প্রতিটি উদ্ভিদের মধ্যেই আছে বিশ্বজগৎ

· Prothom Alo

পৃথিবীর ক্ষুদ্রতম অণু-পরমাণুর সঙ্গে বিশাল বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের এক অদ্ভুত মিল রয়েছে। জীব হোক বা জড়বস্তু, পৃথিবীর সবকিছুই অণু দিয়ে তৈরি। অণুর ভেতরে থাকে পরমাণু, আর পরমাণুর কেন্দ্রে থাকে নিউক্লিয়াস। এই নিউক্লিয়াসকে কেন্দ্র করে নির্দিষ্ট কক্ষপথে ঘুরতে থাকে ইলেকট্রন। সৌরজগতের দিকে তাকালে আমরা যেন এরই এক বিশাল প্রতিচ্ছবি দেখতে পাই। সেখানে সূর্যকে কেন্দ্র করে ঘুরছে গ্রহ, আবার গ্রহকে কেন্দ্র করে ঘুরছে উপগ্রহ। এ ছাড়া মহাকাশে ছড়িয়ে আছে নানা রকমের গ্রহাণু ও ধূলিকণা। আমাদের সৌরজগতের মতো মহাবিশ্বে যে কত সৌরজগৎ আছে, তার কোনো নির্দিষ্ট হিসাব নেই। আমাদের মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সিতেই রয়েছে হাজার কোটির বেশি নক্ষত্র ও সৌরজগৎ।

Visit asg-reflektory.pl for more information.

আর মহাবিশ্বে এমন ছায়াপথের সংখ্যাও শতকোটির বেশি। প্রতিটি জীবের দেহগঠনের ক্ষেত্রেও একই রকম নকশা দেখা যায়। জীবের দেহগঠনের একক হলো কোষ, যেগুলো দেখতে অনেকটা অণুর মতোই। প্রতিটি কোষের ভেতর রয়েছে নিউক্লিয়াস। তাকে ঘিরে কোষের ভেতর চলছে বিশাল এক কর্মযজ্ঞ। অণুবীক্ষণ যন্ত্রের নিচে একটি সাধারণ গাছকে পর্যবেক্ষণ করলেও এর ভেতর এক অচেনা, অদেখা ও বিস্ময়কর জগতের সন্ধান পাওয়া যায়। ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র এসব জগৎ নিয়ে ভাবলে রীতিমতো অবাক হতে হয়। মনে হয়, প্রতিটি গাছের মধ্যেই যেন লুকিয়ে আছে বিশাল এক বিশ্বজগৎ!

উদ্ভিদ কি চিন্তা করতে পারে?
জীবের দেহগঠনের একক হলো কোষ, যেগুলো দেখতে অনেকটা অণুর মতোই। প্রতিটি কোষের ভেতর রয়েছে নিউক্লিয়াস। তাকে ঘিরে কোষের ভেতর চলছে বিশাল এক কর্মযজ্ঞ।

পৃথিবীর প্রতিটি উদ্ভিদ আলাদা বৈশিষ্ট্যের হলেও এদের মৌলিক গঠন প্রায় অভিন্ন। তবে অনেক সময় একই প্রজাতি ও গোত্রের হওয়ার পরও ভিন্ন ভিন্ন উদ্ভিদে আলাদা আচরণ ও প্রতিক্রিয়া লক্ষ করা যায়। এত দিন এসব সূক্ষ্ম বিষয় নিয়ে গবেষকেরা খুব একটা না ভাবলেও বর্তমানে আধুনিক গবেষণায় অভিনব সব তথ্য উঠে আসছে। পৃথিবীতে কোনো উদ্ভিদই আসলে একা নয়। একটি উদ্ভিদের চারপাশে যেমন নানা জীবজন্তু ও প্রাকৃতিক পরিবেশ থাকে, তেমনি এর দেহের ভেতরেও থাকে এক বিস্ময়কর অদেখা ভুবন। এই অদেখা ভুবনে বাস করে অসংখ্য অণুজীব বা মাইক্রোব।

এসব অণুজীবের উপস্থিতি বা অনুপস্থিতির ওপর নির্ভর করে উদ্ভিদের সাড়া দেওয়ার ধরন বদলে যায়। বিজ্ঞানীরা উদ্ভিদের ভেতরের এই সক্রিয় আন্তক্রিয়ামূলক জগতের নাম দিয়েছেন মাইক্রোবায়োম। শুধু উদ্ভিদের নয়, মানুষসহ পৃথিবীর প্রতিটি জীবেরই নিজস্ব মাইক্রোবায়োম রয়েছে। এমনকি জড়বস্তুর চারপাশেও নানা ধরনের অণুজীব থাকে। স্যাঁতসেঁতে পাথরের ওপর জন্মানো শেওলা বা ভেতরে থাকা জলকণাতেও প্রাণের অস্তিত্ব থাকতে পারে। প্রতিটি উদ্ভিদের এই নিজস্ব মাইক্রোবায়োম নানা অজানা ও অনাবিষ্কৃত রহস্যে ঘেরা। বিশ্বের অনেক বিজ্ঞানী এখন এই রহস্য অনুসন্ধানে কাজ করছেন।

বাংলাদেশের চার নতুন উদ্ভিদ
এসব অণুজীবের উপস্থিতি বা অনুপস্থিতির ওপর নির্ভর করে উদ্ভিদের সাড়া দেওয়ার ধরন বদলে যায়। বিজ্ঞানীরা উদ্ভিদের ভেতরের এই সক্রিয় আন্তক্রিয়ামূলক জগতের নাম দিয়েছেন মাইক্রোবায়োম।

যুক্তরাষ্ট্রের অরেগন অঙ্গরাজ্যের করভ্যালিস শহরে উদ্ভিদ গবেষক পোসি বাসবি একটি বাগানে কাজ করতেন। সেখানে প্রায় তিন হাজার ব্ল্যাক কটনউড গাছ লাগানো হয়েছিল। এর বৈজ্ঞানিক নাম পপুলাস বালসামিফেরা সাবস্পিসিস ট্রাইকোকার্পা (Populus balsamifera subsp. trichocarpa)। এটি উত্তর-পশ্চিম আমেরিকার স্থানীয় একটি বিশাল, দ্রুত বর্ধনশীল ও পাতাঝরা বৃক্ষ। হৃৎপিণ্ড আকৃতির পাতা, সুগন্ধি আঠালো কুঁড়ি এবং বাতাসের সাহায্যে ভেসে চলা তুলোর মতো বীজগুচ্ছ দেখে গাছটিকে সহজেই চেনা যায়।

বসন্তের শেষে এর ফল ফেটে সাদা তুলতুলে আবরণে ঢাকা ক্ষুদ্র বীজ বাতাসে বহুদূর পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ে। গাছগুলো সাধারণত ৬০ থেকে ১০০ ফুট লম্বা এবং কাণ্ডের ব্যাস প্রায় ৬ ফুট পর্যন্ত হয়। নদীর পাড়, ঝরনার আশপাশ বা উপত্যকার আর্দ্র ও ভেজা মাটিতে এগুলো ভালো জন্মে। এ ছাড়া অনেক বন্য প্রাণীর খাদ্য ও আশ্রয়স্থল এই গাছ। পাখিরাও বাসা বাঁধার জন্য এর উঁচু ডালপালা ব্যবহার করে। গবেষক বাসবি মূলত এই ব্ল্যাক কটনউড গাছের ভেতরের মাইক্রোবায়োম বা অণুজীবদের সূক্ষ্ম জগৎটি পর্যবেক্ষণ করতে চেয়েছিলেন।

ওরেগনের করভালিসে একটি ব্ল্যাক কটনউড গবেষক পোজি বাসবি

পরীক্ষা করে বাসবি দেখলেন, এই তিন হাজার গাছ প্রায় এক হাজার ভিন্ন ভিন্ন জিনগত বৈশিষ্ট্যের প্রতিনিধিত্ব করছে। ক্যালিফোর্নিয়া থেকে কানাডা পর্যন্ত উত্তর আমেরিকার পশ্চিম উপকূলের বিভিন্ন স্থান থেকে এগুলো সংগ্রহ করা হয়েছিল। ব্ল্যাক কটনউড বিশ্বের অন্যতম দ্রুত বর্ধনশীল গাছ। বাগানটি দেখতে অনেকটা বাণিজ্যিক কাঠ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের বনায়ন এলাকার মতো ছিল। তবে অরেগন স্টেট ইউনিভার্সিটির বাস্তুসংস্থানবিদ পোসি বাসবি বড় গাছের চেয়ে অনেক ক্ষুদ্র একটি বিষয় নিয়ে গবেষণা করছিলেন। তাঁর গবেষণার মূল বিষয় ছিল পাতার ভেতরে বসবাসকারী অণুজীবেরা, যা ওই উদ্ভিদের মাইক্রোবায়োম হিসেবে পরিচিত। ঠিক এভাবেই পৃথিবীতে সামুদ্রিক মাইক্রোবায়োম, মানুষের মাইক্রোবায়োম ও মাটির মাইক্রোবায়োমের মতো নানা জগৎ রয়েছে।

সবচেয়ে বিষাক্ত দশ উদ্ভিদ
বসন্তের শেষে কটনউড গাছের ফল ফেটে সাদা তুলতুলে আবরণে ঢাকা ক্ষুদ্র বীজ বাতাসে বহুদূর পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ে। গাছগুলো সাধারণত ৬০ থেকে ১০০ ফুট লম্বা এবং কাণ্ডের ব্যাস প্রায় ৬ ফুট পর্যন্ত হয়।

উদ্ভিদ মাইক্রোবায়োম বিজ্ঞানের ভাষায় ফাইটোমাইক্রোবায়োম নামেও পরিচিত। এটি উদ্ভিদের স্বাস্থ্য ও উৎপাদনশীলতায় বড় ভূমিকা পালন করে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিষয়টি গবেষকদের বেশ মনোযোগ আকর্ষণ করেছে। উদ্ভিদের মাইক্রোবায়োম বলতে শুধু উদ্ভিদের গায়ে বা ভেতরে বসবাসকারী অণুজীবদেরই বোঝায় না, বরং তাদের যাবতীয় কার্যকলাপকেও বোঝায়। উদ্ভিদ মূলত বিভিন্ন অণুজীব গোষ্ঠীর সঙ্গে সহাবস্থান করে বেঁচে থাকে। এই অণুজীবগুলোকে মাইক্রোবায়োটা বলা হয়। এগুলো উদ্ভিদের কোষকলার ভেতরে (এন্ডোস্ফিয়ার) এবং বাইরের পৃষ্ঠে (এপিস্ফিয়ার) বাস করে। উদ্ভিদের শারীরবৃত্তীয় কাজ ও বাস্তুসংস্থানে এদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। উদ্ভিদ মাইক্রোবায়োমের মূল কাঠামোটি কিছু নির্দিষ্ট প্রধান অণুজীব বা কিস্টোন মাইক্রোবিয়াল ট্যাক্সা দিয়ে গঠিত, যা উদ্ভিদের সুস্থতার জন্য অপরিহার্য।

মার্কিন গবেষক পোসি বাসবি অণুজীবের প্রতি গভীরভাবে মনোযোগ দিতে শুরু করেন একটি নির্দিষ্ট কারণে। তিনি বুঝতে চেয়েছিলেন, কেন পাতার মরিচা রোগের মতো সংক্রমণে বুনো গাছপালা এক জায়গায় অসুস্থ হয়ে পড়লেও অন্য জায়গায় সুস্থ থাকে। গাছে রোগের তীব্রতা ঠিক কী কারণে কমে বা বাড়ে, সেটিও তিনি জানতে চেয়েছিলেন। ব্ল্যাক কটনউড গাছের পাতার মরিচা রোগ মূলত একটি সাধারণ ছত্রাকজনিত রোগ। মেলাম্পসোরা অক্সিডেন্টালিস ও এর সমগোত্রীয় ছত্রাক প্রজাতির আক্রমণে এই রোগটি হয়। এতে পাতার নিচের দিকে হলুদ-কমলা রঙের গুঁড়োযুক্ত ফুসকুড়ি দেখা দেয় এবং সময়ের আগেই গাছের পাতা ঝরে পড়ে। জিনতত্ত্ব ও পরিবেশগত কারণগুলো দিয়ে এই রহস্যের কেবল আংশিক ব্যাখ্যা দেওয়া সম্ভব ছিল। কিন্তু গাছের অভ্যন্তরে লুকিয়ে আছে অণুজীবের এক বিশাল জগৎ। বাসবি দেখতে পেলেন, নির্দিষ্ট একটি ছত্রাক ব্ল্যাক কটনউড গাছে এই রোগ সৃষ্টি করলেও, রোগের তীব্রতা অনেকটাই নির্ভর করে ওই গাছের মাইক্রোবায়োমে বসবাসকারী অন্যান্য অণুজীবের ওপর।

উনিশে আবিষ্কৃত নতুন উদ্ভিদ
ব্ল্যাক কটনউড গাছের পাতার মরিচা রোগ মূলত একটি সাধারণ ছত্রাকজনিত রোগ। মেলাম্পসোরা অক্সিডেন্টালিস ও এর সমগোত্রীয় ছত্রাক প্রজাতির আক্রমণে এই রোগটি হয়।

শুরুতে বাসবি এ ধরনের ব্যাকটেরিয়া ও ছত্রাকগুলোকে কেবল আলাদা আলাদা ক্ষতিকর বা উপকারী জীব হিসেবেই বিবেচনা করতেন। কিন্তু মানুষের শরীরের মাইক্রোবায়োম নিয়ে পড়াশোনা করার সময় তিনি একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় উপলব্ধি করেন। তিনি বুঝতে পারেন, গাছের ভেতরের অণুজীব গোষ্ঠীও মানুষের শরীরের অণুজীব গোষ্ঠীর মতোই জটিল ও রহস্যময়। এরা একে অপরের সঙ্গে মিলে একটি পূর্ণাঙ্গ সিস্টেম হিসেবে কাজ করে।

মাটি যে অণুবীক্ষণিক জীবে পরিপূর্ণ, তা বিজ্ঞানীরা বহু শতাব্দী ধরেই জানেন। আবার কিছু উদ্ভিদ যে মাটির তলায় ছত্রাকের সঙ্গে মিথোজীবী সম্পর্ক গড়ে তোলে, তা-ও ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষ ভাগ থেকেই মানুষের জানা। তবে বর্তমান গবেষণায় বিজ্ঞানীরা দেখতে পাচ্ছেন, অণুজীবেরা কেবল উদ্ভিদের আশপাশেই থাকে না; বরং উদ্ভিদের শিকড়, কাণ্ড ও পাতার ভেতরেও এরা বিপুল সংখ্যায় ও বৈচিত্র্যময় রূপে বাস করে। উদ্ভিদের ভেতরের এই বিশাল অণুজীব জগতের কথা আগে কারও ধারণাতেই ছিল না।

উদাহরণ হিসেবে বাসবির গবেষণার কথাই ধরা যাক। গবেষণায় দেখা গেছে, ব্ল্যাক কটনউড গাছগুলোতে অল্প কিছু অণুজীবঘটিত রোগজীবাণু বা প্যাথোজেন থাকে। বাসবি জানান, ‘যখন আমরা পাতাগুলোর ছত্রাকের সামগ্রিক বৈচিত্র্য খতিয়ে দেখলাম, তখন অভাবনীয় ফল পেলাম। দেখা গেল, গাছটির বিস্তৃতিজুড়ে পাতাগুলোর ভেতরে ও বাইরের অংশে প্রায় এক থেকে দেড় হাজার প্রজাতির ছত্রাক বাস করছে। এটি সত্যিই বিস্ময়কর একটি সংখ্যা!’

ভ্যাম্পায়ার উদ্ভিদ
বর্তমান গবেষণায় বিজ্ঞানীরা দেখতে পাচ্ছেন, অণুজীবেরা কেবল উদ্ভিদের আশপাশেই থাকে না; বরং উদ্ভিদের শিকড়, কাণ্ড ও পাতার ভেতরেও এরা বিপুল সংখ্যায় ও বৈচিত্র্যময় রূপে বাস করে।

এটি সাধারণ মানুষের কল্পনারও বাইরে। সাধারণত আমরা যখন কোনো উদ্ভিদের রোগ নিয়ে ভাবি, তখন আমাদের দৃষ্টি শুধু রোগ সৃষ্টিকারী নির্দিষ্ট জীবাণুটির দিকেই নিবদ্ধ থাকে। কিন্তু সেই জীবাণুর সঙ্গে যে আরও অনেক অণুজীব ও পরিবেশের এক নিবিড় সম্পর্ক রয়েছে, তা আমরা অনেক সময়ই এড়িয়ে যাই।

আধুনিক গবেষণার ফলে এখন ধীরে ধীরে বোঝা যাচ্ছে, উদ্ভিদের নিজস্ব মাইক্রোবায়োমই তাদের সুস্বাস্থ্যের চাবিকাঠি হতে পারে। উদ্ভিদ মাইক্রোবায়োম নিয়ে বিজ্ঞানীদের গবেষণার একটি প্রাথমিক লক্ষ্য হলো, এই অণুজীব সম্প্রদায়ের সদস্য কারা এবং তারা উদ্ভিদের জন্য ঠিক কী কাজ করছে, তা শনাক্ত করা। গবেষণায় দেখা গেছে, গাছটি কোথায় বেড়ে উঠছে, তার ওপর ভিত্তি করে ভেতরের বাস্তুতন্ত্র বা ইকোসিস্টেম নির্ধারিত হয়।

ব্ল্যাক কটনউড গাছের বিস্তৃতি

এটি উদ্ভিদের পুরো জীবনচক্রের ওপর প্রভাব ফেলে। বাসবির মতে, পাহাড়ের এপাশে নাকি ওপাশে গাছটি রয়েছে, তা অণুজীবের উপস্থিতির ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। মাত্র ৩০ মাইল দূরত্বের কারণেও গাছের ভেতরের অণুজীব সম্প্রদায়ে বড় পার্থক্য দেখা যেতে পারে। উদাহরণ হিসেবে অরেগনের করভ্যালিস থেকে প্রায় এক ঘণ্টা উত্তরের দিকে অবস্থিত ব্ল্যাক কটনউড গাছের আরেকটি বাগানের কথা বলা যায়। বাসবি সেখানে দেখতে পান, মাত্র কয়েক মাইলের ব্যবধানে থাকা ওই দুটি ভিন্ন স্থানে সম্পূর্ণ আলাদা ধরনের অণুজীব সম্প্রদায় গড়ে উঠেছে।

মহাকাশে উদ্ভিদ উন্মেষ
গবেষণায় দেখা গেছে, গাছটি কোথায় বেড়ে উঠছে, তার ওপর ভিত্তি করে ভেতরের বাস্তুতন্ত্র বা ইকোসিস্টেম নির্ধারিত হয়। এটি উদ্ভিদের পুরো জীবনচক্রের ওপর প্রভাব ফেলে।

আধুনিক ও সাশ্রয়ী ডিএনএ সিকোয়েন্সিং প্রযুক্তি আসার আগে উদ্ভিদের বাইরের পৃষ্ঠ ও ভেতরের কোষকলায় বসবাসকারী অণুজীবদের সম্পর্কে আমাদের খুব বেশি কিছু জানা ছিল না। ব্ল্যাক কটনউড গাছের একটি পাতাতেই প্রায় ৫০ প্রজাতির ছত্রাক ও ব্যাকটেরিয়া বাস করতে পারে। আবার একই গাছের শিকড় ও পাতায় সম্পূর্ণ ভিন্ন অণুজীব গোষ্ঠী থাকতে পারে। তবে একটি নির্দিষ্ট উদ্ভিদ প্রজাতির ক্ষেত্রে কিছু সাধারণ অণুজীব ওই গোষ্ঠীর মূল ভিত্তি বা কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে কাজ করে। অবশ্য উদ্ভিদের বিস্তৃতি বা ভৌগোলিক অবস্থানের ওপর ভিত্তি করে এই অণুজীব গোষ্ঠীর ব্যাপক পরিবর্তন লক্ষ করা যায়।

শুধু গাছের পাতাতেই যে এমন চিত্র দেখা যায়, তা কিন্তু নয়। একটি উদ্ভিদের যেকোনো অংশ নিয়ে পরীক্ষা করলে পরিবেশ, ভৌগোলিক অবস্থান, গাছের বয়স ও আবহাওয়ার কারণে বিভিন্ন অণুজীব গোষ্ঠীর দেখা পাওয়া যায়। যেমন মাটির নিচে থাকা গাছের শিকড়াঞ্চলের মাইক্রোবায়োমকে লক্ষ করলে দেখা যাবে, সেখানে বহু ছত্রাক সংঘবদ্ধভাবে বসবাস করছে। বিশ্বের সবচেয়ে পরিচিত কিছু মাশরুম হলো মাইকোরাইজা ছত্রাকের বর্ধিত অংশ বা ফ্রুটিং বডি। এগুলো উদ্ভিদের শিকড়ের সঙ্গে মিথোজীবী সম্পর্ক স্থাপন করে বেড়ে ওঠে। এই মিথোজীবী সম্পর্কে উদ্ভিদ ও ছত্রাক একে অপরকে সাহায্য করে। উদ্ভিদ তার তৈরি খাবার ছত্রাককে দেয়, বিনিময়ে ছত্রাক মাটি থেকে পানি ও খনিজ উপাদান সংগ্রহ করে উদ্ভিদকে সরবরাহ করে।

৯০ শতাংশ মাইক্রোপ্লাস্টিক দূর করতে পারে যে দুটি প্রাকৃতিক উদ্ভিদ
বিশ্বের সবচেয়ে পরিচিত কিছু মাশরুম হলো মাইকোরাইজা ছত্রাকের বর্ধিত অংশ বা ফ্রুটিং বডি। এগুলো উদ্ভিদের শিকড়ের সঙ্গে মিথোজীবী সম্পর্ক স্থাপন করে বেড়ে ওঠে।

ইউরোপ বা যুক্তরাষ্ট্রের পূর্বাঞ্চলে বেড়ে ওঠা মানুষেরা পশ্চিমাঞ্চলে ভ্রমণ করার সময় সেখানকার মাশরুমগুলোকে নিজেদের পরিচিত মাশরুম বলেই মনে করতেন। কিন্তু আধুনিক বিজ্ঞানের কল্যাণে এখন আমরা জানি, সেগুলো সম্পূর্ণ ভিন্ন প্রজাতি। যুক্তরাষ্ট্রের স্ট্যানফোর্ড ইউনিভার্সিটির জীববিজ্ঞানের সহকারী অধ্যাপক কবির পিয়েরে এ সম্পর্কে বলেছেন, ভৌগোলিক অবস্থানের ওপর ভিত্তি করে মাইকোরাইজা ছত্রাকের সম্পূর্ণ ভিন্ন আঞ্চলিক গোষ্ঠী দেখা যায়। প্রসঙ্গত, এই ছত্রাকগুলো উদ্ভিদের ভেতরে ও বাইরে—উভয় জায়গাতেই বাস করতে পারে। পুষ্টি সংগ্রহের জন্য এদের তন্তুময় অংশ (হাইফি) মাটির গভীরে ছড়িয়ে পড়ে। আবার উদ্ভিদের ভেতরে এরা এমন এক নিবিড় কাঠামো তৈরি করে, যার মাধ্যমে তারা উদ্ভিদ কোষের একেবারে সংস্পর্শে চলে আসে।

অণুজীব বা ছত্রাকের গোষ্ঠীতে এই আঞ্চলিক ভিন্নতা আবার পুরো উদ্ভিদ গোষ্ঠীর কাঠামোর ওপর ব্যাপক প্রভাব ফেলে। যেমন রোগ সৃষ্টিকারী অণুজীব কোনো একটি নির্দিষ্ট প্রজাতির গাছকে বনে আধিপত্য বিস্তার করা থেকে বিরত রাখতে পারে। তবে এদের এই প্রভাব নির্ভর করে সহাবস্থানে থাকা অন্যান্য অণুজীবের মিশ্রণের ওপর। গবেষক কবির পিয়েরে বলেন, ‘আমরা যখন এই অণুজীব গোষ্ঠীর গঠন পরিবর্তন করে ফেলি এবং এদের বৈচিত্র্য কমিয়ে দিই, তখন বৃহৎ পরিসরে ঠিক কী অবস্থার সৃষ্টি হয়, বিজ্ঞানীদের কাছে এখনো তার সঠিক উত্তর নেই। তবে পরিবেশের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে এর যে বড় ধরনের প্রভাব পড়ে, তা নিশ্চিত। বোস্টন ইউনিভার্সিটির গবেষক কলিন অ্যাভেরিলের মতে, ভিন্ন ভিন্ন অণুজীব বনের ওপর একেবারে ভিন্ন ভিন্ন প্রভাব ফেলে। গাছের শিকড়ে কোন ধরনের ছত্রাক রয়েছে, তা জানা থাকলে বন কতটা কার্বন ধরে রাখতে সক্ষম, সে বিষয়ে আরও ভালোভাবে ধারণা করা যাবে। একই সঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব সম্পর্কেও পূর্বাভাস দেওয়া সম্ভব হবে।

কাগজ রিসাইকেল করলে কতগুলো গাছ বাঁচে
রোগ সৃষ্টিকারী অণুজীব কোনো একটি নির্দিষ্ট প্রজাতির গাছকে বনে আধিপত্য বিস্তার করা থেকে বিরত রাখতে পারে। তবে এদের এই প্রভাব নির্ভর করে সহাবস্থানে থাকা অন্যান্য অণুজীবের মিশ্রণের ওপর।

এত দিন বিজ্ঞানীদের ধারণা ছিল, উদ্ভিদ ও অণুজীবের মিথস্ক্রিয়া নিয়ে গবেষণা শুধু সেসব অণুজীবের মধ্যেই সীমাবদ্ধ, যাদের গবেষণাগারে চাষ করা যায়। কিন্তু প্রকৃতিতে এমন অসংখ্য অণুজীব আছে, যাদের গবেষণাগারে চাষ করা যায় না। তাই তারা অনাবিষ্কৃতই রয়ে গেছে এবং উদ্ভিদের জীবনে তাদের ভূমিকাও অজানা থেকে গেছে। বর্তমানে আধুনিক প্রযুক্তির সাহায্যে উদ্ভিদ ও অণুজীবের এই সম্পর্ক উন্মোচনের সুযোগ তৈরি হয়েছে, যা পরিবেশবিদ, জীববিজ্ঞানী ও কৃষিবিদদের মধ্যে ব্যাপক আগ্রহ জাগিয়েছে।

সম্প্রতি মাল্টিওমিকস (জীববিজ্ঞানের আধুনিক তথ্য বিশ্লেষণ পদ্ধতি) প্রযুক্তির অগ্রগতি উদ্ভিদের মাইক্রোবায়োমের গঠন ও বৈচিত্র্য সম্পর্কে আমাদের জ্ঞান নাটকীয়ভাবে বাড়িয়ে দিয়েছে। সমগ্র অণুজীব সম্প্রদায়ের নির্দিষ্ট জিন শনাক্তকরণের পদ্ধতি, যা মেটাজেনোমিকস নামে পরিচিত, সেটি উদ্ভিদের মাইক্রোবায়োমের পরিবর্তনীয় বৈচিত্র্যের ওপর আলো ফেলতে সক্ষম হয়েছে। এটি উদ্ভিদের মাইক্রোবায়োমে থাকা সামগ্রিক অণুজীব গোষ্ঠীর সমাবেশ গঠনের প্রধান জৈব ও অজৈব কারণগুলো জানতে সাহায্য করছে। অবশ্য উদ্ভিদের মাইক্রোবায়োম ঠিক কীভাবে কী ধরনের পরিবর্তন ঘটায়, তা এখনো বিজ্ঞানীদের কাছে এক বড় রহস্য।

গাছ যখন রক্ত ঝরায়
সমগ্র অণুজীব সম্প্রদায়ের নির্দিষ্ট জিন শনাক্তকরণের পদ্ধতি, যা মেটাজেনোমিকস নামে পরিচিত, সেটি উদ্ভিদের মাইক্রোবায়োমের পরিবর্তনীয় বৈচিত্র্যের ওপর আলো ফেলতে সক্ষম হয়েছে।

উদ্ভিদ মাইক্রোবায়োম আসলে শুধু ছত্রাকের জগৎ নয়; এটি বিভিন্ন অণুজীবের এক গতিশীল সম্প্রদায়। এর মধ্যে রয়েছে ব্যাকটেরিয়া, ছত্রাক, আর্কিয়া ও ভাইরাসের মতো অণুজীব। এরা উদ্ভিদের ওপরে, ভেতরে ও চারপাশে বাস করে। এরা উদ্ভিদের সুস্বাস্থ্যের জন্য অপরিহার্য। মাটি থেকে পুষ্টি গ্রহণ, খরা বা প্রতিকূল পরিবেশ সহ্য করার ক্ষমতা এবং রোগ প্রতিরোধব্যবস্থা গড়ে তুলতে এরা গাছকে সাহায্য করে। সায়ানোব্যাকটেরিয়া হলো এমন একধরনের অণুজীব, যা স্থলজ উদ্ভিদের সঙ্গে ব্যাপকভাবে মিথোজীবী সম্পর্ক গড়ে তোলে। সায়ানোব্যাকটেরিয়া পাতার পত্ররন্ধ্রের মধ্য দিয়ে উদ্ভিদের ভেতরে প্রবেশ করতে পারে। এরপর তারা কোষের মধ্যবর্তী ফাঁকা স্থানে অবস্থান নিয়ে প্যাঁচানো কাঠামো তৈরি করে।

উদ্ভিদ মাইক্রোবায়োম আসলে শুধু ছত্রাকের জগৎ নয়; এটি বিভিন্ন অণুজীবের এক গতিশীল সম্প্রদায়

যেমন অ্যানাবেনা প্রজাতির সায়ানোব্যাকটেরিয়া গম ও তুলাগাছের মূলে বাসা বাঁধে। এদের সঙ্গে ক্যালথ্রিক্স প্রজাতির উপস্থিতিও পাওয়া গেছে। আবার গম ও ধানের মতো একবীজপত্রী উদ্ভিদে নস্টক প্রজাতির উপনিবেশ দেখা গেছে। ১৯৯১ সালে বিজ্ঞানী গ্যান্থার ও তাঁর সহযোগীরা উদ্ভিদের মূল ও মাটি থেকে বিভিন্ন ধরনের নাইট্রোজেন সংবন্ধনকারী সায়ানোব্যাকটেরিয়া আলাদা করেন। এদের মধ্যে ছিল নস্টক, অ্যানাবেনা ও সিলিন্ড্রোস্পার্মাম। গমের চারাগাছের মূল পরীক্ষা করেও অ্যানাবেনা ও নস্টকের মতো মিথোজীবী ব্যাকটেরিয়া শনাক্ত করা হয়েছে। এসব ব্যাকটেরিয়া মূলের ওপরের স্তরে নিজেদের উপনিবেশ গড়ে তোলে। এগুলো তো জানা কথা, কিন্তু মূলাঞ্চলে থাকা অজানাদের খবর কে জানবে? বোস্টন ইউনিভার্সিটির সহকারী অধ্যাপক জেনিফার ভাটনগর বলেন, ‘বিজ্ঞানীরা এখন বুঝতে শুরু করেছেন, উদ্ভিদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অণুজীবদের বিপাকীয় প্রক্রিয়া কতটা বৈচিত্র্যময়। এর বড় প্রভাব খাদ্য উৎপাদন, ওষুধ আবিষ্কার ও পরিবেশ ব্যবস্থাপনার মতো গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রগুলোতে পড়তে পারে।’

ঘরের বাতাস ভালো রাখার সেরা ৩ গাছ
১৯৯১ সালে বিজ্ঞানী গ্যান্থার ও তাঁর সহযোগীরা উদ্ভিদের মূল ও মাটি থেকে বিভিন্ন ধরনের নাইট্রোজেন সংবন্ধনকারী সায়ানোব্যাকটেরিয়া আলাদা করেন।

বেশ কিছু গবেষণায় দেখা গেছে, একটি উদ্ভিদের স্বাস্থ্যগত অবস্থা তার মাইক্রোবায়োমের ওপর নির্ভর করে। প্রকৃতপক্ষে উদ্ভিদকে সুস্থ রাখার বিষয়টি মানুষের স্বাস্থ্যের সঙ্গেও ওতপ্রোতভাবে জড়িত। উদ্ভিদের মাইক্রোবায়োমকে কীভাবে আরও উন্নত বা নিয়ন্ত্রণ করা যায়—তা বুঝতে পারলে কৃষিক্ষেত্রে যুগান্তকারী পরিবর্তন আনা সম্ভব। এতে কৃষকেরা রাসায়নিক সার ছাড়াই ফসলের উৎপাদন বাড়ানোর শক্তিশালী উপায় পেতে পারেন। উদ্ভিদের মাইক্রোবায়োম সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা লাভ করা গেলে তা আমাদের জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সৃষ্ট পরিবেশগত অনিশ্চয়তার কঠিন সময়গুলো মোকাবিলায় সাহায্য করবে। গবেষক পোসি বাসবির মতে, উদ্ভিদের মধ্যে বসবাসকারী এই অজানা অণুজীবগুলো উদ্ভিদের বৃদ্ধি, বিকাশ এবং রোগ প্রতিরোধক্ষমতার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ভবিষ্যতে পৃথিবীর ক্রমবর্ধমান জনগোষ্ঠীর জন্য পর্যাপ্ত খাদ্য উৎপাদনের ক্ষেত্রে এরাই হয়তো মূল চাবিকাঠি হয়ে উঠবে।

লেখক: কৃষিবিদ ও পরিবেশ বিশেষজ্ঞসূত্র: অ্যাটলাস অবসকিউরাগাছ কীভাবে সিদ্ধান্ত নেয়, কখন ফুল ফুটবে

Read full story at source