অর্থনৈতিক গবেষণার মান বাড়াব কীভাবে
· Prothom Alo

বাংলাদেশে অর্থনীতি নিয়ে আমরা অনেক কথা বলি। গবেষণাও কম হয় না। মূল্যস্ফীতি, প্রবৃদ্ধি, বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান, রপ্তানি, রাজস্ব কিংবা বৈদেশিক মুদ্রা—প্রায় প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়েই গবেষণা হচ্ছে, প্রতিবেদন প্রকাশিত হচ্ছে, সেমিনার হচ্ছে। তারপরও একটি প্রশ্ন থেকে যায়: এত গবেষণার পরও আমাদের অনেক অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত কেন যথেষ্ট তথ্যপ্রমাণের ওপর দাঁড়ায় না?
Visit hilogame.news for more information.
আমার মনে হয়, সমস্যাটি গবেষণার পরিমাণে নয়; বরং গবেষণার মান, স্বাধীনতা এবং নীতিনির্ধারণে তার ব্যবহার নিয়ে। একটি দেশের অর্থনীতি যত জটিল হয়, নীতিনির্ধারণে ভালো গবেষণার প্রয়োজন তত বাড়ে। বাংলাদেশের অর্থনীতিও এখন এমন এক পর্যায়ে এসেছে, যেখানে শুধু অতীতের প্রবৃদ্ধির হার দেখে ভবিষ্যতের পথ ঠিক করা যাবে না। আমাদের বুঝতে হবে অর্থনীতির ভেতরে কী পরিবর্তন ঘটছে এবং সেই পরিবর্তনের সঙ্গে মানুষ ও প্রতিষ্ঠানগুলো কীভাবে মানিয়ে নিচ্ছে।
আমাদের কেন আন্তর্জাতিক মানের গবেষণা ইনস্টিটিউট প্রয়োজনভালো গবেষণার ভিত্তি ভালো তথ্য। কিন্তু আমাদের গবেষকদের অনেক সময় তথ্য পেতে দীর্ঘ অপেক্ষা করতে হয়, বিভিন্ন উৎসের তথ্য মিলিয়ে দেখতে হয় কিংবা প্রয়োজনীয় তথ্যই পাওয়া যায় না। কোনো কোনো ক্ষেত্রে তথ্য প্রকাশের সময়, পদ্ধতি বা সংজ্ঞার পরিবর্তনও বিশ্লেষণকে কঠিন করে তোলে। ফলে গবেষণার একটি বড় অংশ চলে যায় তথ্য সংগ্রহ ও যাচাই করতে।
ভালো গবেষণা আমাদের কোনো সমস্যাকে আরও পরিষ্কারভাবে বুঝতে সাহায্য করে, প্রচলিত ধারণাকে যাচাই করে এবং সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে সম্ভাব্য ফলাফল সম্পর্কে সতর্ক করে।
আমাদের অনেক গবেষণা বলে দেয় কী ঘটেছে। প্রবৃদ্ধি কত হয়েছে, মূল্যস্ফীতি কত বেড়েছে, রপ্তানি কত কমেছে—এসব জানা জরুরি। কিন্তু একজন নীতিনির্ধারকের আসল প্রয়োজন হলো কেন এমন হলো এবং এখন কী করা যেতে পারে। অর্থনৈতিক গবেষণার মূল্য সেখানেই।
মূল্যস্ফীতির কথাই ধরা যাক। শুধু মূল্যস্ফীতির হার জানলে সমস্যাটির পুরো চিত্র পাওয়া যায় না। আমদানি ব্যয়, বিনিময় হার, জ্বালানি ও পরিবহন ব্যয়, সরবরাহব্যবস্থা, বাজারের প্রতিযোগিতা এবং মুদ্রা ও রাজস্বনীতির ভূমিকা—সবকিছু দেখতে হবে। একই সঙ্গে জানতে হবে এর সবচেয়ে বড় চাপ কার ওপর পড়ছে।
একজন মধ্যবিত্ত হয়তো কিছু ব্যয় কমিয়ে পরিস্থিতি সামাল দিতে পারেন। কিন্তু নিম্ন আয়ের একটি পরিবার হয়তো খাবারের মান কমিয়ে বা চিকিৎসা পিছিয়ে দিয়ে সেই চাপ সামলায়। অর্থনীতির এই মানবিক দিকটি গবেষণায় না এলে পরিসংখ্যান আমাদের পুরো সত্যটি বলবে না।
এ কারণেই গবেষণাকে আরও বেশি বাস্তব অর্থনীতির কাছাকাছি নিতে হবে। অর্থনৈতিক মডেল, অর্থমিতি ও পরিসংখ্যান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু এগুলো মানুষের অভিজ্ঞতার বিকল্প নয়। ব্যবসায়ী কেন বিনিয়োগ করছেন না, একজন তরুণ কেন নিজের শিক্ষার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ চাকরি পাচ্ছেন না, একজন কৃষক কেন উৎপাদন বাড়িয়েও কাঙ্ক্ষিত আয় করছেন না—এসব প্রশ্নের উত্তর পেতে মাঠপর্যায়ের গবেষণা প্রয়োজন।
একইভাবে কর্মসংস্থান বাড়ছে শুনলেই আমরা সন্তুষ্ট হতে পারি না। প্রশ্ন করতে হবে, কী ধরনের কর্মসংস্থান তৈরি হচ্ছে। কাজটি কি উৎপাদনশীল? আয় কি পর্যাপ্ত? কাজটি কি নিরাপদ ও টেকসই? জাতীয় পরিসংখ্যানের সঙ্গে পরিবার ও প্রতিষ্ঠানভিত্তিক তথ্য যুক্ত করতে পারলে অর্থনীতির আরও বাস্তব চিত্র পাওয়া সম্ভব।
গবেষণার বিশ্বাসযোগ্যতার আরেকটি শর্ত হলো স্বাধীনতা। গবেষণার কাজ কোনো পূর্বনির্ধারিত সিদ্ধান্তকে সঠিক প্রমাণ করা নয়; বরং সে সিদ্ধান্ত সঠিক কি না, তা পরীক্ষা করা। গবেষককে এমন ফলাফল প্রকাশের স্বাধীনতা দিতে হবে, যা হয়তো প্রচলিত ধারণা বা কোনো নীতির সঙ্গে মেলে না। একই সঙ্গে গবেষণার পদ্ধতি, তথ্য, অনুমান ও সীমাবদ্ধতা প্রকাশ করা এবং গুরুত্বপূর্ণ গবেষণাকে স্বাধীনভাবে যাচাইয়ের সুযোগ রাখা দরকার।
এর পাশাপাশি আমাদের একটি বড় ঘাটতি পূরণ করতে হবে—নীতি বাস্তবায়নের পর তার ফলাফল মূল্যায়ন। কোনো কর-সুবিধা সত্যিই বিনিয়োগ বাড়িয়েছে কি না, কোনো ভর্তুকি উৎপাদনশীলতা বাড়িয়েছে কি না, কোনো প্রশিক্ষণ কর্মসূচি টেকসই কর্মসংস্থান তৈরি করেছে কি না—এসব প্রশ্নের উত্তর নিয়মিতভাবে খোঁজা দরকার। একটি নীতি ঘোষণা করেই সরকারের কাজ শেষ হয়ে যায় না; বরং তখনই শুরু হয় ফলাফল পরিমাপের কাজ।
ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি হওয়ার পথে বাধা কোথায়এখানে অর্থনীতির প্রাতিষ্ঠানিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতাকেও গবেষণার অংশ করতে হবে। অনেক সময় একটি নীতি কাগজে যথেষ্ট ভালো মনে হয়, কিন্তু বাস্তবায়নে গিয়ে প্রত্যাশিত ফল দেয় না। এর কারণ কি প্রশাসনিক সক্ষমতার ঘাটতি, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সমন্বয়ের অভাব, ভুল প্রণোদনা, নাকি প্রভাবশালী স্বার্থগোষ্ঠীর চাপ? এসব প্রশ্নের উত্তর শুধু অর্থনৈতিক মডেল দিয়ে পাওয়া সম্ভব নয়। অর্থনীতিকে বুঝতে হলে প্রতিষ্ঠান ও মানুষের আচরণকেও বুঝতে হবে।
গবেষক ও নীতিনির্ধারকদের মধ্যকার দূরত্বও কমানো প্রয়োজন। তবে এর অর্থ এই নয় যে গবেষকেরা নীতির পক্ষে বা বিপক্ষে অবস্থান নেবেন। বরং নীতিনির্ধারকদের উচিত বাস্তব সমস্যাগুলো গবেষকদের সামনে তুলে ধরা আর গবেষকদের কাজ হবে স্বাধীনভাবে প্রমাণের ভিত্তিতে তার উত্তর খোঁজা। বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণাপ্রতিষ্ঠান, সরকার এবং বেসরকারি খাত—সবার মধ্যে এই যোগাযোগ আরও শক্তিশালী হওয়া দরকার।
সবশেষে আমাদের তরুণ গবেষকদের প্রস্তুত করার পদ্ধতিও বদলাতে হবে। অর্থনীতির তাত্ত্বিক জ্ঞানের পাশাপাশি তথ্য বিশ্লেষণ, অর্থমিতি, প্রযুক্তি, জরিপ পদ্ধতি এবং নীতি মূল্যায়নের দক্ষতা এখন অপরিহার্য। তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো প্রশ্ন করার সাহস, প্রচলিত ধারণাকে সন্দেহ করার অভ্যাস এবং জটিল বিষয়কে সহজ ভাষায় বোঝানোর ক্ষমতা।
শেষ পর্যন্ত ভালো অর্থনৈতিক গবেষণার সাফল্য কত পৃষ্ঠার প্রতিবেদন তৈরি হলো বা কত জটিল মডেল ব্যবহার করা হলো, তার ওপর নির্ভর করে না। ভালো গবেষণা আমাদের কোনো সমস্যাকে আরও পরিষ্কারভাবে বুঝতে সাহায্য করে, প্রচলিত ধারণাকে যাচাই করে এবং সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে সম্ভাব্য ফলাফল সম্পর্কে সতর্ক করে।
মামুন রশীদ অর্থনীতি বিশ্লেষক