প্রধানমন্ত্রী যাচ্ছেন ডুলাহাজারা সাফারি পার্কে, কী আছে সেখানে

· Prothom Alo

১৩ জুন কক্সবাজারের ডুলাহাজারা সাফারি পার্ক পরিদর্শনে যাওয়ার কথা প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের। সমুদ্রসৈকতের জন্য পরিচিত কক্সবাজারে বহু পর্যটক গেলেও জেলার অন্যতম আকর্ষণ এই সাফারি পার্ক। এটি দেশের প্রথম সাফারি পার্ক। পাহাড়, বন, জলাধার আর উন্মুক্ত পরিবেশে বিচরণকারী শত শত প্রাণী নিয়ে গড়ে উঠেছে এই অনন্য বন্য প্রাণীর জগৎ।

কক্সবাজারের চকরিয়া উপজেলার ডুলাহাজারায় অবস্থিত পার্কটি। চট্টগ্রাম শহর থেকে এর দূরত্ব প্রায় ১০৭ কিলোমিটার। কক্সবাজার শহর থেকে প্রায় ৪৭ কিলোমিটার। এই সাফারি পার্কের যাত্রা শুরু ১৯৮০-৮১ অর্থবছরে। তখন ৪২ দশমিক ৫ হেক্টর বনভূমি নিয়ে এখানে একটি হরিণ প্রজননকেন্দ্র গড়ে তোলে বন বিভাগ। পরে দেশের প্রথম সাফারি পার্ক প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেওয়া হয়। ১৯৯৯ থেকে ২০০১ সালের মধ্যে এর পরিসর বাড়িয়ে ৩০০ হেক্টর করা হয়। দ্বিতীয় পর্যায়ে ২০০২ থেকে ২০০৬ সালের মধ্যে আয়তন বাড়িয়ে করা হয় ৯০০ হেক্টর। এরপর ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন করা হয় একাধিক উন্নয়ন প্রকল্প।

Visit asg-reflektory.pl for more information.

২০১৬ সালে দেশি-বিদেশি বিশেষজ্ঞদের সহায়তায় অনুমোদন পায় ১০ বছর মেয়াদি মহাপরিকল্পনা। সেই পরিকল্পনার অংশ হিসেবে ২০১৯ সাল থেকে চলছে উন্নয়ন ও সম্প্রসারণ প্রকল্প।

বন বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, ডুলাহাজারার বর্তমান রূপের ভিত্তি তৈরি হয় ২০০১ থেকে ২০০৬ সালের মধ্যে। ওই সময় পার্কটির আয়তন তিন গুণ বাড়িয়ে ৯০০ হেক্টরে উন্নীত করা হয়। গড়ে ওঠে মূল অবকাঠামো। তখন ক্ষমতায় ছিল বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার। বন্য প্রাণী সংরক্ষণ, গবেষণা, শিক্ষা, ইকো-ট্যুরিজম ও বিনোদনের সুযোগ সৃষ্টিই ছিল এই উদ্যোগের প্রধান লক্ষ্য।

জানতে চাইলে বন্য প্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগ চট্টগ্রামের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা আবু নাছের মোহাম্মদ ইয়াছিন নেওয়াজ প্রথম আলোকে বলেন, ‘১৩ জুন দুপুরে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ডুলাহাজারা সাফারি পার্কে আসবেন বলে কথা রয়েছে। বহু বছর আগে তিনি এখানে এসেছিলেন। তখন পার্কটি তাঁর ভালো লেগেছিল। এবার আবার আসছেন। আমরা প্রস্তুতি শেষ করেছি।’

হাজারো প্রাণীর আবাস

ডুলাহাজারা এখন দেশের অন্যতম বড় বন্য প্রাণী সংগ্রহশালা। পার্ক কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, বিভিন্ন বেষ্টনীতে রয়েছে ৫২ প্রজাতির ৩৪১টি প্রাণী। এর মধ্যে আছে সিংহ, বাঘ, জেব্রা, ওয়াইল্ডবিস্ট, জলহস্তী, কুমির, অজগর, হাতি, ভালুক, ময়ূর ও বিভিন্ন প্রজাতির হরিণ।

অন্যদিকে উন্মুক্ত পরিবেশে বিচরণ করছে ১২৩ প্রজাতির প্রায় এক হাজার প্রাণী। এ তালিকায় রয়েছে গুইসাপ, শজারু, বনরুই, মার্বেল ক্যাট ও বাগডাশের মতো বন্য প্রাণী। সাফারি পার্কের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. মনজুরুল আলম প্রথম আলোকে বলেন, ‘এখানে ৭টি বাঘ, ৬টি সিংহ ও ২৪টি ভালুক রয়েছে। এ ছাড়া জলহস্তী, কুমির, বনগরু, সাম্বার হরিণ, চিত্রা হরিণ, নীলগাই, বুনো শূকর, বানর, সরীসৃপ ও নানা প্রজাতির পাখি আছে।’ তিনি বলেন, অনেক প্রাণী বেষ্টনীতে থাকলেও অধিকাংশের জন্য রয়েছে বিস্তীর্ণ উন্মুক্ত এলাকা। ফলে দর্শনার্থীরা তাদের স্বাভাবিক আচরণ কাছ থেকে দেখতে পারেন।

সাফারি পার্কে শিশুদের খেলার জায়গা

ডুলাহাজারা সাফারি পার্কে বর্তমানে পাঁচটি হাতি রয়েছে। পাশাপাশি পার্কসংলগ্ন বনাঞ্চল দীর্ঘদিন ধরে বন্য হাতির বিচরণক্ষেত্র হিসেবে পরিচিত। বন বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, কক্সবাজার ও চট্টগ্রামের বিভিন্ন বনাঞ্চলের সঙ্গে এই এলাকার সংযোগ থাকায় হাতির চলাচল এখনো অব্যাহত রয়েছে।

অন্যদিকে সাফারি পার্কের সবচেয়ে জনপ্রিয় অংশ প্রাণী সাফারি জোন। বিশেষ যানবাহনে বসে নিরাপদ দূরত্ব থেকে বাঘ, সিংহ, ভালুক ও তৃণভোজী প্রাণীর বিচরণ দেখা যায়। শিশুদের কাছে বিশেষ আকর্ষণ জলহস্তী, কুমির, ময়ূর, বানর ও হরিণ। টিকিটের দাম ৫০ টাকা থেকে এক হাজার টাকা।

শুধু প্রাণী নয়, গাছপালারও অভয়ারণ্য

ডুলাহাজারাকে অনেকে বাঘ, সিংহ বা হাতির আবাস হিসেবে চেনেন। কিন্তু সাম্প্রতিক গবেষণা বলছে, এটি দেশের অন্যতম সমৃদ্ধ উদ্ভিদভিত্তিক বাস্তুতন্ত্রও।

গবেষণায় দেখা গেছে, ৯০০ হেক্টরের এই পার্কে রয়েছে শত শত প্রজাতির দেশীয় গাছপালা, ঝোপঝাড়, লতাগুল্ম ও অর্কিড। গবেষকেরা একে বাংলাদেশের উদ্ভিদবৈচিত্র্যের গুরুত্বপূর্ণ ভান্ডার হিসেবে উল্লেখ করেছেন।

২০২৩ সালে ‘জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ ও জীব সম্পদ ব্যবস্থাপনা সাময়িকী’তে প্রকাশিত ‘কক্সবাজারের ডুলাহাজারা সাফারি পার্কের বৃক্ষ প্রজাতির প্রাকৃতিক পুনর্জন্মের সম্ভাবনা মূল্যায়ন’ শীর্ষক গবেষণায় দেখা যায়, পার্কটিতে প্রাকৃতিকভাবে বন পুনরুজ্জীবনের ভালো সক্ষমতা রয়েছে।

পার্কের উন্মুক্ত পরিবেশে বিচরণ করছে ১২৩ প্রজাতির প্রায় এক হাজার প্রাণী। এ তালিকায় রয়েছে গুইসাপ, শজারু, বনরুই, মার্বেল ক্যাট ও বাগডাশের মতো বন্য প্রাণী। এ ছাড়া এই পার্কে রয়েছে শত শত প্রজাতির দেশীয় গাছপালা, ঝোপঝাড়, লতাগুল্ম ও অর্কিড। গবেষকেরা একে বাংলাদেশের উদ্ভিদবৈচিত্র্যের গুরুত্বপূর্ণ ভান্ডার হিসেবে উল্লেখ করেছেন।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকেরা সেখানে ৫৬ প্রজাতির বৃক্ষের ৮৩৫টি চারা শনাক্ত করেন। তাঁদের মতে, যথাযথ সংরক্ষণ নিশ্চিত করা গেলে বনজ জীববৈচিত্র্য আরও সমৃদ্ধ হতে পারে।

গবেষণায় আরও উল্লেখ করা হয়, অতীতে মানববসতি সম্প্রসারণ, অবৈধ বৃক্ষনিধন, বনভূমি দখল ও ভূমি ব্যবহারের পরিবর্তনের কারণে অনেক দেশীয় উদ্ভিদ ও বন্য প্রাণী হারিয়ে যেতে শুরু করেছিল। সাফারি পার্ক প্রতিষ্ঠার অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল সেই হারিয়ে যাওয়া সম্পদকে সংরক্ষণ করা।

গবেষণাটির তত্ত্বাবধানে ছিলেন বনবিদ্যা ও পরিবেশবিজ্ঞান ইনস্টিটিউটের সংখ্যাতিরিক্ত অধ্যাপক মোহাম্মদ কামাল হোসাইন। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘এটি শুধু প্রাণীর নয়, গাছপালারও অভয়ারণ্য। এখানে প্রাকৃতিকভাবে বন পুনর্জন্মের সক্ষমতা রয়েছে। গর্জন, তেলসুর, হরিণাগোলাসহ বহু দেশীয় বৃক্ষ এখনো টিকে আছে।’

সাফারি পার্কে রয়েছে সাতটি বাঘ

পর্যটকদের অন্যতম গন্তব্য

প্রতিবছর লাখো দর্শনার্থী ডুলাহাজারা সাফারি পার্কে আসেন। পর্যটন মৌসুমে প্রতিদিন কয়েক হাজার মানুষ এখানে ভিড় করেন। অন্য সময়ে প্রতিদিন পাঁচ শতাধিক দর্শনার্থী আসেন।

কক্সবাজার ভ্রমণে যাওয়া পর্যটকদের বড় একটি অংশ সমুদ্রসৈকতের পাশাপাশি ডুলাহাজারাও ঘুরে দেখেন।

ডুলাহাজারার সাফল্যের পাশাপাশি কিছু চ্যালেঞ্জও রয়েছে। বন বিভাগের চলমান উন্নয়ন প্রকল্পে প্রাণীর আবাসস্থল উন্নয়ন, খাদ্য ও চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করা, পর্যটন সুবিধা বৃদ্ধি এবং আধুনিক সাফারি পার্ক হিসেবে গড়ে তোলার বিষয়গুলোকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে।

অন্যদিকে ২০২৩ সালে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকেরা পার্কটির সংরক্ষণ ও ব্যবস্থাপনা কার্যক্রম আরও জোরদার করার সুপারিশ করেছেন। গবেষণায় স্থানীয় কিছু মানুষের অবৈধ কর্মকাণ্ডকে জীববৈচিত্র্যের জন্য হুমকি হিসেবেও উল্লেখ করা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর সফরকে ঘিরে তাই আবারও আলোচনায় এসেছে ডুলাহাজারা। দেশের প্রথম সাফারি পার্কটি শুধু পর্যটনকেন্দ্র নয়, এটি বাংলাদেশের বন্য প্রাণী ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ ঠিকানা।

Read full story at source