে দেয়। রোমান আইনের ওপর ভিত্তি করে আগামবেন হোমো সেকার (homo sacer) নামের একটি চরিত্রের অবতারণা করেন, যে এমন একজন ব্যক্তি, যাকে হত্যা করা হলেও সে কাজ নরহত্যা হিসেবে গণ্য হয় না, অথচ যাকে কোনো ধর্মীয় আচারে বলি দেওয়াও যায় না (আগামবেন, ১৯৯৮: ৮-১০)। এই কূটাভাসিক অবস্থা এমন এক জীবনকে চিহ্নিত করে, যা রাজনৈতিক ও পবিত্র—উভয় ব্যবস্থা থেকেই বহিষ্কৃত; এমন এক জীবন, যা মূল্যহীন অথচ চিরস্থায়ীভাবে মৃত্যুর মুখে উন্মুক্ত। নগ্ন জীবন (bare life) কেবল জৈবিক অস্তিত্ব নয়; এটি এমন এক জীবন, যা একটি সার্বভৌম সিদ্ধান্তের মাধ্যমে উৎপাদিত হয় এবং যা ‘শুধুই বেঁচে থাকা’ (zoē) থেকে ‘রাজনৈতিকভাবে যোগ্যতাসম্পন্ন জীবন’কে (bios) পৃথক করে। আগামবেনের মতে, সার্বভৌমত্বকে ঠিক এই অন্তর্ভুক্তিমূলক বর্জনের (inclusive exclusion) ক্ষমতা দ্বারাই সংজ্ঞায়িত করা হয়, অর্থাৎ আইনের মাধ্যমেই জীবনকে আইনের বাইরে রাখার ক্ষমতা। এই তত্ত্বের আলোকে ফ্যাসিবাদী শাসনে ইহুদি, রোমা ও রাজনৈতিক শত্রুদের এবং সমকালীন বিভিন্ন প্রেক্ষাপটে রাষ্ট্রহীন, দখলকৃত বা অবরুদ্ধ জনগোষ্ঠীর আইনি সুরক্ষাহীনতাকে বিশ্লেষণ করা যায়।

আগামবেনের সবচেয়ে বিতর্কিত দাবি হলো, শহর বা সংবিধানের পরিবর্তে শিবিরই হলো আধুনিক রাজনৈতিক পরিসরের লুকানো কাঠামো (আগামবেন, ১৯৯৮: ১৬৬-১৭০)। শিবির হলো সেই স্থান, যেখানে ব্যতিক্রমী অবস্থা স্থায়ী হয়ে ওঠে, যেখানে আইন সাময়িকভাবে নয়, বরং কাঠামোগতভাবে স্থগিত থাকে। শিবিরে বৈধতা ও অবৈধতার মধ্যেকার পার্থক্য বিলীন হয়ে যায়; সবকিছুই সম্ভব, কারণ কোনো কিছুই নিষিদ্ধ নয়। ফ্যাসিবাদ শিবিরের উদ্ভাবক নয়, বরং এটি তার যুক্তিকে এক চরম ও দৃশ্যমান রূপে প্রকাশ করে। কনসেন্ট্রেশন ও এক্সটারমিনেশন ক্যাম্পগুলো আধুনিক শাসনে আগে থেকেই সুপ্ত থাকা একটি কাঠামোকে সুস্পষ্ট করে তোলে, অর্থাৎ মানুষকে রাজনৈতিক তাৎপর্যহীন জৈবিক বস্তুতে পরিণত করার ক্ষমতা। সুতরাং শিবির ফ্যাসিবাদের কোনো বিচ্যুতি নয়, বরং এর নির্জলা সত্যতা, যা আধুনিক সার্বভৌমত্বের মধ্যেই নিহিত প্রাণঘাতী সম্ভাবনাকে উন্মোচন করে। আরেন্ট যেখানে আমলাতন্ত্র ও ভাবাদর্শের ওপর জোর দেন, আগামবেন সেখানে আইনি শূন্যতার ওপর আলোকপাত করেন, যা হত্যাকে সম্ভব করে তোলে। শিবিরে মৃত্যু মূলত প্রশাসনিক বা ভাবাদর্শগত নয়; এটি সত্তাগত। বন্দীকে হত্যা করা হয়, কারণ তাকে আর আদৌ কোনো আইনি সত্তা হিসেবে গণ্য করা হয় না। এখানে সহিংসতার কোনো যুক্তির প্রয়োজন হয় না, এটি এমন এক পরিসরে কাজ করে, যেখানে যুক্তির সুযোগ স্থগিত রাখা হয়েছে।

আগামবেনের কাঠামো ফ্যাসিবাদী মৃত্যুকে ব্যতিক্রমের স্বাভাবিকীকরণ হিসেবে বোঝার সুযোগ করে দেয়। ফ্যাসিবাদী রাষ্ট্র এমন শত্রু ঘোষণা করে শাসন করে, যাদের আইনের বাইরে রাখতে হবে, কিন্তু এই বর্জন আইনি ব্যবস্থার মাধ্যমেই তৈরি হয়। জরুরি আদেশ, বর্ণবাদী আইন ও নিরাপত্তাব্যবস্থা এমন পরিসর তৈরি করে, যেখানে ‘মেরে ফেলা’ আর হত্যাকাণ্ড থাকে না। এ যুক্তির সুদূরপ্রসারী প্রভাব চিরায়ত ফ্যাসিবাদের বাইরেও রয়েছে। যখন জরুরি ক্ষমতা, আটক শিবির ও আইনি পার্থক্যহীনতার পরিসরগুলো ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে, তখন শিবিরটি স্থানান্তরযোগ্য হয়ে ওঠে। যেখানেই জবাবদিহি ছাড়া জীবনকে হত্যাযোগ্য করে তোলা হয়, সেখানেই এর আবির্ভাব ঘটে। এই অর্থে ফ্যাসিবাদ কেবল একটি ঐতিহাসিক শাসনব্যবস্থা নয়, বরং একটি রাজনৈতিক প্রবণতা, যা তখনই দৃশ্যমান হয়, যখন গণহারে নগ্ন জীবন উৎপাদিত হয়। যদিও আগামবেনের তত্ত্ব ফ্যাসিবাদী মৃত্যুর আইনি কাঠামোকে জোরালোভাবে উপস্থাপন করে; কিন্তু এটি বিমূর্ততা ও ঐতিহাসিক সরলীকরণের জন্য সমালোচিতও হয়। শিবিরকে একটি সর্বজনীন দৃষ্টান্ত হিসেবে বিবেচনা করার মাধ্যমে আগামবেন সেই নির্দিষ্ট জাতিগত, ঔপনিবেশিক ও অর্থনৈতিক ইতিহাসকে অস্পষ্ট করে ফেলার ঝুঁকি নেন, যা নির্ধারণ করে কারা নগ্ন জীবনে পরিণত হয়। তবু আগামবেন একটি গুরুত্বপূর্ণ ধারণাগত অন্তর্দৃষ্টি প্রদান করেন, যা বুঝতে সাহায্য করে কীভাবে ফ্যাসিবাদী সহিংসতা আইনের বিরুদ্ধে নয়, বরং আইনের মাধ্যমেই পরিচালিত হয়। এর মাধ্যমে আগামবেন সেসব নিদানরাজনীতির বিশ্লেষণের জন্য ক্ষেত্র প্রস্তুত করেন, যা ঔপনিবেশিক দখলদারত্ব, জাতিগত আধিপত্য ও গোলকায়িত দক্ষিণকে রাজনৈতিক মৃত্যুর কেন্দ্রীয় স্থান হিসেবে সুস্পষ্টভাবে তুলে ধরে।

নিদানরাজনীতি ও ইউরোপের সীমানা পেরিয়ে ফ্যাসিবাদ

এশিলে এমবেম্বের নিদানরাজনীতি তত্ত্ব সার্বভৌমত্ব, জৈবরাজনীতি ও রাজনৈতিক সহিংসতাবিষয়ক বিতর্কে একটি নির্ণায়ক উত্তর–ঔপনিবেশিক মনোযোগের প্রতিনিধিত্ব করে। ফুকোর ‘জৈবক্ষমতা’ ধারণার গুরুত্ব স্বীকার করেও এমবেম্বে যুক্তি দেন, শুধু জৈবরাজনীতি দিয়ে ক্ষমতার সেসব রূপকে যথাযথভাবে ব্যাখ্যা করা যায় না, যেখানে জীবনের পরিবর্তে মৃত্যুই শাসনের প্রধান হাতিয়ার হয়ে ওঠে (এমবেম্বে, ২০০৩: ১১-১৪)। নিদানরাজনীতি সেসব শাসনব্যবস্থাকে নির্দেশ করে, যেখানে কে বাঁচবে আর কাকে মরতে হবে, তা নির্ধারণ করার ক্ষমতার মাধ্যমে সার্বভৌমত্ব প্রকাশ পায়, যা প্রায় ক্ষেত্রেই কোনো ধরনের আইনি বা নৈতিক বাধার বাইরে ঘটে। এমবেম্বের মূল দাবি হলো, আধুনিক রাজনৈতিক সহিংসতার সবচেয়ে চরম রূপগুলো ইউরোপের মধ্যে নয়, বরং ঔপনিবেশিক ও উত্তর-ঔপনিবেশিক পরিসরে উদ্ভূত হয়। এই পরিসরগুলো মৃত্যুর পরীক্ষাগার হিসেবে কাজ করে, যেখানে আধিপত্য, আবদ্ধকরণ ও নির্মূলের কৌশলগুলো ইউরোপীয় ফ্যাসিবাদে পুনরায় আমদানি হওয়ার অনেক আগেই বিকশিত হয়। নিদানরাজনীতি এভাবে ফ্যাসিবাদকে একটি অনন্য ইউরোপীয় ব্যাধি হিসেবে নয়, বরং সাম্রাজ্য, বর্ণবাদী পুঁজিবাদ ও ঔপনিবেশিক দখলদারত্বে প্রোথিত একটি বৈশ্বিক রাজনৈতিক যুক্তি হিসেবে পুনঃস্থাপন করে।

এমবেম্বের নিদানরাজনৈতিক ক্ষমতার উৎসকে ঔপনিবেশিক বিজয়ের মধ্যে চিহ্নিত করেন, যেখানে আদিবাসী জনগোষ্ঠীকে পদ্ধতিগতভাবে হত্যাযোগ্য করে তোলা হয়েছিল। ঔপনিবেশিক শাসন একটি স্থায়ী ব্যতিক্রমী অবস্থার মাধ্যমে পরিচালিত হতো: জরুরি আইন, সম্মিলিত শাস্তি ও অবাধ সামরিক সহিংসতা মৃত্যুকে শাসনের একটি হাতিয়ার হিসেবে স্বাভাবিক করে তুলেছিল (এমবেম্বে, ২০০৩: ২৩-২৬)। জৈবরাজনৈতিক শাসনব্যবস্থা, যা একটি জনগোষ্ঠীর জীবনকে সর্বোত্তম করার লক্ষ্য রাখে, তার বিপরীতে ঔপনিবেশিক শাসনব্যবস্থা প্রায় ক্ষেত্রেই পরাধীন জনগোষ্ঠীকে ব্যয়যোগ্য হিসেবে গণ্য করত। এই ঔপনিবেশিক যুক্তি এমন কিছুর জন্ম দেয়, যাকে এমবেম্বে ‘মৃত্যুজগৎ’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন—এমন অঞ্চল, যেখানে বিশাল জনগোষ্ঠীকে এমন এক জীবনযাপনের অবস্থার শিকার হতে হয়, যা তাদের জীবন্ত মৃতের মর্যাদা প্রদান করে। এই স্থানগুলোর মধ্যে রয়েছে উপনিবেশ শাসনের আওতাভুক্ত এলাকা (plantations), দখলকৃত অঞ্চল, সংরক্ষিত এলাকা, শরণার্থীশিবির ও সমসাময়িক যুদ্ধক্ষেত্র। রাজনৈতিক ক্ষমতা ও আইনি সুরক্ষা থেকে বঞ্চিত হয়ে এই পরিসরগুলোয় জীবন টিকে থাকে কেবল অবিরাম হুমকির মুখে বেঁচে থাকার সংগ্রাম হিসেবে।

এমবেম্বের বিশ্লেষণ ইউরোপীয় ফ্যাসিবাদ ও ঔপনিবেশিক সহিংসতার মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক ও ধারণাগত ধারাবাহিকতা শনাক্ত করতে সাহায্য করে। নাৎসি নির্মূল শিবিরকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন কোনো বর্বরতা হিসেবে না দেখে বিচ্ছিন্নতা, জোরপূর্বক শ্রম, বর্ণবাদী শ্রেণিবিন্যাস ও গণহত্যার ঔপনিবেশিক ইতিহাসের সঙ্গে তুলনা করা যায়। তবে এই তুলনা নাৎসি গণহত্যার স্বতন্ত্র ঐতিহাসিক বৈশিষ্ট্যকে অস্বীকার করে না। ফ্যাসিবাদের অধীনে আগে তুলনামূলকভাবে আইনি সুরক্ষা ভোগ করা ইউরোপীয় জনগোষ্ঠীর ওপরও চরম নিদানরাজনৈতিক কৌশল প্রয়োগ করা হয়। উত্তর–ঔপনিবেশিক প্রেক্ষাপটেও সামরিক দখলদারত্ব, বিদ্রোহ দমন অভিযান ও স্বৈরাচারী শাসন জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণে ড্রোন, চেকপয়েন্ট, অবরোধ, অনাহার ও ধীরগতির সহিংসতার মতো কৌশল ব্যবহার করতে পারে। এসব চর্চা আনুষ্ঠানিকভাবে অফ্যাসিবাদী রাষ্ট্রেও ঔপনিবেশিক ও নিদানরাজনৈতিক মৃত্যুযুক্তির ধারাবাহিকতা প্রকাশ করে।

এমবেম্বের অন্যতম একটি মনোযোগ আকর্ষণকারী অন্তর্দৃষ্টি হলো এই যে নেক্রোপলিটিকস বা নিদানরাজনীতি ফ্যাসিবাদী ভাবাদর্শ ছাড়াই ফ্যাসিবাদের টিকে থাকাকে সম্ভব করে তোলে। নিরাপত্তাবিষয়ক আলোচনা, মানবিক হস্তক্ষেপ বা উন্নয়নমূলক যুক্তির মাধ্যমে মৃত্যু ঘটানো যেতে পারে। চিরায়ত ফ্যাসিবাদের মতো শত্রুকে আর স্পষ্টভাবে জাতিগত দিক থেকে চিহ্নিত করা হয় না, তবু জনগোষ্ঠী পরিত্যাগ, কারাবাস, গুম-খুন ও সামরিকীকৃত পুলিশি–ব্যবস্থার মাধ্যমে অকালমৃত্যুর শিকার হয়। এমবেম্বে আমাদের ফ্যাসিবাদী শাসনকে একটি পুনরাবৃত্তিমূলক যুক্তি হিসেবে দেখতে আহ্বান জানান, যা সেখানেই পুনরায় আবির্ভূত হয়, যেখানে সার্বভৌমত্ব প্রধানত মৃত্যুর মাধ্যমে প্রয়োগ করা হয়। এমবেম্বের বিশ্লেষণ বর্ণবাদী পুঁজিবাদের গতিপ্রকৃতির সঙ্গে অবিচ্ছেদ্যভাবে যুক্ত। জীবনের ভিন্ন ভিন্ন মূল্যায়নের মাধ্যমেই অর্থনৈতিক নিষ্কাশন, সম্পত্তিচ্যুতি ও শোষণ টিকে থাকে। কিছু জীবন সুরক্ষিত, বিমাভুক্ত ও শোকসন্তপ্ত; অন্যগুলোকে বর্জনীয় করে তোলা হয়। এভাবেই নিদানরাজনীতি বৈশ্বিক বৈষম্য, অভিবাসনব্যবস্থা ও সীমান্তের সামরিকীকরণের সঙ্গে সম্পর্কিত। এই অর্থে ফ্যাসিবাদী মৃত্যু কোনো ব্যতিক্রম নয়, বরং বৈশ্বিক আধুনিকতার একটি কাঠামোগত বৈশিষ্ট্য। উদ্বৃত্ত জনসংখ্যার ব্যবস্থাপনা, জাতিগত পরিচয়ের ভিত্তিতে চিহ্নিত দেহগুলোর ওপর নজরদারি এবং গোলকায়িত দক্ষিণে গণমৃত্যুর স্বাভাবিকীকরণ, ফ্যাসিবাদী যুক্তিগুলোর চিরায়ত ঐতিহাসিক রূপের ঊর্ধ্বে তাদের দীর্ঘস্থায়ী প্রাসঙ্গিকতা প্রকাশ করে। তাই ফ্যাসিবাদী মৃত্যু হয়ে ওঠে এক পরিবর্তনশীল বিন্যাস, যা নতুন প্রেক্ষাপটের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেয়।

উপসংহার: ফ্যাসিবাদ, মৃত্যু ও রাজনৈতিক সহিংসতার ভবিষ্যৎ

বর্তমান প্রবন্ধে বর্ণিত তাত্ত্বিক গতিপথটি সমসাময়িক রাজনৈতিক বাস্তবতার জন্য জরুরি ও প্রয়োজনীয় প্রাসঙ্গিকতা বহন করে, বিশেষ করে গোলকায়িত দক্ষিণের প্রসঙ্গে। কর্তৃত্ববাদী শাসনব্যবস্থাগুলো ক্ষমতা সুসংহত করার জন্য ক্রমবর্ধমানভাবে নিদানরাজনীতির যুক্তির ওপর নির্ভর করে এবং সামাজিক নিয়ন্ত্রণ ও রাজনৈতিক শৃঙ্খলার উপায় হিসেবে মৃত্যুকে ব্যবহার করে। সামরিকীকৃত পুলিশি–ব্যবস্থা, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, বিদ্রোহ দমন অভিযান ও উদ্বাস্তু জনগোষ্ঠীর ব্যবস্থাপনা প্রমাণ করে যে মৃত্যুর ফ্যাসিবাদীসদৃশ যুক্তিগুলো ইউরোপের বাইরেও ছড়িয়ে পড়েছে। ভৌত ও প্রতীকী—উভয় সীমান্তই এমন স্থান হিসেবে কাজ করে, যেখানে রাষ্ট্র জীবন ও মৃত্যুর শ্রেণিবিন্যাস বলবৎ করে, কিছু জনগোষ্ঠীকে বিশেষ সুবিধা দেয় এবং অন্যদের ব্যয়যোগ্য করে তোলে (এমবেম্বে, ২০০৩: ৩০)। সমসাময়িক যুদ্ধ, ড্রোন হামলা ও লক্ষ্যবস্তুভিত্তিক (targeted) সহিংসতার রূপগুলোও একইভাবে পূর্ববর্তী ফ্যাসিবাদী শাসনব্যবস্থায় চিহ্নিত প্রশাসনিক, জৈবরাজনৈতিক ও নিদানরাজনীতির যুক্তিগুলোর সংমিশ্রণকে প্রতিফলিত করে। অধিকন্তু বিশ্বজুড়ে জনবাদী ও জাতীয়তাবাদী আন্দোলনগুলো এমন নৈতিক ও নান্দনিক বাগাড়ম্বরকে পুনরুৎপাদন করে, যা আমাদের স্পষ্টভাবে সোরেল ও জেন্টাইলের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। ত্যাগ, শহীদ হওয়া ও সম্মিলিত বীরত্ব এক কল্পিত জাতীয় বা জাতিগত পুনর্জন্মের স্বার্থে সহিংসতাকে বৈধতা দিয়ে চলছে। এমনকি আপাতদৃষ্টিতে উদার প্রেক্ষাপটেও নিরাপত্তাসংক্রান্ত আলোচনা, জরুরি ক্ষমতা ও গণনজরদারি মৃত্যুকে শাসনের একটি হাতিয়ার হিসেবে স্বাভাবিক করে তোলে, যা আগামবেনের শিবির ও আরেন্টের আমলাতান্ত্রিক হত্যাকাণ্ডের প্রতিধ্বনি।

রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে মৃত্যুর স্বাভাবিকীকরণ গভীর নৈতিক প্রশ্ন উত্থাপন করে। যদি মৃত্যুকে উৎপাদনশীল, পুণ্যময় বা প্রয়োজনীয় হিসেবে যৌক্তিকতা দেওয়া যায়, তবে হত্যার বিরুদ্ধে নৈতিক ও আইনি সমালোচনার মূল ভিত্তিই দুর্বল হয়ে পড়ে। দার্শনিক, রাজনৈতিক তাত্ত্বিক ও নীতিনির্ধারকদের অবশ্যই সীমানা বিলুপ্ত করে দেওয়ার এই প্রক্রিয়াকে মোকাবিলা করতে হবে—আইনের স্থগিতাদেশ, সহিংসতার নান্দনিকীকরণ ও নিষ্ঠুরতার আবেগীয় প্রলোভন। ফ্যাসিবাদকে কেবল একটি ঐতিহাসিক ব্যতিক্রম হিসেবে নয়, বরং ক্ষমতার এক অবিচল ও কাঠামোগতভাবে অভিযোজনযোগ্য যুক্তি হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে উদারনৈতিক নৈতিক কাঠামোর আত্মতুষ্টিকে চ্যালেঞ্জ করতে হবে এবং বলিষ্ঠ পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। এর জন্য প্রয়োজন বৈশ্বিক বৈষম্য, বর্ণগত শ্রেণিবিন্যাস ও সেসব আবেগগত অর্থনীতির প্রতি মনোযোগ দেওয়া, যা মৃত্যুকে অর্থবহ করে তোলে। নীতিশাস্ত্র, রাষ্ট্রদর্শন, মনোবিশ্লেষণ ও উত্তর–ঔপনিবেশিক তত্ত্ব থেকে প্রাপ্ত অন্তর্দৃষ্টিগুলোকে কেবল সমন্বিত করার মাধ্যমেই গবেষক, আন্দোলনকর্মী ও রাষ্ট্রসমূহ ফ্যাসিবাদী যুক্তির পুনরুৎপাদন ও মৃত্যুর পদ্ধতিগত ব্যবস্থাপনাকে প্রতিহত করার কৌশল প্রণয়ন করতে পারে। পরিশেষে ফ্যাসিবাদ একটি স্থির ঐতিহাসিক শাসনব্যবস্থা হিসেবে নয়, বরং সহিংসতা, মৃত্যু ও সার্বভৌমত্বের এক গতিশীল বিন্যাস হিসেবে টিকে আছে। এর অধ্যয়নের জন্য সেসব পদ্ধতির প্রতি মনোযোগ দেওয়া প্রয়োজন, যেখানে মানুষকে উপায় হিসেবে নয়, লক্ষ্য হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করে।

রচনাপঞ্জি

আংঘি ২০০৪।। A. Anghie, Imperialism, Sovereignty and the Making of International Law, Cambridge: Cambridge University Press।
আগামবেন ১৯৯৮।। G. Agamben, Homo Sacer: Sovereign Power and Bare Life, Stanford, CA: Stanford University Press।
আরাদ, গুটম্যান ও মার্গালিয়ট ১৯৯৯।। Yitzhak Arad, Yisrael Gutman, and Abraham Margaliot (eds.), Documents on the Holocaust, Lincoln: University of Nebraska Press।
আরেন্ট ১৯৫১।। Hannah Arendt, The Origins of Totalitarianism, New YorkYork: Harcourt, Brace and Company।
আরেন্ট ১৯৬৯।। Hannah Arendt, On Violence, New York: Harcourt Brace।
আরেন্ট ১৯৭৩।। Hannah Arendt, The Origins of Totalitarianism, New York: Harcourt Brace।
আরেন্ট ২০০৬।। Hannah Arendt, Eichmann in Jerusalem: A Report on the Banality of Evil, Harmondsworth: Penguin।
ইয়ুঙ্গার ২০০৩।। Ernst Jünger, Storm of Steel, trans. Michael Hofmann, London: Penguin।
উডলি ২০১০।। D. Woodley, Fascism and Political Theory: Critical Perspectives on Fascist Ideology, London: Routledge।
এমবেম্বে ২০০৩।। Achille Mbembe, ‘Necropolitics’, Public Culture, 15(1), pp. 11–40।11–40।11–40।
ওয়েবার ২০০৪।। Max Weber, ‘Politics as a Vocation’, in The Vocation Lectures, trans. Rodney Livingstone, ed. David Owen and Tracy B. Strong, Indianapolis: Hackett Publishing।
গিডেন্স ১৯৮৫।। A.Publishing। Giddens, The Nation-State and Violence, Cambridge: Polity।
গ্রিফিন ১৯৯১।। Roger Griffin, The Nature of Fascism, London: Routledge।
জেন্টাইলে ২০০৭।। Giovanni Gentile, The Theory of Mind as Pure Act, Toronto: University of Toronto Press।

জেন্টাইলে ২০০২।। Giovanni Gentile, Origins and Doctrine of Fascism: With Selections from Other Works, trans. and ed. A. James Gregor, New Brunswick, NJ: Transaction Publishers।

জিজেক ২০০৮।। Slavoj Žižek, Violence, London: Profile।
নোল্টে ১৯৬৫।। E. Nolte, Three Faces of Fascism, English trans., London: Weidenfeld & Nicolson।
ফুকো ১৯৮৪ [১৯৭১]।। M. Foucault, ‘Nietzsche, Genealogy, History’, in The Foucault Reader, ed. Paul Rabinow, New York: Pantheon Books।
ফুকো ২০০৩।। Michel Foucault, Society Must Be Defended: Lectures at the Collège de France, 1975–76, New York: Picador।
ফানোঁ ১৯৬৭ [১৯৫২]।। Frantz Fanon, Black Skin, White Masks, trans. Charles Lam Markmann, New York: Grove Press।
ফানোঁ ২০০৪ [১৯৬১]।। Frantz Fanon, The Wretched of the Earth, trans. Richard Philcox, New York: Grove Press।
ফ্রম ১৯৭৩।। E. Fromm, The Anatomy of Human Destructiveness, Harmondsworth: Penguin।
বাউম্যান ১৯৮৯।। Z. Bauman, Modernity and the Holocaust, Cambridge: Polity।
বেঞ্জামিন ১৯৯৭ [১৯২১]।। W. Benjamin, ‘Critique of Violence’, in One-Way Street and Other Writings, English trans., London: Verso।

রাইখ ১৯৭০।। Wilhelm Reich, The Mass Psychology of Fascism, English trans, New York: Farrar, Straus and Giroux।

ভাস্কুয়েজ ১৯৭৭।। A. Sánchez Vásquez, The Philosophy of Praxis, English trans., London: Merlin।

মেমি ১৯৬৭।। A. Memmi, The Colonizer and the Colonized, Boston: Beacon Press।
স্টার্নহেল ১৯৯৪।। Zeev Sternhell, with Mario Sznajder and Maia Ashéri, The Birth of Fascist Ideology: From Cultural Rebellion to Political Revolution, trans. David Maisel, Princeton, NJ: Princeton University Press।
সেজেয়ার ২০০০।। A. Césaire, Discourse on Colonialism, New York: Monthly Review Press।
সোরেল ১৯৯৯।। Georges Sorel, Reflections on Violence, Cambridge: Cambridge University Press।

লেখক পরিচিতি

ড. মো. মাসুদ আলম বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিসের একজন সদস্য। দর্শনের সহযোগী অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান হিসেবে বরিশালের সরকারি ব্রজমোহন (বিএম) কলেজে পড়ান। তিনি মূলত গবেষক, প্রাবন্ধিক ও অনুবাদক। এর আগে ঢাকার ঐতিহ্য থেকে তাঁর অনূদিত বই (জিজেক রচিত) প্যানডেমিক!: কোভিড–১৯ শেক্স দ্য ওয়ার্ল্ড (২০২০), প্যানডেমিক! ২: ক্রনিকলস অব আ টাইম লস্ট (২০২১) এবং কথাপ্রকাশ থেকে ফেদেরিকো ফিনচেলস্তাইন রচিত ফ্যাসিবাদী মিথ্যার সংক্ষিপ্ত ইতিহাস (২০২৬) প্রকাশিত হয়েছে। তাঁর মৌলিক প্রবন্ধের বই মেধাতন্ত্র: দর্শন, সমাজ ও রাজনীতি (২০২৫) কথাপ্রকাশ থেকে প্রকাশিত হয়েছে।

Read full story at source