অলিগার্কিদের বিশ্ব আর কতদিন টিকবে?

· Prothom Alo

অলিগার্ক বা গুটিকয়েক ধনী ও ক্ষমতাবান ব্যক্তির হাতে বিপুল সম্পদ ও রাজনৈতিক প্রভাব কেন্দ্রীভূত হওয়ার ঘটনা শুধু রাশিয়া বা যুক্তরাষ্ট্রে সীমাবদ্ধ নয়। এটি এখন বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়েছে। ক্রমেই প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নিচ্ছে। উদীয়মান বিশ্বব্যবস্থার অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য হয়ে উঠছে এই অলিগার্কদের আধিপত্য।

Visit turconews.click for more information.

আমরা অলিগার্ক বলতে এমন ব্যক্তিদের বুঝি, যাঁরা বিপুল সম্পদের মালিক হওয়ার পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষমতাও অর্জন করেন। অর্থাৎ সম্পদ ও ক্ষমতা তাঁদের হাতে একীভূত হয়। এর জন্য অ্যারিস্টটলের সংজ্ঞার মতো শুধু ধনীদের শ্রেণিগত শাসন প্রতিষ্ঠার প্রয়োজন নেই।

বর্তমানে কেউ কেউ সম্পদের মালিক হয়েই রাজনৈতিক ক্ষমতা অর্জন করেন। ডোনাল্ড ট্রাম্প তার উদাহরণ। আবার কেউ রাজনৈতিক ক্ষমতা ব্যবহার করে বিপুল সম্পদের মালিক হন। গত প্রায় ২৫ বছরে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন এভাবে সম্পদ ও ক্ষমতা দুটিই বাড়িয়েছেন। অন্যদিকে সৌদি আরবের যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান এবং মরক্কোর রাজা ষষ্ঠ মোহাম্মদের শুরু থেকেই সম্পদ ও ক্ষমতা দুটিই রয়েছে।

অলিগার্ক হতে হলে শতকোটিপতি হওয়া বাধ্যতামূলক নয়। আমাদের হিসাবে, অন্তত দুই কোটি ডলারের নিট সম্পদের পাশাপাশি সম্পদ ও ক্ষমতার একীভূত হওয়ার প্রমাণ থাকলে একজন ব্যক্তিকে অলিগার্ক হিসেবে বিবেচনা করা যায়। কারণ, এত সম্পদ থাকলে অন্যের আর্থিক সহায়তার ওপর নির্ভর না করেই একজন ব্যক্তি নিজের ক্ষমতা তৈরি ও প্রয়োগ করতে পারেন।

এই সংজ্ঞা ব্যবহার করে আমরা হিসাব করেছি, বর্তমানে বিশ্বের ৫৯ জন রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধান অলিগার্ক। তাঁদের মধ্যে বিশ্বের ক্রয়ক্ষমতার সমতা অনুযায়ী ২০টি বৃহত্তম অর্থনীতির আটটির নেতা রয়েছেন। এই হিসাবের ভিত্তি আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের ২০২৬ সালের প্রাক্কলন।

ট্রাম্প, পুতিন ও মোহাম্মদ বিন সালমান ছাড়াও এই তালিকায় আছেন চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিং, ইন্দোনেশিয়ার প্রেসিডেন্ট প্রাবোও সুবিয়ান্তো, তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান এবং নাইজেরিয়ার প্রেসিডেন্ট বোলা আহমেদ তিনুবু। যেসব দেশে অন্তত একজন অলিগার্ক নেতা রয়েছেন, সেসব দেশের সম্মিলিত অর্থনীতি বিশ্বের মোট ক্রয়ক্ষমতা-সমন্বিত মোট দেশজ উৎপাদনের প্রায় ৫৪ শতাংশ।

এখন প্রশ্ন আর এটি নয় যে অলিগার্করা বিশ্ব শাসন করবেন কি না। তাঁরা ইতিমধ্যেই বিশ্বে আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করেছেন। আগামী কয়েক দশকেও এই পরিস্থিতি অব্যাহত থাকার আশঙ্কা রয়েছে। এখন আমাদের সামনে আসল প্রশ্ন হলো, তাঁদের হাতে গড়ে ওঠা বিশ্বটি শেষ পর্যন্ত কেমন হবে?

এএই ৫৯ জন অলিগার্ক নেতার মধ্যে প্রায় এক-পঞ্চমাংশ শুরুতেই সম্পদের মালিক ছিলেন। দুই-পঞ্চমাংশ প্রথমে ক্ষমতা অর্জন করেছেন। বাকিরা সম্পদ ও ক্ষমতা একসঙ্গেই গড়ে তুলেছেন। তাঁদের মাত্র ৭ শতাংশ নিজের চেষ্টায় সম্পদশালী হয়েছেন। বাকি ৯৩ শতাংশ উত্তরাধিকার সূত্রে সম্পদ পেয়েছেন অথবা রাজনৈতিক ও অন্যান্য যোগাযোগ ব্যবহার করে সম্পদের মালিক হয়েছেন।

দক্ষিণ আফ্রিকার প্রেসিডেন্ট সিরিল রামাফোসার উদাহরণ দেওয়া যায়। আফ্রিকান ন্যাশনাল কংগ্রেসের সঙ্গে তাঁর রাজনৈতিক সম্পর্ক ব্যক্তিগত সম্পদ অর্জনে সরাসরি সহায়তা করেছে। অন্যদিকে চেক প্রজাতন্ত্রের প্রধানমন্ত্রী আন্দ্রেই বাবিশ নিজেই দেশের অন্যতম বড় ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছেন। পরে সেই সম্পদ ব্যবহার করে রাজনৈতিক ক্ষমতা অর্জন করেছেন।

তবে অলিগার্কদের প্রভাব বিস্তারের জন্য রাষ্ট্র বা সরকারপ্রধান হওয়ার প্রয়োজন নেই। ক্ষমতার তিনটি ধরন রয়েছে। প্রথমটি হলো সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা। রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধানেরা মূলত এই ক্ষমতা প্রয়োগ করেন। দ্বিতীয়টি হলো কোন বিষয়গুলো রাজনৈতিক ও সামাজিক আলোচনায় গুরুত্ব পাবে, তা নির্ধারণের ক্ষমতা। তৃতীয়টি হলো মানুষের চিন্তাভাবনা ও বিশ্বাসকে প্রভাবিত করার ক্ষমতা। শেষের দুটি ক্ষমতা চোখে কম পড়ে। পরিমাপ করাও কঠিন। কিন্তু নতুন বিশ্বব্যবস্থা বোঝার জন্য এগুলো সমান গুরুত্বপূর্ণ।

যুক্তরাষ্ট্রের পুরোনো অলিগার্কদের মধ্যে রয়েছেন চার্লস কোচ ও রুপার্ট মারডক। চার্লস কোচের বিপুল সম্পদ দীর্ঘদিন ধরে রিপাবলিকান পার্টিকে সহায়তা করেছে। অন্যদিকে মারডক তাঁর সংবাদমাধ্যমের সাম্রাজ্য ব্যবহার করে যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশের জনমত প্রভাবিত করেছেন।

তবে ট্রাম্প প্রশাসনের সময়ে প্রযুক্তি খাতের ধনকুবেরেরা বিশেষভাবে আলোচনায় এসেছেন। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন ওপেনএআইয়ের স্যাম অল্টম্যান, টেসলা ও স্পেসএক্সের ইলন মাস্ক এবং গুগলের ল্যারি পেজ। তাঁদের রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা বেড়েছে। একই সময়ে তাঁরা লাভজনক সরকারি চুক্তি, নিয়ন্ত্রণ শিথিল করা এবং অন্যান্য সুবিধাও পেয়েছেন।

তবে তাঁদের সবচেয়ে বড় ক্ষমতা এসব সুবিধা আদায় করার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। চ্যাটজিপিটি, মাস্কের এক্স এবং গুগল সার্চের মতো প্রযুক্তির ওপর তাঁদের নিয়ন্ত্রণ বা প্রভাব রয়েছে। এসব প্রযুক্তি মানুষের চিন্তা ও আচরণকে প্রভাবিত করছে। আমাদের মতে, এই প্রভাব অনেক ক্ষেত্রে রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধানদের সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতার সমান, এমনকি কোনো কোনো ক্ষেত্রে তার চেয়েও বেশি হতে পারে।

প্রতিদিন কোটি কোটি মানুষ সার্চ ইঞ্জিন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করছেন। শত শত কোটি মানুষের জীবনে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহারও বাড়ছে। তথ্য খোঁজা, বোঝা এবং নতুন তথ্য তৈরি করতে তাঁরা এসব প্রযুক্তির ওপর নির্ভর করছেন। মানুষ কী দেখবে, কী জানবে এবং শেষ পর্যন্ত কী বিশ্বাস করবে, তা প্রভাবিত করার ক্ষমতা অসাধারণ শক্তির বিষয়।

অলিগার্কদের হুমকির ব্যাপকতা অনেকেই বুঝতে পারেন না। এর একটি কারণ, তাঁরা কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক মতাদর্শের অনুসারী নন। গণতান্ত্রিক ও কর্তৃত্ববাদী—দুই ধরনের ব্যবস্থাতেই তাঁদের দেখা যায়। কেউ বামপন্থী, কেউ ডানপন্থী। কেউ সমাজতন্ত্রের কথা বলেন, কেউ পুঁজিবাদের। চীনের সি চিন পিং কমিউনিস্ট রাষ্ট্রীয় সমাজতন্ত্রের প্রতিনিধি। নিকারাগুয়ার ড্যানিয়েল ওর্তেগা ও রোসারিও মুরিয়ো বিপ্লবী বামপন্থী। বাবিশ মধ্যপন্থী জনতুষ্টিবাদী। এরদোয়ান রক্ষণশীল জাতীয়তাবাদী। ইরানের সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি ধর্মীয় রক্ষণশীল। আর ট্রাম্প কট্টর ডানপন্থী রাজনীতির প্রতিনিধি।

অলিগার্কদের রাজনৈতিক নীতি, উদ্দেশ্য এবং তাঁদের সম্পদ-ক্ষমতার সংমিশ্রণ থেকে কারা লাভবান হচ্ছেন, সেগুলো আলাদা করে বিচার করতে হবে। নতুন বিশ্বব্যবস্থা কোনো একটি নির্দিষ্ট মতাদর্শের ভিত্তিতে গড়ে উঠবে না। বরং এতে নানা মতাদর্শের মানুষ একসঙ্গে প্রভাবশালী হয়ে উঠবেন। ফলে বিশ্বরাজনীতিকে বোঝার প্রচলিত ছক দিয়ে এই ব্যবস্থাকে পুরোপুরি ব্যাখ্যা করা কঠিন হবে।

এই বিশ্বব্যবস্থায় বিভিন্ন ধরনের অলিগার্কের প্রভাব বাড়বে। রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধানেরা তাঁদের বলপ্রয়োগের ক্ষমতার কারণে গুরুত্বপূর্ণ থাকবেন। কিন্তু প্রযুক্তি খাতের অলিগার্করা মানুষের চিন্তা ও জনপরিসরের আলোচ্য বিষয় নির্ধারণে নতুন ধরনের ক্ষমতা প্রয়োগ করবেন। রাষ্ট্রের পক্ষে এই ক্ষমতা নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হবে। ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে ইলন মাস্কের সম্পদ ও প্রভাব যেভাবে বেড়েছে, তা বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়। ভবিষ্যতে এমন প্রবণতা আরও বাড়তে পারে।

এখন প্রশ্ন আর এটি নয় যে অলিগার্করা বিশ্ব শাসন করবেন কি না। তাঁরা ইতিমধ্যেই বিশ্বে আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করেছেন। আগামী কয়েক দশকেও এই পরিস্থিতি অব্যাহত থাকার আশঙ্কা রয়েছে। এখন আমাদের সামনে আসল প্রশ্ন হলো, তাঁদের হাতে গড়ে ওঠা বিশ্বটি শেষ পর্যন্ত কেমন হবে?

  • ডেভিড লিঙ্গেলবাখ দ্য সেন্টার ফর দ্য স্টাডি অব অলিগার্কস–এর অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা

  • ভ্যালেন্তিনা রদ্রিগেস গুয়েরা একই প্রতিষ্ঠানের সহপ্রতিষ্ঠাতা

  • স্বত্ব: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট, ইংরেজি থেকে অনূদিত

Read full story at source