বিরল ও প্রাণঘাতী রোগ হেমোফ্যাগোসাইটিক লিম্ফোহিস্টিওসাইটোসিস (এইচএলএইচ) কী ও কেন হয়
· Prothom Alo
আফগানিস্তানের পেসার শাপুর জাদরান আক্রান্ত বিরল ও প্রাণঘাতী রোগে। বর্তমানে ভারতের একটি হাসপাতালের নিবিড় পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রে মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ছেন।
মাঠের লড়াকু পেসার হিসেবে আফগানিস্তানের শাপুর জাদরানের নাম বিশ্ব ক্রিকেটে সুপরিচিত। ২০১৫ বিশ্বকাপে স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে তাঁর ঐতিহাসিক জয়সূচক শট আজও ক্রিকেট–ভক্তদের মনে গেঁথে আছে। কিন্তু বর্তমানে এই বাঁহাতি পেসার মাঠের বাইরের এক কঠিনতম পিচে লড়াই করছেন, যেখানে প্রতিপক্ষ কোনো ব্যাটার নয়, বরং এক বিরল ও প্রাণঘাতী রোগ—হেমোফ্যাগোসাইটিক লিম্ফোহিস্টিওসাইটোসিস (এইচএলএইচ)। সম্প্রতি এই ক্রিকেটারের অসুখের খবর বিশ্বজুড়ে ভক্ত ও চিকিৎসাবিশেষজ্ঞদের মধ্যে গভীর উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে। তিনি বর্তমানে ভারতের দিল্লির একটি হাসপাতালের নিবিড় পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রে মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ছেন।
Visit lebandit.lat for more information.
এ লড়াইয়ে শাপুর জাদরানের শরীরের ওজন প্রায় ১৪ কেজি কমে গেছেশাপুর জাদরানের কী রোগ, কেন হয়, প্রতিকার কী জানুন।
শাপুর জাদরানের বর্তমান শারীরিক অবস্থা
সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, শাপুর জাদরান গত বছরের অক্টোবর মাস থেকে অসুস্থবোধ করতে শুরু করেন। কিন্তু রোগটি শনাক্ত হতে বেশ সময় লেগে যায়, যা এইচএলএইচের ক্ষেত্রে একটি বড় চ্যালেঞ্জ। বর্তমানে তাঁর শারীরিক পরিস্থিতি অত্যন্ত জটিল হওয়ার কারণগুলো—
১. সংক্রমণের বিস্তার।
২. তাঁর শরীরে যক্ষ্মা বা টিউবারকিউলোসিস ধরা পড়েছে, যা কেবল ফুসফুসে সীমাবদ্ধ নেই, বরং রক্তপ্রবাহের মাধ্যমে তাঁর মস্তিষ্কেও ছড়িয়ে পড়েছে।
৩. ডেঙ্গু ও ইমিউন ডেফিসিয়েন্সি।
৪. চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি ডেঙ্গুতেও আক্রান্ত হন। এইচএলএইচ রোগের কারণে তাঁর রোগ প্রতিরোধক্ষমতা বা ইমিউন সিস্টেম এতটাই অকেজো হয়ে পড়েছে যে সাধারণ একটি সংক্রমণও তাঁর শরীরে দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ছে।
৫. চতুর্থ পর্যায় ও ওজন হ্রাস। গত ২৬ মার্চ বোন ম্যারো টেস্টের (অস্থিমজ্জা পরীক্ষা) পর নিশ্চিত হওয়া যায়, শাপুর জাদরান এই রোগের চতুর্থ পর্যায়ে আছেন। এ লড়াইয়ে তাঁর শরীরের ওজন প্রায় ১৪ কেজি কমে গেছে, যা তাঁর শারীরিক সক্ষমতাকে চরম সংকটে ফেলেছে।
এইচএলএইচ আদতে কী, এটি কেন এত ভয়াবহ
সহজভাবে বলতে গেলে, এটি একটি ‘সাইটোকাইন স্টর্ম’ বা রোগ প্রতিরোধব্যবস্থার মাত্রাতিরিক্ত ও অনিয়ন্ত্রিত সক্রিয়তা। আমাদের শরীরে যখন কোনো ভাইরাস বা ব্যাকটেরিয়া আক্রমণ করে, তখন শ্বেত রক্তকণিকা (যেমন ম্যাক্রোফেজ ও লিম্ফোসাইট) সেসবকে ধ্বংস করতে ঝাঁপিয়ে পড়ে। কাজ শেষ হলে এসব কোষের শান্ত হওয়ার কথা। কিন্তু এইচএলএইচ আক্রান্ত রোগীর ক্ষেত্রে এসব কোষ থামতে জানে না।
২০২৩ সালের ছবিএসব কোষ অবিরাম সক্রিয় থাকে এবং ভুলবশত নিজের শরীরের সুস্থ টিস্যু ও অঙ্গপ্রত্যঙ্গ ধ্বংস করতে শুরু করে। বিশেষ করে এদের ‘হেমোফ্যাগোসাইটোসিস’ নামের প্রক্রিয়ায় এসব কোষ নিজের রক্তকণিকাকেই (লোহিত কণিকা, শ্বেত কণিকা ও অণুচক্রিকা) ‘খেয়ে’ বা গ্রাস করে ফেলে। ফলে রোগীর রক্তে কোষের সংখ্যা দ্রুত কমতে থাকে।
দুবার ক্যানসার জয় করা রায়না মাহমুদের দুঃসহ দিনের গল্পএইচএলএইচের প্রকারভেদ ও কারণ
চিকিৎসাবিজ্ঞানে একে মূলত দুই ভাগে ভাগ করা হয়—
১. জন্মগত/জেনেটিক/প্রাইমারি: এটি সাধারণত শিশুদের ক্ষেত্রে দেখা দেয়। নির্দিষ্ট কিছু জিনগত ত্রুটির কারণে রোগ প্রতিরোধক্ষমতা স্বাভাবিকভাবে কাজ করতে পারে না।
২. অর্জিত বা সেকেন্ডারি: এটি যেকোনো বয়সে হতে পারে। শাপুর জাদরানের ক্ষেত্রে যক্ষ্মা বা ডেঙ্গুর মতো সংক্রমণ এই রোগকে ‘ট্রিগার’ বা ত্বরান্বিত করেছে। এ ছাড়া ক্যানসার বা অটো ইমিউন রোগের কারণেও এটি হতে পারে।
প্রধান লক্ষণগুলো, যা এড়িয়ে যাওয়া বিপজ্জনক
এই রোগের লক্ষণগুলো সাধারণ ফ্লু বা ইনফেকশনের মতো মনে হতে পারে, যা রোগ নির্ণয়কে কঠিন করে তোলে। প্রধান লক্ষণগুলো হলো—
নাছোড়বান্দা জ্বর: উচ্চমাত্রার জ্বর, যা অ্যান্টিবায়োটিক বা সাধারণ ওষুধে নামে না।
অঙ্গ ফুলে যাওয়া: লিভার ও স্প্লিন (প্লীহা) অস্বাভাবিক বড় হয়ে যাওয়ার ফলে পেটের ওপরের অংশ ফুলে ওঠে।
রক্তস্বল্পতা ও রক্তক্ষরণ: অণুচক্রিকা কমে যাওয়ার ফলে চামড়ার নিচে কালচে দাগ বা নাক-মুখ দিয়ে রক্তপাত হতে পারে।
ফেরিটিন লেভেল: রক্ত পরীক্ষায় ফেরিটিন নামক প্রোটিনের মাত্রা অস্বাভাবিক বেড়ে যাওয়া (৫০০–এর বদলে অনেক সময় ১০ হাজারের বেশি হয়ে যায়)।
রোগনির্ণয় ও চিকিৎসার চ্যালেঞ্জ
এইচএলএইচ নির্ণয় করা একটি রেস জেতার মতো—যত দ্রুত শনাক্ত হবে, বাঁচার সম্ভাবনা তত বাড়বে।
ডায়াগনসিস: সিবিসি, ফেরিটিন টেস্ট, লিভার ফাংশন টেস্ট এবং নিশ্চিত হওয়ার জন্য বোন ম্যারো বা অস্থিমজ্জা পরীক্ষা করা হয়।
চিকিৎসা: এর মূল লক্ষ্য হলো খ্যাপাটে ইমিউন সিস্টেমকে শান্ত করা। এর জন্য উচ্চমাত্রার স্টেরয়েড, ইমিউনোসাপ্রেসেন্ট ওষুধ এবং কখনো কখনো কেমোথেরাপি দেওয়া হয়। চূড়ান্ত পর্যায়ে অনেক সময় বোন ম্যারো ট্রান্সপ্লান্ট বা অস্থিমজ্জা প্রতিস্থাপনের প্রয়োজন হয়।
শাপুর জাদরানের লড়াই কেবল একজন ক্রিকেটারের লড়াই নয়, এটি বিরল রোগের বিরুদ্ধে চিকিৎসাবিজ্ঞানের লড়াই। তাঁর এই অসুখ আমাদের শিখিয়ে দিচ্ছে, দীর্ঘমেয়াদি জ্বর বা অস্বাভাবিক শারীরিক পরিবর্তনকে কখনোই অবহেলা করা উচিত নয়। সঠিক সময়ে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ এবং উন্নত ল্যাব টেস্টই পারে এইচএলএইচের মতো মরণব্যাধি থেকে প্রাণ রক্ষা করতে। আমরা আশা করি, মাঠের মতো জীবনের এই কঠিন পিচেও শাপুর জাদরান জয়ী হয়ে ফিরে আসবেন।