নীরব কূটনীতির রাজকীয় সফর: চার্লস-ট্রাম্পের না বলা রাজনীতি

· Prothom Alo

ব্রিটেনের রাজা চার্লস তৃতীয়ের সাম্প্রতিক ওয়াশিংটন সফরকে বাইরে থেকে যতটা আড়ম্বরপূর্ণ মনে হয়েছে, ভেতরে তার তাৎপর্য ছিল অনেক গভীর। এটি নিছক প্রটোকল মেনে করা একটি রাষ্ট্রীয় সফর ছিল না। বরং একে বলা যায় সম্পর্ক মেরামতের এক সূক্ষ্ম প্রয়াস।

Visit newssport.cv for more information.

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে তাঁর দূরত্ব তৈরি হয়েছিল। সেই সঙ্গে ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার ও কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নির সঙ্গে সম্পর্কেও একধরনের অস্বস্তি দেখা দিয়েছিল। এ সফরের উদ্দেশ্য ছিল, সেই ভাঙন কিছুটা হলেও মেরামত করা।

এটি যেন দুই প্রবীণ নেতার মুখোমুখি হওয়া। চার্লসের বয়স সাতাত্তর, ট্রাম্পের উনআশি। অভিজ্ঞতা ও বয়সে প্রায় সমান এই দুই নেতার সাক্ষাৎ তাই প্রতীকী অর্থও বহন করে। সফরের সময় যে জাঁকজমক দেখা গেছে, তাকে অনেক সময়ই সম্পর্কের বাস্তব দুর্বলতা ঢেকে রাখার চেষ্টা বলে মনে হয়েছে। যেন একটি ক্ষয়িষ্ণু সম্পর্ককে চাকচিক্যের আড়ালে ধরে রাখার প্রয়াস।

সফরের আগে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে একটি মন্তব্যকে ঘিরে। ব্রিটেনের প্রভাবশালী সংবাদপত্র ফাইন্যান্সিয়াল টাইমস প্রকাশ করে ব্রিটিশ রাষ্ট্রদূত স্যার ক্রিশ্চিয়ান টার্নারের একটি বক্তব্য। দায়িত্ব নেওয়ার কিছুদিন পর তিনি কয়েকজন স্কুলশিক্ষার্থীর সঙ্গে অনানুষ্ঠানিক আলাপে বলেছিলেন, যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ সম্পর্ক আসলে অনেকটাই অতীতনির্ভর ও নস্টালজিক।

তিনি আরও যোগ করেন, যুক্তরাষ্ট্রের প্রকৃত বিশেষ সম্পর্ক যদি কারও সঙ্গে থাকে, তবে তা সম্ভবত ইসরায়েলের সঙ্গে। ইসলামাবাদে হাইকমিশনার হিসেবে দায়িত্ব পালনের সময় তিনি যে সংযম দেখিয়েছিলেন, এ মন্তব্যে তাঁর সেই সংযমের অভাব স্পষ্ট হয়। বিষয়টি প্রকাশ্যে আসার পর ব্রিটিশ পররাষ্ট্র দপ্তর দ্রুত জানায়, এটি রাষ্ট্রদূত ব্যক্তিগত ও অনানুষ্ঠানিক মত, সরকারের অবস্থান নয়।

এ বিতর্ক সফরের আবহকে প্রভাবিত করলেও সফরের সময় রাজা চার্লস ও প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প কেউই প্রকাশ্যে কোনো বিতর্কিত বিষয় উত্থাপন করেননি। স্যার টার্নারের এ মন্তব্য হয়তো দ্রুতই বিস্মৃত হবে। কিন্তু তার ছাপ অন্যভাবে থেকে যাবে। কারণ, রাজা চার্লস যেসব ভাষণ দিয়েছেন, তাতে তাঁর লেখার ছাপ অনেকেই লক্ষ করেছেন।

ইরান যুদ্ধ: ভুলের পর ভুল করে ট্রাম্প যে মূল্য দিচ্ছেন

রাজা চার্লস যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসে যৌথ অধিবেশনে এবং পরদিন হোয়াইট হাউসের রাষ্ট্রীয় নৈশভোজে যে ভাষণ দেন, তা ছিল ইতিহাস ও প্রতীকের মিশেলে গড়া। তিনি একে একে উল্লেখ করেন শেক্‌সপিয়র, ডিকেন্স, অস্কার ওয়াইল্ড, উইনস্টন চার্চিল, আব্রাহাম লিংকন, ফ্র্যাঙ্কলিন রুজভেল্ট, জর্জ মার্শাল, ডুইট আইজেনআওয়ার, জন এফ কেনেডি ও হেনরি কিসিঞ্জারের মতো ব্যক্তিত্বদের। নিজের পূর্বপুরুষ রাজা তৃতীয় জর্জের কথাও তোলেন। এসব নাম উল্লেখের মাধ্যমে তিনি যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘ ঐতিহাসিক সম্পর্ককে তুলে ধরতে চেয়েছেন।

রাজা স্মরণ করেন ১৯৩৯ সালে তাঁর দাদা-দাদির যুক্তরাষ্ট্র সফরের কথা। তখন ব্রিটেন নাৎসি জার্মানির বিরুদ্ধে লড়াইয়ে আমেরিকার সমর্থন চাইছিল। আবার ১৯৫৭ সালে তাঁর মায়ের যুক্তরাষ্ট্র সফরের কথাও বলেন, যখন সুয়েজ সংকটের পর ব্রিটেন যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তার প্রয়োজন বোধ করেছিল। এসব উদাহরণ দিয়ে তিনি বোঝাতে চান যে দুই দেশের সম্পর্ক সংকটের সময় আরও দৃঢ় হয়েছে।

রাজা চার্লস আব্রাহাম লিংকনের গেটিসবার্গ ভাষণের একটি বিখ্যাত বক্তব্য নিজের ভাষায় তুলে ধরেন, ‘বিশ্ব হয়তো আমাদের কথাকে খুব একটা মনে রাখবে না, কিন্তু আমাদের কাজকে কখনো ভুলবে না।’ এর মাধ্যমে তিনি কার্যকর পদক্ষেপের গুরুত্ব বোঝাতে চেয়েছেন।

ভবিষ্যতে যদি যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে কোনো সমঝোতা হয়, তাহলে কী হবে? উপসাগরীয় দেশগুলো কি আবার আগের মতো আত্মবিশ্বাস ফিরে পাবে, নাকি তারা হতাশ হবে? এ প্রসঙ্গে কবি রবার্ট ব্রাউনিংয়ের সেই হতাশার কথাও মনে পড়ে, যখন তিনি তাঁর প্রিয় কবি উইলিয়াম ওয়ার্ডসওয়ার্থকে নিয়ে বলেন, ‘যাঁকে তারা এত ভালোবেসেছিল, অনুসরণ করেছিল, আদর্শ মনে করেছিল, তাঁর কাছ থেকেই তারা শেষ পর্যন্ত হতাশ হয়েছে’।

পরিবেশ হালকা করতে চার্লস রসিকতাও করেন। ট্রাম্প সম্প্রতি মন্তব্য করেছিলেন যে যুক্তরাষ্ট্র না থাকলে ইউরোপের দেশগুলো হয়তো জার্মান ভাষায় কথা বলত। এর জবাবে চার্লস বলেন, ব্রিটেন না থাকলে হয়তো আমেরিকানরা ফরাসি ভাষায় কথা বলত। এ মন্তব্যে ইতিহাসের সূক্ষ্ম ইঙ্গিত যেমন ছিল, তেমনি ছিল কূটনৈতিক হাস্যরসও। উল্লেখযোগ্য যে চার্লসের পিতা জার্মান ভাষায় সাবলীল ছিলেন এবং তাঁর মা নির্ভুল ফরাসি বলতেন।

এসব ভাষণের প্রকৃত তাৎপর্য শুধু এতে কী বলা হয়েছে তা নয়, বরং এতে কী বলা হয়নি, সেটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ। চার্লস ন্যাটো জোটের সদস্যদের প্রতিশ্রুতির কথা বলেন এবং ইউক্রেন প্রসঙ্গ তোলেন। কিন্তু তিনি ইরানের প্রসঙ্গ এড়িয়ে যান। তিনি অস্ট্রেলিয়া, যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ সাবমেরিন কর্মসূচির কথা বলেন, যা ইতিহাসের সবচেয়ে উচ্চাকাঙ্ক্ষী প্রকল্পগুলোর একটি। কিন্তু ইরানকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল জোটে ব্রিটেন ও অস্ট্রেলিয়ার আক্রমণাত্মক ভূমিকা নিতে অনীহার বিষয়টি উল্লেখ করেননি।

যেভাবে একের পর এক পরাজয় আড়াল করছেন ট্রাম্প

অন্যদিকে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প তুলনামূলক খোলামেলা ছিলেন। তিনি বলেন, তাঁর মা অন্তরে রাজতন্ত্রের সমর্থক ছিলেন এবং তরুণ প্রিন্স চার্লসের প্রতি তাঁর একধরনের আকর্ষণ ছিল। যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতার আড়াই শ বছর পূর্তি উপলক্ষে তিনি বলেন, ইংরেজিভাষী বিশ্ব ব্রিটেনের কাছ থেকে অনেক কিছু পেয়েছে—আইনের শাসন, স্বাধীনতা ও ব্রিটিশ রীতিনীতি। তিনি মনে করিয়ে দেন যে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের প্রভাব এখনো বিশ্বজুড়ে রয়েছে।

ইরান প্রসঙ্গে ট্রাম্প কিছুটা ইঙ্গিতপূর্ণ ভাষায় বলেন, তাঁরা সেই প্রতিপক্ষকে সামরিকভাবে পরাজিত করেছেন এবং কখনো তাকে পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন করতে দেবেন না। তিনি এমনও দাবি করেন যে এ বিষয়ে চার্লস তাঁর চেয়ে বেশি একমত।
তবে এ সফরের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ দিক হলো, কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সম্পূর্ণ এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে। গাজা, লেবানন, হরমুজ প্রণালির অবরোধ, পাল্টা অবরোধ ইত্যাদি স্পর্শকাতর প্রসঙ্গ কেউই উত্থাপন করেননি। একইভাবে ইউরোপীয় ইউনিয়ন, যুক্তরাজ্য বা উপসাগরীয় আরব দেশগুলোর যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল জোটে যোগ দিতে অনীহার কথাও আলোচনায় আসেনি।

এ প্রেক্ষাপটে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উঠে আসে। উপসাগরীয় আরব শাসকেরা কি কোরআনের সেই আয়াত ভুলে গেছেন, যা হুদায়বিয়ার সন্ধির সময় নাজিল হয়েছিল? সেখানে বলা হয়েছিল, মরুভূমির আরবরা নানা অজুহাত দেখাবে, মুখে এক কথা বলবে, কিন্তু অন্তরে অন্য কিছু লুকিয়ে রাখবে।

ভবিষ্যতে যদি যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে কোনো সমঝোতা হয়, তাহলে কী হবে? উপসাগরীয় দেশগুলো কি আবার আগের মতো আত্মবিশ্বাস ফিরে পাবে, নাকি তারা হতাশ হবে? এ প্রসঙ্গে কবি রবার্ট ব্রাউনিংয়ের সেই হতাশার কথাও মনে পড়ে, যখন তিনি তাঁর প্রিয় কবি উইলিয়াম ওয়ার্ডসওয়ার্থকে নিয়ে বলেন, ‘যাঁকে তারা এত ভালোবেসেছিল, অনুসরণ করেছিল, আদর্শ মনে করেছিল, তাঁর কাছ থেকেই তারা শেষ পর্যন্ত হতাশ হয়েছে’।

সব মিলিয়ে এ সফর ছিল এক জটিল কূটনৈতিক মুহূর্তের প্রতিচ্ছবি। এখানে যা বলা হয়েছে, তার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে, যা বলা হয়নি, তা। এই নীরবতা, এই এড়িয়ে যাওয়া—এসবই ভবিষ্যতের আন্তর্জাতিক রাজনীতির দিকনির্দেশ দেয়। যুদ্ধক্ষেত্রের বাইরে, কথার আড়ালে, ইঙ্গিতের ভেতর দিয়েই আজকের বিশ্বরাজনীতি অনেকাংশে নির্ধারিত হচ্ছে।

  • এফ এস আইজাজউদ্দিন পাকিস্তানের লেখক ও বিশ্লেষক।
    ডন থেকে নেওয়া, ইংরেজি থেকে অনূদিত।

Read full story at source