গাছে থোকায় থোকায় আঙুর, সমৃদ্ধির পথ পেয়ে গেছেন কৃষক জাহাঙ্গীর

· Prothom Alo

বিভিন্ন রকম চাষাবাদ করে কোনো রকমে সংসারের কোনোমতে সংসারের ঘানি টেনে নিচ্ছিলেন কৃষক জাহাঙ্গীর আলম (মিন্টু)। কৃষিকাজ থেকে যে সামান্য আয় হতো, তা দিয়ে ধীরে ধীরে কিছু জমিজমা কেনেন। আর্থিক টানাপোড়েনের কারণে নিজের বসতবাড়িটি পাকা করার স্বপ্নও পূরণ করতে পারেননি। কেননা অর্থনৈতিক স্বাচ্ছন্দ্য দেখা দিচ্ছিল না তাঁকে। এর মধ্যে এ বছর আঙুর ফলের চাষ করে বাজিমাত করেছেন জাহাঙ্গীর। মাত্র ২৫ শতাংশ জমি থেকে ১০ লাখ টাকার আঙুর ও চারা বিক্রি করেছেন। পেয়ে গেছেন অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির পথ।

৫০ বছর বয়সী জাহাঙ্গীর এখন আঙুর চাষকে ঘিরেই বড় স্বপ্ন দেখছেন। নতুন করে ৪৫ শতক জমিতে এই ফলের চাষ সম্প্রসারণ করেছেন। বিক্রি করছেন আঙুরের চারা। সেই সঙ্গে নতুন উদ্যোক্তাদের খেত প্রস্তুত করা থেকে ফল উৎপাদন পর্যন্ত পরামর্শ দিয়ে সহায়তা করছেন। জাহাঙ্গীরের আঙুর চাষের সাফল্যে যশোরে দেখা দিয়েছে নতুন এক সম্ভাবনা।

Visit biznow.biz for more information.

জাহাঙ্গীর আলম, কৃষকআমার ২৫ শতাংশ জমির আঙুর গাছের বয়স এক বছর। সাত মাসে গাছে ফল ধরে। ১০ মাস বয়স থেকে ফল পাকা শুরু হয়। ফল পাকা শুরু হলে প্রথমদিকে মাত্র দুই দিন বাজারে নিয়ে বিক্রি করেছি। এরপর আর বাজারে নিতে হয়নি। খেত থেকেই ৪০০ টাকা কেজি দরে ৪১ দিনে সব ফল বিক্রি হয়ে গেছে।

ইউটিউব দেখে আঙুর চাষে হাতেখড়ি

জাহাঙ্গীরের বাড়ি যশোরের মনিরামপুর উপজেলার কৃষ্ণবাটি গ্রামে। ১৯৯৫ সালে মাধ্যমিক পাস করার পর দালালের খপ্পরে পড়ে অবৈধপথে মালয়েশিয়ায় পাড়ি জমিয়েছিলেন। পরে সেদেশের পুলিশের হাতে আটক হন। ছয় মাস কারাগারে দুর্বিষহ বন্দিজীবন কাটিয়ে দেশে ফিরে আসেন। এরপর শুরু করেন চাষাবাদ। কৃষিকাজ থেকে সামান্য আয়ে চলতো তাঁর সংসার। কিন্তু আর্থিক সংকটের কারণে নিজের বসতবাড়িটিও ভালোভাবে গড়ে নির্মাণ করতে পারেননি তিনি।

আধুনিক কৃষির প্রতি শুরু থেকেই আগ্রহ ছিল জাহাঙ্গীরের। ইউটিউবে কৃষিবিষয়ক ভিডিও দেখে তিনি বাড়ির পাশের মাঠে ২৫ শতাংশ জমিতে আঙুর চাষ শুরু করেন। এ বছর আঙুর বিক্রি করে ভালো লাভ হওয়ায় নতুন করে আরও ৪৫ শতক জমিতে চাষ সম্প্রসারণ করেছেন। শুধু আঙুর উৎপাদনই নয়, একই সঙ্গে আঙুরের চারা তৈরি করেও বিক্রি করছেন। প্রতিটি চারা ২৫০ থেকে ৩০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।

জাহাঙ্গীর দুই জাতের আঙুর চাষ করেছেন। বাইকুনুর ও রাশিয়ান একেলো। জাহাঙ্গীর জানান, ইউটিউবে ঝিনাইদহের মহেশপুর উপজেলার যোগীহুদা গ্রামের একটি আঙুরখেতের ভিডিও দেখে তিনি উদ্বুদ্ধ হন। পরে সেখানে গিয়ে ৩০০ টাকা করে চারা কিনে এনে রোপণ করেন এবং ওই খেতের মালিকের পরামর্শে চাষ শুরু করেন।

১০ লাখ টাকা বিক্রি

গত ১ জুন বিকেলে কৃষ্ণবাটি গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, ফসলের মাঠের মাঝখানে জাল দিয়ে ঘেরা একটি ছোট আঙুরখেত। পিচের রাস্তা থেকে নেমে মাঠের মাঝ দিয়ে মোটরসাইকেল ও হেঁটে দলে দলে মানুষ ছুটছেন ওই খেতের দিকে।

খেতের সামনে গিয়ে দেখা গেল, অন্তত ৫০টি মোটরসাইকেল সারিবদ্ধভাবে রাখা। খেতের ভেতরে ২০০ থেকে ৩০০ মানুষের ভিড়। কেউ গাছে ঝুলে থাকা আঙুরের থোকা হাতে নিয়ে ছবি তুলছেন, কেউ ওজন করে আঙুর কিনছেন, কেউ চারা সংগ্রহ করতে এসেছেন, আবার কেউ এসেছেন খেতের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগ করতে। দর্শনার্থীদের জন্য খেতের সামনে আইসক্রিম, পানি ও পাঁপড় ভাজার দোকানও বসেছে।

জাহাঙ্গীর আলম বলেন, ‘আমার ২৫ শতাংশ জমির আঙুর গাছের বয়স এক বছর। সাত মাসে গাছে ফল ধরে। ১০ মাস বয়স থেকে ফল পাকা শুরু হয়। ফল পাকা শুরু হলে প্রথমদিকে মাত্র দুই দিন বাজারে নিয়ে বিক্রি করেছি। এরপর আর বাজারে নিতে হয়নি। খেত থেকেই ৪০০ টাকা কেজি দরে ৪১ দিনে সব ফল বিক্রি হয়ে গেছে।’
স্ত্রী, দুই মেয়ে ও এক ছেলে নিয়ে সংসার জাহাঙ্গীরের। বড় মেয়েকে স্নাতক পাস করিয়ে বিয়ে দিয়েছেন। মেজ মেয়ে যশোর সরকারি মহিলা কলেজে স্নাতক ভর্তি হয়েছেন। ছোট ছেলে এ বছর মাধ্যমিক পাস করেছে। পাঁচজনের সংসার খরচ চালাতে হিমশিম খেতে হতো তাঁকে। আঙুর চাষ তাঁকে স্বস্তি দিয়েছে।

এই কৃষক জানান, এক বছর পার না হতেই তিনি ৭ লাখ টাকার আঙুর ও তিন লাখ টাকার চারা বিক্রি করেছেন। খরচ হয়েছে ৩ লাখ টাকার মতো। ৭ লাখ টাকা মতো লাভ হয়েছে। ওই লাভের টাকা দিয়ে বসতবাড়ির ঘর করার কাজে হাত দেবেন। নতুন করে আরও ৪৫ শতক জমিতে আঙুর চাষ বাড়াবেন।

আঙুর খেতের যত্ন নিচ্ছেন জাহাঙ্গীর আলম। সম্প্রতি তোলা ছবি

একজন কৃষক থেকে ‘আঙুর বিশেষজ্ঞ’

সফল আঙুরচাষি হিসেবে এখন এলাকায় বিশেষ পরিচিতি পেয়েছেন জাহাঙ্গীর। আশপাশের মানুষ আঙুর চাষের বিষয়ে তাঁর কাছে পরামর্শ নিতে আসছেন। এমনকি কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারাও তাঁর কাছ থেকে চাষপদ্ধতি সম্পর্কে তথ্য নিচ্ছেন। জাহাঙ্গীর বলেন, ‘মালয়েশিয়ায় দুর্বিষহ বন্দিজীবনের কথা মনে পড়লে এখনো শিউরে উঠি। তবে এখন জীবনের চাকা ঘোরানোর পথ পেয়ে গেছি।’

আঙুর চাষে জাহাঙ্গীরের বাজিমাত খেত দেখে অনেকে উদ্বুদ্ধ হচ্ছেন আঙুর চাষে। এ বছর অন্তত পাঁচজনের নতুন আঙুর খেত প্রস্তুত করতে সহায়তা করেছেন জাহাঙ্গীর। কৃষ্ণবাটি গ্রামসহ আশপাশের তিনটি গ্রামের মাঠে এখন আঙুর চাষ সম্প্রসারণ ঘটেছে। এ বছর নতুন করে ১৪ জন চাষি আঙুর চাষ শুরু করেছেন। মনিরামপুরের পাশাপাশি যশোর সদর উপজেলার হৈবতপুর, ঝিকরগাছা উপজেলার ছুটিপুরসহ বিভিন্ন গ্রামে অন্তত ৩০ জন চাষি আমদানি নির্ভর এই ফল চাষে ঝুঁকেছেন।

জাহাঙ্গীর জানান, আঙুরের চারা তৈরি করেও অনেক টাকা লাভ হচ্ছে। সারা বছর চারা বিক্রি হবে। ইতিমধ্যে অনেকে তাঁর আঙুরখেত দেখে চাষে আগ্রহী হয়েছেন। তিনি বলেন, ‘আমার তৈরি চারা নিয়ে আমি অন্তত পাঁচজনের খেত প্রস্তুত করে দিয়েছি। এর মধ্যে বাঘারপাড়া উপজেলার খাজুরা গ্রামের হাফিজুর রহমানের ৩৩ শতকের তিন বিঘা, নড়াইলের রূপগঞ্জ এলাকার মিলনের চার বিঘা এবং মনিরামপুর উপজেলার ঘুঘরাইল গ্রামের আবদুর রাজ্জাকের ১৪ শতক জমিতে আঙুর চাষের জন্য খেত প্রস্তুত করে দিয়েছি।’

জাহাঙ্গীরের ভাই রিপন হোসেনও কৃষ্ণবাটি গ্রামের মাঠে ২০ শতক জমিতে আঙুর চাষ করেছেন। তাঁর খেতে গিয়ে দেখা যায়, জাহাঙ্গীরের তুলনায় ফলন কিছুটা কম। এ বিষয়ে রিপন হোসেন বলেন, ‘জাহাঙ্গীর ভাইয়ের খেত দেখে আমিও আঙুর চাষ শুরু করি। আমার গাছ একটু দেরিতে রোপণ করা হয়েছে। এ জন্য ফলন কমে গেছে। তবে এখন ভালোভাবে প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে। আমাদের দেখে পাশের তিন গ্রামের অন্তত ১৪ জন নতুন করে আঙুর চাষ শুরু করেছেন।’

সম্ভাবনার মাঝেও বড় বাধা ‘ডরমেক্স’

আঙুরের এত ভালো ফলনের মাঝেও জাহাঙ্গীর ও রিপন হোসেনদের কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়েছে। কারণ, আঙুর চাষে ব্যবহৃত ‘ডরমেক্স’ নামের একটি গুরুত্বপূর্ণ ওষুধ আমদানির সরকারি অনুমোদন নেই। দেশেও এটি উৎপাদিত হয় না। ফলে কৃষকদের চোরাইপথে ভারত থেকে উচ্চমূল্যে ওষুধটি সংগ্রহ করতে হয়।

জাহাঙ্গীর আলম বলেন, ‘আঙুর চাষের অনেক সম্ভাবনা রয়েছে। কিন্তু আমরা মার খেয়ে যাচ্ছি ডরমেক্স ওষুধ সংগ্রহ করতে গিয়ে। এই ওষুধ ছাড়া আঙুর চাষ হবেই না। চোরাই পথে আনার সময়ে এই মূল্যবান ওষুধের দুই-একটি চালানে ভালো কাজ করে না, অর্থাৎ ভেজাল থাকে। আমাদের দাবি, সরকার এই ওষুধ আমদানির অনুমোদন দিক। তাহলে আঙুর আমদানি কমবে, দেশের কৃষক বাঁচবে। মানুষও কম দামে আঙুরের মতো দামি ফল সহজে খেতে পারবে।’

এ বিষয়ে জানতে চাইলে কৃষি বিপণন অধিদপ্তর যশোরের জ্যেষ্ঠ কৃষি বিপণন কর্মকর্তা কিশোর কুমার সাহা প্রথম আলো বলেন, ‘আমি নিজে জাহাঙ্গীর ও রিপন হোসেনসহ কয়েকজন আঙুর চাষির খেত পরিদর্শন করেছি। তাঁদের দাবিটি যোৗক্তিক। এই চাষ সংক্রান্ত ওষুধ আমদানির বিষয়ে আমরা সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠাচ্ছি।’

Read full story at source