ঈদের ছুটিতে পাহাড়ে এবার কোথায় যাচ্ছেন পর্যটকেরা

· Prothom Alo

বান্দরবান, খাগড়াছড়ি ও রাঙামাটিতে ঈদের লম্বা ছুটিতে পর্যটক সমাগম বাড়বে বলে আশা করেছেন পর্যটনসংশ্লিষ্টরা। তিন পার্বত্য জেলার বিভিন্ন রিসোর্টে আগাম বুকিং শুরু হয়েছে। ৫০ থেকে ৮০ শতাংশ বুকিং হয়ে গেছে এর মধ্যেই।

Visit orlando-books.blog for more information.

ঘন নীল পাহাড়, তার গায়ে এসে ধাক্কা খাওয়া পেজা তুলার মতো সাদা মেঘ, ঝিরি–ঝরনা আর পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর সমৃদ্ধ সংস্কৃতি দেখতে পার্বত্য চট্টগ্রামে ছুটে যান অনেকে। এবার ঈদের লম্বা ছুটিতে পাহাড় হতে পারে আদর্শ গন্তব্য। শান্ত, নিরিবিলি ও সমাহিত সৌন্দর্যের মধ্যে কয়েকটা দিন কাটিয়ে আসতে এর মধ্যেই আগাম বুকিং দিতে শুরু করেছেন পর্যটকেরা।

হোটেল ব্যবসার সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, প্রতিবছরের মতো এবারও পার্বত্য চট্টগ্রামের বান্দরবান, খাগড়াছড়ি ও রাঙামাটিতে পর্যটকদের ভিড় হবে। ইতিমধ্যে এসব জেলার ৫০ থেকে ৮০ শতাংশ হোটেল বুকিং দিয়ে রেখেছেন পর্যটকেরা। ব্যবসায়ী ও প্রশাসনও প্রত্যাশিত ভিড়ের কথা মাথায় রেখে প্রস্তুতি নিচ্ছে।

বান্দরবানে দুই দফায় যাবেন পর্যটক

ঈদের দীর্ঘ ছুটিতে পর্যটকের অপেক্ষায় প্রস্তুতি নিয়ে রয়েছে পর্যটন জেলা বান্দরবানের মানুষ। হোটেল-মোটেল ও অবকাশ যাপনকেন্দ্রগুলোয় আগাম কক্ষভাড়া (বুকিং) গতকাল মঙ্গলবার পর্যন্ত গড়ে ৫০ শতাংশ হয়েছে। আজ বৃহস্পতিবার পর্যন্ত বুকিং বাড়তে পারে বলে হোটেল-মোটেল মালিক সমিতির নেতারা জানিয়েছেন।

হোটেল-মোটেলগুলোর আগাম কক্ষভাড়ার তথ্য অনুযায়ী, জেলায় পর্যটকের আগমন ঘটবে দুই দফায়। প্রথম দফায় আগামীকাল শুক্রবার অর্থাৎ ২০ মার্চ থেকে ২৩ মার্চ পর্যন্ত ঈদের বন্ধে পরিবার-পরিজন নিয়ে পর্যটকেরা আসবেন। এরপর ২৬ মার্চ স্বাধীনতা দিবসের পর শুক্র ও শনিবার সাপ্তাহিক ছুটি। এ জন্য ২৬ থেকে ২৮ মার্চও অনেক হোটেল–রিসোর্টে আগাম কক্ষ ভাড়া হয়েছে।

বান্দরবান শহরের চেয়ে রুমা, থানচি ও লামা এলাকায় বেশি যাচ্ছেন পর্যটকেরা। তবে তরুণ পর্যটকদের মধ্যে যাঁরা মোটরসাইকেলে ভ্রমণে আগ্রহী, তাঁদের কেউ কেউ তেলের সংকটের কারণে বুকিং বাতিল করছেন বলে জানিয়েছেন হোটেল-মোটেল মালিক ও কর্মচারীরা। তবু রুমা উপজেলার বগালেক ও কেওক্রাডাং পাহাড়চূড়া, থানচির তিন্দু, রেমাক্রী ও নাফাখুমের অবকাশ যাপনকেন্দ্রগুলোয় ২৮ মার্চ পর্যন্ত পর্যটকের সমাগম থাকবে বলে পর্যটন ব্যবসায়ীরা জানান।

এবার জেলা শহরের চেয়ে রুমা, থানচি ও লামা এলাকায় বেশি যাচ্ছেন পর্যটকেরা। তবে তরুণ পর্যটকদের মধ্যে যাঁরা মোটরসাইকেলে ভ্রমণে আগ্রহী, তাঁদের কেউ কেউ তেলের সংকটের কারণে বুকিং বাতিল করছেন বলে জানিয়েছেন হোটেল-মোটেল মালিক ও কর্মচারীরা।

অ্যাডভেঞ্চারপ্রিয় তরুণদের কাছে জনপ্রিয় রুমা উপজেলার বগালেক ও কেওক্রাডং পাহাড়চূড়া, থানচির তিন্দু, রেমাক্রী ও নাফাখুম। এসব এলাকায় কুটির ও অবকাশ যাপনকেন্দ্রগুলোয় ২৮ মার্চ পর্যন্ত পর্যটকের সমাগম থাকবে।

বান্দরবান জেলা শহরের চেয়ে পর্যটকদের কাছে রুমা, থানচির বিভিন্ন গন্তব্যে বেশি জনপ্রিয়। রুমা উপজেলার বগা লেকেও ঈদের ছুটিতে আগাম বুকিং হয়েছে

বগালেকের কুটির মালিক লালকিম বম প্রথম আলোকে বলেন, ‘আগামীকাল ১৯ মার্চ থেকে এক নাগাড়ে ২৮ মার্চ পর্যন্ত আমার কুটিরে বুকিং রয়েছে। কিন্তু তেলের সংকটে পানি সরবরাহ কঠিন হয়ে পড়েছে। আবার মোটরসাইকেল আরোহী পর্যটক বুকিং করার সময় তেল পাবেন কি না, এ নিয়ে আশঙ্কা প্রকাশ করছেন।’

জেলা শহর থেকে ১৮ কিলোমিটার দূরে ওয়াইজংশন এলাকার সাইরু অবকাশ যাপনকেন্দ্রের ব্যবস্থাপক আতিকুর রহমান বলেন, ‘আমাদের অবকাশ যাপনকেন্দ্রে ৮০ শতাংশ কক্ষ আগাম ভাড়া হয়েছে। সবাই নিজের মালিকানা যানবাহনে আসেন। সেই ক্ষেত্রে তেল না পাওয়া গেলে অনেক পর্যটক ভ্রমণ বাতিল করতে পারেন।’

জেলা শহরের আবাসিক হোটেল-মোটেলগুলোয় ৪০ থেকে ৭০ শতাংশ বুকিং রয়েছে। হোটেল-মোটেল মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক জসীম উদ্দিন বলেন, ‘জেলা শহরে শতাধিক ছোট-বড় হোটেল-মোটেলে গড়ে ৫০ শতাংশ বুকিং রয়েছে। এখনো বুকিংয়ের সময় রয়েছে। শেষ পর্যন্ত শতভাগ না হলেও ৮০ থেকে ৮৫ শতাংশ হয়ে যাবে।’

জেলা পর্যটন পুলিশের পরিদর্শক মোহাম্মদ ফরিদ উদ্দিন বলেন, ‘এবারে ঈদে ছুটি বেশি হওয়ায় পর্যটকের আগমন বেশি হবে ধরে নিয়ে পর্যটন ব্যবসায়ী, পুলিশ ও প্রশাসন প্রস্তুতি নিয়ে রয়েছে। পর্যটকেরা নিরাপদে ভ্রমণ করতে পারবেন এবং প্রাপ্য সেবা সহজে পাবেন।’

খাগড়াছড়িতে ছুটির শুরুতেই ভিড়

ঈদের টানা ছুটিকে সামনে রেখে খাগড়াছড়ির বিভিন্ন পর্যটনকেন্দ্র নতুন করে সাজানো হয়েছে। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরপুর এই জেলায় বছরজুড়েই নদী, পাহাড় ও ঝরনা দেখতে ভিড় করেন পর্যটকেরা। পাশাপাশি রাঙামাটির সাজেক ভ্যালিতে যাতায়াতের পথ হওয়ায় খাগড়াছড়ি হয়ে প্রতিদিনই বহু পর্যটক যাতায়াত করেন।

গতকাল সকালে শহরের বিভিন্ন এলাকা ও খাগড়াছড়ি গেটসংলগ্ন সাজেক কাউন্টারে গিয়ে দেখা যায়, ছুটির প্রথম দিনেই পর্যটকেরা আসতে শুরু করেছেন। অনেকে ঈদের আগেই সাজেক ভ্রমণে বের হয়েছেন, যাতে ছুটির ভিড় এড়ানো যায়।

ফেনী থেকে আসা মো. রাকিব ও আবদুল্লাহসহ একদল তরুণ বলেন, ‘ভোরে দুটি সিএনজি ভাড়া করে ১০ জন মিলে আমরা খাগড়াছড়িতে এসেছি। অনলাইনে ঈদের পর সাজেকে কোনো কক্ষ না পাওয়ায় আগেভাগেই ভ্রমণের সিদ্ধান্ত নিয়েছি। আজ (গতকাল) সাজেক গিয়ে আগামীকাল (আজ) ফিরে এসে খাগড়াছড়ির আশপাশের পর্যটনকেন্দ্র ঘুরে সন্ধ্যায় বাড়ি ফিরব।’

সাজেক কাউন্টারের লাইনম্যান সৈকত চাকমা বলেন, ‘আজ সকালে সাজেকের উদ্দেশে ৪০টি গাড়ি ছেড়ে গেছে। আগামী শুক্রবার ও শনিবারের জন্য সব গাড়ি আগেই বুকিং হয়ে গেছে। ঈদের পরদিন থেকে পর্যটকের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে।’

জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, খাগড়াছড়িতে ছোট-বড় মিলিয়ে ৪৫টি হোটেল, মোটেল ও গেস্টহাউস রয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ৫০ শতাংশ কক্ষ আগাম বুকিং হয়েছে।

রাঙামাটি জেলার অন্যতম আকর্ষণ সাজেক ভ্যালি। দূরদূরান্ত থেকে পর্যটকেরা এখানে ঘুরতে আসেন। এই পর্যটনকেন্দ্রে ২২ থেকে ২৮ মার্চ পর্যন্ত শতভাগ বুকিং রয়েছে।

পর্যটকেরা সাধারণত আলুটিলা গুহা, রিছাং ঝরনা, দেবতার পুকুর, হর্টিকালচার পার্ক, তৈদুছড়া ঝরনা, বিডিআর স্মৃতিসৌধ, মায়াবিনী লেক ও শান্তিপুর অরণ্য কুঠির ঘুরে দেখতে আসেন। মিলনপুর এলাকার গাইরিং হোটেলের ব্যবস্থাপক প্রান্ত ত্রিপুরা বলেন, ‘আমাদের সব কক্ষ আগামী শুক্রবার থেকে রোববার পর্যন্ত বুকিং হয়ে গেছে।’ অন্যদিকে অরণ্য বিলাশ হোটেলের ব্যবস্থাপক আহম্মদ রশিদ বলেন, ‘ঈদের পরদিন থেকে আমাদের হোটেলেও কোনো কক্ষ খালি থাকবে না।’

তবে অধিকাংশ হোটেলে এখনো অর্ধেকের কম বুকিং হয়েছে। খাগড়াছড়ি হোটেল মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক বিকাশ ত্রিপুরা বলেন, ‘জেলায় পর্যটনকেন্দ্র তুলনামূলক কম হওয়ায় পর্যটকেরা বেশি সময় অবস্থান করেন না। বেশির ভাগই সাজেক গিয়ে পরদিন ফিরে এসে খাগড়াছড়ি ঘুরে দ্রুত চলে যান। পর্যটকদের দীর্ঘ সময় ধরে রাখতে হলে নতুন পর্যটনকেন্দ্র গড়ে তোলার ওপর জোর দিতে হবে।’

আলুটিলা পর্যটনকেন্দ্রের ব্যবস্থাপক কোকোনাথ ত্রিপুরা বলেন, ‘গত বছর বড়দিনের ছুটিতে প্রতিদিন ৫ থেকে ১০ হাজার পর্যটক এখানে এসেছিলেন। এবারের ঈদেও পর্যটকের সংখ্যা বাড়বে বলে আশা করছি।’

স্থানীয় রেস্তোরাঁগুলোও বাড়তি ভিড় সামাল দিতে প্রস্তুতি নিচ্ছে । পানখাইয়াপাড়ার সিস্টেম রেস্তোরাঁর কর্মী আচিং মারমা বলেন, ‘ইতিমধ্যে কয়েকটি পর্যটক দল খাবারের জন্য আগাম অর্ডার দিয়েছে। ছুটির দিনগুলোতে ভিড় আরও বাড়বে।’

খাগড়াছড়ির জেলা প্রশাসক মো. আনোয়ার সাদাত বলেন, ‘ঈদকে সামনে রেখে আলুটিলা পর্যটনকেন্দ্র সাজানো হয়েছে। দীর্ঘদিন বন্ধ থাকার পর ফুলকলির হাতির কবরও দর্শনার্থীদের জন্য খুলে দেওয়া হয়েছে। ঈদে পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী নিয়োজিত রয়েছে।’

খাগড়াছড়ির আলুটিলা পর্যটনের জনপ্রিয় স্পট হয়ে উঠেছে

রাঙামাটিতে আগাম বুকিংয়ে সন্তুষ্ট ব্যবসায়ীরা

রাঙামাটিতেও ঈদের ছুটিকে ঘিরে হোটেল-মোটেল ও রিসোর্টগুলোয় আগাম বুকিং বেড়েছে। এতে সন্তুষ্ট সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা। পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিতে প্রস্তুত রয়েছে পুলিশ প্রশাসন। সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীদের তথ্যমতে, গত বছরের তুলনায় এবার পর্যটক সমাগম বেশি হবে। রাঙামাটি পর্যটন করপোরেশনের ব্যবস্থাপক আলোক বিকাশ চাকমা বলেন, ‘ইতিমধ্যে ৮০ শতাংশ রুম বুকিং হয়ে গেছে। গত বছরের তুলনায় এ বছর বেশি পর্যটক সমাগম হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।’

রাঙামাটি হোটেল মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মো. ইউছুপ চৌধুরী বলেন, ‘শহরের বেশ কয়েকটি হোটেল-মোটেলে ইতিমধ্যে ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত বুকিং হয়েছে। পর্যটকদের সেবা ও বরণে সব ধরনের প্রস্তুতি নিয়েছি।’ শহরের পরিচিত রিসোর্টগুলো ইতিমধ্যে শতভাগ বুকিং রয়েছে। জানতে চাইলে রাঙাদ্বীপ রিসোর্টের পরিচালক আলোক ব্রত চাকমা বলেন, ‘আমাদের রিসোর্টে প্রায় ১২০ জন পর্যটকের রাতযাপনের ব্যবস্থা আছে। ২২ থেকে ২৭ মার্চ পর্যন্ত ইতিমধ্যে শতভাগ বুকিং রয়েছে।’

রাঙামাটি জেলার অন্যতম আকর্ষণ সাজেক ভ্যালি। দূরদূরান্ত থেকে পর্যটকেরা এখানে ঘুরতে আসেন। জানতে চাইলে সাজেক রিসোর্ট মালিক সমিতির সভাপতি সুপর্ণ দেব বর্মণ বলেন, ‘সাজেকে ২২ থেকে ২৮ মার্চ পর্যন্ত শতভাগ বুকিং রয়েছে। তবে জ্বালানি তেলের সংকটের কারণে পর্যটকদের যাতায়াতে অসুবিধা হবে কি না, তা নিয়ে আমরা কিছুটা চিন্তিত।’ রাঙামাটি বার্গি লেক ভ্যালির পরিচালক সুমেত চাকমা বলেন, ‘আমাদের রিসোর্টে ১৮ মার্চ থেকে ২৯ মার্চ পর্যন্ত শতভাগ বুকিং সম্পন্ন হয়েছে।’

রাঙামাটি টুরিস্ট পুলিশ সুপার মো. খাইরুল আলম প্রথম আলোকে বলেন, ‘পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে টুরিস্ট পুলিশের সর্বোচ্চ প্রস্তুতি রয়েছে। পর্যটকেরা যাতে নিরাপদে রাঙামাটি ঘুরে যেতে পারেন, সে জন্য নৌপথে ও সড়কপথে টুরিস্ট পুলিশের মোবাইল টিম থাকবে। নৌপথে ভ্রমণের জন্য প্রতিটি টুরিস্ট বোটে লাইফ জ্যাকেট নিশ্চিত করতে কাজ করা হবে।’

Read full story at source