দেশে কোন জ্বালানি তেল কতদিন চলবে
· Prothom Alo
মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে নির্ধারিত সময়ে কয়েকটি জ্বালানিবাহী জাহাজ না আসায় দেশে তেল সরবরাহ নিয়ে দুশ্চিন্তা বাড়ছে। সরকার বিকল্প উৎস থেকে জ্বালানি তেল সংগ্রহের চেষ্টা চালালেও কোথাও নিশ্চয়তা মিলছে, কোথাও মিলছে না। ফলে এপ্রিলে সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা যাবে কি না, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
Visit xsportfeed.life for more information.
বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) সূত্র বলছে, গতকাল সোমবার পর্যন্ত তাদের হাতে ১৪ দিনের ডিজেল মজুত ছিল। সংকট আরও বাড়ার আশঙ্কায় মানুষ আগেভাগেই ডিজেল, অকটেন ও পেট্রল কিনে রাখতে শুরু করেছে। কোথাও কোথাও ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেও তেল পাওয়া যাচ্ছে না।
বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম গতকাল প্রথম আলোকে বলেন, দেশে এখনো জ্বালানি তেলের সংকট তৈরি হয়নি। ইতিমধ্যে কয়েকটি জাহাজ এসেছে, আরও কয়েকটি আসার কথা রয়েছে। এপ্রিল মাসের আমদানি সূচিও চূড়ান্ত করা হচ্ছে। প্রয়োজনে খোলাবাজার থেকেও পরিশোধিত ডিজেল কেনা হবে। তিনি বলেন, চাহিদা অনুযায়ী সরবরাহ বজায় রাখা হচ্ছে, তবে আতঙ্কে অনেকেই স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি তেল কিনছে। এতে সরবরাহ ব্যবস্থায় সাময়িক চাপ তৈরি হচ্ছে।
প্রতিমন্ত্রী আরও বলেন, মূল সমস্যা জাহাজের সূচি পিছিয়ে যাওয়া এবং বিশ্ববাজারে তেলের দাম দ্রুত বেড়ে যাওয়া। দাম বাড়লে আমদানি ব্যয়ও বাড়ে, যা সামগ্রিক অর্থনীতিতে চাপ ফেলে।
ম তামিম, জ্বালানি বিশেষজ্ঞঅতিরিক্ত মজুত বা কৃত্রিম সংকট তৈরির প্রবণতা বন্ধে মাঠপর্যায়ে নজরদারি বাড়াতে হবে।গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিমান হামলার পর মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ পরিস্থিতি তৈরি হয়। পাল্টাপাল্টি হামলার মধ্যে হরমুজ প্রণালি বন্ধের ঘোষণা আসে। মধ্যপ্রাচ্য থেকে জ্বালানি তেল সরবরাহের প্রধান এই নৌপথ অচল হয়ে পড়ায় বাংলাদেশেও জ্বালানি আমদানি নিয়ে অনিশ্চয়তা দেখা দেয়।
বিপিসির হিসাবে, দেশে বছরে ৬৫ থেকে ৬৮ লাখ টন জ্বালানি তেল আমদানি করা হয়। এর মধ্যে প্রায় ১৫ লাখ টন অপরিশোধিত তেল, যা মূলত সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে আসে। মোট চাহিদার ২০ শতাংশ অপরিশোধিত আকারে এনে দেশে পরিশোধন করা হয়, বাকি ৮০ শতাংশ পরিশোধিত অবস্থায় আমদানি করা হয়। যুদ্ধের কারণে এই সরবরাহ ব্যবস্থায় চাপ তৈরি হয়েছে।
তেলের মজুত পরিস্থিতি
বিপিসি সূত্র বলছে, দেশে জ্বালানি ব্যবহারের বড় অংশই ডিজেলনির্ভর। কৃষি সেচ, সড়ক পরিবহন, এমনকি বিদ্যুৎ উৎপাদনের ক্ষেত্রেও ডিজেলের ওপর নির্ভরতা বেশি। তাই ডিজেলের বাজারে চাপ বাড়লে তার প্রভাব দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে।
বিপিসির তথ্য অনুযায়ী, দেশে ডিজেল সংরক্ষণের মোট সক্ষমতা ৬ লাখ ২৪ হাজার ১৮৯ টন। গতকাল পর্যন্ত সরবরাহযোগ্য মজুত ছিল ১ লাখ ৮৫ হাজার টন, যা মোট সক্ষমতার প্রায় ২৯ শতাংশ। এই মজুত দিয়ে প্রায় ১৪ দিনের চাহিদা পূরণ সম্ভব।
১ মার্চ থেকে গত রোববার পর্যন্ত দেশে ডিজেল বিক্রি হয়েছে প্রায় ২ লাখ ৬৪ হাজার টন। সে হিসাবে দৈনিক গড় বিক্রি প্রায় ১২ হাজার টন। গত বছরের একই সময়ে তা ছিল সাড়ে ১২ হাজার টনের কাছাকাছি।
দেশে অকটেনের মোট সংরক্ষণ সক্ষমতা ৫৩ হাজার ৬১৬ টন। বর্তমানে মজুত আছে প্রায় ১১ হাজার টন, যা দিয়ে প্রায় ৯ দিনের চাহিদা পূরণ সম্ভব। পেট্রলের মোট সংরক্ষণ সক্ষমতা ৩৭ হাজার ১৩ টন। এর মধ্যে মজুত রয়েছে ১৬ হাজার ৬০৫ টন, যা দিয়ে প্রায় ১১ দিন সরবরাহ বজায় রাখা যাবে।
আর ফার্নেস তেলের মজুত রয়েছে ৭০ হাজার ৮৩৩ টন, যা দিয়ে প্রায় ২৯ দিনের চাহিদা পূরণ সম্ভব। আর জেট ফুয়েলের মজুত ৩৪ হাজার ৮৭৭ টন, যা দিয়ে প্রায় ২৩ দিন সরবরাহ চালানো যাবে। কেরোসিনের মজুত ৮ হাজার ৫৭১ টন, যা দিয়ে ৪৬ দিন চাহিদা মেটানো যাবে। মেরিন ফুয়েলের মজুত আছে প্রায় দেড় হাজার টন, যা দিয়ে ৪৪ দিন সরবরাহ সম্ভব।
অন্যদিকে ইস্টার্ন রিফাইনারিতে বর্তমানে ৮০ হাজার টন অপরিশোধিত তেল মজুত আছে। দৈনিক গড়ে সাড়ে ৪ হাজার টন শোধনক্ষমতা বিবেচনায় এই মজুত দিয়ে আরও ১৭ থেকে ১৮ দিন উৎপাদন চালানো সম্ভব। তবে নতুন চালান সময়মতো না এলে উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আমদানি স্বাভাবিক থাকলে এই মজুত ব্যবস্থাপনা যথেষ্ট। কিন্তু জাহাজ আসতে দেরি হওয়া, আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্যবৃদ্ধি এবং আতঙ্কে হঠাৎ চাহিদা বেড়ে যাওয়া—এই তিনটি চাপ একসঙ্গে তৈরি হওয়ায় ঝুঁকি বেড়েছে।
আমদানির সূচি এলোমেলো
যুদ্ধ শুরুর পর দেশের জ্বালানি আমদানির পূর্বনির্ধারিত সূচি এলোমেলো হয়ে গেছে। বিপিসির তথ্য অনুযায়ী, চলতি মাসে ডিজেল ও ফার্নেস অয়েল নিয়ে মোট ১৭টি জাহাজ আসার কথা ছিল। কিন্তু যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে গতকাল পর্যন্ত দেশে পৌঁছেছে ৮টি জাহাজ, যেগুলো থেকে প্রায় ২ লাখ টন তেল পাওয়া গেছে।
আরও দুটি জাহাজ আসার কথা থাকলেও বাকি ৬টি জাহাজের বিষয়ে এখনো নিশ্চিত হতে পারেনি বিপিসি। ফলে প্রায় দেড় লাখ টন জ্বালানি তেল পাওয়া নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
বিপিসির নথি অনুযায়ী, বড় দুই সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান (চীনের ইউনিপেক ও মালয়েশিয়ার পেটকো ট্রেডিং) ইতিমধ্যে জানিয়েছে, যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে তারা নির্ধারিত সময় মেনে তেল সরবরাহ করতে পারছে না। তবে এই ঘাটতি কিছুটা পুষিয়ে নিতে ভারত থেকে পাইপলাইনে ১০ হাজার টন তেল এসেছে, আর এ মাসে আরও ৫ হাজার টন আসতে পারে।
অপরিশোধিত তেলের ক্ষেত্রেও সমস্যার শেষ নেই। ৩ মার্চ সৌদি আরবের রাস তানুরা টার্মিনাল থেকে ১ লাখ টন অপরিশোধিত তেল আনার কথা থাকলেও জাহাজটি আটকে যায়। আবার আবুধাবি ন্যাশনাল অয়েল কোম্পানি (অ্যাডনক) থেকে তেল আনার জন্য ভাড়া করা ‘এমটি ওমেরা গ্যালাক্সি’ নামের জাহাজটির চুক্তিও বাতিল হয়েছে। ফলে চলতি মাসে নতুন কোনো অপরিশোধিত তেলের চালান দেশে আসছে না।
অবশ্য বিকল্প ব্যবস্থা হিসেবে আগামী মাসে সৌদি আরবের ইয়ানবু বন্দর থেকে ১ লাখ টন অপরিশোধিত তেল আনার নিশ্চয়তা পাওয়া গেছে। কিন্তু এ ক্ষেত্রে প্রতি ব্যারেলে অতিরিক্ত ২৫ সেন্ট বেশি খরচ করতে হবে সরকারকে।
জ্বালানিসংকট মোকাবিলায় যেসব পদক্ষেপ নিচ্ছে বিভিন্ন দেশএপ্রিল ও মে মাসের পরিকল্পনা
পরিস্থিতি সামাল দিতে এপ্রিল ও মে মাসের জন্য প্রাথমিক আমদানি সূচি তৈরি করেছে বিপিসি। এপ্রিলে সমুদ্রপথে ১৪টি জাহাজ এবং পাইপলাইনে ৩টি পার্সেলের মাধ্যমে মোট ৩ লাখ টন ডিজেল, ৫০ হাজার টন জেট ফুয়েল, ২৫ হাজার টন অকটেন এবং ৫০ হাজার টন ফার্নেস তেল আমদানির পরিকল্পনা রয়েছে। তবে এখন পর্যন্ত মাত্র ১ লাখ ১০ হাজার টন ডিজেল এবং পাইপলাইনে ২০ হাজার টন সরবরাহের নিশ্চয়তা পাওয়া গেছে।
দেশের ফিলিং স্টেশনগুলোতে জ্বালানি সরবরাহ করে রাষ্ট্রায়ত্ত তিন প্রতিষ্ঠান পদ্মা অয়েল, মেঘনা পেট্রোলিয়াম ও যমুনা অয়েল কোম্পানি। সারা দেশে তাদের ডিপো রয়েছে। এসব ডিপো থেকে প্রায় আড়াই হাজার ফিলিং স্টেশনে জ্বালানি পাঠানো হয়।
মে মাসে ১৭টি জাহাজে সাড়ে ৩ লাখ টন ডিজেলসহ অন্যান্য জ্বালানি আসার সূচি ঠিক করা হয়েছে। তবে সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানগুলো এখনো চূড়ান্ত মত দেয়নি।
ফিলিং স্টেশনে চাপ বাড়ছে
যুদ্ধ পরিস্থিতি শুরু হওয়ার পর থেকেই দেশের বিভিন্ন এলাকায় ফিলিং স্টেশনগুলোতে ভিড় বেড়েছে। রাজধানীসহ বিভিন্ন জেলা শহরের কয়েকটি ফিলিং স্টেশনে গতকাল তেল পাওয়া যায়নি। কোথাও তেল থাকলেও অতিরিক্ত ভিড়ের কারণে সরবরাহে সময় লাগছে।
ফিলিং স্টেশনের সামনে জ্বালানি তেল নেওয়ার জন্য মোটরসাইকেল ও প্রাইভেটকারের দীর্ঘ লাইন।ইন্টারকন্টিনেন্টাল হোটেল মোড় এলাকা, ঢাকা । ২২ মার্চবাংলাদেশ পেট্রল পাম্প ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন বলছে, তেল কোম্পানিগুলো থেকে যে পরিমাণ জ্বালানি দেওয়া হচ্ছে, তা চাহিদার তুলনায় কম। ফলে অনেক পাম্পে প্রয়োজনমতো তেল পাওয়া যাচ্ছে না।
সংগঠনটির সভাপতি সৈয়দ সাজ্জাদুল করিম কাবুল প্রথম আলোকে বলেন, ডিপো থেকে নির্ধারিত পরিমাণ তেল এলেও হঠাৎ চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় অনেক জায়গায় চাপ তৈরি হয়েছে।
দেশের ফিলিং স্টেশনগুলোতে জ্বালানি সরবরাহ করে রাষ্ট্রায়ত্ত তিন প্রতিষ্ঠান পদ্মা অয়েল, মেঘনা পেট্রোলিয়াম ও যমুনা অয়েল কোম্পানি। সারা দেশে তাদের ডিপো রয়েছে। এসব ডিপো থেকে প্রায় আড়াই হাজার ফিলিং স্টেশনে জ্বালানি পাঠানো হয়।
তেল কোম্পানির কয়েকজন কর্মকর্তা জানান, কিছু ফিলিং স্টেশন স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি তেল নিচ্ছে। আবার আগে যেসব স্টেশনে বিক্রি কম ছিল, সেগুলোও এখন বেশি তেল তুলছে। এতে সরবরাহ ব্যবস্থায় চাপ তৈরি হচ্ছে। তবে ঈদের দিন ও ঈদের পরদিন ডিপো থেকে সরবরাহ বন্ধ ছিল। গতকাল আবার সরবরাহ শুরু হয়েছে। কিন্তু ব্যাংক বন্ধ থাকায় অনেক ফিলিং স্টেশন পে-অর্ডার জমা দিতে পারেনি। ফলে তারাও তেল নিতে পারেনি।
পদ্মা অয়েল কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. মফিজুর রহমান বলেন, ডিপো থেকে তেল সরবরাহ বন্ধ নেই। পরিস্থিতি বিবেচনায় প্রয়োজন অনুযায়ী সরবরাহ দেওয়া হচ্ছে। কোম্পানির কাছে মজুত আছে এবং বিষয়টি নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।
মাঠপর্যায়ে নজরদারি দরকার
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশে এখনো বড় ধরনের জ্বালানিসংকট তৈরি হয়নি। কিন্তু অস্বাভাবিক চাহিদা বৃদ্ধি, জাহাজ আসতে বিলম্ব, সীমিত মজুত এবং আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্যবৃদ্ধি ইত্যাদি চাপ একসঙ্গে তৈরি হওয়ায় পরিস্থিতি দ্রুত বদলে যেতে পারে।
সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টার জ্বালানিবিষয়ক বিশেষ সহকারী ম তামিম প্রথম আলোকে বলেন, প্রয়োজনে সীমিত পরিসরে রেশনিং ব্যবস্থা বিবেচনা করা যেতে পারে। একই সঙ্গে অতিরিক্ত মজুত বা কৃত্রিম সংকট তৈরির প্রবণতা বন্ধে মাঠপর্যায়ে নজরদারি বাড়াতে হবে।
ইতিহাসের ভয়াবহ জ্বালানি–সংকটের মুখে বিশ্ব, সতর্কবার্তা আইইএ প্রধানের