উৎসবের দিনগুলোয় আনন্দ যেন মাটি না হয়ে যায়
· Prothom Alo

উৎসবের দিনগুলোয় আনন্দ মাটি হয়ে যেতে পারে অতিরিক্ত মাংস আর নানা ধরনের প্রোটিন গ্রহণের কারণে। এক মাস রোজার পর অতিরিক্ত খাওয়ায় শরীরে অস্বস্তি তৈরি হতে পারে। এ জন্যই প্রয়োজনীয় সঠিক খাদ্যাভ্যাসেই সুস্থতা বজায় রাখা সম্ভব।
ঈদের দিনে তো খাওয়া আনলিমিটেড। ঈদের পরের দিনগুলোতেও এই রুটিনের ব্যত্যয় ঘটে না। সেমাই, পোলাও আর নানা ধরনের মাংস খাওয়া চলতেই থাকে। এ বাড়ি ও বাড়িতে একটার পর একটা খাওয়ার শেষ থাকে না। সেমাই থেকে চটপটি, পোলাও থেকে ভুনা খিচুড়ি সঙ্গে নানা ধরনের মাংস। গরু, খাসি, মুরগি, হাঁস—বাদ যায় না কিছুই।
Visit sport-tr.bet for more information.
এত প্রোটিন খেলে সমস্যা হতেই পারেত্রিশ দিন রোজা রেখে মানুষ যেন ঈদের দিনে অতিরিক্ত খাওয়ার চাপে নিজেকে খাদক বানিয়ে ফেলে। এতে স্বাস্থ্যের ক্ষতি ছাড়াও কিছু ত্রুটিতে হাসপাতালে যাওয়ার ঝুঁকিও নিতান্তই কম নয়।
আমরা ঈদের দিন যা খাই, তা নিঃসন্দেহে অতিরিক্ত। সবচেয়ে বেশি খাওয়া হয় প্রোটিনজাতীয় খাবার। মাংসের নানা পদ, কাবাব, ডিম, দুধ—সবই প্রোটিন, যা অধিক খাওয়ায় আমাদের শরীরে নানা বিক্রিয়া করে থাকে।
শরীরের জন্য প্রোটিন খুব গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। প্রোটিন খাওয়ার পর পাকস্থলী ও ছোট অন্ত্রে হজম হয়ে অ্যামিনো অ্যাসিডে ভেঙে রক্তে শোষিত হয়, তারপর মাসল প্রোটিন সিনথেসিস (এমপিএস) বা অন্যান্য কাজে ব্যবহৃত হয়। শোষণের হার নির্ভর করে প্রোটিনের ধরন, খাবারের সঙ্গে কী মেশানো হয়েছে, হজমের অবস্থা ইত্যাদির ওপর।
প্রোটিন শরীরের পেশি, হাড়, এনজাইম, হরমোন, অ্যান্টিবডি ও কোষের মূল গঠন উপাদান। বিশেষজ্ঞের মতে সাধারণ প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য ০.৮ গ্রাম প্রোটিন প্রতি কেজি শরীরের ওজন (কম পরিশ্রমী জীবনযাপনের জন্য)।
উদাহরণ
• ৬০ কেজি ওজনের মানুষ ৪৮ গ্রাম/দিন
• ৭০ কেজি ওজনের মানুষ ৫৬ গ্রাম/দিন
• ৮০ কেজি ওজনের মানুষ ৬৪ গ্রাম/দিন
ক্যালরির শতাংশ হিসাবে: দৈনিক ক্যালরির ১০ থেকে ৩৫ শতাংশ প্রোটিন থেকে আসা উচিত (২০০০ ক্যালরি খেলে ৫০ থেকে ১৭৫ গ্রাম)। বয়স ও জীবনধারা অনুসারে আসল চাহিদা আরও বেশি হতে পারে, বয়স্ক (৬৫+): ১.০-১.২ গ্রাম/কেজি (সারকোপেনিয়া বা মাসল হারানো রোধ করতে)। অসুস্থ/আঘাতপ্রাপ্তদের জন্য: ১.২-২.০ গ্রাম/কেজি/।
সাম্প্রতিক গাইডলাইন (যুক্তরাষ্ট্রের ডায়েটারি গাইডলাইনস আপডেপ অনুসারে): অনেক বিশেষজ্ঞ এখন ১.২-১.৬ গ্রাম/কেজি সুপারিশ করছেন সুস্থ থাকা ও পেশি রক্ষার জন্য।
কম প্রোটিন খেলে কী হয়?ডায়েটের নিয়ম অনুযায়ী যতটা খেতে বলা হয়েছে এর নিচে প্রোটিন গ্রহণ করলে শরীর নেগেটিভ নাইট্রোজেন ব্যালান্স তৈরি করে। অর্থাৎ প্রোটিন সিনথেসিসের (নতুন প্রোটিন তৈরি) চেয়ে প্রোটিন ব্রেকডাউন (ভাঙন) বেশি হয়। শরীর মাসল ও অঙ্গ থেকে অ্যামিনো অ্যাসিড বের করে ব্যবহার করে।
প্রধান ক্ষতি ও লক্ষণ
• মাসল হারানো ও দুর্বলতা: সারকোপেনিয়া, ফ্যাটিগ, পসচারের সমস্যা।
• এডিমা (ফোলা): অ্যালবুমিন কমে গেলে শরীরে পানি জমে (বিশেষ করে পা ও পেটে)।
• রোগ প্রতিরোধক্ষমতা কমা: অ্যান্টিবডি তৈরি হয় না, বারবার ইনফেকশন।
• চুল-ত্বক-নখের সমস্যা: কেরাটিন, কোলাজেন কমে চুল পড়া, শুষ্ক ত্বক।
• শিশু-কিশোরদের: বৃদ্ধি বন্ধ (স্টান্টিং), কোয়াশিয়রকর (ফোলা ও লিভার সমস্যা)।
• দীর্ঘ মেয়াদে ক্ষতি: অ্যানিমিয়া, মুড ডিজঅর্ডার (ডোপামিন-সেরোটোনিন কমে), হাড় দুর্বল, হার্ট-ভাসকুলার সমস্যা।
গবেষণায় দেখা গেছে, মাত্র এক সপ্তাহ কম প্রোটিন খেলেই মাসলের পসচার-সম্পর্কিত দুর্বলতা শুরু হয় (বিশেষ করে ৫৫–এর বেশি বয়সে)। দীর্ঘদিন চললে মৃত্যুর ঝুঁকি বাড়ে।বেশি প্রোটিন খেলে কী হয়?সুস্থ মানুষের ক্ষেত্রে ২-৩ গ্রাম/কেজি পর্যন্ত (এমনকি তার বেশি) সাধারণত নিরাপদ। কোনো সুনির্দিষ্ট আপার লিমিটনেই, কারণ সুস্থ কিডনি অতিরিক্ত নাইট্রোজেন (ইউরিয়া) সহজে বের করে দেয়।
সম্ভাব্য ঝুঁকি (মূলত যাঁদের আগে থেকে সমস্যা আছে)
• কিডনি: গ্লোমেরুলার হাইপারফিলট্রেশন (GFR বাড়ে), ইউরিয়া-ক্রিয়েটিনিন সাময়িক বাড়ে। সুস্থ মানুষের এটা ক্ষতি করে না, কিন্তু আগে থেকে কিডনি রোগ থাকলে (CKD) অবস্থা খারাপ হয়। অবেস বা মোটা মানুষের জন্য স্বল্প মেয়াদে GFR বাড়তে দেখা গেছে।
• হাড়: সালফার-যুক্ত অ্যামিনো অ্যাসিড থেকে অ্যাসিড লোড বাড়ে, ক্যালসিয়াম বের হয় (হাইপারক্যালসিয়ুরিয়া)। তবে সাম্প্রতিক মেটা-অ্যানালাইসিসে সুস্থ মানুষে হাড়ের ক্ষতি প্রমাণিত হয়নি (ক্যালসিয়াম-ভিটামিন ডি থাকলে)।
• পানি: কম খেলে ডিহাইড্রেশন, পেটের সমস্যা, লিভারে অতিরিক্ত চাপ (বেশি খেলে)।
প্রোটিনের উৎস ও দৈনিক পরিকল্পনা নিয়ে বিস্তারিত বলছি। প্রোটিনের উৎস দুই ধরনের: প্রাণীজ ও উদ্ভিজ্জ। প্রাণীজ প্রোটিনগুলো সাধারণত ৯টি এসেনশিয়াল অ্যামিনো অ্যাসিড থাকে আর উদ্ভিজ্জগুলো বেশিরভাগ অ্যামিনো অ্যাসিড কম থাকে, তাই বিভিন্ন উৎস মিশিয়ে খেলে ভালো।
প্রোটিনের প্রধান উৎস: প্রাণীজ
ডিম ও মাংসে প্রচুর প্রোটিন মেলে• ডিম (১টা বড়): ৬-৭ গ্রাম (সাদা অংশে বেশি, কম ফ্যাট)।
• মুরগির বুকের মাংস (চর্বি ছাড়া, ১০০ গ্রাম রান্না করা): ২৫-৩০ গ্রাম।
• মাছ (ইলিশ, রুই, চিংড়ি, টুনা): ২০-২৫ গ্রাম (১০০ গ্রামে)।
• দুধ (১ গ্লাস/২৫০ মিলি): ৮-৯ গ্রাম।• দই/ছানা/পনির (১০০-১৫০ গ্রাম): ৮-১৫ গ্রাম (গ্রিক ইয়োগার্টে বেশি)।
• গরুর মাংস/খাসি (চর্বি ছাড়া, ১০০ গ্রাম): ২৫-২৮ গ্রাম।
প্রোটিনের প্রধান উৎস: উদ্ভিজ্জ উৎস
প্রোটিনের ভাল উৎস ডাল• ডাল (মসুর, মুগ, ছোলা, মটরশুঁটি—১ কাপ রান্না): ১৫-২০ গ্রাম।
• সয়াবিন/সয়া চাঙ্ক/টফু (১০০ গ্রাম): ১৫-২০ গ্রাম।
• ছোলা (১ কাপ রান্না): ১২-১৫ গ্রাম।
• বাদাম (চিনাবাদাম, কাঠবাদাম, আখরোট – ৩০ গ্রাম/মুঠো): ৫-৮ গ্রাম।
• পনির-ছানা: ১০-১৫ গ্রাম (১০০ গ্রামে)।
• দুধের বিকল্প সয়া মিল্ক: ৬-৮ গ্রাম (১ গ্লাস)।
উৎসবের দিনগুলোয় খাবার হয় আনন্দময়, তাই রুটিন করে খাওয়া উচিত। প্রয়োজনের সঙ্গে মিলিয়ে খেলে স্বস্তি বোধ করবেন, নয়তো ঈদের এই সময় পেট ফেঁপে ঈদের আনন্দ মাটি করে দেবে।
লেখক: খাদ্য ও পথ্যবিশেষজ্ঞ প্রধান নির্বাহী, প্রাকৃতিক নিরাময় কেন্দ্র
ছবি: এআই