ভ্রমণে বার্সেলোনা, স্মৃতি ও সময়ের শহর
· Prothom Alo

আমি থাকি সুইডেনে, তবে স্পেন আমার শ্বশুরবাড়ি, তাই মাঝেমধ্যে এখানে বেড়াতে আসি। বার্সেলোনায় আগেও এসেছি, কিন্তু হঠাৎ এবার শীতে স্পেনের কয়েকটি শহর ঘুরে এলাম। বেশ ঠান্ডা ছিল আর কিছুক্ষণ বৃষ্টির পরিবর্তে তুষারপাত হলো। তুষারপাতের অনুভূতিটা শরীরের কাপড়ে জড়িয়ে গেল, চমৎকার এক অনুভূতি। এই মুহূর্তে দাঁড়িয়ে আছি বার্সেলোনার লা সাগরাদা ফামিলিয়ার সামনে।
Visit milkshakeslot.online for more information.
লা সাগরাদা ফামিলিয়া শুধু একটি চার্চ নয়। এটি সময়, বিশ্বাস, গণিত, প্রকৌশল এবং কল্পনার এক অসাধারণ সংলাপ। বার্সেলোনার আকাশরেখায় দাঁড়িয়ে থাকা এই স্থাপত্য যেন নিজেই একটি জীবন্ত সত্তা, যা নির্মিত হচ্ছে, বদলাচ্ছে, আবার নিজেকে নতুনভাবে আবিষ্কার করছে।
এর নকশাকার অ্যান্টনি গার্ড (Antoni Gaud) কেবল একটি উপাসনালয় নির্মাণ করতে চাননি। তিনি চেয়েছিলেন প্রকৃতিকে পাথরে রূপ দিতে। গাছের কাণ্ডের মতো স্তম্ভ, মৌচাকের মতো জ্যামিতিক গঠন, আলো ও ছায়ার এমন খেলা, যা দিনের বিভিন্ন সময়ে ভিন্ন অভিজ্ঞতা তৈরি করে। ভেতরে দাঁড়ালে মনে হয় যেন একটি পাথরের বনভূমির মধ্যে আছি, যেখানে রঙিন কাচ ভেদ করে আসা আলো আত্মাকে নীরবে স্পর্শ করে।
স্মৃতি, সময় এবং ফিরে দেখা—
বহু বছর আগে গিয়েছিলাম এই শহরে। তখনকার সেই সফরের অনেক স্মৃতি আজও রয়ে গেছে, যদিও ছবিগুলো নেই। সময়ের স্রোতে হারিয়ে গেছে দৃশ্যের প্রমাণ, কিন্তু অনুভূতির রং ফিকে হয়নি। এবার ফিরে এসে মনে হলো, শহরটি যেন আমাকে চিনে রেখেছে। পুরোনো স্মৃতির ভাঁজে নতুন আলোর রেখা যুক্ত হলো। ছবিহীন অতীত আর বর্তমানের ক্যামেরাবন্দী মুহূর্ত একসঙ্গে মিশে তৈরি করল এক ব্যক্তিগত ইতিহাস। তাই এই লেখার সঙ্গে কিছু ছবি যুক্ত করলাম, স্মৃতির প্রতি সম্মান জানাতে, আর সেই হারিয়ে যাওয়া সময়কে নতুন করে স্পর্শ করতে।
লা সাগরাদা ফামিলিয়ার সামনে দাঁড়িয়ে বুঝেছি, অসম্পূর্ণতার মধ্যেও সৌন্দর্য থাকে। ১৮৮২ সালে যার কাজ শুরু, আজও যার নির্মাণ চলছে, সেই স্থাপত্য যেন সময়ের সঙ্গে কথোপকথন চালিয়ে যাচ্ছে। দ্রুততার যুগে এটি ধৈর্যের এক নীরব বিপ্লব।
সমুদ্রের ধারে গিয়ে দাঁড়ালে চোখে পড়ে কলম্বাসের সেই উচ্চস্তম্ভ। কলম্বাস ভারতের উদ্দেশ্যে যাত্রা করেছিলেন কিন্তু পৌঁছেছিলেন আমেরিকায়। ভুল দিকনির্দেশনাই ইতিহাসের নতুন মানচিত্র তৈরি করেছিল। মনুমেন্টটির দিকে তাকিয়ে মনে হলো মানুষের জীবনও কি এমন নয়? আমরা এক গন্তব্য ভেবে যাত্রা শুরু করি, কিন্তু পথ আমাদের অন্য এক আবিষ্কারের দিকে নিয়ে যায়।
দূর পরবাসে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: [email protected]
ভূমধ্যসাগরের বাতাসে দাঁড়িয়ে সেই মুহূর্তে মনে হয়েছিল, ভ্রমণ মানে শুধু নতুন শহর দেখা নয়। এটি নিজের ভেতরের অজানা ভূখণ্ড আবিষ্কার করা।
পার্কগুয়েলে গিয়ে মনে হয় যেন কল্পনার ভেতর হাঁটছি। রঙিন মোজাইক, বক্ররেখা, প্রকৃতির অনুকরণে নির্মিত স্থাপত্য সব মিলিয়ে এটি এক সৃজনশীল উচ্ছ্বাস। এখানেও গাউদির স্পর্শ, যেখানে কাঠামো দর্শনে রূপ নেয়।
লা রাম্বলায় হাঁটতে হাঁটতে মনে হয় শহরটি নিজেই এক চলমান নাট্যমঞ্চ। শিল্পী, সংগীত, ক্যাফে, মানুষের ভিড়, সব মিলিয়ে এক জীবন্ত স্পন্দন। এখানে শহর শুধু স্থাপত্য নয়, মানুষই তার প্রাণ।
কেন লা সাগরাদা ফামিলিয়া এ যুগের এক বিস্ময়
১. সময়কে অতিক্রম করা নির্মাণ: প্রায় দেড় শতাব্দী ধরে চলমান একটি প্রকল্প। আধুনিক বিশ্বে যেখানে দ্রুততা মানদণ্ড, সেখানে এটি ধৈর্যের এক দৃঢ় ঘোষণা।
২. প্রযুক্তির বিবর্তনের সাক্ষী: হাতে আঁকা নকশা থেকে আজকের থ্রিডি মডেলিং ও ডিজিটাল নির্মাণ প্রযুক্তি পর্যন্ত, অতীত ও বর্তমান এখানে একই ছাদের নিচে মিলিত হয়েছে।
৩. শিল্প ও প্রকৌশলের সংমিশ্রণ: ধর্মীয় প্রতীক, ভাস্কর্য, গাণিতিক নকশা ও কাঠামোগত উদ্ভাবনের অনন্য সমন্বয়।
৪. অসম্পূর্ণতার মধ্যেই পূর্ণতা: এটি শেখায়, মহৎ কাজ প্রজন্ম পেরিয়ে গড়ে ওঠে। একজনের স্বপ্ন, বহু মানুষের সাধনায় বাস্তব হয়ে ওঠে।
শেষ কথা
বার্সেলোনা আমাকে শিখিয়েছে, একটি শহর কেবল মানচিত্রের স্থান নয়, এটি স্মৃতির ভাঁজে জমে থাকা অনুভূতি। লা সাগরাদা ফামিলিয়া সময়ের ধৈর্য শেখায়। কলম্বাসের মনুমেন্ট মনে করিয়ে দেয়, ভুল পথও নতুন পৃথিবীর দুয়ার খুলে দিতে পারে। পার্ক গুয়েল দেখায় কল্পনার শক্তি। লা রাম্বলা শেখায় মানুষের ভিড়ের মধ্যেও জীবন স্পন্দিত থাকে।
স্মৃতি হয়তো সব সময় ছবিতে ধরা পড়ে না। কিন্তু অনুভূতি যদি বেঁচে থাকে, তবে শহরও বেঁচে থাকে। বার্সেলোনা আমার কাছে তেমনই এক শহর, যেখানে সময়, ইতিহাস, ভুল, আবিষ্কার আর সৌন্দর্য একসঙ্গে দাঁড়িয়ে আছে।
*লেখক: রহমান মৃধা, গবেষক ও লেখক, সাবেক পরিচালক, ফাইজার, সুইডেন