কোয়ায়েট লাক্সারির দিন কি শেষ? এই সময়ের ফ্যাশনে ম্যাক্সিমালিজম বনাম মিনিমালিজম
· Prothom Alo

একদিকে সংযম, পরিমিতি ও নীরব সৌন্দর্য, অন্যদিকে রং, অলংকরণ ও সাহসী আত্মপ্রকাশ। বহুদিন ধরে কোয়ায়েট লাক্সারির রাজত্ব চলছিল ফ্যাশন দুনিয়ায়। কিন্তু এখন এই দুই ভাবধারার সহাবস্থানই সমকালীন ফ্যাশনকে আরও বৈচিত্র্যময় করে তুলেছে।
Visit afnews.co.za for more information.
রানওয়েতে হেঁটে আসছেন বিখ্যাত সুপারমডেল জিজি হাদিদ। একেবারে সাদামাটা কোয়ায়েট লাক্সারি আমেজের আর্দি টোনের পোশাকে। মেকওভারে নেই বাড়াবাড়ি।
বিখ্যাত সুপারমডেল জিজি হাদিদ। একেবারে সাদামাটা কোয়ায়েট লাক্সারি আমেজের আর্দি টোনের পোশাকেডেমি মুর চমকে দিলেন ঢাউস বো দেওয়া এক হট পিংক টাফেটা ড্রেসেএদিকে কান চলচ্চিত্র উৎসবে রেড কার্পেট লুকের জন্য পরিচিত হলিউড তারকা ডেমি মুর চমকে দিলেন ঢাউস বো দেওয়া এক হট পিংক টাফেটা ড্রেসে। ফ্যাশনের এই দুই বিপরীতমুখী ভাবধারার মধ্যে কোনটি এগিয়ে আছে এখন? এ প্রশ্ন কিন্তু ফ্যাশনিস্তাদের মনে প্রায়ই কড়া নাড়ে।
একই জেন্ডায়া চরম মিনিমালিস্টিক লুকে দেখা দিয়েছেন বিগত বছরগুলোয়। মেকওভার বা গয়নার বালাই নেই। অথচ সদ্যবিবাহিতা এই হলিউড ডিভার সাম্প্রতিক স্পাইডারম্যান লুকগুলোতে ম্যাক্সিমালিজমের ছড়াছড়ি।
জিভঁশির মিনিমালিস্টিক কালারব্লকিং গাউনে জেন্ডায়াজিভঁশি লুকেই আইফেল টাওয়ার হেডপিসে দেখা যাচ্ছে জেন্ডায়াকেএকই ব্র্যান্ড জিভঁশির মিনিমালিস্টিক কালারব্লকিং গাউন আর আইফেল টাওয়ার হেডপিসে দেখা যাচ্ছে জেন্ডায়াকে। কোয়ায়েট লাক্সারির ভক্ত দীপিকা পাড়ূকোনও মিনিমাল পোশাকের সঙ্গে পরছেন ম্যাক্সিমালিস্টিক পিস।
দীপিকা পাড়ূকোনও মিনিমাল পোশাকের সঙ্গে পরছেন ম্যাক্সিমালিস্টিক পিসতবে আজকাল ফ্যাশন দুনিয়ায় কোনো ট্রেন্ডই একেবারে টেক ওভার করছে বা বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে না। তাই ম্যাক্সিমালিজম ও মিনিমালিজমের সহাবস্থানই বেশি চোখে পড়ছে।
ফ্যাশন কখনোই শুধু পোশাকের গল্প নয়; এটি সময়, সমাজ, রুচি ও ব্যক্তিত্বের প্রতিচ্ছবি। একেকটি দশক যেমন নতুন ট্রেন্ডের জন্ম দেয়, তেমনি পুরোনো ট্রেন্ডকেও ফিরিয়ে আনে নতুনভাবে। বর্তমান সময়ে ফ্যাশন অঙ্গনের সবচেয়ে আলোচিত দুই বিপরীতধর্মী ট্রেন্ড বা ভাবধারা হলো মিনিমালিজম ও ম্যাক্সিমালিজম।
সংযম, পরিমিতি ও নীরব সৌন্দর্য ফুটে উঠেছে রাধিকা আম্বানির লুকে রঙের বৈচিত্র্য, অলংকরণ ও সাহসী আত্মপ্রকাশ ঘটে সমকালীন অনেক লুকেইএকদিকে সংযম, পরিমিতি ও নীরব সৌন্দর্য, অন্যদিকে রঙের বৈচিত্র্য, অলংকরণ ও সাহসী আত্মপ্রকাশ। এই দুই ভাবধারার সহাবস্থানই সমকালীন ফ্যাশনকে আরও বৈচিত্র্যময় করে তুলেছে।
অল্পের মধ্যেই পরিপূর্ণতা
মিনিমালিজমের মূল দর্শন হলো 'Less is more'। অর্থাৎ অল্প মানেই বেশি। অপ্রয়োজনীয় অলংকরণ বাদ দিয়ে নকশার সরলতা, নিখুঁত কাট, মানসম্মত ফেব্রিক ও নিউট্রাল কালারের ব্যবহারে তৈরি হয় ফ্যাশনের এই ভাবধারা। সাদা, কালো, ধূসর, বেইজ বা আর্দি টোনের পাশাপাশি ক্লিন সিলুয়েটই এখানে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পায়।
সাদা, কালো, ধূসর, বেইজ বা আর্দি টোনের পাশাপাশি ক্লিন সিলুয়েটই এখানে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পায়অপ্রয়োজনীয় অলংকরণ বাদ দিয়ে নকশার সরলতা, নিখুঁত কাট, মানসম্মত ফেব্রিক ও নিউট্রাল কালারের ব্যবহারে মিনিমালিজম দেখা যাচ্ছে অননন্যা পান্ডের লুকেসাম্প্রতিক বছরগুলোয় ক্যাপসুল ওয়ার্ডরোব ধারণার জনপ্রিয়তা মিনিমালিজমকে আরও এগিয়ে দিয়েছে। কয়েকটি মানসম্মত ও বহুমুখী পোশাক দিয়েই নানা উপলক্ষে স্টাইলিশ লুক তৈরি করার ধারণাই মিনিমালিজমের অন্যতম শক্তি। ফাস্ট ফ্যাশনের বিকল্প হিসেবে এই ট্রেন্ড সচেতন ভোক্তাদের মধ্যে ক্রমেই জনপ্রিয় হয়ে উঠছে।
যখন ‘বেশি’ই হয়ে ওঠে সৌন্দর্য
ম্যাক্সিমালিজমের দর্শন ঠিক উল্টো। এখানে বোল্ড রং, বড় প্রিন্ট, ভারী কারুকাজ, লেয়ারিং, স্টেটমেন্ট গয়না ও কিছুটা লাউড অনুষঙ্গের মাধ্যমে ফ্যাশন স্টেটমেন্ট প্রকাশ করা হয়। এই স্টাইলের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো স্বাধীনতা।
স্টেটমেন্ট গয়না ও কিছুটা লাউড অনুষঙ্গের মাধ্যমে ফ্যাশন স্টেটমেন্ট প্রকাশ করা হয় এখানে এই স্টাইলের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো স্বাধীনতাকোনো নির্দিষ্ট নিয়মের মধ্যে আটকে না থেকে নিজের রুচি ও সৃজনশীলতাকে প্রকাশ করাই ম্যাক্সিমালিজমের লক্ষ্য। সোশ্যাল মিডিয়ার যুগে ফ্যাশনের এই আগলভাঙা ভাবধারা নতুন গতি পেয়েছে।
ইনস্টাগ্রাম, টিকটক কিংবা রেড কার্পেট—সব জায়গাতেই ভিজ্যুয়ালি আকর্ষণীয়, ড্রামাটিক লুক দ্রুত নজর কাড়েইনস্টাগ্রাম, টিকটক কিংবা রেড কার্পেট—সব জায়গাতেই ভিজ্যুয়ালি আকর্ষণীয়, ড্রামাটিক লুক দ্রুত নজর কাড়ে। ফলে সাহসী ফ্যাশন স্টেটমেন্টের প্রতি আগ্রহও বেড়েছে ফ্যাশনিস্তাদের। আর তা এখন জায়গা করে নিয়েছে ব্যক্তিগত বা পারিবারিক ইভেন্ট ও ফটোশুটে।
এই দুই ট্রেন্ড কি আসলে সাংঘর্ষিক
মিনিমালিজম ও ম্যাক্সিমালিজমের এই পার্থক্য শুধু পোশাকের ক্ষেত্রেই নয়; বরং জীবনযাপনেরও প্রতিফলন। ব্যস্ত সময়ে অনেকেই শান্ত, পরিচ্ছন্ন ও ব্যবহারিক পোশাকের দিকে ঝুঁকছেন। আবার উৎসব, বিশেষ আয়োজন কিংবা আত্মপ্রকাশের মুহূর্তে অনেকের পছন্দ হয়ে উঠছে রঙিন, নাটকীয় ও অলংকৃত স্টাইল।
অনেকের পছন্দ হয়ে উঠছে রঙিন, নাটকীয় ও অলংকৃত স্টাইলমিনিমালিজম ও ম্যাক্সিমালিজমের সহাবস্থান আসলে সাংঘর্ষিক নয়; বরং স্থান–কাল-পাত্র ভেদে পরিপূরকঅর্থাৎ ফ্যাশন এখন আর একটি নির্দিষ্ট নিয়মে আবদ্ধ নয়; বরং মানুষের মুড, উপলক্ষ, জীবনধারা ও ব্যক্তিত্বের সঙ্গে তাল মিলিয়েই বদলে যাচ্ছে স্টাইলের ভাষা। তাই এখনকার ফ্যাশন–দর্শন অনুযায়ী, মিনিমালিজম ও ম্যাক্সিমালিজমের সহাবস্থান আসলে সাংঘর্ষিক নয়; বরং স্থান–কাল-পাত্র ভেদে পরিপূরক।
দুই ট্রেন্ডের মধ্যে কোনটি এগিয়ে
বাস্তবতা হলো কোন ট্রেন্ডটি এখন এগিয়ে, এই প্রশ্নের নির্দিষ্ট উত্তর নেই। কারণ, আজকের ফ্যাশন একমুখী নয়; বরং বহুমাত্রিক। তাই একই মৌসুমে বিশ্বের নামকরা ফ্যাশন হাউসগুলো একদিকে যেমন উপস্থাপন করছে সংযত ও মিনিমাল কালেকশন, অন্যদিকে বোল্ড কালার প্যালেট, বিস্তৃত অলংকরণ ও নাটকীয় সিলুয়েটের ম্যাক্সিমাল ডিজাইনও সমান গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরছে।
বর্তমান ফ্যাশনে দুটি ট্রেন্ডের মিশ্রণও দেখা যাচ্ছে। অনেক ফ্যাশনিস্তারাই এর নাম দিয়েছেন ‘মিনিম্যাক্স’বর্তমান ফ্যাশনে দুটি ট্রেন্ডের মিশ্রণও দেখা যাচ্ছে। অনেক ফ্যাশনিস্তারাই এর নাম দিয়েছেন ‘মিনিম্যাক্স’। যেমন মিনিমাল পোশাকের সঙ্গে নজরকাড়া অ্যাকসেসরি বা জমকালো পোশাকের সঙ্গে পরিমিত স্টাইলিং। এ রকম ভারসাম্যপূর্ণ উপস্থাপনাই অনেকের কাছে হয়ে উঠছে নতুন ফ্যাশন ল্যাঙ্গুয়েজ।
সমকালীন ফ্যাশনের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো ব্যক্তিস্বাধীনতা। এখানে নির্দিষ্ট কোনো স্টাইলই শেষ কথা নয়। কেউ যদি মিনিমালিজমের নীরব আভিজাত্যে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন, সেটিই তাঁর স্টাইল।
বৈচিত্র্য, আত্মপ্রকাশ ও ব্যক্তিত্বের উদ্যাপনই আগামী দিনের ফ্যাশনকে আরও সমৃদ্ধ করবেআবার কেউ যদি ম্যাক্সিমালিজমের বর্ণিল উচ্ছ্বাসে নিজের পরিচয় খুঁজে পান, সেটিও সমান গ্রহণযোগ্য। ফ্যাশনের ভবিষ্যৎ তাই কোনো একক ধারা বা ট্রেন্ডের নয়; বরং বৈচিত্র্য, আত্মপ্রকাশ ও ব্যক্তিত্বের উদ্যাপনই আগামী দিনের ফ্যাশনকে আরও সমৃদ্ধ করবে।
সূত্র: ভোগ, কসমোপলিটান
ছবি: ইন্সটাগ্রাম