উচ্ছেদ অভিযানে গিয়ে হেনস্তার শিকার ম্যাজিস্ট্রেট অতীশ দর্শী ঘটনা সম্পর্কে যা বললেন

· Prothom Alo

ফুটপাতের অবৈধ দখল উচ্ছেদে গিয়ে স্থানীয় লোকজন ও ব্যবসায়ীদের রোষের মুখে পড়েছিলেন ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট অতীশ দর্শী চাকমা। ঘুষ নেওয়ার অভিযোগ তুলে গতকাল বুধবার তাঁকে ঘিরে ধরেন স্থানীয় লোকজন ও ব্যবসায়ীরা। একপর্যায়ে শারীরিকভাবে হেনস্তার শিকার হয়ে পুলিশের সহায়তায় ঘটনাস্থল ছাড়তে হয় তাঁকে।

Visit tr-sport.click for more information.

ঘটনার পর নিজের অবস্থান তুলে ধরে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার কাছে লিখিত প্রতিবেদন দিয়েছেন এই ম্যাজিস্ট্রেট। তিনি বলেন, ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযানকে বিতর্কিত করতে পরিকল্পিতভাবে লোকজন জড়ো করা হয়েছিল। তবে তাঁর সেই বক্তব্যের সঙ্গে পুরোপুরি একমত হতে পারেননি সংশ্লিষ্ট ওই ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা। তিনি নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট অতীশ দর্শী চাকমাকে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনার কাজ থেকে বিরত রাখার সুপারিশ করেছেন।

গতকাল দুপুরে উত্তরা ৩ নম্বর সেক্টরের ১৮ নম্বর সড়কের পাকার মাথা এলাকায় ফুটপাতে উচ্ছেদ অভিযান চালানোর সময় অতীশ দর্শী চাকমাকে ঘিরে ধরেন স্থানীয় লোকজন ও ব্যবসায়ীরা। একপর্যায়ে তাঁকে শারীরিকভাবে হেনস্তা করা হয়। পরে উত্তরা পশ্চিম থানা-পুলিশ তাঁকে উদ্ধার করে।

ব্যবসায়ীদের অভিযোগ ছিল, জরিমানা কমিয়ে দেওয়ার কথা বলে ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে অভিযানের দলে থাকা একজন এক দোকানির কাছ থেকে ১ হাজার ৫০০ টাকা নিয়েছেন। পরে ওই টাকা তাঁর কাছ থেকে পাওয়া গেছে বলেও দাবি করেন তাঁরা। তবে ঘুষ নেওয়ার অভিযোগের সত্যতা তাৎক্ষণিকভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

ঘটনার বিষয়ে উত্তরা পশ্চিম থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) খালিদ মনসুর প্রথম আলোকে বলেছিলেন, ফুটপাতে দোকান থাকার অভিযোগে কয়েকজনকে জরিমানা করেন ম্যাজিস্ট্রেট। জরিমানার রসিদ দেওয়াকে কেন্দ্র করে দোকানিদের সঙ্গে তাঁর বাগ্‌বিতণ্ডা হয়। একপর্যায়ে উত্তেজনাকর পরিস্থিতি তৈরি হলে পুলিশ তাঁকে উদ্ধার করে থানায় নিয়ে আসে।

ম্যাজিস্ট্রেট প্রতিবেদনে বলেছেন, অবৈধ ফুটপাত দখলদারদের পক্ষের লোকজন ঘটনাটিকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে ভিন্নভাবে উপস্থাপন করেছে বলে তিনি জানতে পেরেছেন। বিমানবন্দর-সংলগ্ন সড়ক ও এলাকা অবৈধ দখলমুক্ত রাখতে এবং দেশের প্রবেশদ্বার পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখতে আরও শক্তিশালী অভিযান পরিচালনার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার অনুরোধ জানান তিনি।

ম্যাজিস্ট্রেটের পরিচয়পত্র ছিল না

ঘটনার পর ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের অঞ্চল-১-এর আঞ্চলিক নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ কামাল হোসেনের কাছে লিখিত প্রতিবেদন দেন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট অতীশ দর্শী চাকমা। প্রতিবেদনে তিনি জানান, ডেঙ্গু পরিস্থিতিতে এডিস মশার বংশ বিস্তার নিয়ন্ত্রণ এবং শহরের রাস্তা-ফুটপাত ও আঙিনা পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখার লক্ষ্যে নিয়মিত ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা হচ্ছে। এর অংশ হিসেবে ৪ নভেম্বর সকাল ১০টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত উত্তরা ৪ নম্বর সেক্টরে রাজউক কলেজের সামনের সড়কে অভিযান চালানো হয়।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, অভিযানে উত্তরা পূর্ব থানার পুলিশ এবং সিটি করপোরেশনের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা দলের সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন। দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে বিমানবন্দর-সংলগ্ন জসীমউদ্‌দীন সড়কে (১ ও ৩ নম্বর সেক্টরের মাঝামাঝি) একটি অবৈধ ভ্রাম্যমাণ দোকানকে ফুটপাত অপরিচ্ছন্ন করতে দেখা যায়। ওই দোকানির বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানালে আশপাশের লোকজন জড়ো হন।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে পরিচয় দেওয়ার পর লোকজন তাঁর পরিচয়পত্র দেখতে চান। পরিচয়পত্র না থাকায় তাঁরা ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন। আরও লোকজন জড়ো হলে তিনি কাছের একটি অস্থায়ী প্রেস ক্লাবে অবস্থান নেন।

এ ঘটনায় একটি দুষ্কৃতকারী গোষ্ঠী আগে থেকেই ভ্রাম্যমাণ আদালতকে চ্যালেঞ্জ করতে লোকজন জড়ো করার প্রস্তুতি রেখেছিল বলে অনুমান করেন তিনি। পরে উত্তরা পশ্চিম থানার কর্তব্যরত পুলিশ সদস্যরা লোকজনকে বুঝিয়ে পরিস্থিতি শান্ত করেন। এরপর পুলিশসহ ভ্রাম্যমাণ আদালতের সদস্যরা ঘটনাস্থল ত্যাগ করেন।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, অবৈধ ফুটপাত দখলদারদের পক্ষের লোকজন ঘটনাটিকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে ভিন্নভাবে উপস্থাপন করেছে বলে তিনি জানতে পেরেছেন। বিমানবন্দর-সংলগ্ন সড়ক ও এলাকা অবৈধ দখলমুক্ত রাখতে এবং দেশের প্রবেশদ্বার পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখতে আরও শক্তিশালী অভিযান পরিচালনার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার অনুরোধ জানান তিনি।

ফুটপাতের অবৈধ দোকানদারদের সঙ্গে পাশের প্রেসক্লাবের সদস্যদের সমঝোতা রয়েছে। চলমান ভ্রাম্যমাণ আদালতের কার্যক্রমকে বিতর্কিত করে উচ্ছেদ অভিযান স্থবির করার উদ্দেশ্য থাকতে পারে। তবে এসব পরিস্থিতির বাইরে ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বগুণ, দল পরিচালনায় দক্ষতা এবং পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার সক্ষমতায় যথেষ্ট ঘাটতি রয়েছে বলে উল্লেখ করেন আঞ্চলিক নির্বাহী কর্মকর্তা।

নেতৃত্ব ও প্রস্তুতিতে ঘাটতি

ম্যাজিস্ট্রেটের লিখিত প্রতিবেদন এবং অভিযানে থাকা সিটি করপোরেশনের অন্যান্য কর্মীদের বক্তব্য পর্যালোচনা করে আঞ্চলিক নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ কামাল হোসেন তাঁর মতামত দেন। সেটা ঢাকা উত্তর সিটির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (অতিরিক্ত দায়িত্ব) মুহাম্মদ আসাদুজ্জামানের কাছে দেওয়া হয়েছে।

মতামতে বলা হয়, অভিযানের সময় ওই দলের সঙ্গে কোনো পুলিশ ফোর্স ছিল না। পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার মতো পর্যাপ্ত প্রস্তুতিও ছিল না। অভিযানে থাকা অন্য সদস্যদের ওপর ম্যাজিস্ট্রেটের পুরো নিয়ন্ত্রণ ছিল না।

ঘটনার সময় স্থানীয় সাংবাদিক ও উপস্থিত লোকজন ম্যাজিস্ট্রেটের পরিচয় নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করলে তিনি পরিষ্কারভাবে নিজের পরিচয় তুলে ধরতে পারেননি। অভিযানে থাকা এক সদস্যের বিরুদ্ধে টাকা নেওয়ার অভিযোগ উঠলেও ম্যাজিস্ট্রেট এ বিষয়ে পরিষ্কার বক্তব্য দেননি কিংবা কোনো ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানাননি। এতে তাঁর দুর্বলতার পরিচয় প্রকাশ পেয়েছে বলে মতামতে উল্লেখ করা হয়।

ঘটনার পর তাঁকে মামলা করার কথা বলা হলেও প্রতিবেদন প্রস্তুত করা পর্যন্ত তিনি কোনো মামলা করেননি। এ ছাড়া সাংবাদিক ও স্থানীয় লোকজনের ভিড়ের মধ্যে পুলিশ ফোর্স না থাকায় তিনি ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে পড়েন। ফলে কোনো বিষয়ে সঠিক জবাব দিতে এবং পরিস্থিতি সামাল দিতে পারেননি।

মতামতে আরও বলা হয়, ফুটপাতের অবৈধ দোকানদারদের সঙ্গে পাশের প্রেস ক্লাবের সদস্যদের সমঝোতা রয়েছে। চলমান ভ্রাম্যমাণ আদালতের কার্যক্রমকে বিতর্কিত করে উচ্ছেদ অভিযান স্থবির করার উদ্দেশ্য থাকতে পারে। তবে এসব পরিস্থিতির বাইরে ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বগুণ, দল পরিচালনায় দক্ষতা এবং পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার সক্ষমতায় যথেষ্ট ঘাটতি রয়েছে বলে উল্লেখ করেন আঞ্চলিক নির্বাহী কর্মকর্তা।

এ কারণে অতীশ দর্শী চাকমাকে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনার কাজ থেকে বিরত রাখা যথাযথ হবে বলে সুপারিশ করেন মোহাম্মদ কামাল হোসেন। তবে সিটি করপোরেশনের সূত্র জানিয়েছে, ওই ঘটনায় এখন পর্যন্ত নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট অতীশ দর্শী চাকমার বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত নেয়নি ডিএনসিসি কর্তৃপক্ষ।

উত্তরায় ঘুষ নেওয়ার অভিযোগ তুলে ম্যাজিস্ট্রেটকে হেনস্তা

Read full story at source