‘ট্রেন টু পাকিস্তান’–এ লেখক কিসের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেছেন
· Prothom Alo

১৯৪৭ সালের ভারত বিভাজন ভারতীয় উপমহাদেশের ইতিহাসে কেবল একটি রাজনৈতিক মানচিত্রের পরিবর্তন ছিল না। এটি ছিল কোটি মানুষের দীর্ঘশ্বাস, আকস্মিক বাস্তুচ্যুতি এবং ইতিহাসের অন্যতম নৃশংস ও রক্তক্ষয়ী অধ্যায়। এই অভূতপূর্ব মানবিক বিপর্যয় ও সাম্প্রদায়িক দাঙ্গাকে কেন্দ্র করে প্রখ্যাত লেখক ও সাংবাদিক খুশবন্ত সিং রচনা করেছেন তাঁর কালজয়ী উপন্যাস ‘ট্রেন টু পাকিস্তান’। আনোয়ার হোসেন মঞ্জুর সাবলীল ও চমৎকার বাংলা অনুবাদে বইটি মূল উপন্যাসের সেই বিষাদময়, থমথমে ও শিউরে ওঠার মতো আবহকে অত্যন্ত জীবন্তভাবে বাঙালি পাঠকের সামনে তুলে ধরেছে, যা কেবল ইতিহাসের একটি শুষ্ক দলিল নয়, বরং সাম্প্রদায়িকতার আগুনে পুড়তে থাকা মানবতার এক মর্মস্পর্শী আর্তনাদ।
উপন্যাসের মূল পটভূমি ভারত-পাকিস্তান সীমান্তের অবিকল একচিলতে ভারতের প্রতীক—‘মানো মাজরা’ নামের একটি প্রত্যন্ত ও শান্ত গ্রাম। এ গ্রামের বিশেষত্ব ছিল এর সরলতা এবং যুগ যুগ ধরে চলে আসা ধর্মীয় সম্প্রীতি, যেখানে শিখ এবং মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষ একে অপরের সুখ-দুঃখে, উৎসবে-পার্বণে পরম ভ্রাতৃত্বের সঙ্গে বসবাস করত। বাহ্যিক পৃথিবীর রাজনৈতিক কোলাহল বা ‘দ্বিজাতি তত্ত্বের’ মতো জটিল সমীকরণ এ গ্রামের মানুষের সহজ–সরল জীবনকে স্পর্শ করতে পারেনি। তাদের সকাল হতো ট্রেনের হুইসেল শুনে এবং রাত হতো শেষ ট্রেনের শব্দে। কিন্তু দেশভাগের রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত এবং তার ফলে সৃষ্ট সাম্প্রদায়িকতার বিষাক্ত হাওয়া যখন এই শান্ত গ্রামে এসে পৌঁছায়, তখন চিরচেনা চেনা জগৎটা রাতারাতি অচেনা হয়ে যায় এবং বিশ্বাসের জায়গায় বাসা বাঁধে চরম অবিশ্বাস।
Visit afnews.co.za for more information.
এই শান্ত কাহিনির মোড় ঘুরতে শুরু করে যখন পাকিস্তান থেকে শিখ ও হিন্দুদের অ্যাকাউন্টহীন রক্তাক্ত, ক্ষতবিক্ষত লাশ বোঝাই একটি ‘ভুতুড়ে ট্রেন’ মানো মাজরা স্টেশনে এসে পৌঁছায়। ট্রেনের কামরাগুলো ছিল লাশের স্তূপ, যা ছিল সীমানার ওপারে চলা নারকীয় তাণ্ডবের জীবন্ত প্রমাণ এবং এই ভয়ানক দৃশ্য পুরো গ্রামের শান্ত পরিবেশকে বিষাক্ত করে তোলে। এর পরপরই শুরু হয় মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ, যেখানে দীর্ঘদিনের চেনা প্রতিবেশীদের মধ্যে সন্দেহের দেয়াল তৈরি হয়। যে শিখরা মুসলিমদের ভাই ভাবত, তারা নিজেদের নিরাপত্তার স্বার্থে মুসলিমদের ওপর সন্দেহ করতে শুরু করে। লেখক অত্যন্ত নিপুণভাবে দেখিয়েছেন—কীভাবে বহিরাগত উগ্রবাদীরা এসে স্থানীয় যুবকদের মগজ ধোলাই করে এবং প্রতিশোধের আগুনে সবাইকে অন্ধ করে তোলে। ফলে এই চরম সংকটের মুখে উপন্যাসের চরিত্রগুলো ভিন্ন ভিন্ন সামাজিক ও মানসিক রূপ ধারণ করে।
গ্রামের অবাধ্য ও কুখ্যাত ডাকাত জুগ্গা বা জগগত সিং। যে কিনা এক মুসলিম মেয়ে নোরানের প্রেমে পড়েছিল। সে শেষ পর্যন্ত চরম মানবিকতার পরিচয় দেয়। আপাতদৃষ্টিতে সে সমাজের চোখে অপরাধী হলেও উপন্যাসের শেষে যখন সবাই চরম হিংস্রতায় মেতে ওঠে, তখন এই তথাকথিত ‘অপরাধী’ জুগ্গাই নিজের জীবনের পরোয়া না করে, ট্রেনের ওপর বাঁধা দড়ি কেটে দিয়ে শত শত মুসলিম শরণার্থীর জীবন বাঁচায়। অন্যদিকে শহরের শিক্ষিত ও সমাজতান্ত্রিক ভাবধারার যুবক ইকবাল সিং। যে বড় বড় তাত্ত্বিক কথা বলত ও সমাজ পরিবর্তনের স্বপ্ন দেখাত, সে সংকটের মুহূর্তে কোনো বাস্তব সমাধান দিতে পারে না এবং নৈতিক দায়িত্ব এড়িয়ে নিজের চামড়া বাঁচাতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। যার মাধ্যমে লেখক তৎকালীন বুদ্ধিজীবী সমাজের নিষ্ক্রিয়তাকে খোঁচা দিয়েছেন। আবার ম্যাজিস্ট্রেট হুকুম চাঁদ চরিত্রটির মাধ্যমে প্রশাসন ও আইনব্যবস্থার ভেঙে পড়া রূপ ও পরিস্থিতির চাপে একজন মানুষের ভেতরের নৈতিক দ্বন্দ্ব ও অসহায়ত্বকে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে।
‘আরেক ফাল্গুন’–এ জহির রায়হান ‘ফাল্গুন’ বলতে কী বুঝিয়েছেনএ উপন্যাসে রেলগাড়ি বা ট্রেন কেবল যাতায়াতের মাধ্যম নয়, বরং এটি উপন্যাসের অন্যতম প্রধান একটি প্রতীকী চরিত্র হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। গল্পের শুরুতে ট্রেন জীবনযাত্রা, গতি ও শৃঙ্খলার প্রতীক হলেও কাহিনির অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে তা হয়ে ওঠে মৃত্যু, ধ্বংস, বাস্তুচ্যুতি এবং দেশভাগের নির্মমতার এক শক্তিশালী ও ভয়াবহ রূপ, যা মূলত দুই দেশের মানুষের হাহাকার ও লাশের বোঝা বহনকারী এক যমদূতে পরিণত হয়েছিল। খুশবন্ত সিংয়ের সবচেয়ে বড় সার্থকতা হলো তিনি এই উপন্যাসে কোনো নির্দিষ্ট ধর্ম বা সম্প্রদায়কে এককভাবে দোষারোপ করেননি। বরং দেখিয়েছেন কীভাবে সাধারণ ও ভালো মানুষগুলোও পরিস্থিতির শিকার হয়ে অন্ধ–হিংস্রতায় মেতে ওঠে।
পরিস্থিতি কীভাবে রাতারাতি মানুষকে পশুতে রূপান্তর করতে পারে, তার এক গভীর মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ রয়েছে এখানে। পরিশেষে বলা যায়, ‘ট্রেন টু পাকিস্তান’ কেবল একটি ঐতিহাসিক ট্র্যাজেডির বিবরণ নয়। বরং যুগে যুগে সাম্প্রদায়িকতা ও ঘৃণার বিরুদ্ধে এক তীব্র শৈল্পিক প্রতিবাদ, যা মানবতা ও ভালোবাসার চরম আত্মত্যাগের মধ্য দিয়ে শেষ হয় এবং পাঠককে এক গভীর আত্মোপলব্ধির মুখোমুখি দাঁড় করায়।
বন্ধু, দিনাজপুর বন্ধুসভা