যৌন হয়রানি প্রতিরোধ ও সুরক্ষা: সমন্বিত আইনের প্রয়োজনীয়তা
· Prothom Alo
ইউএন উইমেনের সহযোগিতায় বাংলাদেশ লিগ্যাল এইড অ্যান্ড সার্ভিসেস ট্রাস্ট (ব্লাস্ট) ও প্রথম আলোর উদ্যোগে ‘যৌন হয়রানি প্রতিরোধ ও সুরক্ষা: সমন্বিত আইনের প্রয়োজনীয়তা’ শীর্ষক গোলটেবিল অনুষ্ঠিত হয় ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ঢাকার প্রথম আলো কার্যালয়ে।
ড. শাহনাজ হুদা
Visit tr-sport.click for more information.
অধ্যাপক, আইন বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
বছরের পর বছর একই কথা বলতে বলতে আমাদের মধ্যে একধরনের হতাশা তৈরি হয়েছে। মনে হয়, আমরা এক পা সামনে এগোই, আবার দুই পা পিছিয়ে যাই। এখনো হয়রানির শিকার নারীর পোশাক কেমন ছিল, কেন এমন পোশাক পরেছিলেন—এ ধরনের প্রশ্ন ওঠে। ইন্টারনেট ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কারণে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে। এসব বিষয়ে আমাদের কথা বলে যেতে হবে। নীতিনির্ধারক ও আইনপ্রণেতাদের কাছে আমাদের উদ্বেগগুলো পৌঁছে দিতে হবে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যৌন হয়রানি প্রতিরোধে কমিটি, অভিযোগের বাক্স ও ই-মেইলের ব্যবস্থা করা হয়েছে। কিন্তু শিক্ষার্থীরা এসব ব্যবস্থা সম্পর্কে জানেন কি না এবং অভিযোগ আসার পর সেগুলো কীভাবে ব্যবস্থাপনা করা হচ্ছে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। আবার ব্র্যাকের মতো কিছু প্রতিষ্ঠান যৌন হয়রানির অভিযোগ নীতিমালা অনুযায়ী নিয়মিতভাবে পরিচালনা করছে। তাদের অভিজ্ঞতা থেকেও শেখার সুযোগ আছে।
আমাদের একটি আইন প্রয়োজন—এ কথা ঠিক। তবে দেশে আইন কম নেই; সমস্যা অনেক ক্ষেত্রে কার্যকারিতার অভাব। বিদ্যমান দণ্ডবিধির ৫০৯ ধারায় পরিবর্তন আনার যে প্রস্তাব বাংলাদেশ আইন কমিশন দিয়েছে, নতুন আইনের সঙ্গে তার সমন্বয় জরুরি। অনেক আলোচনা করে যে আইন তৈরি হচ্ছে, শেষ পর্যন্ত সেটি আলোচনার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ না হলে তার সার্থকতা থাকবে না।
প্রতিষ্ঠানেরও দায়িত্ব নিশ্চিত করতে হবে। কোনো কর্মী যৌন হয়রানির শিকার হলে প্রতিষ্ঠান প্রতিরোধে ব্যবস্থা নিতে ব্যর্থ হলে ক্ষতিপূরণের মতো দেওয়ানি প্রতিকারের বিষয়টিও বিবেচনা করা যেতে পারে।
একই সঙ্গে বিদ্যমান আইন ও ব্যবস্থাগুলো বাস্তবে কতটা কার্যকর, তা খতিয়ে দেখা দরকার। পুলিশ অর্ডিন্যান্স বা মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে যৌন হয়রানির ঘটনায় কতজনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, সে বিষয়ে বাস্তবভিত্তিক অনুসন্ধান প্রয়োজন। পাশাপাশি অভিযোগ ও প্রতিকারের বিদ্যমান ব্যবস্থাগুলো সম্পর্কে মানুষকে জানাতে হবে।
ফওজিয়া করিম ফিরোজ
সিনিয়র আইনজীবী, বাংলাদেশের সুপ্রিম কোর্ট
বর্তমান ব্যবস্থায় যৌন হয়রানি প্রতিরোধ ও সুরক্ষার উদ্যোগগুলো যথেষ্ট নয়। কোথাও ব্যবস্থা আছে, কোথাও নেই; আবার থাকলেও সেটি কীভাবে কাজ করছে, তার নিশ্চয়তা নেই। তাই সব পক্ষের অংশগ্রহণে এ বিষয়ে সচেতনতা ও শিক্ষা বাড়ানো জরুরি।
যৌন হয়রানির বিরুদ্ধে লড়াই করতে গিয়ে আমরা দেখেছি, বিশ্ববিদ্যালয়ে মেয়েরা যৌন নির্যাতনের শিকার হতে পারেন—এ কথাও একসময় স্বীকার করতে অনেকে রাজি ছিলেন না। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি ঘটনায় মামলা হওয়ার পর বিষয়টি সামনে আসে। পরে আদালতের নির্দেশনার মাধ্যমে আমরা একটি আইনি কাঠামো পেয়েছি। কিন্তু ধীরে ধীরে বুঝেছি, শুধু আদালতের নির্দেশনা দিয়ে দীর্ঘ মেয়াদে আইনগত সুরক্ষা নিশ্চিত করা কঠিন।
আমরা আইন প্রণয়নের জন্য দীর্ঘদিন ধরে কাজ করছি। খসড়া তৈরি ও নানা পর্যায়ে আলোচনা হলেও শেষ পর্যন্ত তা আইন হিসেবে কার্যকর হয়নি। একই সঙ্গে যৌন হয়রানি প্রতিরোধ কমিটির কার্যক্রম নিয়েও প্রশ্ন আছে। কমিটি করলেই হবে না, সেটি কার্যকরভাবে কাজ করছে কি না, সেটিও দেখতে হবে।
তাই শুধু নতুন আইন করলেই হবে না; বিদ্যমান আইনগুলোর প্রয়োগ ও সমন্বয়ও জরুরি। আইন থাকলেও বিচারক, আইনজীবী ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মধ্যে আইন সম্পর্কে যথেষ্ট ধারণা না থাকলে তার সুফল পাওয়া যায় না। পারিবারিক সহিংসতা আইনের ক্ষেত্রেও আমরা দেখেছি, অন্তর্বর্তীকালীন সুরক্ষা আদেশ পেতে দীর্ঘ সময় লেগে যায়। অথচ আইনে এর দ্রুত ব্যবস্থার কথা রয়েছে।
আমাদের আইনের প্রতি সম্মান তৈরি করতে হবে এবং আইনের বিধানগুলো সঠিকভাবে প্রয়োগ করতে হবে। একই সঙ্গে সংসদে নারীর বিষয় নিয়ে আলোচনা বাড়াতে হবে। কারণ, শেষ পর্যন্ত আইন সেখানেই তৈরি হবে। সমাজ ও বিভিন্ন সংগঠন নীরব না থেকে তাদের নিয়মিতভাবে এসব বিষয়ে কথা বলতে হবে। আইন তৈরি, প্রয়োগ ও নজরদারি—সব ক্ষেত্রেই ধারাবাহিকভাবে আমাদের কাজ করতে হবে।
আয়েশা আক্তার
আইনজীবী, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট ও লিগ্যাল স্পেশালিস্ট, জেন্ডার জাস্টিস অ্যান্ড ওমেন এমপাওয়ারমেন্ট ক্লাস্টার, ব্লাস্ট
যৌন হয়রানি প্রতিরোধে বাংলাদেশে পূর্ণাঙ্গ কোনো আইন নেই। তা সত্ত্বেও আমাদের সংবিধান, দেশে বিদ্যমান বিভিন্ন আইন ও হাইকোর্ট প্রদত্ত নীতিমালা যৌন হয়রানি প্রতিরোধে কার্যকর ভূমিকা রাখছে।
আমাদের সংবিধানে সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ রয়েছে—প্রত্যেক নাগরিক আইনের দৃষ্টিতে সমান এবং আইনের সমান আশ্রয়লাভের অধিকারী হবেন। এ ছাড়া নারী, শিশু ও নাগরিকদের যেকোনো অনগ্রসর অংশের অগ্রগতির জন্য বিশেষ বিধান প্রণয়নের ক্ষমতা রাষ্ট্রের রয়েছে। একই সঙ্গে নাগরিকের জীবন, স্বাধীনতা, দেহ, সুনাম ও সম্পত্তির সুরক্ষার বিষয়টির উল্লেখও সংবিধানে রয়েছে। অর্থাৎ যৌন হয়রানি প্রতিরোধে ও এ ধরনের হয়রানির বিপরীতে নিরাপত্তা ও সুরক্ষা নিশ্চিতে রাষ্ট্রের একটি সাংবিধানিক দায়বদ্ধতা রয়েছে।
আমরা যদি ১৮৬০ সালের দণ্ডবিধি দেখি, সেখানেও একজন নারীকে অসম্মান করার উদ্দেশ্যে করা অশালীন মন্তব্য, অঙ্গভঙ্গি বা এ ধরনের অন্য যেকোনো আচরণের জন্য শাস্তির বিধান রয়েছে। এ ছাড়া ঢাকা, চট্টগ্রাম ও খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশ অধ্যাদেশ এবং রাজশাহী মহানগরী পুলিশ আইনেও রাস্তায় বা সর্বসাধারণের ব্যবহার্য প্রকাশ্য স্থানে ইচ্ছাকৃতভাবে করা অশালীন মন্তব্যের জন্য শাস্তির বিধান রয়েছে। একই সঙ্গে ২০২২ সালে সংশোধিত শ্রম বিধিমালা এবং ২০২৬ সালে সংশোধিত শ্রম আইনে কর্মক্ষেত্রে যৌন হয়রানির সংজ্ঞা, কর্মক্ষেত্রে বৈষম্য, সহিংসতা ও হয়রানি প্রতিরোধে অভিযোগ কমিটি গঠন, অভিযোগ বাক্স স্থাপন, যৌন হয়রানি প্রতিরোধে নীতিমালা তৈরির মতো বিষয়গুলো সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। উল্লেখ্য, বাংলাদেশ গত ২২ অক্টোবর ২০২৫ কর্মক্ষেত্রে সহিংসতা ও হয়রানি প্রতিরোধবিষয়ক সনদ ১৯০ অনুসমর্থন পত্রে স্বাক্ষর করেছে।
যৌন হয়রানি প্রতিরোধে বিদ্যমান আইনি সুরক্ষার অন্যতম মূল ভিত্তিই হচ্ছে ২০০৮ সালে যৌন হয়রানি প্রতিরোধে হাইকোর্টে দায়ের করা একটি জনস্বার্থ মামলার (রিট মামলা নং ৫৯১৬/২০০৮) পরিপ্রেক্ষিতে ২০০৯ সালে প্রাপ্ত সুস্পষ্ট নীতিমালা। এ মামলার রায়ে সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছিল যে যৌন সহিংসতা প্রতিরোধে যথাযথ একটি আইন প্রণয়ন না হওয়া পর্যন্ত সরকারি ও বেসরকারি উভয় ক্ষেত্রের সকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং কর্মস্থলে হাইকোর্ট প্রদত্ত এ নীতিমালা কঠোরভাবে অনুসরণ ও প্রতিপালন করতে হবে।
এ নীতিমালায় যৌন হয়রানির সুস্পষ্ট একটি সংজ্ঞা প্রদান করা হয়েছে। একই সঙ্গে যৌন হয়রানি প্রতিরোধে অভিযোগ কমিটি গঠন, এ কমিটিতে ন্যূনতম পাঁচজন সদস্যের মধ্যে সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্য নারী হবেন এবং প্রাপ্যতা সাপেক্ষে কমিটির প্রধান একজন নারী হবেন; একই সঙ্গে, নিরপেক্ষতা ও স্বচ্ছতা নিশ্চিতে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের বাইরে থেকে যৌন ও লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতা প্রতিরোধে কর্ম অভিজ্ঞতা রয়েছে এমন প্রতিষ্ঠান হতে অন্তত দুইজন সদস্য কমিটিতে অন্তর্ভুক্ত থাকবেন, মর্মে সুস্পষ্টভাবে নীতিমালায় উল্লেখ রয়েছে।
যৌন হয়রানি ও স্টকিং প্রতিরোধে ২০১০ সালে হাইকোর্টে দায়ের করা অপর একটি জনস্বার্থবিষয়ক মামলার (রিট মামলা নং ৮৭৬৯/২০১০) সুনির্দিষ্ট নীতিমালা–সংবলিত রায়ে ‘ইভ টিজিং’ শব্দটির পরিবর্তে আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থা, গণমাধ্যমসহ সকল ক্ষেত্রে ‘যৌন হয়রানি’ শব্দ ব্যবহারের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এ নীতিমালায় ‘যৌন হয়রানি’ ও ‘স্টকিং’-এর সুস্পষ্ট সংজ্ঞা প্রদান করা হয়েছে। একই সঙ্গে এ নীতিমালায় যৌন হয়রানি প্রতিরোধে প্রতিটি থানায় একটি সুনির্দিষ্ট ‘টিম’ বা ‘সেল’ থাকা, জেলা আইনশৃঙ্খলা কমিটি প্রতি মাসে অন্তত একবার সংবাদকর্মী এবং নারী ও শিশু অধিকারকর্মীদের উপস্থিতিতে সংশ্লিষ্ট জেলায় ঘটে যাওয়া যৌন হয়রানির ঘটনা, অপরাধীদের শাস্তি প্রদান এবং এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধে গৃহীত পদক্ষেপ বিষয়ে অবগত করার উদ্দেশ্যে ‘মিট দ্য পিপল’ সেশনের আয়োজন করা, ভুক্তভোগী এবং সাক্ষীদের কার্যকর সুরক্ষাব্যবস্থা নিশ্চিত করা, ভুক্তভোগীর মানসিক ট্রমা দূরীকরণে সরকারিভাবে কাউন্সেলিং সেবা নিশ্চিতের বিষয় সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে।
যৌন হয়রানি প্রতিরোধে এ আইনি সুরক্ষাসমূহ বিদ্যমান থাকা সত্ত্বেও হাইকোর্টের নীতিমালার সুষ্ঠু বাস্তবায়নের অভাবে অর্থাৎ নীতিমালা অনুযায়ী অভিযোগ কমিটি গঠন না করা, অভিযোগ বাক্স স্থাপন না করা, নিয়মিত মনিটরিং না করা, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের জবাবদিহির অভাব, হাইকোর্টের নীতিমালা প্রতিপালনের বিষয়টি বাধ্যতামূলক হিসেবে গণ্য না করে ঐচ্ছিক বিষয় হিসেবে দেখা—এসবই যৌন হয়রানি প্রতিরোধে প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি করছে।
বিগত ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৩ তারিখে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের বেগম ফজিলাতুন্নেসা মুজিব হলের বিবাহিত এবং অন্তঃসত্ত্বা শিক্ষার্থীদের হল ছাড়ার নির্দেশ প্রদান করে ওই হলের প্রভোস্ট কর্তৃক জারি করা নোটিশে সংক্ষুব্ধ হয়ে এবং একই সঙ্গে দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক হলে বসবাসরত নারী শিক্ষার্থীদের জন্য প্রযোজ্য লিঙ্গবৈষম্যমূলক বিধিবিধান ও চর্চাকে চ্যালেঞ্জ করে ব্লাস্ট, বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ, বাংলাদেশ উইমেন হেলথ কোয়ালিশন, আইন ও সালিশ কেন্দ্র, নারীপক্ষ, সেরাক বাংলাদেশ এবং ব্র্যাকের যৌথ উদ্যোগে ২০২৩ সালের অক্টোবর মাসে মহামান্য হাইকোর্টে একটি জনস্বার্থবিষয়ক মামলা (রিট মামলা নং ১৩৪৭৮/২০২৩) দায়ের করা হয়। গত ৩০ অক্টোবর ২০২৩ তারিখ মহামান্য হাইকোর্ট এ মামলার প্রাথমিক শুনানি অন্তে রুল জারির পাশাপাশি, দেশের সকল সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক হলে নারী-পুরুষনির্বিশেষে সকল শিক্ষার্থীদের লিঙ্গ, বৈবাহিক অবস্থা ও স্বাস্থ্যগত অবস্থাবিষয়ক প্রচলিত/বিদ্যমান বৈষম্যমূলক সকল বিধিবিধান দূর করে সকল শিক্ষার্থীদের জন্য আইনের সমতা এবং শিক্ষার ক্ষেত্রে সমান সুযোগ ও বৈষম্যহীনতা নিশ্চিতের লক্ষ্যে একটি লিঙ্গ-অন্তর্ভুক্তিমূলক নীতিমালা প্রণয়নের নির্দেশনা প্রদান করেন। মামলাটি বর্তমানে শুনানির জন্য অপেক্ষমাণ রয়েছে। অতিসম্প্রতি এ মামলার শুনানিকালে, বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক হলে নারী শিক্ষার্থীদের জন্য প্রযোজ্য লিঙ্গবৈষম্যমূলক সান্ধ্য আইনের বিধানটিও আদালতের নজরে নিয়ে আসা হয়।
মূলত দেশের প্রতিটি নাগরিকের নিরাপত্তা ও সুরক্ষা নিশ্চিতে সাংবিধানিক দায়বদ্ধতা পূরণ এবং নিরাপদ কর্মসংস্থান ও শিক্ষার পরিবেশ নিশ্চিতের মধ্য দিয়ে রাষ্ট্রের প্রতিটি ক্ষেত্রে নারীর সমান অংশগ্রহণ, প্রতিনিধিত্ব এবং পূর্ণ ক্ষমতায়ন নিশ্চিতে কর্মক্ষেত্র ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যৌন হয়রানি প্রতিরোধে পূর্ণাঙ্গ একটি আইন প্রণয়ন বর্তমানে সময়ের দাবি।
সামিনা লুৎফা
অধ্যাপক, সমাজবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
নতুন আইনের প্রয়োজনীয়তা আমরা সবাই বুঝতে পারছি। এখন আমাদের হাতে মূলত হাইকোর্টের নির্দেশনা ছাড়া সমন্বিত কোনো কাঠামো নেই। তবে সরকার বা সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো চাইলে বিদ্যমান ব্যবস্থার মধ্যেও কিছু কাজ করা সম্ভব। যেমন, ইউজিসির নির্দেশনার ফলে সব পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে যৌন নিপীড়নবিরোধী কমিটি গঠন করা হয়েছে। কিন্তু কমিটি গঠন করলেই যে কাজ শেষ, তা নয়। অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ে কমিটি আছে, কিন্তু কমিটিগুলো কার্যকরভাবে কাজ করছে কি না, তা দেখার কোনো ব্যবস্থা নেই।
হাইকোর্টের নির্দেশনায় সচেতনতা তৈরির ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল। কোন আচরণ যৌন হয়রানি, কোথায় অভিযোগ করতে হবে—এসব বিষয়ে শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের জানানো দরকার। কিন্তু অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ে ওয়েবসাইট, নোটিশ বোর্ড বা অন্য কোনো মাধ্যমে অভিযোগের প্রক্রিয়া সম্পর্কে স্পষ্ট তথ্যই নেই। এমন অভিজ্ঞতাও হয়েছে যে যৌন হয়রানিবিরোধী কমিটির সদস্যরাই যৌন হয়রানির সংজ্ঞা সম্পর্কে পরিষ্কার নন।
এর সঙ্গে নতুন করে যুক্ত হয়েছে প্রযুক্তিনির্ভর জেন্ডারভিত্তিক সহিংসতা। কিন্তু এসব ঘটনা মোকাবিলায় প্রয়োজনীয় প্রযুক্তিগত ও অন্যান্য সহায়তা অনেক প্রতিষ্ঠানেরই নেই। সবচেয়ে শিক্ষিত মানুষদের প্রতিষ্ঠানেও যখন সচেতনতা, আলোচনা ও সম্পদের ঘাটতি থাকে, তখন শ্রমজীবী নারীদের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি আরও কঠিন—এটা সহজেই বোঝা যায়।
তাই একটি সমন্বিত আইনের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে কোনো দ্বিমত থাকার সুযোগ নেই। তবে আইন প্রণয়নের পাশাপাশি এর জন্য কার সঙ্গে কথা বলব, কার কাছে দাবি জানাব, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। বিভিন্ন শ্রেণি-পেশা ও কর্মক্ষেত্রে নারীদের অধিকার নিয়ে যাঁরা কাজ করছেন, তাঁদের সবাইকে এক জায়গায় আসতে হবে।
শুধু আইন দিয়ে সবকিছু সমাধান করা সম্ভব নয়। প্রতিষ্ঠানের জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয়, শিল্পপ্রতিষ্ঠান বা যেকোনো প্রতিষ্ঠান—সংশ্লিষ্ট নেতৃত্বকে এ বিষয়ে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হতে হবে। সমাজের বিভিন্ন বিভাজন পেরিয়ে আমাদের একসঙ্গে কাজ করতে হবে।
সুমাইয়া ইসলাম
নির্বাহী পরিচালক, নারী শ্রমিক কেন্দ্র
সংস্কার কমিশনের সঙ্গে কাজ করতে গিয়ে আমরা বিভিন্ন শ্রেণি ও পেশার নারীদের সঙ্গে কথা বলেছি। মৎস্যজীবী নারী, যৌনকর্মী, বিদেশফেরত নারী শ্রমিক থেকে শুরু করে পোশাক, নির্মাণ ও অন্যান্য খাতের শ্রমিক—প্রায় সবাই কোনো না কোনোভাবে যৌন হয়রানির শিকার হওয়ার অভিজ্ঞতা জানিয়েছেন।
বিশেষ করে অনানুষ্ঠানিক খাতের নারীরা অর্থনীতি ও পরিবারে বড় অবদান রাখলেও হয়রানির শিকার হলে তাঁদের সুরক্ষার জন্য কার্যকর আইন বা পরিপত্র নেই। গৃহশ্রমিকদের আইনগত কাভারেজের বাইরে থাকার বিষয়টিও বড় সমস্যা।
আমরা বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে যৌন হয়রানি প্রতিরোধ কমিটি করেছি, বহিরাগত সদস্য রেখেছি এবং কিছুদিন নিয়মিত তদারকিও করেছি। কিন্তু কয়েক মাস পরই তা থেমে গেছে। কারণ, প্রতিষ্ঠানগুলোর নিজস্ব দায়িত্বের ওপর ছেড়ে দিলে বিষয়টি এগোয় না। আমাদের অভিজ্ঞতা হলো, কমিটি গঠন করলেই হবে না; নিয়মিত মনিটরিং ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে।
তাই এমন একটি আইন দরকার, যা বাস্তবায়নে সবাই বাধ্য থাকবে। এটি কোনো প্রতিষ্ঠানের একক দায়িত্বের বিষয় হবে না; রাষ্ট্রের দায়িত্ব হবে আইনটি বাস্তবায়ন করা এবং সব শ্রেণির নারীকে সুরক্ষা দেওয়া। বিশেষ করে অনানুষ্ঠানিক খাতের শ্রমিকদের আইনের আওতায় আনতে সমন্বিত আইন জরুরি।
আমরা সংস্কার কমিশনে বিভিন্ন খাতের নারীদের সঙ্গে কথা বলেছি। তাঁদের অভিজ্ঞতায় স্পষ্ট, হয়রানির বিচার ও প্রতিকার পাওয়ার সুযোগ খুবই সীমিত। প্রত্যেক নারী হয়রানি থেকে মুক্তি চান। এটি শুধু নারীর বিষয় নয়; সমাজের জন্যও জরুরি।
এখনো সামনে এগোনোর সুযোগ আছে। তবে এ জন্য সম্মিলিত প্রচেষ্টা দরকার। আমরা এককভাবে যতই চেষ্টা করি, খুব বেশি দূর এগোনো সম্ভব নয়। সংস্কার কমিশনের যেসব সুপারিশ বাস্তবায়িত হয়নি, সেগুলো বাস্তবায়নের জন্য আমরা সংশ্লিষ্ট সবার সঙ্গে কাজ করে যাচ্ছি।
শ্রবণা দত্ত
প্রোগ্রাম ম্যানেজার, ইউএন উইমেন বাংলাদেশ
ইউএন উইমেন মূলত জেন্ডার সমতা ও নারীর ক্ষমতায়নে কাজ করে। যৌন হয়রানি প্রতিরোধে আমরা নীতি, সক্ষমতা বৃদ্ধি, প্রতিষ্ঠানকে জবাবদিহির আওতায় আনা ও নেতৃত্বের মালিকানার ওপর গুরুত্ব দিয়ে থাকি। ২০১৮ সাল থেকে বিভিন্ন অংশীজনের সঙ্গে কাজ করতে গিয়ে আমাদের অভিজ্ঞতা হয়েছে, যৌন হয়রানি প্রতিরোধে নীতিগত কাঠামোর পাশাপাশি এর কার্যকর বাস্তবায়নও জরুরি।
বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে যৌন হয়রানি প্রতিরোধে হাইকোর্টের নির্দেশনা গুরুত্বপূর্ণ। শুধু কমপ্লেইন কমিটি থাকলেই হবে না, এর কার্যকারিতা বজায় রাখা জরুরি। ১৫–২০ বছর আগের নির্দেশনা দিয়ে বর্তমানের পরিবর্তিত চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করাও কঠিন। কিছু সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভালো উদ্যোগ আছে। কোথাও কমিটিকে আলাদা সেলে রূপান্তর করে বাজেট ও কার্যক্রম দেওয়া হয়েছে। তবে এ ক্ষেত্রে কোনো অভিন্ন মানদণ্ড নেই।
আমাদের একটি সমন্বিত আইন প্রয়োজন। বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক অঙ্গনে যৌন হয়রানি প্রতিরোধে বিভিন্ন অঙ্গীকার করেছে। সেই অঙ্গীকারের জায়গা থেকেও একটি পূর্ণাঙ্গ আইন প্রয়োজন। তবে নতুন আইন প্রণয়নের প্রক্রিয়ার পাশাপাশি বিদ্যমান হাইকোর্টের নির্দেশনাগুলোর কঠোর বাস্তবায়নও নিশ্চিত করতে হবে। শুধু আইন বা নীতি করলেই হবে না, প্রতিষ্ঠানকে তা বাস্তবায়নের জন্য জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে।
আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ সাইবার সহিংসতা। এর অনেকটাই অনলাইনে শুরু হলেও এর প্রকাশ ঘটে অফলাইনেও। ডিজিটাল ফরেনসিক প্রমাণ বিশ্লেষণের মতো প্রযুক্তিগত সক্ষমতাও এখনো পর্যাপ্ত নয়। বিশ্ববিদ্যালয়, কর্মক্ষেত্র বা অন্য কোনো প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ কমিটি তদন্ত কার্যক্রম পরিচালনের জন্য বিশেষায়িত কারিগরি সহায়তার ব্যবস্থা থাকতে হবে।
কমিটি গঠন থেকে শুরু করে তদন্ত ও প্রতিকার—পুরো প্রক্রিয়াটিকে প্রাতিষ্ঠানিক করতে হবে। ব্যক্তি উদ্যোগের ওপর এটি নির্ভর করলে দীর্ঘ মেয়াদে টেকসই হবে না। তাই সমন্বিত আইন, বিদ্যমান নির্দেশনার বাস্তবায়ন, প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহি এবং প্রয়োজনীয় কারিগরি সক্ষমতা—সবকিছুকে একসঙ্গে দেখতে হবে।
ড. তাসলিমা ইয়াসমীন
সহযোগী অধ্যাপক, আইন বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে বিচারকসহ বিচারপ্রক্রিয়ায় নিয়োজিত ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে সংবেদনশীলতার বিষয়টি বিবেচনা করা গুরুত্বপূর্ণ। যৌন হয়রানি প্রতিরোধে ভালো আইন করলেই হবে না, যাঁরা সেই আইন প্রয়োগ করবেন, তাঁদের জেন্ডার সংবেদনশীলতাও নিশ্চিত করতে হবে।
যৌন হয়রানি প্রতিরোধে একটি আলাদা আইনের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে ২০১৮ সাল থেকে আমরা কাজ করছি। বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও সংগঠনের মতামত নিয়ে একটি খসড়া তৈরি হয়েছিল। সেই খসড়ায় অনানুষ্ঠানিক খাতকে অন্তর্ভুক্ত করার চেষ্টা ছিল। কিন্তু এখন সেই খসড়াটি কোথায় আছে, তার কোনো স্পষ্ট ধারণা আমাদের নেই। তাই এত দিনের কাজকে আবার সমন্বিতভাবে এগিয়ে নেওয়া দরকার।
আমরা শুরু থেকেই বলে আসছি, আইনি কাঠামোয় দুটি বিষয় একসঙ্গে থাকতে হবে। একটি হলো প্রতিষ্ঠানের দায়বদ্ধতা—প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে অভিযোগ জানানোর ব্যবস্থা থাকবে এবং কমিটি গঠন না করলে প্রতিষ্ঠানের জবাবদিহি ও সাজার বিধান থাকবে। অন্যটি হলো ফৌজদারি আইনের সংস্কার। কারণ, বর্তমান ফৌজদারি আইনের কিছু ধারা যৌন হয়রানির বর্তমান বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
নতুন আইন হলেও বিদ্যমান হাইকোর্টের নির্দেশনা বাস্তবায়ন বন্ধ রাখা যাবে না। ২০০৯ সালের রায়ে প্রতিষ্ঠানগুলোকে অভিযোগ গ্রহণ ও নিষ্পত্তির ব্যবস্থা করার কথা বলা হয়েছে, কিন্তু এর কার্যকর প্রয়োগের ব্যবস্থা সীমিত। এমনকি অনেক শিক্ষার্থী জানেন না, যৌন হয়রানি প্রতিরোধ কমিটির সদস্য কারা বা কীভাবে অভিযোগ করতে হয়।
কারিশমা জাহান
আইনজীবী, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট
যৌন হয়রানি প্রতিরোধে হাইকোর্টের নির্দেশনা আছে। সেখানে যৌন হয়রানির একটি আধুনিক সংজ্ঞা দেওয়া হয়েছে এবং প্রতিষ্ঠানগুলো কীভাবে বিষয়টি মোকাবিলা করবে, তার নির্দেশনা রয়েছে। কিন্তু বড় সমস্যা হলো, এসব ব্যবস্থায় ফৌজদারি অপরাধের বিষয়টি স্পষ্ট নয়। ফলে যৌন হয়রানির শিকার কেউ প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে প্রতিকার না পেলে ফৌজদারি আইনের আওতায় যাওয়ার সুযোগ খুবই সীমিত।
আমাদের বিভিন্ন আইনে যৌন হয়রানির কিছু সংজ্ঞা আছে। নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে যৌন নিপীড়নের ক্ষেত্রে শারীরিক সংস্পর্শের বিষয়টি আসে। আবার প্রচলিত ফৌজদারি আইনে ‘আউটরেজিং মডেস্টি’ বা শালীনতাহানির মতো পুরোনো ধারণা রয়েছে। কিন্তু যৌন হয়রানির আধুনিক বাস্তবতা—ক্ষমতার অপব্যবহার, ভয় দেখানো, অঙ্গভঙ্গি কিংবা অন্যান্য আচরণ—এসবের সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। সাইবার পরিসরেও একই সমস্যা রয়েছে। তাই আমাদের দুটি জায়গায় একসঙ্গে সংস্কার দরকার। একটি হলো প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা ও দায়বদ্ধতা; অন্যটি হলো ফৌজদারি আইনে পরিবর্তন এনে যৌন হয়রানিকে শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে স্পষ্টভাবে অন্তর্ভুক্ত করা। শুধু আইন বা কমিটি থাকলেই হবে না, আইন ভঙ্গ করলে কী পরিণতি হবে, সেটিও স্পষ্ট থাকতে হবে। হাইকোর্টের নির্দেশনা বা প্রস্তাবিত আইনেও কার্যকর স্যাংশনের ঘাটতি রয়েছে।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো অনানুষ্ঠানিক খাত। গৃহশ্রমিকসহ এসব খাতের নারীদের প্রাতিষ্ঠানিক সুরক্ষা নেই। প্রস্তাবিত খসড়ায় অনানুষ্ঠানিক খাতকে অন্তর্ভুক্ত করার উদ্যোগ ছিল। তাই আমাদের এখন সমন্বিতভাবে সেই উদ্যোগ আবার এগিয়ে নিতে হবে।
আশরাফুন নাহার মিষ্টি
প্রতিষ্ঠাতা ও নির্বাহী পরিচালক, উইমেন উইথ ডিজঅ্যাবিলিটিজ ডেভেলপমেন্ট ফাউন্ডেশন
আমরা এমন একটি বাংলাদেশ দেখতে চাই, যেখানে নারীর প্রতি কোনো সহিংসতা বা নির্যাতন থাকবে না। সেই লক্ষ্যেই আইন প্রণয়নের কথা বলি। বিদ্যমান আইনগুলো কতটা সময়োপযোগী, সেটিও ভাবতে হবে। অনেক আইন ১৫ থেকে ৪০ বছর ধরে পর্যালোচনা হয়নি। মেট্রোপলিটন অধ্যাদেশে যৌন হয়রানির মতো অপরাধের শাস্তি এখনো সর্বোচ্চ দুই হাজার টাকা জরিমানা। এ ধরনের শাস্তি অপরাধ প্রতিরোধে কতটা কার্যকর, সেটি প্রশ্নের বিষয়।
হাইকোর্টের নির্দেশনায় প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে যৌন হয়রানি প্রতিরোধ ও সুরক্ষার জন্য কমিটি থাকার কথা। কিন্তু বাস্তবে কতটি প্রতিষ্ঠানে এসব কমিটি আছে? সচেতন কিছু প্রতিষ্ঠানে কমিটি থাকলেও অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানে এর বাস্তবায়ন ও নজরদারি নেই। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, গণপরিবহন—কোথাও নারীর নিরাপত্তা নিশ্চিত নয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও যৌন হয়রানি বাড়ছে। সাইবার নিরাপত্তার আইন থাকলেও তার যথাযথ প্রয়োগ হচ্ছে না।
তাই যৌন হয়রানি প্রতিরোধে আমাদের একটি সমন্বিত আইন প্রয়োজন। আইন না হওয়া পর্যন্ত শুধু হাইকোর্টের নির্দেশনা ও বিভিন্ন অধ্যাদেশ দিয়ে কার্যকর সুরক্ষা নিশ্চিত করা কঠিন। একই সঙ্গে বিদ্যমান আইনি কাঠামো যথাযথভাবে প্রয়োগ হচ্ছে কি না, সেটিও দেখতে হবে এবং প্রয়োগ না হলে প্রতিকার পাওয়ার পথ নিশ্চিত করতে হবে। আইন প্রণয়নের আগে আইনপ্রণেতাদের এ বিষয়ে গভীরভাবে ভাবতে হবে ও সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলতে হবে। আমরা বেসরকারি প্রতিষ্ঠান হিসেবে এ বিষয়ে চাপ তৈরি করছি। যৌন হয়রানি বাড়ছে, তাই আরও জোরালোভাবে কাজ করতে হবে। প্রায় দুই যুগের পুরোনো হাইকোর্টের নির্দেশনাটিও পর্যালোচনা করা দরকার।
হেমা চাকমা
কার্যনির্বাহী সদস্য, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু)
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে মেয়েদের হলে রাত ১০টার পর প্রবেশের বিধিনিষেধ নিয়ে আমরা প্রায় এক মাস আন্দোলন করেছি। ২০২৬ সালে এসেও নারী শিক্ষার্থীদের জন্য এমন বৈষম্যমূলক নিয়ম নিয়ে কথা বলতে হচ্ছে—এটা দুঃখজনক।
আমার কাছে আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো ডিজিটাল হয়রানি। একজন সংসদ সদস্যকে প্রকাশ্যে ধর্ষণের হুমকি দেওয়া হলেও এরপর আইনি পদক্ষেপ হয়েছে কি না, তা আমরা জানি না।
একজন আইনপ্রণেতার ক্ষেত্রেই যদি এমন হয়, তাহলে সাধারণ শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিয়ে আমাদের উদ্বেগ আরও বাড়ে। বাংলাদেশে আইন থাকলেও তার কার্যকর প্রয়োগ খুব কম দেখা যায়। মামলা হলেও পরবর্তী সময়ে কীভাবে এগোতে হবে, সে বিষয়ে আমাদের ধারণাও সীমিত।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যৌন হয়রানির অভিযোগের ক্ষেত্রেও একই সমস্যা। প্রক্টরের কাছে অভিযোগ করার পর তদন্ত কমিটি হয়, কিন্তু তার ফলাফল বা অনুসরণের কোনো ব্যবস্থা আমরা দেখি না। কোথাও অভিযোগ বাক্স রাখা হয়েছে, কিন্তু সেগুলো খোলা হয় কি না বা অভিযোগের ভিত্তিতে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, সে বিষয়ে কোনো প্রতিবেদন নেই। ক্ষমতার অপব্যবহার করে শিক্ষক-শিক্ষার্থীর সম্পর্কেও হয়রানির ঘটনা ঘটে, অথচ সেগুলোও যথাযথভাবে সামনে আসে না।
সবচেয়ে বড় বিষয়, অভিযোগকারীকে আবার ভুক্তভোগী করা হয় এবং তাঁর পরিচয় গোপন থাকে না।
তাই স্বাধীন ও নিরপেক্ষ অভিযোগব্যবস্থার পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের প্রশিক্ষণ ও কর্মশালা প্রয়োজন, যাতে হয়রানির শিকার হলে তারা পরবর্তী পদক্ষেপ সম্পর্কে জানতে পারে। সর্বোপরি, সবার সুরক্ষা নিশ্চিত করতে একটি কার্যকর সমন্বিত আইন অত্যন্ত জরুরি।
মাহবুবা আক্তার
পরিচালক (অ্যাডভোকেসি ও কমিউনিকেশন), ব্লাস্ট
দীর্ঘদিন ধরে আমরা যৌন হয়রানি প্রতিরোধ ও সুরক্ষায় একটি পূর্ণাঙ্গ আইন দাবি করে আসছি । ২০০৯ সালের হাইকোর্টের রায়ের প্রায় দুই যুগ পেরিয়ে গেলেও আমরা কাঙ্ক্ষিত আইনটি পাইনি। বিগত সময়ে এ বিষয়ে কাজ হয়েছে। একটি খসড়া অধ্যাদেশও আমরা পেয়েছিলাম। নারী সংস্কার কমিশনের সুপারিশেও বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে।
আমাদের সুপারিশ ছিল, হাইকোর্টের রায়টি যেন পূর্ণাঙ্গভাবে অনুসরণ করা হয়। কিন্তু বাস্তবে অনেক প্রতিষ্ঠানে অভিযোগ কমিটি গঠিত হলেও তার কার্যকারিতা ও প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহি নেই। অভিযোগ কীভাবে গ্রহণ ও নিষ্পত্তি হচ্ছে, তারও কার্যকর তদারকির ব্যবস্থা আমরা দেখি না। হাইকোর্টের নির্দেশনা অনুযায়ী কমিটিতে প্রতিষ্ঠানের বাইরের দুজন সদস্য থাকার কথা থাকলেও অনেক ক্ষেত্রে তা কার্যকরভাবে হচ্ছে না।
তাই এমন একটি আইন প্রয়োজন, যাতে কর্মক্ষেত্র ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসহ সংশ্লিষ্ট সব জায়গায় প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহি ও তদারকি নিশ্চিত হয়। অভিযোগকারীরা যাতে নির্ভয়ে ন্যায়বিচার পান, তা নিশ্চিত করা জরুরি। সরকারের পক্ষ থেকে আইন প্রণয়নের উদ্যোগের কথা আমরা জেনেছি। তবে আইন চূড়ান্ত করার আগে সংশ্লিষ্ট ও অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের সঙ্গে পরামর্শ করা প্রয়োজন।
অংশগ্রহণকারীঃ
শাহনাজ হুদা
অধ্যাপক, আইন বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
ফওজিয়া করিম ফিরোজ
সিনিয়র আইনজীবী, বাংলাদেশের সুপ্রিম কোর্ট
আয়েশা আক্তার
আইনজীবী, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট ও লিগ্যাল স্পেশালিস্ট, জেন্ডার জাস্টিস অ্যান্ড ওমেন এমপাওয়ারমেন্ট ক্লাস্টার, ব্লাস্ট
সামিনা লুৎফা
অধ্যাপক, সমাজবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
সুমাইয়া ইসলাম
নির্বাহী পরিচালক, নারী শ্রমিক কেন্দ্র
শ্রবণা দত্ত
প্রোগ্রাম ম্যানেজার, ইউএন উইমেন বাংলাদেশ
তাসলিমা ইয়াসমীন
সহযোগী অধ্যাপক, আইন বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
কারিশমা জাহান
আইনজীবী, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট
আশরাফুন নাহার মিষ্টি
প্রতিষ্ঠাতা ও নির্বাহী পরিচালক, উইমেন উইথ ডিজঅ্যাবিলিটিজ ডেভেলপমেন্ট ফাউন্ডেশন
হেমা চাকমা
কার্যনির্বাহী সদস্য, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু)
মাহবুবা আক্তার
পরিচালক (অ্যাডভোকেসি ও কমিউনিকেশন), ব্লাস্ট
সঞ্চালনা:
ফিরোজ চৌধুরী
সহকারী সম্পাদক, প্রথম আলো