হালদার মাছে ক্ষুদ্র প্লাস্টিক কণা, বাড়ছে শঙ্কা
· Prothom Alo

গবেষকদের ভাষ্য, সংযোগ খালে এবং হালদায় দূষণ বাড়ায় এই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।
Visit syntagm.co.za for more information.
ষাটোর্ধ্ব মৎস্যজীবী মো. কামাল উদ্দিনের চোখে হালদা নদী বদলে যেতে দেখার ইতিহাস প্রায় পাঁচ দশকের। এই নদী থেকেই তিনি পোনা সংগ্রহ করেন। নদীর স্রোত, পানির রং, মাছের চলাফেরা—সবই তাঁর চেনা। কিন্তু এখন আর সেই পুরোনো হালদাকে খুঁজে পান না।
হালদার কথা উঠতেই কিছুক্ষণ চুপ থাকেন তিনি। তারপর আক্ষেপ নিয়ে বলেন, ‘আগের মতো পানি আর স্বচ্ছ নেই। অনেক সময় ডলফিন ও মা মাছ মরে ভাসতে দেখি। চোখের সামনেই নদীটা শেষ হয়ে যাচ্ছে।’
কামাল উদ্দিনের এই আশঙ্কার সঙ্গে মিলেছে নতুন এক গবেষণার ফল। দেশের একমাত্র প্রাকৃতিক কার্প প্রজননক্ষেত্র হালদা নদীর মাছের শরীরে মিলেছে ক্ষুদ্র প্লাস্টিক কণা বা মাইক্রোপ্লাস্টিক। গবেষকদের ভাষ্য, হালদার এই পরিস্থিতিতে নদীর জীববৈচিত্র্য ও মানুষের খাদ্যনিরাপত্তা নিয়ে তৈরি হয়েছে নতুন উদ্বেগ। সংযোগ খালে এবং হালদায় দূষণ বাড়ায় এই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।
ঢাকা ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকদের করা ‘হালদা নদীর মাছের মধ্যে ক্ষুদ্র প্লাস্টিক দূষণ: বাংলাদেশের একটি প্রাকৃতিক কার্প প্রজননক্ষেত্র’ শীর্ষক গবেষণা সম্প্রতি জীববিজ্ঞান সাময়িকী ঢাকা ইউনিভার্সিটি জার্নাল অব বায়োলজিক্যাল সায়েন্স-এ প্রকাশিত হয়েছে।
গবেষণায় আলোচিত ক্ষুদ্র প্লাস্টিক কণা বা মাইক্রোপ্লাস্টিক হলো পাঁচ মিলিমিটারের চেয়ে ছোট প্লাস্টিক কণা। এসব কণা শুধু নদীর পানি দূষিত করে না, বিভিন্ন ক্ষতিকর রাসায়নিক ও ভারী ধাতু বহন করতে পারে। জলজ প্রাণীর শরীরে ঢুকে তা খাদ্যশৃঙ্খলের মাধ্যমে মানুষের শরীরেও পৌঁছানোর ঝুঁকি তৈরি করে।
গবেষক দলের সদস্য ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের হালদা রিভার রিসার্চ ল্যাবরেটরির সমন্বয়ক মো. মনজুরুল কিবরীয়া প্রথম আলোকে বলেন, নদীতে যে প্লাস্টিক বর্জ্য যাচ্ছে, তা ধীরে ধীরে ভেঙে ক্ষুদ্র কণায় পরিণত হচ্ছে এবং খাদ্যশৃঙ্খলের মাধ্যমে মাছের শরীরে ঢুকছে। এখনই উৎসগুলো বন্ধ করা না গেলে ভবিষ্যতে হালদার জীববৈচিত্র্য ও মাছের প্রজননব্যবস্থায় এর প্রভাব পড়তে পারে।
সব মাছেই প্লাস্টিক
হালদা থেকে কাতলা, মৃগেল, বেলে, গলদা চিংড়ি, শিলনসহ আট প্রজাতির ৪৮টি মাছ সংগ্রহ করে পরীক্ষা করেন গবেষকেরা। ফল ছিল একটাই—পরীক্ষা করা প্রতিটি মাছের শরীরেই মিলেছে মাইক্রোপ্লাস্টিক। অর্থাৎ নমুনার শতভাগ মাছ এই দূষণের শিকার।
প্রতি মাছের পরিপাকতন্ত্রে গড়ে ৬ দশমিক ৫টি এবং মাংসপেশিতে গড়ে ৬টি কণা পাওয়া গেছে। অর্থাৎ প্লাস্টিক কণা শুধু পাকস্থলীতে নয়, মানুষের খাওয়ার উপযোগী অংশেও পৌঁছে যাচ্ছে।
সবচেয়ে বেশি কণা মিলেছে শিলন মাছে। এ মাছের পরিপাকতন্ত্রে গড়ে ১০ দশমিক ৮টি এবং মাংসে ৮ দশমিক ২টি কণা পাওয়া গেছে।
গবেষণায় দেখা গেছে, পানির ওপরের স্তর ও তলদেশ—দুই জায়গায় বিচরণ করা মাছের শরীরে তুলনামূলক বেশি মাইক্রোপ্লাস্টিক জমা হয়েছে। গবেষকদের মতে, মাছের খাদ্যাভ্যাস ও বিচরণক্ষেত্রের সঙ্গে এর সম্পর্ক রয়েছে।
তন্তু, পাতলা স্তর, ভাঙা টুকরা, ফেনা ও দানাদার—এই পাঁচ ধরনের মাইক্রোপ্লাস্টিক শনাক্ত হয়েছে। সবচেয়ে বেশি পাওয়া গেছে তন্তুজাত কণা। মাছের মাংসে পাওয়া কণার ৮০ শতাংশের বেশি ছিল ৫০০ মাইক্রোমিটারের কম আকারের।
রাসায়নিক বিশ্লেষণে পলিপ্রোপিলিন, পলিথিলিন, পলিয়েস্টার ও পিইটিই ধরনের প্লাস্টিক পাওয়া গেছে। গবেষকদের ধারণা, প্যাকেটজাত পণ্য, প্লাস্টিক মোড়ক ও বস্ত্রশিল্পের বর্জ্য এ দূষণের অন্যতম উৎস।
খাল বেয়ে দূষণ
হালদার সঙ্গে সংযোগ রয়েছে ১৯টি খালের। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, খন্দকিয়া, কৃষ্ণখালী, কাটাখালী, মাদারী ও বোয়ালিয়া খাল দিয়ে সবচেয়ে বেশি দূষণ নদীতে পৌঁছায়। আবাসিক এলাকা, শিল্পকারখানা ও বাজারের বর্জ্য দিনের পর দিন এসব খাল বেয়ে গিয়ে মিশছে হালদায়।
এর মধ্যে সবচেয়ে উদ্বেগজনক চিত্র খন্দকিয়া খালে। কালুরঘাট শিল্প এলাকার বিভিন্ন কারখানার বর্জ্য এই খাল দিয়ে হালদায় গিয়ে পড়ছে। গত সোমবার দুপুরে খন্দকিয়া ও কাটাখালী খালের পাড়ে গিয়ে দেখা যায়, পানির স্বাভাবিক রং অনেক আগেই হারিয়ে গেছে। কালচে ঘোলা পানি ধীরগতিতে এগিয়ে যাচ্ছে হালদার দিকে। কোথাও কোথাও পানির ওপর ভাসছে প্লাস্টিক বর্জ্য, আবার কোথাও জমেছে তেলের মতো কালচে আস্তরণ। কয়েক শ গজ দূরেই এই পানি গিয়ে মিশছে হালদা নদীতে।
‘বাঁচাতে হবে হালদা’
মিঠাপানির কার্পজাতীয় মাছের প্রাকৃতিক প্রজননক্ষেত্র হিসেবে চট্টগ্রামের হালদা নদী বিশ্বে অনন্য। এটির উৎপত্তি খাগড়াছড়ির রামগড় উপজেলার পাহাড়ি এলাকা থেকে। প্রায় ৯৫ কিলোমিটার পথ অতিক্রম করে ফটিকছড়ি, হাটহাজারী ও রাউজান উপজেলার মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে এই নদী। মিশেছে কর্ণফুলী নদীতে।
এ নদীকে দূষণের হাত থেকে বাঁচাতে সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন বলে মনে করেন চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য এবং চট্টগ্রাম নদী ও খাল রক্ষা আন্দোলনের সভাপতি মুহাম্মদ মোজাম্মেল হক। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, খাল দিয়ে অপরিশোধিত বর্জ্য নদীতে মিশছে। দূষণ, বালু উত্তোলন ও ব্যবস্থাপনার ঘাটতির কারণে হালদা ক্রমেই সংকটে পড়ছে।
জানতে চাইলে চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা বলেন, হালদা বাঁচাতে গবেষকদের সঙ্গে আলোচনা করে প্রয়োজনীয় করণীয় নির্ধারণ এবং নদীকে দূষণের হাত থেকে রক্ষায় কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হবে।