পরাজয় ছাপিয়েও যখন বড় হয়ে ওঠে ফিরে আসার গল্প

· Prothom Alo

পরাজয় তো পরাজয়ই। তা সেটি ১ উইকেটে হোক বা ১০ উইকেটে।

ধ্যাৎ, বললেই হলো?

Visit rouesnews.click for more information.

সব জয় যেমন একরকম নয়, সব পরাজয়ও না। মিরপুরে রোববারের অতিপ্রাকৃত সন্ধ্যা যে মহানাটকীয়তার সাক্ষী হয়ে থাকল, জয়–পরাজয়ের মতো ‘তুচ্ছ’ ব্যাপার ছাপিয়ে তা আরও বড় কিছু হয়ে উঠতে চায়! শুধুই আরেকটি ওয়ানডে ম্যাচের সীমানায় তো কোনোভাবেই আটকে থাকে না।

নাজমুল হোসেন, ভারপ্রাপ্ত অধিনায়ক, বাংলাদেশ ওয়ানডে দলএই ম্যাচ আমাদের বিশ্বাস দিয়েছে, যেকোনো সময় আমরা ম্যাচে ফিরতে পারি।

স্কোরবোর্ড বলবে, বাংলাদেশ ১ উইকেটে হেরেছে। এটা তো শুধু ম্যাচের ফল। এতে কি আর আসলে কিছু বলা হয়! ১ উইকেটে জয়–পরাজয় তুমুল প্রতিদ্বন্দ্বিতাময় এক ম্যাচের কথা বলে বটে। তবে শুধু ওটুকুই। শেষ ৫ ওভারে হঠাৎই ম্যাচের রং বদলে যাওয়ার ওই রোমাঞ্চ, ওই নখ কামড়ানো উত্তেজনা বোঝানোর সাধ্য কি তার! খেলা দেখে থাকলে ভিন্ন কথা, নইলে স্কোরবোর্ড খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখলেই না কেউ বুঝবে, কী দুর্দান্ত এক প্রত্যাবর্তনের গল্পই না লিখেছে বাংলাদেশ! তা এমনই অভাবনীয় যে ম্যাচ হারার পরও অধিনায়ক প্রতিক্রিয়ায় অবলীলায় বলে ফেলছেন—‘ভেরি হ্যাপি’। পরে যেটির ব্যাখ্যাও দিয়েছেন অসুস্থ মিরাজের বদলে এই ম্যাচে নেতৃত্ব দেওয়া নাজমুল হোসেন। বলেছেন এই ম্যাচ থেকে আসল প্রাপ্তির কথাও—‘এই ম্যাচ আমাদের বিশ্বাস দিয়েছে, যেকোনো সময় আমরা ম্যাচে ফিরতে পারি।’ জয়–পরাজয়কে তুচ্ছ বলছিলাম না, এই বিশ্বাস তো আসলে তেমন কিছুই। বাংলাদেশের ওয়ানডে ইতিহাসে মাত্র দ্বিতীয়বারের মতো ১ উইকেটে পরাজয়ের দুঃখকেও যা ভুলিয়ে দেয়।

সেঞ্চুরির পর কুপার কনোলি

ম্যাচ দেখে থাকলে সেই ফিরে আসার শিহরণ জাগানো গল্পটা আপনার জানা। তারপরও যদি একটু রিওয়াইন্ড করে ম্যাচের শেষ ৬ ওভারে নিয়ে যাই! অস্ট্রেলিয়ার তখন দরকার ৩৬ রান, হাতে ৫ উইকেট। তার চেয়েও বড় কথা উইকেটে তখনো ১৩১ রানে অপরাজিত কুপার কনোলি। চোটের কারণে এই সফর মিস করা অস্ট্রেলিয়ার নিয়মিত ওয়ানডে অধিনায়ক মিচেল মার্শকে আদর্শ মেনে বেড়ে ওঠা ২২ বছরের তরুণ। এর আগে ১১ ম্যাচে যাঁর মাত্র একটিই ফিফটি। কিন্তু এদিন তাঁর ব্যাট যেন অস্ট্রেলিয়ার মান বাঁচানোর প্রতিজ্ঞায় শাণিত  তলোয়ার। প্রশ্নটা তখন ‘এই ম্যাচে কে জিতবে নয়’, বরং ‘অস্ট্রেলিয়া কয় উইকেটে জিতবে’।

নাটকীয়ভাবে ম্যাচে ফিরেও অস্ট্রেলিয়াকে ধবলধোলাই করা হলো না বাংলাদেশের

তাসকিনের পরের ওভারটি শেষে পরের প্রশ্নটাও প্রায় মুছে যাওয়ার মতো অবস্থা। পরপর তিন বলে কনোলির ছক্কা, তাসকিনের ওই ওভারেই ২১ রান। ম্যাচ তো সেখানেই ‘শেষ’। ৫ ওভারে মাত্রই তো ৯ রান লাগে অস্ট্রেলিয়ার। ৪৬তম ওভারটি করতে শরীফুলের হাতে বল তুলে দেওয়ার সময় নাজমুলও কি ভাবছিলেন, এই ওভারেই হয়তো শেষ হয়ে যেতে পারে ম্যাচ! বা শরীফুল? প্রথম ওভারেই যিনি ২ উইকেট নিয়েছেন, এরপর আরও একটি। প্রথম দুই ম্যাচে দর্শক হয়ে ছিলেন, নাহিদ রানাকে বিশ্রাম দেওয়ায় এই প্রথম সুযোগ পেয়েছেন সিরিজে। সেটিকে কী স্মরণীয়ই না করে রাখলেন এই বাঁহাতি পেসার! বাঁহাতি পরিচয়টা দিতে গিয়ে মনে হলো, এই ম্যাচটা তো ছিল আসলে দুই বাঁহাতিরই লড়াই। শরীফুল বাঁহাতি বোলার, কনোলি বাঁহাতি ব্যাটসম্যান। কনোলির উইকেটটা অবশ্য শরীফুল পাননি, সেটি নিয়েছেন ডেথ ওভারে তাঁকে যোগ্য সংগত করা মোস্তাফিজুর রহমান।

দুর্দান্ত বোলিং করে ৬ উইকেট নিয়েছেন শরীফুল ইসলাম

তবে সেটি তো ৪৯তম ওভারের ঘটনা। নবম ব্যাটসম্যান হিসেবে কুপার কনোলি যখন মোস্তাফিজের বলে প্লেড অন হয়ে ফিরেছেন, জয় থেকে অস্ট্রেলিয়ার দূরত্ব ৪ রানের। অস্ট্রেলিয়ার শেষ দুই ব্যাটসম্যানের জন্য সেটিও তো বড় চ্যালেঞ্জ।

ওয়ানডের যে ১০টি রেকর্ড (হয়তো) ভাঙবে না কোনো দিন

শেষের কথা আগে বলা হয়ে গেল। অস্ট্রেলিয়ার ১০–১১–কে ওই চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলার নায়ক তো আসলে শরীফুল। ৪৬তম ওভারে মাত্র ১ রান দিয়ে পরপর দুই বলে উইকেট নিয়েছেন। নিজের পরের ওভারে আরেকটি, সেটিতে তো রানই দেননি। আট বলের মধ্যে ৩ উইকেট। বাংলাদেশের পঞ্চম বোলার হিসেবে ওয়ানডেতে ৬ উইকেট নিয়েছেন। রান খরচের হিসাব বিবেচনায় নিলে বাংলাদেশের পক্ষে সেরা বোলিংয়ের তালিকায় তাঁর নামটা আসে ৫ নম্বরে। তা সবার ওপরেই থাকত, যদি স্লিপে জাম্পার ক্যাচটা ফেলে না দিতেন তানজিদ। সেটি হতো শরীফুলের সপ্তম উইকেট। শেষ ওভারের তৃতীয় বলে জাম্পা যখন বাউন্ডারিতে অস্ট্রেলিয়ার স্বস্তির এক জয় এনে দিলেন, শরীফুলের আক্ষেপটা নিশ্চয়ই বেড়ে গেছে আরও। যত না সপ্তম উইকেট না পাওয়ায়, তার চেয়ে বেশি ওই ক্যাচটি না পড়লে হয়তো বাংলাদেশ জিতে যায় ভেবে।

অস্ট্রেলিয়ার জয়ের নায়ক কুপার কনোলিকে ফিরিয়ে বাংলাদেশকে জয়ের খুব কাছে নিয়ে গিয়েছিলেন মোস্তাফিজুর রহমান

গত কিছুদিনে বাংলাদেশ দলে বদলে যাওয়া হাওয়া এভাবেই ভাবতে শিখিয়েছে ক্রিকেটারদের। ব্যক্তিগত প্রাপ্তি–অপ্রাপ্তির চেয়ে অনেক বড় দলীয় অর্জন। সেই অর্জনের দিক থেকেও স্মরণীয় হয়ে থাকবে এই সিরিজ। যে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে একমাত্র জয়টি ছিল ২১ বছর আগে, তাদের বিপক্ষে পরপর দুই ম্যাচ জিতে সিরিজ জয়! ধবলধোলাই করতে না পারার দুঃখের কথা বলছেন? শেষ ম্যাচের ওই লড়াই সেটিকেও মনে হয় ভুলিয়ে দিয়েছে।

বলছিলাম না, সব পরাজয় একরকম নয়!

টেস্ট ক্রিকেটের যে ১০টি রেকর্ড (হয়তো) ভাঙবে না কোনো দিন

Read full story at source