ফাহমিদার ডায়েরিতে এখন শুধুই সুখের গল্প
· Prothom Alo

মেয়ে স্কুল থেকে আসার সময় বলল, রিকশায় ফিরবে। কিন্তু আমার কাছে ১০ টাকাও নেই। বাচ্চা ছেলে বলে, কলা খাবে। মেয়েকে বললাম, টাকা নেই। ছেলেকে সামনে থেকে কিনে দেব বলে বাসায় নিয়ে এলাম। মনটা খারাপ হয়ে গেল। আল্লাহ, কেন আমাদের এত কষ্ট দিচ্ছেন!
Visit moryak.biz for more information.
২০১৪ সালের ২৫ জুন ডায়েরিতে জীবনের এ তিক্ত অভিজ্ঞতা লিখে রাখেন সিলেটের ফাহমিদা জান্নাত (হেপী)। এক যুগ পর ২০২৬ সালের ২৬ জুন ফাহমিদা তাঁর ফেসবুক স্ট্যাটাসে লেখেন, ‘প্রতিটি কষ্ট, প্রতিটি ব্যস্ততা আর প্রতিটি ছোট সফলতা আমাকে আরও শক্ত হতে শেখায়। নিজের কাজকে ভালোবাসুন। সততা আর পরিশ্রমকে সঙ্গী করুন। ইনশা আল্লাহ, সফলতা একদিন দরজায় কড়া নাড়বেই।’
সফলতা কড়া নেড়েছে ফাহমিদার দরজায়ও। তিনি এখন স্বাবলম্বী। তিনি বলেন, ‘ধৈর্য, সততা আর পরিশ্রমী ছিলাম বলেই টিকতে পেরেছি। নইলে কবেই খড়কুটোর মতো ভেসে যেতাম!’
ফাহমিদার জীবনকাহিনি ‘সিনেমার গল্পকেও হার মানায়’ বলে মন্তব্য করেন সিলেট উইমেন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি লুবানা ইয়াসমিন। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, হঠাৎ দুই সন্তান রেখে ফাহমিদাকে ছেড়ে স্বামী চলে যান। অবিরাম পরিশ্রম আর একাগ্রতায় অবশেষে সফল হন। সফল এই নারী উদ্যোক্তার সংগ্রামমুখর জীবন এখন অন্যদের অনুপ্রেরণা।
ফেলে আসা জীবনের গল্প
সিলেট নগরের মীরাবাজারের একটি বাসার দোতলায় ভাড়া থাকেন ফাহমিদা। গত ৯ জুন সন্ধ্যায় ওই বাসায় বসেই কথা হয় তাঁর সঙ্গে। কথা বলার এক পর্যায়ে ফাহমিদা এ প্রতিবেদকের সামনে মেলে ধরেন কয়েকটি ডায়েরি। এসব ডায়েরির পৃষ্ঠায় পৃষ্ঠায় তিনি লিখে রেখেছেন ফেলে আসা জীবনের গল্প।
ডায়েরিগুলো এ প্রতিবেদককে পড়ার অনুমতি দেন ফাহমিদা। ডায়েরি-পাঠ আর তাঁর সঙ্গে আলাপচারিতায় জানা যায়, ফাহমিদাকে শত যন্ত্রণা, অর্থকষ্ট, পারিবারিক টানাপোড়েন আর কঠিন সংগ্রামের মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে। কীভাবে সফল হলেন, তা-ও আছে তাঁর ডায়েরিতে।
ফাহমিদার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, তাঁর বাড়ি সিলেটের বিয়ানীবাজারে। সিলেট নগরের দরগাগেটের উচ্চশিক্ষিত ও বনেদি পরিবারে তাঁর বিয়ে হয়। বর ব্যাংক কর্মকর্তা, শহরে বাসাবাড়ি আছে—এ কারণে তাঁর পরিবারের সদস্যরা উচ্চমাধ্যমিক উত্তীর্ণ মেয়েকে ২০০৭ সালে বিয়ে দেন। প্রথম আড়াই বছর স্বামীর সংসারে তাঁর ভালোই কাটে। হঠাৎ শ্বশুরবাড়ির লোকজন দুর্ব্যবহার শুরু করেন। একপর্যায়ে স্বামীও খারাপ আচরণ শুরু করেন।
২০১৪ সালের ২৫ জুন ডায়েরিতে জীবনের এ তিক্ত অভিজ্ঞতা লিখে রাখেন ফাহমিদা জান্নাতফাহমিদা বলেন, বিয়ের পর তৃতীয় বছরে তাঁর গর্ভে প্রথম সন্তান আসে। শ্বশুরবাড়ির পরামর্শে জন্মের পর মেয়েকে নিয়ে হাসপাতাল থেকে সরাসরি বাবার বাড়ি চলে যান। দিনের পর দিন বাবার বাড়িতে থাকলেও স্বামী তাঁকে শ্বশুরবাড়িতে আনতে গড়িমসি করেন। দেবর, ননদরাও তাঁকে আসতে নিষেধ করেন। এভাবে ছয় মাস কেটে যায়। একদিন জোর করেই শিশুসন্তানকে নিয়ে শ্বশুরবাড়ি চলে আসেন। এ সময় তাঁর ঠাঁই হয় শ্বশুরবাড়ির নির্মাণাধীন পৃথক ঘরে। প্রতিনিয়ত তাঁকে হেনস্তা করতে শুরু করেন শ্বশুরবাড়ির লোকজন। একসময় দ্বিতীয় সন্তানের জন্ম হয়। দ্বিতীয় সন্তান ছেলে হলেও স্বামীর মনে পরিবর্তন আসেনি; বরং তিনি চাকরি ছেড়ে দিয়ে ঋণে জর্জরিত হয়ে পড়েন। বাবার বাড়ি ও আত্মীয়স্বজনের কাছ থেকে ছয়-সাত লাখ টাকা এনে ঋণ কিছুটা শোধ করেন। ঋণ পরিশোধ করতে তখন বাবার বাড়ি ও শ্বশুরবাড়ি থেকে পাওয়া অন্তত ১৪ ভরি স্বর্ণালংকারও বিক্রি করেন। ২০১৪ সালের আগস্টে স্বামী চাকরি করবেন জানিয়ে সিলেট ছেড়ে ঢাকায় চলে যান। শুরুর দিকে কিছুদিন যোগাযোগ ছিল। পরে স্বামী যোগাযোগ বন্ধ করে দেন। একপর্যায়ে দেবর, ননদেরা মানসিক নির্যাতন বাড়িয়ে দেন। তাঁকে স্বামীর সংসার ছেড়ে বাবার বাড়িতে চলে যেতে তাঁরা চাপ দিতে থাকেন।
সে সময়ের বর্ণনা ফাহমিদা ডায়েরিতে এভাবেই লিখেছেন, ‘ছেলে দুধের জন্য খুব কাঁদে। হাতে কিন্তু একটা টাকাও নেই।’ আরেক দিনের ঘটনা তিনি ডায়েরিতে লিখেছেন এভাবে, ‘আজ প্রথম রোজা। কোনো বাজার করতে পারিনি। আমার কপালটাই খারাপ। কী করব?’
২০১৬ সালের ২৫ নভেম্বর ফাহমিদা ডায়েরিতে লিখেছেন, ‘আজ মনটা খুব খারাপ। হাতে একটা টাকাও নেই। ছেলেটা মাছ-মাংস খাবে, খুব বায়না করছে। মেয়েও তাই। কী করব। একা একা খুব কাঁদছি।’
রান্না করা খাবার হাতে ফাহমিদা জান্নাতযেভাবে এল সুখ
ফাহমিদা বলেন, ‘স্কুলে পড়ার সময়েই সেলাই ও ব্লক বাটিকের কাজ শিখেছি। ২০১৭ সালেই সেটাই কাজে লাগালাম। মেয়েকে স্কুলে দিতাম আর অন্য অভিভাবকদের সেলাইয়ের নানা কাজ এনে বাসায় বসে করে দিতাম। এভাবেই উপার্জন শুরু। ধীরে ধীরে পাড়া-প্রতিবেশীসহ অনেকের পোশাক টাকার বিনিময়ে সেলাই করা শুরু করি। একসময় ভাই-বোনদের কাছ থেকে অর্থসহায়তা এনে থ্রি-পিস ব্যবসা এবং সেসব সেলাইও শুরু করি। তখন শ্বশুরবাড়ির লোকজন তাঁকে ‘সেলাই আপা’সহ নানা অভিধায় কটূক্তি করতেন। তাঁকে দমাতে না পেরে অন্য পথ ধরেন শ্বশুরবাড়ির লোকজন। শ্বশুরবাড়ি থেকে চলে যাওয়ার জন্য হুমকিধমকির পাশাপাশি পানি ও গ্যাস–সংযোগ লাইন বিচ্ছিন্ন করে দেওয়াসহ ‘স্বামীর পাওনাদার’ সাজিয়ে রাতবিরাতে একদল ব্যক্তিদের দিয়ে প্রায়ই জ্বালাতন ও উত্ত্যক্ত করার ঘটনা ঘটাতেন তাঁরা। এ সময় তাঁর স্বামীর বিরুদ্ধে ‘চেক জালিয়াতি মামলা’র অভিযোগ এনে পুলিশও নিয়মিত বাসায় আসতে থাকে। এতে বাচ্চারা ভয় পেত। সারাক্ষণ ভয় ও ভীতিকর পরিবেশে থাকায় মেয়ে ও ছেলের মানসিক রোগ দেখা দিতে থাকে। তিনি নিজেও ২০১৯ সালে ব্রেন স্ট্রোক করেন। পরে ২০২১ সালে তিনি নগরের মীরাবাজারে বাসা ভাড়া নেন। ওই এলাকার একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সন্তানদের ভর্তি করিয়ে শুরু করেন নতুন জীবন।
ভাড়া বাসায় এসে ফাহমিদা ব্যবসার পরিসর বাড়ান। অনলাইনে ‘হেপীস কিচেন’ নামে একটা পেজ আর ইউটিউব চ্যানেল চালু করে সরবরাহ করতে থাকেন ঘরে তৈরি নানা স্বাস্থ্যকর ও মজাদার খাবার। আখনি, ভাত-তরকারি, বিরিয়ানি, পিঠা, কেকসহ অর্ধশতাধিক খাবার রান্না করে বিক্রি করতে থাকেন। স্বাস্থ্যসম্মত খাবার সরবরাহ করায় দিন দিন সুনাম বাড়ে। এখন তো তিনি নিয়মিতই বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও অনুষ্ঠানে খাবার সরবরাহ করেন।
অনলাইন পেজ থেকে খাবার সরবরাহের শুরুর দিকে প্রায় দুই বছর ফাহমিদা একটি জনপ্রিয় অনলাইনভিত্তিক খাবার এবং মুদিপণ্য সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানে মাসিক ১০ হাজার টাকার বিনিময়ে প্রতিদিন রান্না করা খাবার সরবরাহ করেছেন। চাহিদা অনুযায়ী তিনি ওই অনলাইন খাবার সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানটির জন্য খাবার প্রস্তুত করে দিতেন। পরে তাঁর নিজের অনলাইন পেজটি জনপ্রিয়তা পেলে তিনি সে কাজ ছেড়ে দেন। এখন তাঁর প্রতিষ্ঠানটি সুপরিচিত।
‘বিশেষ করে ২০১৪ সাল থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত খাবারের অভাবে যে অসহনীয় কষ্ট সহ্য করেছেন, তা বাবার বাড়ির লোকজনদের লজ্জায় জানাননি ফাহমিদা। ফাহমিদা বলেন, ‘সে সময়টাতে মেয়েকে হেঁটে হেঁটে স্কুলে নিয়ে যেতাম। মেয়ে রিকশায় উঠার বায়না ধরত, তাকে রিকশায় চড়াতে পারতাম না। ছেলে চকলেট চাইত, তা-ও দিতে পারতাম না। মাসের পর মাস গিয়েছে মাছ বা মাংস কিনতে পারিনি। আমি এক অসহায় মা ছিলাম। যাক, শেষ পর্যন্ত আল্লাহ মুখ তুলে তাকিয়েছে।’
২০১৬ সালের ২৫ নভেম্বর ফাহমিদা তাঁর ডায়েরিতে এসব কথা লিখে রাখেনএসেছে সচ্ছলতা, মনে আনন্দ
ফাহমিদা ২০২৪ সালে পেয়েছেন এন্টারপ্রেনিউর অ্যান্ড ই-কমার্স প্ল্যাটফর্ম সম্মাননা স্মারক। সন্তানেরা পড়াশোনায়ও ভালো করছে। তাঁর মেয়ে এবার মাধ্যমিক পরীক্ষায় ‘এ’ গ্রেড পেয়ে পাস করেছে, ছেলে পড়ছে অষ্টম শ্রেণিতে।
ফাহমিদা ‘হেপীস কিচেন’ প্রতিষ্ঠানের জন্য মাসিক তিন হাজার টাকায় একজন সাহায্যকারী নিয়োগ দিয়েছেন। এ ছাড়া পাঁচজন অস্থায়ী ডেলিভারি ম্যানও (তাঁদের নির্ধারিত কোনো বেতন নেই, তাঁরা কাজের ভিত্তিতে বেতন পান) কাজ করছেন। এখন যে টাকা আয় হয়, তা দিয়ে ঘরভাড়া, সংসারের খরচ, সন্তানদের পড়াশোনাসহ যাবতীয় চাহিদা মেটানোর পরও মাসে পাঁচ হাজার টাকার বেশি তাঁর হাতে থাকে।
ফাহমিদা এখন তাঁর ডায়েরিতে আনন্দের কথা লেখেন, সুখের গল্প লেখেন। এখন তাঁর একটাই কথা, আর পেছন ফিরে তাকাতে চাই না। এখন কেবল লক্ষ্য সামনে এগিয়ে চলা।