ফরাসি স্বাদসাম্রাজ্যে পনিরের রাজত্ব ১২
· Prothom Alo

হাজার বছরের ঐতিহ্য, নিখুঁত কারিগরি আর আঞ্চলিক বৈচিত্র্যের অনন্য মেলবন্ধনে ফরাসি পনির বিশ্বজুড়ে সমাদৃত। তবে শুধু নিজস্ব পনির নয়, বিদেশি কিছু পনিরও ফরাসিদের রসনায় বিশেষ স্থান অধিকার করে আছে।
বিশ্বজুড়ে পনিরের সাম্রাজ্য
ফরাসিরা পনির খুবই পছন্দ করে। এ দেশের খাদ্যসংস্কৃতি থেকে পনিরকে আলাদা করে কল্পনা করাও কঠিন। দুধ সংরক্ষণের একটি প্রাচীন কৌশল থেকে শুরু করে হাজার হাজার বছরের নিষ্ঠা, সাধনা, উদ্ভাবন, কারিগরি দক্ষতা ও শিল্পসত্তার অপূর্ব সমন্বয়ে আজ ফরাসি পনির বিশ্বজুড়ে অনন্য সুনাম অর্জন করেছে।
Visit moryak.biz for more information.
বিশ্বজুড়ে জনপ্রিয় নানা স্বাদের পনিরপনির আর শুধু একটি সাধারণ খাদ্য নয়; এটি একটি জাতির ইতিহাস, ঐতিহ্য, পরিচয় ও সভ্যতার প্রতীক। এটি কৃষি, গ্রামীণ অর্থনীতি, স্থানীয় ঐতিহ্য এবং পর্যটনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। বিভিন্ন অঞ্চলের জলবায়ু, পশুপালনের ধরন, দুধের বৈশিষ্ট্য এবং শতাব্দীপ্রাচীন কারিগরি দক্ষতার সমন্বয়ে প্রতিটি পনির গড়ে তুলেছে নিজস্ব স্বাদ, গন্ধ ও স্বতন্ত্র চরিত্র। এভাবেই কালের পরিক্রমায় পনির আন্তর্জাতিক খাদ্যসংস্কৃতির এক গুরুত্বপূর্ণ প্রতীক হয়ে উঠেছে।
তবে ফরাসিরা শুধু নিজেদের দেশের পনির নিয়েই মুগ্ধ নয়; বিশ্বের বিভিন্ন দেশের উৎকৃষ্ট পনিরও তাদের রসনাতৃপ্তির তালিকায় স্থান করে নিয়েছে। এমন কয়েকটি বিদেশি পনির রয়েছে, যেগুলো ফরাসিদের বিশেষ পছন্দের। সেগুলোর মধ্যে শীর্ষ কয়েকটির নাম উল্লেখ না করলেই নয়।
মোজারেলা (দক্ষিণ ইতালি)
স্বাদের জগতে পনির নিয়ে কথা বলতে শুরু করলে মোজারেলা দিয়ে শুরু করা অনুচিত হবে না। দক্ষিণ ইতালির ঐতিহ্যবাহী এই পনির মহিষের দুধ থেকে তৈরি হয়ে বিশ্বজুড়ে বিশেষ সুনাম অর্জন করেছে। আকাশছোঁয়া জনপ্রিয় এই পনির দেখলেই প্রথমে রসগোল্লা বলে ভ্রম হতে পারে। তবে দেখতে রসগোল্লার মতো নরম এবং রসের মধ্যে ডুবে থাকলেও এর সঙ্গে মিষ্টির কোনো সম্পর্ক নেই।
মোজারেলা দক্ষিণ ইতালির হালকা দুধেল ঘ্রাণ ও কোমল স্বাদের পনির বিভিন্ন ধরনের খাবারে ব্যবহৃত হয়। বিশেষ করে পিৎজা, সালাদ এবং বিভিন্ন বেকড ডিশে মোজারেলা অতুলনীয় স্বাদ যোগ করেদক্ষিণ ইতালির হালকা দুধেল ঘ্রাণ ও কোমল স্বাদের এই পনির বিভিন্ন ধরনের খাবারে ব্যবহৃত হয়। বিশেষ করে পিৎজা, স্যালাড এবং বিভিন্ন বেকড ডিশে মোজারেলা অতুলনীয় স্বাদ যোগ করে। এ কারণেই ফরাসি রন্ধনশিল্পীসহ বিশ্বের বহু দেশের শেফ ও খাদ্যরসিকদের কাছে এটি অত্যন্ত প্রিয়।
আদিতে মোজারেলা মূলত মহিষের দুধ থেকে তৈরি হলেও বর্তমানে গরুর দুধের ব্যবহারই বেশি দেখা যায়। দক্ষিণ ইতালির অতিথিপরায়ণতা ও প্রাচুর্যের প্রতীক এই দুধসাদা পনির ইউরোপ ছাড়িয়ে বহু আগেই আটলান্টিক পেরিয়ে উত্তর ও দক্ষিণ আমেরিকায় জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে।
আকাশছোঁয়া জনপ্রিয় এই পনির মোজারেলা দেখলেই প্রথমে রসগোল্লা বলে ভ্রম হতে পারেবর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র মোজারেলা উৎপাদনে শীর্ষস্থানীয় দেশ। প্রতিবছর সেখানে প্রায় ২০ লাখ টন মোজারেলা উৎপাদিত হয়। শুধু উৎপাদনেই নয়, স্বাদ ও ব্যবহারের ক্ষেত্রেও এই পনির বিশ্বব্যাপী সমানভাবে সমাদৃত। অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ডেও এর জনপ্রিয়তা ক্রমে বৃদ্ধি পাচ্ছে।
পারমিজিয়ানো-রেজিয়ানো (উত্তর ইতালি)
পনিরের দোকানে বিশাল আকার–আকৃতির চাকাসদৃশ যে পনিরটি সহজেই কৌতূহলী ক্রেতার দৃষ্টি কাড়বে, সে পনিরটি হচ্ছে ইতালির বহু শতাব্দীপ্রাচীন পনির পারমিজিয়ানো-রেজিয়ানো। গরুর কাঁচা দুধ, প্রাকৃতিক রেনেট ও লবণ—এই তিনটি উপাদানেই তৈরি হয় প্রায় ৪০ কেজির এই পনির।
প্রায় ৪০ কেজি ওজনের বিশালকায় চাকাসদৃশ ইতালির বহু শতাব্দীপ্রাচীন পনির পারমিজিয়ানো-রেজিয়ানো পনিরের দোকানে সহজেই কৌতূহলী ক্রেতার দৃষ্টি কাড়বেঅন্তত ১২ মাস, অনেক ক্ষেত্রে ২৪ থেকে ৩৬ মাস বা তারও বেশি সময় ধরে পরিপক্ব করা হয়। যত দীর্ঘ সময় এটি পরিপক্ব হয়, ততই এর স্বাদ ঘনীভূত হয়, দানাদার গঠন এবং বাদামি সুবাসে সমৃদ্ধ হয়ে ওঠে। তাই শুধু ওজন বিবেচনায় নয়; স্বাদ, ঘ্রাণ, গঠন এবং সেই সঙ্গে ইতালির ঐতিহ্য, অনন্য কারিগরি দক্ষতা এবং সময়ের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ উৎপাদনপ্রক্রিয়ার কারণেও পারমিজিয়ানো-রেজিয়ানোকে বলা হয় ‘পনিরের রাজা’। বিশ্বজুড়ে যার এমন সুনাম ও গ্রহণযোগ্যতা, সেটিকে শুধু ‘রাজা’ বললেও যেন কম বলা হয়।
মধ্যযুগে উদ্ভাবিত এই পনির আজও প্রায় একই ঐতিহ্যবাহী নিয়মে তৈরি হয়। এর গুণগত মান, উৎপাদনপদ্ধতি এবং স্বকীয়তা রক্ষার জন্য এটি নির্দিষ্ট ভৌগোলিক নির্দেশক মর্যাদা লাভ করেছে। ফলে নির্ধারিত অঞ্চল ও নির্দিষ্ট নিয়ম অনুসরণ করেই কেবল এই নাম ব্যবহার করা যায়।
পারমিজিয়ানো-রেজিয়ানো পনিরের আরেকটি নাম ‘পনিরের রাজা’নামকরা শেফদের যেমন প্রিয়, তেমনই প্রিয় সাধারণের কাছেও। কারণ, রান্নাঘরে এর ব্যবহারও বহুমুখী। এই পনির ছাড়া অনেকেই পাস্তা, রিসোত্তো, স্যুপ, স্যালাড কিংবা পিৎজা কল্পনা করতে পারেন না। এসব খাবারের ওপর কুঁচি করে ছড়িয়ে দিলে স্বাদে আলাদা মাত্রা যুক্ত হয়। এ ছাড়াও ফল, বাদাম কিংবা সামান্য মধুর সঙ্গে পরিবেশন করলেও এটি অনন্য স্বাদের হয়। অনেকেই এই রাজা পনিরের শক্ত আবরণটি ফেলে না দিয়ে স্যুপে দিয়ে রান্না করেন, তাতে বাড়তি স্বাদ যোগ হয়।
শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে অপরিবর্তিত কারিগরি, কঠোর মাননিয়ন্ত্রণ এবং অতুলনীয় স্বাদের কারণে পারমিজিয়ানো-রেজিয়ানো আজও বিশ্বের খাদ্যরসিকদের কাছে এক অনন্য বিস্ময় এবং ইতালীয় খাদ্য–ঐতিহ্যের অন্যতম গর্ব।
গৌদা (নেদারল্যান্ডস)
নেদারল্যান্ডসের দক্ষিণ হল্যান্ড প্রদেশের গৌদা শহরের সঙ্গে জড়িয়ে আছে একটি পৃথিবী বিখ্যাত পনিরের উদ্ভব, ইতিহাস ও ঐতিহ্য। এই শান্ত লোকালয়ের মানুষের জীবনধারা গরুর দুধের এই কিংবদন্তি পনিরকে ঘিরে শতাব্দীর পর শতাব্দী একই ছন্দে আবর্তিত হচ্ছে। এই পনিরের নাম ‘গৌদা’ শহরের নামে। পনিরের নাম নিয়ে মধ্যযুগে কেউ তেমন মাথা ঘামাননি, সে সময়কার কারিগরদের অধ্যবসায়, মেধা ও কৌশল ছিল দুধ সংরক্ষণের কার্যকর উপায় খুঁজে বের করা। তাঁদের সেই উদ্যমের ফসল আজকের বিশ্বের অন্যতম জনপ্রিয় ও প্রাচীন পনিরগুলোর একটি এই ‘গৌদা’। শুধু তা–ই নয়, নেদারল্যান্ডসের গৌদা বিশ্বের সবচেয়ে বেশি রপ্তানি করা পনিরগুলোর একটি।
নেদারল্যান্ডসের অহংকার ‘গৌদা’, আজকের বিশ্বের অন্যতম জনপ্রিয় ও প্রাচীন পনিরগুলোর একটিএই শহরের প্রাণকেন্দ্রে গড়ে উঠেছে বিখ্যাত ‘চিজ মার্কেট’ বা পনিরের বাজার। ৭০০ বছরের ইতিহাস বুকে নিয়ে এই মার্কেটটি পর্যটকদের কাছে এখনো সমান আকর্ষণীয় এবং আজও স্বাদের জগতে সৌরভ ছড়াচ্ছে । রন্ধনশৈলী ও আঞ্চলিক ঐতিহ্যের নানা দিক সম্পর্কে জানতে আগ্রহীরা এই বাজার পরিদর্শন করলে সত্যিই চমৎকৃত হবেন।
এখানকার গ্রামীণ জনপদের সুপ্রাচীন ঐতিহ্য ধরে রেখে চোখ ঝলসানো ঐতিহ্যবাহী পোশাকে নারী-পুরুষ ও শিশুদের উপস্থিতি, পরিবেশ এবং আবহ পযটকদের টাইম মেশিনে করে নিয়ে যাবে সুন্দর অতীতে। গরমের দিনগুলোতে প্রতি বৃহস্পতিবার (আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে) স্থানীয় বাসিন্দারা ঐতিহ্যবাহী পোশাক পরে অতীতে গৌডার পনিরের বাজারটি কেমন ছিল, তা সবার সামনে তুলে ধরেন। এখানে দেখতে পাওয়া যাবে পনির প্রস্তুতকারী বিক্রেতা এবং ক্রেতার দর–কষাকষির প্রাণবন্ত এবং নাটকীয় দৃশ্য। একটুকরো গৌদা মুখে দিয়ে হালকা ক্যারামেল ও মাখন–মাখন স্বাদ নিতে গিয়ে স্বাদের জগতে ভ্রমণের অনন্য আনন্দ চিরদিনের এক অমূল্য উপহার হবে।
গৌদা শহরের প্রাণকেন্দ্রে ৭০০ বছরের ইতিহাস বুকে নিয়ে বিখ্যাত ‘চিজ মার্কেট’ পর্যটকদের কাছে আজও সমান আকর্ষণীয়একটুকরো রুটির সঙ্গে গৌদার স্বাদ যেমন অতুলনীয়, তেমনি স্যান্ডউইচ, পাস্তা, পিৎজা, স্যুপ এমনকি ডেজার্টের সঙ্গেও এই পনির খাদ্যরসিকদের তৃপ্তি দেয়। নেদারল্যান্ডসের মানুষ গৌদা সাধারণত রুটি ও আপেলের সঙ্গে খেতে পছন্দ করেন। বিয়ার ও ওয়াইনের সঙ্গেও এর জুটি বেশ জনপ্রিয়।
স্বাদের সাম্রাজ্যে গৌদা আজ ইতিহাস, সংস্কৃতি এবং ইউরোপীয় খাদ্য–ঐতিহ্যের এক উজ্জ্বল প্রতীক।
চেডার (যুক্তরাজ্য)
পৃথিবীর নামকরা পনিরগুলোর তালিকার শীর্ষে যে কয়েকটি পনির আছে, তার মধ্যে একটি হচ্ছে যুক্তরাজ্যের চেডারপৃথিবীর নামকরা পনিরগুলোর তালিকার শীর্ষে যে কয়েকটি পনির আছে, তার মধ্যে একটি হচ্ছে যুক্তরাজ্যের চেডার। ইংল্যান্ডের সমারসেট অঞ্চলের চেডার গ্রাম থেকেই চেডার পনিরের জয়যাত্রা শুরু হয়েছিল। আজও বিশ্বজয়ের অপ্রতিরোধ্য সে যাত্রা ব্যাহত হয়নি। আজ এটি বিশ্বের জনপ্রিয় ও বহুল উৎপাদিত পনিরগুলোর একটি।
পনিরের জগতের খবর যাঁরা রাখেন, তাঁদের মতে অন্তত দ্বাদশ শতক থেকেই চেডার গ্রামে এই পনির তৈরি হয়ে আসছে। গ্রামের পাশে প্রাকৃতিক গুহাগুলো ছিল পনির পরিপক্ব করার জন্য বেশ উপযোগী স্থান। মানুষের দক্ষ কারিগরি ও প্রাকৃতিক গুহার স্থিতিশীল তাপমাত্রা এবং আদর্শ আর্দ্রতার অনন্য সমন্বয়ই এই পনিরের স্বতন্ত্র স্বাদ, সমৃদ্ধ ঘ্রাণ এবং অসাধারণ গুণমানের মূল রহস্য।
চেডার পনিরের ঈর্ষণীয় জনপ্রিয়তার মূল কারণ হলো এর স্বাদ, গঠন ও ঘ্রাণের অসাধারণ বৈচিত্র্য। একটি মাত্র পনির হলেও পরিপক্বতার সময়কাল অনুযায়ী এর স্বাদ মৃদু ও ক্রিমি থেকে শুরু করে খানিকটা ঝাঁজালো ও বাদামি সুবাসযুক্ত স্বাদের হয়ে উঠতে পারে।
চেডার পনিরের ঈর্ষণীয় জনপ্রিয়তার মূল কারণ হলো এর স্বাদ। মৃদু ও ক্রিমি থেকে শুরু করে খানিকটা ঝাঁজালো, বাদামি সুবাসযুক্ত স্বাদের হয়ে উঠতে পারেএই বহুমাত্রিক বৈশিষ্ট্যই চেডারকে বিভিন্ন ধরনের খাবার ও ভোক্তার পছন্দের সঙ্গে সহজেই মানিয়ে নিতে পারে, যা এর ব্যাপক জনপ্রিয়তার অন্যতম প্রধান কারণ। স্যান্ডউইচ, বার্গার, ম্যাকারনি অ্যান্ড চিজ, বেকড খাবার এবং নানা ধরনের স্ন্যাকসে চেডারের ব্যবহার বিশ্বজুড়ে ব্যাপক। (চলবে)
লেখক: ফ্রান্স প্রবাসী লেখক
ছবি: লেখকের সৌজন্যে