সরকার বদলেছে, রাষ্ট্র কি বদলেছে?
· Prothom Alo
বাংলাদেশে আমরা সরকার পরিবর্তনকে প্রায়ই নতুন যুগের সূচনা হিসেবে দেখি। ক্ষমতা বদলায়, মন্ত্রিসভা বদলায়, নতুন প্রতিশ্রুতি আসে, নতুন স্লোগান তৈরি হয়। কিন্তু একটি প্রশ্ন আমরা খুব কমই করি: সরকার বদলেছে, রাষ্ট্র কি বদলেছে?
প্রশ্নটি শুনতে সহজ, কিন্তু এর উত্তরই হয়তো বাংলাদেশের আগামী দিনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ও সামাজিক বাস্তবতা নির্ধারণ করবে।
Visit mchezo.life for more information.
কারণ, সরকার পরিবর্তন আর রাষ্ট্র পরিবর্তন এক বিষয় নয়। সরকার বদলাতে পারে একটি নির্বাচনের মধ্য দিয়ে। কিন্তু রাষ্ট্র বদলায় তখনই, যখন তার প্রতিষ্ঠানগুলো বদলায়, যখন আইন সবার জন্য সমানভাবে কার্যকর হয়, যখন প্রশাসন নাগরিকের সেবা করে, যখন পুলিশ রাজনৈতিক ক্ষমতার পরিবর্তে আইনের কাছে জবাবদিহি করে, যখন বিচারব্যবস্থা স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারে এবং যখন একজন সাধারণ নাগরিক রাষ্ট্রের কাছে ন্যায়বিচার পেতে নিজের পরিচয়, রাজনৈতিক সম্পর্ক কিংবা অর্থনৈতিক সামর্থ্যের ওপর নির্ভর করতে হয় না।
২০২৪ সালের জুলাইয়ের আন্দোলন বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে শুধু একটি সরকারের পতনের ঘটনা ছিল না। এটি রাষ্ট্র পরিচালনার পদ্ধতি নিয়ে মানুষের গভীর অসন্তোষ এবং পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষাকে সামনে নিয়ে এসেছিল। সেই আকাঙ্ক্ষা থেকেই নির্বাচনব্যবস্থা, সাংবিধানিক কাঠামো, ক্ষমতার ভারসাম্য, বিচারব্যবস্থা, পুলিশ, প্রশাসন ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান সংস্কারের প্রশ্ন সামনে এসেছে।
২০২৬ সালের নির্বাচনের মাধ্যমে দেশে নতুন সরকার এসেছে। এখন তাই প্রশ্নটি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। কারণ, একটি সরকার পরিবর্তনের পর মানুষের প্রত্যাশা শুধু নতুন মুখ দেখার নয়, তারা দেখতে চায় রাষ্ট্রের আচরণ বদলেছে কি না।
একটি সরকারকে কয়েক মাসে রাষ্ট্র বদলে দেওয়ার হিসাব দেওয়া অন্যায় হতে পারে, কিন্তু রাষ্ট্র বদলের দিকটি কোন দিকে যাচ্ছে, সেই প্রশ্ন করতে কয়েক বছর অপেক্ষা করার প্রয়োজন নেই।
নতুন সরকার পাওয়া গেছে, কিন্তু নতুন রাষ্ট্র পাওয়ার পরীক্ষা এখনো শেষ হয়নি।
একজন সাধারণ নাগরিকের রাষ্ট্রের সঙ্গে সবচেয়ে বেশি যোগাযোগ হয় সংসদে নয়, স্থানীয় পর্যায়ে। ভূমি, পুলিশ, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, কৃষি, স্থানীয় সরকার, সামাজিক নিরাপত্তা, কর, ব্যবসা, বিদ্যুৎ, পানি, পরিবহন, জন্মনিবন্ধন, বিচার, প্রতিটি জায়গায় রাষ্ট্রকে নাগরিকের কাছে দৃশ্যমান হতে হয়।
সংস্কার শব্দটি আজ বাংলাদেশের রাজনৈতিক অভিধানে সবচেয়ে বেশি উচ্চারিত শব্দগুলোর একটি। কিন্তু সংস্কার মানে শুধু সংবিধানের কয়েকটি ধারা পরিবর্তন করা নয়। শুধু নির্বাচনব্যবস্থা পরিবর্তন করাও নয়। এমনকি ক্ষমতার চেয়ার বদলানোও সংস্কার নয়।
প্রকৃত সংস্কার হলো এমন একটি রাষ্ট্রব্যবস্থা তৈরি করা, যেখানে কোনো ব্যক্তি, পরিবার, দল বা সরকার রাষ্ট্রের ওপর এমন কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে না পারে যে রাষ্ট্র ধীরে ধীরে তার নাগরিকদের পরিবর্তে ক্ষমতাবানদের সেবা করতে শুরু করে।
এ কারণেই বাংলাদেশের সংস্কার নিয়ে আলোচনা শুধু রাজনৈতিক কাঠামোর মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা যাবে না। নির্বাচন ও সংবিধান গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু তার সঙ্গে সমান গুরুত্ব দিয়ে ভাবতে হবে প্রশাসন, বিচারব্যবস্থা, পুলিশ, অর্থনীতি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, স্থানীয় সরকার এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যকারিতা নিয়ে।
আমাদের এখন তাই প্রশ্নটি আরও বড় করে দেখতে হবে।
বাংলাদেশের সমস্যা কি শুধু কে ক্ষমতায় থাকবে, নাকি ক্ষমতা কীভাবে ব্যবহার করা হবে?
একজন নাগরিকের কাছে গণতন্ত্রের মূল্য কতটা, যদি তাকে একটি সাধারণ সরকারি সেবা পেতে বছরের পর বছর দৌড়াতে হয়? একজন তরুণের কাছে স্বাধীনতার অর্থ কী, যদি বিশ্ববিদ্যালয় শেষ করার পর তার সামনে যোগ্যতার ভিত্তিতে কাজের সুযোগ না থাকে? একজন উদ্যোক্তার কাছে অর্থনৈতিক স্বাধীনতা কতটা অর্থবহ, যদি নিয়মের চেয়ে রাজনৈতিক পরিচয় ও প্রভাব বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে?
রাষ্ট্রের প্রকৃত শক্তি তার সরকারের শক্তিতে নয়, তার প্রতিষ্ঠানগুলোর শক্তিতে।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এমন অনেক কাজ এখন কয়েক সেকেন্ডে করতে পারে, যেগুলো একসময় একজন শিক্ষিত মানুষের বিশেষ দক্ষতা হিসেবে বিবেচিত হতো। এআইয়ের যুগে মুখস্থনির্ভর শিক্ষা, তাই শুধু পুরোনো নয়, ক্রমেই অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়ছে।
একটি সরকার পাঁচ বছর ক্ষমতায় থাকতে পারে। কিন্তু একটি শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান কয়েক প্রজন্ম ধরে একটি দেশকে এগিয়ে নিতে পারে। সরকার বদলাবে, মন্ত্রী বদলাবে, সংসদ বদলাবে। কিন্তু নির্বাচন কমিশন, বিচারব্যবস্থা, প্রশাসন, পুলিশ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ব্যাংকিং ব্যবস্থা এবং স্থানীয় সরকার যদি শক্তিশালী ও জবাবদিহিমূলক থাকে, তাহলে রাষ্ট্র তার ধারাবাহিকতা হারাবে না।
বাংলাদেশের সামনে আজ সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জগুলোর একটি হলো এই প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা তৈরি করা।
আমরা অনেক সময় উন্নয়নকে শুধু বড় রাস্তা, সেতু, ভবন কিংবা জিডিপির প্রবৃদ্ধি দিয়ে বিচার করি। কিন্তু উন্নয়নের আরও গভীর একটি অর্থ আছে। একজন নাগরিক কত দ্রুত সরকারি সেবা পাচ্ছেন, একজন রোগী কতটা নিরাপদ চিকিৎসা পাচ্ছেন, একজন কৃষক তার উৎপাদনের ন্যায্য মূল্য পাচ্ছেন কি না, একজন ব্যবসায়ী নিয়ম মেনে ব্যবসা করতে পারছেন কি না, একজন তরুণ তার যোগ্যতার ভিত্তিতে কাজ পাচ্ছেন কি না, এগুলোও রাষ্ট্রের উন্নয়নের মাপকাঠি।
অর্থনীতির ক্ষেত্রেও একই সত্য।
বাংলাদেশের অর্থনীতিকে স্থিতিশীল করা জরুরি। কিন্তু অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা শুধু মূল্যস্ফীতি কমানো কিংবা বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বাড়ানোর নাম নয়। একটি অর্থনীতি তখনই শক্তিশালী হয়, যখন মানুষ বিশ্বাস করে যে আগামীকালও নিয়ম একই থাকবে, বিনিয়োগের নিরাপত্তা থাকবে, ব্যাংকিং ব্যবস্থা রাজনৈতিক প্রভাব থেকে মুক্ত থাকবে এবং উদ্যোক্তার সাফল্য তার পরিচিতির চেয়ে তার যোগ্যতা ও উদ্যোগের ওপর নির্ভর করবে।
বিদেশি বিনিয়োগকারীরাও শেষ পর্যন্ত শুধু সস্তা শ্রম বা বড় বাজার খোঁজেন না। তারা খোঁজেন আইনের শাসন, পূর্বানুমানযোগ্য নীতি, দক্ষ মানবসম্পদ, কার্যকর প্রতিষ্ঠান এবং দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা। বাংলাদেশ যদি সত্যিই বড় অর্থনৈতিক শক্তি হতে চায়, তাহলে শুধু বিনিয়োগের আহ্বান জানালেই হবে না, বিনিয়োগের জন্য প্রয়োজনীয় আস্থার পরিবেশও তৈরি করতে হবে।
এখানে এসে আমাদের সবচেয়ে বড় সম্পদের কথা বলতে হয়: মানুষ।
বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সম্পদ মাটির নিচে নয়, মানুষের মাথার ভেতরে। কিন্তু সেই সম্পদকে কাজে লাগাতে না পারলে বিপুল জনসংখ্যা অর্থনৈতিক শক্তি না হয়ে একসময় হতাশার উৎস হয়ে উঠতে পারে।
বিশেষ করে তরুণ প্রজন্ম বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সম্ভাবনা। কিন্তু সম্ভাবনা নিজে নিজে সম্পদে পরিণত হয় না। তার জন্য প্রয়োজন মানসম্মত শিক্ষা, দক্ষতা, প্রযুক্তি, গবেষণা, সৃজনশীলতা এবং কাজের সুযোগ।
এখানেই আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার দিকে নতুন করে তাকাতে হবে।
আমরা এখনো এমন একটি শিক্ষাকাঠামোর মধ্যে আটকে আছি যেখানে পরীক্ষায় ভালো নম্বর পাওয়া অনেক সময় জ্ঞান অর্জনের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়ায়। মুখস্থ করে উত্তর দেওয়া, পরীক্ষায় ভালো ফল করা এবং সার্টিফিকেট অর্জনকে আমরা শিক্ষার সাফল্যের প্রধান মাপকাঠি বানিয়েছি।
কিন্তু পৃথিবী বদলে গেছে।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এমন অনেক কাজ এখন কয়েক সেকেন্ডে করতে পারে, যেগুলো একসময় একজন শিক্ষিত মানুষের বিশেষ দক্ষতা হিসেবে বিবেচিত হতো। এআইয়ের যুগে মুখস্থনির্ভর শিক্ষা, তাই শুধু পুরোনো নয়, ক্রমেই অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়ছে। ভবিষ্যতের শিক্ষায় বিশ্লেষণ, যুক্তি, সমস্যা সমাধান, সৃজনশীলতা এবং মানুষের নিজস্ব বিচারবোধকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।
এটি শুধু শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের বিষয় নয়। এটি বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রের প্রশ্ন।
আমরা যদি আগামী দশকের জন্যও এমন তরুণ তৈরি করি, যারা পরীক্ষার প্রশ্নের উত্তর দিতে পারে কিন্তু বাস্তব সমস্যার সমাধান করতে পারে না, তাহলে আমাদের সবচেয়ে বড় জনসম্পদই একসময় সবচেয়ে বড় হতাশায় পরিণত হতে পারে।
এআইকে ভয় পাওয়ারও কোনো কারণ নেই। বরং সঠিকভাবে ব্যবহার করতে পারলে এআই বাংলাদেশের সীমাবদ্ধতা অতিক্রম করার একটি বড় সুযোগ হতে পারে। কৃষি, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা, সরকারি সেবা, গবেষণা, শিল্প এবং ছোট ব্যবসা, প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই প্রযুক্তি উৎপাদনশীলতা বাড়াতে পারে।
কিন্তু প্রযুক্তি হাতে তুলে দিলেই মানুষ দক্ষ হয়ে যায় না। প্রযুক্তির সঙ্গে চিন্তার স্বাধীনতা, যুক্তিবোধ, সৃজনশীলতা এবং সমস্যা সমাধানের ক্ষমতাও তৈরি করতে হয়।
তাই বাংলাদেশের পরবর্তী বড় সংস্কার হওয়া উচিত মানবসম্পদ সংস্কার।
দূর পরবাসে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: [email protected]
আমাদের স্কুলে শিশুকে শুধু জিজ্ঞেস করা উচিত নয়, ‘সঠিক উত্তরটি কী?’ বরং তাকে জিজ্ঞাসা করতে হবে, ‘তুমি কীভাবে ভাবলে?’
বিশ্ববিদ্যালয়ে শুধু ডিগ্রি নয়, গবেষণা, উদ্ভাবন, উদ্যোক্তা হওয়ার সুযোগ এবং বাস্তব কাজের সঙ্গে শিক্ষার সম্পর্ক তৈরি করতে হবে। কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষাকে দ্বিতীয় শ্রেণির শিক্ষা হিসেবে দেখার মানসিকতা বদলাতে হবে।
একই সঙ্গে প্রশাসনিক সংস্কারও অপরিহার্য।
একজন সাধারণ নাগরিকের রাষ্ট্রের সঙ্গে সবচেয়ে বেশি যোগাযোগ হয় সংসদে নয়, স্থানীয় পর্যায়ে। ভূমি, পুলিশ, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, কৃষি, স্থানীয় সরকার, সামাজিক নিরাপত্তা, কর, ব্যবসা, বিদ্যুৎ, পানি, পরিবহন, জন্মনিবন্ধন, বিচার, প্রতিটি জায়গায় রাষ্ট্রকে নাগরিকের কাছে দৃশ্যমান হতে হয়।
‘নতুন বাংলাদেশ’ তাই এমন একটি বাংলাদেশ হওয়া উচিত, যেখানে রাষ্ট্রকে ভয় পাওয়ার পরিবর্তে মানুষ রাষ্ট্রের ওপর আস্থা রাখবে।
রাজনৈতিক সংস্কৃতিতেও আমাদের মৌলিক পরিবর্তন প্রয়োজন।
নির্বাচনে জয়ী হওয়া মানে রাষ্ট্রের মালিকানা পাওয়া নয়। বিরোধী দলে থাকা মানে রাষ্ট্রের শত্রু হওয়াও নয়। গণতন্ত্রের সৌন্দর্য হলো, আজ যে ক্ষমতায় আছে কাল সে বিরোধী দলে যেতে পারে, আর আজ যে বিরোধী দলে আছে কাল সে সরকার গঠন করতে পারে।
এই সত্যটি রাজনৈতিক দলগুলো যত দ্রুত গ্রহণ করবে, বাংলাদেশের গণতন্ত্র তত দ্রুত পরিণত হবে।
কারণ রাষ্ট্র কোনো দলের সম্পত্তি নয়। রাষ্ট্র তার নাগরিকদের।
এই জায়গাটিই হয়তো আমাদের রাজনৈতিক সংস্কারের সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষা।
একটি সরকার যদি পুরোনো রাষ্ট্রীয় সংস্কৃতিকে শুধু নতুন মুখ দিয়ে চালিয়ে যায়, তাহলে ক্ষমতার পরিবর্তন হবে, কিন্তু রাষ্ট্রের পরিবর্তন হবে না। আর যদি নতুন সরকার সত্যিই প্রতিষ্ঠানকে ব্যক্তির ওপরে এবং আইনকে ক্ষমতার ওপরে স্থান দিতে পারে, তাহলেই পরিবর্তনের অর্থ তৈরি হবে।
আইন পরিবর্তন করলেই প্রতিষ্ঠান বদলায় না। একটি ভালো আইনও যদি বাস্তবায়নের সক্ষমতা না থাকে, তবে সেটি কাগজে সুন্দর থেকে যায়। প্রতিষ্ঠানকে শক্তিশালী করতে হলে প্রয়োজন দক্ষ মানুষ, স্বচ্ছ নিয়োগ, জবাবদিহি, রাজনৈতিক নিরপেক্ষতা এবং সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন একটি নতুন প্রশাসনিক সংস্কৃতি।
বাংলাদেশের সাম্প্রতিক অভিজ্ঞতা আমাদের একটি শিক্ষা দিয়েছে: সংস্কারের ঘোষণা করা তুলনামূলকভাবে সহজ, কিন্তু তা বাস্তবে কার্যকর করা অনেক কঠিন।
তাই বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নির্ধারিত হবে শুধু কে ক্ষমতায় আছে, তা দিয়ে নয়, ক্ষমতায় থাকা ব্যক্তি বা দল রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে কতটা স্বাধীনভাবে কাজ করতে দেয়, তা দিয়ে।
আমাদের সামনে এখন দুটি পথ।
একটি পথ হলো পুরোনো রাজনৈতিক সংস্কৃতিকে নতুন নামে চালিয়ে যাওয়া। সরকার বদলাবে, মুখ বদলাবে, স্লোগান বদলাবে, কিন্তু রাষ্ট্রের ভেতরের পুরোনো সংস্কৃতি থেকে যাবে।
অন্য পথটি কঠিন, কিন্তু সেটিই বাংলাদেশের জন্য প্রয়োজনীয়। সেটি হলো প্রতিষ্ঠানকে ব্যক্তির ওপরে, আইনকে ক্ষমতার ওপরে এবং নাগরিককে রাষ্ট্রের কেন্দ্রবিন্দুতে স্থাপন করা।
আমাদের এখন আর শুধু প্রশ্ন করা উচিত নয়, ‘কে দেশ চালাবে?’
আমাদের প্রশ্ন হওয়া উচিত, ‘দেশ কীভাবে চলবে?’
কারণ, একজন ভালো নেতা একটি দেশকে কিছু দূর এগিয়ে নিতে পারেন। কিন্তু একটি ভালো রাষ্ট্র তার নাগরিকদের প্রজন্মের পর প্রজন্ম এগিয়ে নিতে পারে।
১৯৭১ সালে আমরা একটি স্বাধীন দেশের স্বপ্ন দেখেছিলাম। ২০২৪ সালে মানুষ রাষ্ট্রকে নতুন করে ভাবার একটি ঐতিহাসিক সুযোগ তৈরি করেছিল। ২০২৬ সালে সেই পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা বাস্তব রাষ্ট্র পরিচালনার পরীক্ষার মুখোমুখি।
এখন আর শুধু প্রতিশ্রুতির সময় নয়। এখন ফল দেখানোর সময়।
আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত এমন একটি বাংলাদেশ, যেখানে সরকার পরিবর্তন হবে, কিন্তু রাষ্ট্র ভেঙে পড়বে না; যেখানে রাজনৈতিক মতভেদ থাকবে, কিন্তু প্রতিষ্ঠান ধ্বংস হবে না; যেখানে ক্ষমতা থাকবে, কিন্তু ক্ষমতার জবাবদিহিও থাকবে; যেখানে তরুণের ভবিষ্যৎ কোনো রাজনৈতিক পরিচয়ের ওপর নির্ভর করবে না; যেখানে শিক্ষা শুধু চাকরি খোঁজার জন্য নয়, মানুষ তৈরি করার জন্য হবে; এবং যেখানে বাংলাদেশ শুধু প্রযুক্তি ব্যবহার করবে না, প্রযুক্তি ও জ্ঞান তৈরির সক্ষমতাও অর্জন করবে।
শেষ পর্যন্ত ইতিহাস কোনো সরকারকে শুধু তার শাসনকাল দিয়ে বিচার করে না। ইতিহাস বিচার করে একটি সময়ের মানুষ রাষ্ট্রকে কতটা শক্তিশালী করে রেখে গেছে।
তাই আজকের বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন সম্ভবত এটিই:
আমরা কি শুধু একটি নতুন সরকার পেয়েছি, নাকি সত্যিই একটি নতুন রাষ্ট্র গড়ার পথে হাঁটছি?
এই প্রশ্নের উত্তরই ঠিক করবে, আগামী প্রজন্ম আমাদের কীভাবে মনে রাখবে।
*লেখক: রহমান মৃধা, সাবেক পরিচালক, ফাইজার, সুইডেন