মার্কিন রেলপথে নবায়নযোগ্য জ্বালানি: নেপথ্যে বাংলাদেশি গবেষক
· Prothom Alo

এখনো বিশ্বের নানা প্রান্তের রেল নেটওয়ার্কের বড় অংশের জ্বালানি ডিজেলনির্ভর। বিশ্বজুড়ে এই বিশাল রেল যোগাযোগের কারণে ব্যাপক পরিবেশদূষণ ঘটছে। বাড়ছে কার্বন নিঃসরণও। যুক্তরাষ্ট্রের বিশাল মালবাহী রেল যোগাযোগব্যবস্থায় পরিবেশবান্ধব ও সাশ্রয়ী জ্বালানির ব্যবহার নিয়ে কাজ করছেন বিজ্ঞানীরা। এই গবেষক দলের নেতৃত্ব দিচ্ছেন দুই বাংলাদেশি গবেষক। তাঁরা হলেন যুক্তরাষ্ট্রের ডিপার্টমেন্ট অব এনার্জির অধীন আরগন ন্যাশনাল ল্যাবের গবেষক চৌধুরী নাজিব সিদ্দিকী এবং ফরহাদ এইচ মাসুম।
Visit truewildgame.online for more information.
গবেষকেরা জানান, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘপাল্লার মোট পণ্যের প্রায় ৪০ শতাংশই পরিবহন করা হয় রেলপথে। ২০২৫ সালের এক গবেষণা অনুযায়ী, রেলে পণ্য পরিবহনের চাহিদা দিন দিন আরও বাড়ছে। ক্রমবর্ধমান এই চাহিদা মেটাতে এবং কার্বন নিঃসরণ কমাতে বিকল্প জ্বালানির কার্যকারিতা নিয়ে তাঁদের এই গবেষণা প্রতিবেদনটি প্রকাশিত হয়েছে।
চৌধুরী নাজিব সিদ্দিকীফরহাদ এইচ মাসুমযুক্তরাষ্ট্রের আরগন ন্যাশনাল ল্যাব পার্টিকেল ফিজিকস, কোয়ান্টাম ও সুপার কম্পিউটিং, ব্যাটারি এবং পরিবেশের ওপর বিভিন্ন জ্বালানির প্রভাব নিয়ে গবেষণার জন্য বিশ্বজুড়ে পরিচিত। এই ল্যাবের গবেষক চৌধুরী নাজিব সিদ্দিকী ইউনিভার্সিটি অব ওয়াশিংটন থেকে মাস্টার্স ও পিএইচডি সম্পন্ন করেছেন। বর্তমানে তিনি আরগন ন্যাশনাল ল্যাবে ট্রান্সপোর্টেশন এনার্জি অ্যানালিস্ট বা পরিবহন জ্বালানি বিশ্লেষক হিসেবে কাজ করছেন। এই প্রজেক্টের লিড অ্যানালিস্টও তিনি। তাঁর মূল গবেষণার বিষয় পরিবহন ও জ্বালানিব্যবস্থা।
শতভাগ নবায়নযোগ্য জ্বালানি কি সম্ভব?গবেষকেরা জানান, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘপাল্লার মোট পণ্যের প্রায় ৪০ শতাংশই পরিবহন করা হয় রেলপথে। ২০২৫ সালের এক গবেষণা অনুযায়ী, রেলে পণ্য পরিবহনের চাহিদা দিন দিন আরও বাড়ছে।
বৈদ্যুতিক যানবাহনের বিস্তার এবং চার্জিং অবকাঠামোর উন্নয়নের পারস্পরিক সম্পর্ক নিয়ে তিনি গবেষণা করেন। পাশাপাশি বিকল্প জ্বালানি, নতুন যানবাহন প্রযুক্তি এবং পণ্য পরিবহনব্যবস্থার জ্বালানিগত, পরিবেশগত ও অর্থনৈতিক প্রভাব নিয়ে আঞ্চলিক ও জাতীয় পর্যায়ে বিশ্লেষণ করেন তিনি।
অন্যদিকে, আরেক গবেষক ফরহাদ এইচ মাসুম ইউনিভার্সিটি অব জর্জিয়া থেকে অর্থনীতিতে মাস্টার্স এবং বনবিদ্যার ওপর পিএইচডি করেছেন। বর্তমানে তিনি আরগন ন্যাশনাল ল্যাবে এনার্জি সিস্টেমস অ্যানালিস্ট হিসেবে নবায়নযোগ্য জ্বালানির পরিবেশগত, অর্থনৈতিক ও সাপ্লাই চেইন-সংক্রান্ত প্রভাব নিয়ে কাজ করছেন। তিনি জাতিসংঘের মেরিটাইম শাখা ইন্টারন্যাশনাল মেরিটাইম অর্গানাইজেশনের বিশেষ গ্রুপে উপদেষ্টা হিসেবেও যুক্ত আছেন। এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের মেরিটাইম অ্যাকশন প্ল্যানের মূল লেখক হিসেবেও কাজ করেছেন তিনি।
আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার হিসাব অনুযায়ী, বিশ্বব্যাপী মোট কার্বন ডাই-অক্সাইড নির্গমনের প্রায় ১ শতাংশই আসে রেল পরিবহন খাত থেকে। খাতটি এখনো মূলত জীবাশ্ম জ্বালানির ওপরই নির্ভরশীল। ব্যাপক ডিজেল ব্যবহারের ফলে কার্বন নিঃসরণ ক্রমশ বাড়ছে। তাই রেল খাতকে কার্বনশূন্য করার লক্ষ্যে এখন বিদ্যুতায়ন ও নবায়নযোগ্য শক্তির ব্যবহারের ওপর সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। নতুন এই গবেষণায় বিজ্ঞানীরা সাতটি ভিন্ন ধরনের বিকল্প জ্বালানির কারিগরি, অর্থনৈতিক ও পরিবেশগত দিক বিশ্লেষণ করেছেন। এর মধ্যে বায়োফুয়েল বা জৈব জ্বালানি এবং অন্যান্য নবায়নযোগ্য উৎস থেকে পাওয়া জ্বালানি অন্যতম।
পারমাণবিক ফিউশন: পরবর্তী জ্বালানি বিপ্লবআন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার হিসাব অনুযায়ী, বিশ্বব্যাপী মোট কার্বন ডাই-অক্সাইড নির্গমনের প্রায় ১ শতাংশই আসে রেল পরিবহন খাত থেকে। খাতটি এখনো মূলত জীবাশ্ম জ্বালানির ওপরই নির্ভরশীল।
গবেষণার প্রধান বিশ্লেষক চৌধুরী নাজিব সিদ্দিকী বলেন, ‘বায়োফুয়েলের সম্ভাবনা অনেক। এ ধরনের জ্বালানি যুক্তরাষ্ট্রের রেল পরিবহন খাতের জন্য দ্রুত বাস্তবায়নযোগ্য ও পরিবেশবান্ধব একটি সমাধান হতে পারে। শুধু যুক্তরাষ্ট্রই নয়, যেকোনো দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা শক্তিশালী করতেই সহায়তা করতে পারে বায়োফুয়েল। এই গবেষণায় আমরা সাত ধরনের বায়োফুয়েলের উৎপাদন খরচ, রেল পরিচালন ব্যয়, আঞ্চলিক সরবরাহ ও চাহিদা এবং পরিবেশ ও স্বাস্থ্যের ওপর সম্ভাব্য প্রভাব বিশ্লেষণ করেছি।’
গবেষণার একটি প্রধান দিক ছিল নতুন এসব জ্বালানির পরিবেশগত প্রভাব বিশ্লেষণ করা। দেখা যায়, বর্জ্য শোধন প্রক্রিয়ার অবশিষ্টাংশ থেকে হাইড্রোথার্মাল লিকুইফ্যাকশন পদ্ধতিতে তৈরি নবায়নযোগ্য ডিজেল প্রচলিত ডিজেলের তুলনায় অত্যন্ত প্রতিযোগিতামূলক দামে বাজারজাত করা সম্ভব। প্রচলিত ডিজেল পোড়ালে যেখানে প্রতি মেগাজুলে ৮৮ গ্রাম কার্বন ডাই-অক্সাইড সমতুল্য গ্যাস নিঃসরণ হয়, সেখানে নবায়নযোগ্য ডিজেলের ক্ষেত্রে এটি মাত্র ৩৫ গ্রাম! অর্থাৎ পরিবেশের সুরক্ষা ও বৈশ্বিক উষ্ণায়ন ঠেকাতে নবায়নযোগ্য ডিজেল অনেক বেশি নিরাপদ ও কার্যকর।
গবেষক ফরহাদ এইচ মাসুম বলেন, ‘আমরা নবায়নযোগ্য জ্বালানির সব রকম পরিবেশগত প্রভাব নিয়ে গবেষণা করেছি। বৈশ্বিক উষ্ণায়নের প্রভাব বুঝতে কার্বন ডাই-অক্সাইড, মিথেন ও নাইট্রাস অক্সাইড নিঃসরণের মাত্রা পরিমাপ করেছি। পাশাপাশি বায়ুদূষণের অন্যান্য পরিমাপক, যেমন সালফার ও নাইট্রোজেন অক্সাইড এবং পার্টিকুলেট ম্যাটার কতটা নির্গত হয়, তা-ও মেপে দেখেছি। মূলত এই খাতের নবায়নযোগ্য জ্বালানিগুলো নিয়ে আমরা একটি পূর্ণাঙ্গ চিত্র তুলে ধরতে চেয়েছি।’
জীবাশ্ম জ্বালানি না থাকলে কী হতো?প্রচলিত ডিজেল পোড়ালে যেখানে প্রতি মেগাজুলে ৮৮ গ্রাম কার্বন ডাই-অক্সাইড সমতুল্য গ্যাস নিঃসরণ হয়, সেখানে নবায়নযোগ্য ডিজেলের ক্ষেত্রে এটি মাত্র ৩৫ গ্রাম!
বিজ্ঞানীরা জানান, নবায়নযোগ্য ডিজেল এবং বায়োডিজেল ব্যবহারের সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো, এগুলো ব্যবহারের জন্য রেল ইঞ্জিনে কোনো ধরনের পরিবর্তনের প্রয়োজন হয় না, কিংবা হলেও তা সামান্য। এ ধরনের জ্বালানিকে বলা হয় ড্রপ-ইন ফুয়েল। অন্যদিকে মিথানল বা ইথানল ব্যবহারের খরচ কিছুটা কম হলেও এগুলো ব্যবহারের জন্য ইঞ্জিনে বড় ধরনের পরিবর্তন আনতে হয়। এই গবেষণায় আরও যুক্ত ছিলেন ওক রিজ ন্যাশনাল ল্যাব ও প্যাসিফিক নর্থওয়েস্ট ন্যাশনাল ল্যাবের গবেষকেরাও। বিকল্প জ্বালানি ব্যবহারের ক্ষেত্রে নিরাপত্তার বিষয়টিকেও গবেষকেরা বেশ গুরুত্বের সঙ্গে দেখেছেন। যেমন অ্যামোনিয়াকে জ্বালানি হিসেবে ব্যবহারের ব্যাপক সম্ভাবনা থাকলেও এর বিষাক্ততা নিয়ে যথেষ্ট উদ্বেগ রয়েছে। এর জন্য প্রয়োজন সুপরিকল্পিত ব্যবস্থাপনা। তবে নবায়নযোগ্য ডিজেলকে প্রচলিত ডিজেলের মতোই বেশ নিরাপদভাবে ব্যবহার করা যায়।
নতুন এসব বিকল্প জ্বালানি বাংলাদেশের রেলখাতেও অনায়াসে ব্যবহার করা যেতে পারে। ফরহাদ এইচ মাসুম বলেন, ‘বিশেষ করে বর্জ্য থেকে যেসব জ্বালানি পাওয়া যায়, সেগুলো ব্যবহার করলে বৈশ্বিক উষ্ণায়ন প্রতিরোধের পাশাপাশি বাংলাদেশ আরও দুধরনের বাড়তি সুবিধা পেতে পারে। প্রথমত, বর্জ্য তখন আর কেবল বর্জ্য থাকবে না, তা সম্পদে বা কাঁচামালে পরিণত হবে। ফলে আরও সুপরিকল্পিত উপায়ে বর্জ্য সংগ্রহ করা হবে এবং পরিবেশ পরিষ্কার থাকবে। দ্বিতীয়ত, সাধারণ ডিজেলের পাশাপাশি পরিবেশবান্ধব এই নবায়নযোগ্য ডিজেল দেশের সামগ্রিক জ্বালানি সরবরাহ বাড়াতেও বড় ভূমিকা রাখবে।’
সূত্র: ইউএস ডিপার্টমেন্ট অব এনার্জি-অফিস অব সায়েন্সঅমূল্য জ্বালানি