‘কমেন্ট্রি বক্স পতাকা ওড়ানোর জায়গা নয়’

· Prothom Alo

ফাস্ট বোলার হিসেবে অমিত সম্ভাবনা পূর্ণতা পায়নি চোটের কারণে। ৪৩ টেস্ট ও ৮৪ ওয়ানডেতেই তাই শেষ হয়ে গেছে ক্যারিয়ার। ১৯৮৮ সালে ওয়েস্ট ইন্ডিজের দোর্দণ্ড প্রতাপের ওই সময়ে তাঁর অভিষেক। পিঠের চোটে যা শেষ হয়ে যায় ১৯৯৮ সালেই। ওটুকু সময়েই বিশ্বের সবচেয়ে ভীতিকর ফাস্ট বোলারদের একজন হয়ে উঠেছিলেন।তবে তাঁর ক্রিকেটার পরিচয়কেও সম্ভবত ছাড়িয়ে গেছে ধারাভাষ্যকার হিসেবে সর্বজনগ্রাহ্যতা। অনেকের মতেই ইয়ান বিশপ এখন বিশ্বের সেরা ধারাভাষ্যকার। এটা নিয়ে কারও ভিন্নমত থাকতেই পারে। তবে মানুষ হিসেবে তাঁর অসাধারণত্ব নিয়ে তা একদমই নেই। বাংলাদেশ–ওয়েস্ট ইন্ডিজ মিরপুর টেস্ট চলার সময় নেওয়া এই সাক্ষাৎকারে নতুন করে আবার তা উপলব্ধি করলেন উৎপল শুভ্র।

প্রথম কবে, কোন ম্যাচে ধারাভাষ্য দিয়েছিলেন, তা কি মনে করতে পারেন?

Visit sportbet.rodeo for more information.

ইয়ান বিশপ: যতটুকু মনে পড়ে, প্রথম ধারাভাষ্য রেডিওতে। সম্ভবত ১৯৯৪ সালে পিঠের চোটের কারণে খেলার বাইরে থাকার সময়, যখন ইংল্যান্ড দল ক্যারিবিয়ানে এসেছিল। মনে পড়ে—ত্রিনিদাদের তৎকালীন ‘৬১০ রেডিও’ নামের একটি স্টেশন থেকে আমাকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। স্টেশনটির দায়িত্বে ছিলেন কেনা ব্ল্যাক নামের একজন ভদ্রলোক, যিনি এখন আর বেঁচে নেই। আমি চোটের কারণে ঘরে বসে ছিলাম, আর তাঁরা ত্রিনিদাদে একজন ধারাভাষ্যকার খুঁজছিলেন। কুইন্স পার্ক ওভালে অনুষ্ঠিত ওই ইংল্যান্ড সিরিজের ম্যাচগুলোয় আমি প্রথমবারের মতো রেডিওতে টুকটাক কাজ করি।

তখনো তো আপনি খেলা ছাড়েননি, তাই না?

ইয়ান বিশপ: হ্যাঁ, আমি তখনো খেলছি। কিন্তু পিঠে স্ট্রেস ফ্র্যাকচারের কারণে কিছুদিনের জন্য মাঠের বাইরে থাকতে হয়েছিল। আর টিভিতে প্রথম ধারাভাষ্য দেওয়ার অভিজ্ঞতা হয়েছিল ১৯৯৯-২০০০ সালের দিকে জিম্বাবুয়ের ওয়েস্ট ইন্ডিজ সফরের সময়। ব্যক্তিগত কারণে মাইকেল হোল্ডিং অপারগতা জানালে তৎকালীন ব্রডকাস্টিং প্রতিষ্ঠান ‘টিডব্লিউআই’ আমাকে এক-দুটি ম্যাচে তাঁর জায়গায় কাজ করার সুযোগ দেয়। আমার প্রথম দিকের স্মৃতি বলতে এগুলোই। অনেক আগের কথা এসব।

প্রথম ধারাভাষ্য দেওয়ার সময় সহ-ধারাভাষ্যকার কারা ছিলেন, তা কি মনে আছে?

ইয়ান বিশপ: একদম প্রথম দিকের কথা সব মনে নেই, তবে ২০০০ সালে ওয়েস্ট ইন্ডিজ দলের ইংল্যান্ড সফরের সময় চ্যানেল ফোরের হয়ে রিচি বেনোর সঙ্গে ধারাভাষ্য দেওয়ার কথা খুব মনে পড়ে। আধা ঘণ্টার এক-একটি স্পেলে রিচির পাশে বসে নিজের স্বভাবজাত লাজুকতার কারণেই হয়তো প্রথম ১০-১৫ মিনিট আমি একটি শব্দও উচ্চারণ করিনি! তর্কযোগ্যভাবে সর্বকালের সেরা ধারাভাষ্যকার প্রয়াত রিচি বেনো কখন কথা বলার সুযোগ করে দেবেন, শুধু সেই অপেক্ষায় ছিলাম।

খুব নার্ভাস ছিলাম, একটু ভয়ও হয়তো পাচ্ছিলাম; পাশাপাশি ধারাভাষ্য বিষয়টা সম্পর্কে সঠিক ধারণাও তখন আমার তৈরি হয়নি।

আন্তর্জাতিক ম্যাচে প্রথম ধারাভাষ্য দেওয়ার নার্ভাসনেসের সঙ্গে ওয়েস্ট ইন্ডিজের হয়ে প্রথম বল করার সময়কার অনুভূতি কি চাইলে মেলানো যায়?

ইয়ান বিশপ: আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে অভিষেকের সময়ও খুব নার্ভাস ছিলাম।ইংল্যান্ডের বিপক্ষে হেডিংলিতে আমার প্রথম ওডিআই ম্যাচ, এরপর লর্ডসে দ্বিতীয়... নিজেকে প্রমাণ করার তাড়না এতটাই বেশি ছিল যে থার্ডম্যান অঞ্চল থেকে বাউন্ডারি বাঁচানোর জন্য ২৫ গজ দূর থেকেই ডাইভ মেরে বসেছিলাম, কিন্তু বলের নাগালই পাইনি! নতুন যেকোনো কিছুর শুরুতেই নার্ভাসনেস থাকে। আপনি ভালো বুঝবেন, কারণ সাংবাদিক বা পেশাদার হিসেবে আপনিও নিশ্চয়ই নিখুঁত হতে চান। চ্যানেল ফোরে রিচি বেনোর সঙ্গে ওই অভিজ্ঞতা এবং ১৯৮৮ সালে ভিভ রিচার্ডসের অধীনে প্রথম ওয়েস্ট ইন্ডিজের হয়ে খেলতে নামার স্মৃতি—নার্ভাসনেসের কথা বললে দুটিই প্রায় একই রকম।

রিচি বেনো তো কম কথা বলার জন্যই বিখ্যাত ছিলেন। বলছেন, আপনিও তাঁর পাশে বসে চুপ করে ছিলেন। তাহলে তো কমেন্ট্রিতে তখন নীরবতারই জয়–জয়কার...

ইয়ান বিশপ: একদমই তাই! আর ধারাভাষ্যে কিছুটা নীরবতা বা বিরতি থাকা মোটেও খারাপ কিছু নয়। সত্যি বলতে, তখন টিভি কমেন্ট্রির মারপ্যাঁচ সম্পর্কে আমার বিশেষ ধারণা ছিল না। সামান্য রেডিও আর জিম্বাবুয়ে সিরিজের দু-একটি ম্যাচ ছাড়া তেমন অভিজ্ঞতা ছিল না, আর রিচির ধারাভাষ্যের ধরন অন্য সবার চেয়ে আলাদা ছিল। ওই বয়সে আমি পুরোপুরি বুঝতামও না যে পর্দায় দেখানো দৃশ্যের সঙ্গে বাড়তি কিছু যোগ করতে পারলেই শুধু টিভি কমেন্ট্রিতে কথা বলা উচিত। যা এমনিতেই পর্দায় দেখা যাচ্ছে, তা হুবহু বলাটা কমেন্ট্রি নয়। রিচির পাশে বসে এমন কিছু বলতে চাইনি যাতে নিজেকে বোকা মনে হয়; যদিও শেষ পর্যন্ত বোধ হয় সেটাই করেছিলাম!

তবে এটাও ঠিক, টেলিভিশন ব্রডকাস্ট একেক দেশে একেকভাবে গ্রহণযোগ্য। এশিয়ার দর্শক বিস্তারিত বিবরণ ও অনেক বেশি কথা শুনতে পছন্দ করেন, আবার ইউরোপ ও অস্ট্রেলিয়ার দর্শক কথার মধ্যে নীরবতা বা পজ বেশি পছন্দ করেন। তাই মূলকথার বাইরে শ্রোতা-দর্শকদের রুচির সঙ্গে মানিয়ে নেওয়াটাও ধারাভাষ্যকারদের জন্য অনেক বড় চ্যালেঞ্জ।

কমেন্ট্রির ধারা একেক দেশে একেকরকম হতে পারে। তবে একটা ব্যাপারে সবাই একমত যে, আপনি বর্তমান সময়ের অন্যতম সেরা ধারাভাষ্যকার। আপনার বিশ্লেষণ এবং পূর্বপ্রস্তুতি নিয়ে সবারই অনেক মুগ্ধতা। ধারাভাষ্য শুরু করার সময় কি বিশ্বসেরা হওয়ার কোনো লক্ষ্য বা স্বপ্ন ছিল?

ইয়ান বিশপ: রিচি একটি চমৎকার কথা বলেছিলেন...সেটি বলার আগে আমি মহান সৃষ্টিকর্তাকে ধন্যবাদ জানাই যে মাইকেল হোল্ডিং, টনি কোজিয়ার ও রিচি বেনোর মতো কিংবদন্তিদের সঙ্গে কাজ করার সুযোগ পেয়েছি। মাইক্রোফোন হাতে নেওয়া ধারাভাষ্যকারদের মধ্যে এই তিনজনকেই আমি সর্বকালের সেরা মনে করি।

রিচির কথাটা বলি, একবার এক জরিপে সর্বসম্মতিক্রমে রিচি বেনো সেরা ক্রিকেট কমেন্টেটর নির্বাচিত হয়েছিলেন। কয়েক হাজার ভোটের মধ্যে তিনি সিংহভাগ ভোট পান, তবে শতভাগ পাননি। তিনি তখন বলেছিলেন, ‘দেখুন, আমি অধিকাংশ ভোট পেয়েছি ঠিকই, কিন্তু সব ভোট পাইনি। তার মানে এখনো এমন মানুষ আছে যারা আমার কাজ পছন্দ করে না।’ কথাটি আমার মনে গভীরভাবে দাগ কেটেছিল। এটা আমাকে শিক্ষা দিয়েছিল যে কেউ হয়তো ধীরগতির কথা পছন্দ করেন, কেউ দ্রুতগতির কথা, কারও হয়তো গম্ভীর কণ্ঠ পছন্দ, কারও হালকা, আবার কেউ ব্যাটারের চেয়ে ফাস্ট বোলারদের বিশ্লেষণ বেশি পছন্দ করেন। একজন সাংবাদিক বা ধারাভাষ্যকার হিসেবে আপনার কাজ হলো কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে দর্শকদের অর্থপূর্ণ তথ্য দেওয়া এবং এটি মেনে নেওয়া যে কেউ হয়তো আপনাকে অতিরিক্ত লম্বা, খাটো, মোটা বা ছিপছিপে মনে করতেই পারে—সেটা নিয়ে পড়ে না থেকে এগিয়ে যাওয়া। আমার লক্ষ্য স্রেফ একটাই—খেলোয়াড় হিসেবে যেমন ছিলাম, ব্রডকাস্টার হিসেবেও প্রতিদিন নিজের সেরাটা দেওয়া। কোনো দিন হয়তো ব্যর্থ হতে পারি, কিন্তু সেটা চেষ্টার অভাবে হবে না।

যে প্রশ্নটা করেছিলাম, একদিন ধারাভাষ্যকার হিসেবে বিশ্বসেরা হব, এমন কোনো স্বপ্ন কি ছিল আপনার?

ইয়ান বিশপ: সত্যি বলতে, ধারাভাষ্যকার হওয়াটাই কখনো আমার স্বপ্ন ছিল না। খেলোয়াড়ি জীবনের শেষের দিকে এসে আমার মনে হয়েছিল, ক্রিকেট থেকে যতটা দূরে সম্ভব চলে যাব; ক্রিকেটকেন্দ্রিক কোনো কিছুর সঙ্গেই আর থাকব না।

খেলোয়াড়ি জীবনের মন্ত্রই ধারাভাষ্যকার হিসেবেও মেনে চলেন ইয়ান বিশপ—প্রতিদিনই নিজের সেরাটা দিতে হবে।

চোটের কারণে যেভাবে ক্রিকেট–জীবন শেষ হয়ে গিয়েছিল, সেই হতাশা থেকেই কি এমন ভাবনা?

ইয়ান বিশপ: না, যেভাবে আমার ক্যারিয়ার শেষ হয়েছিল, তা নিয়ে কোনো ক্ষোভ বা আক্ষেপ ছিল না। কারণটা অন্য। আমি মনে করি, আমাদের মতো অ্যাথলেটরা কিছুটা অহংকারী ও আত্মকেন্দ্রিক হয়, ইগোটা অনেক বেশি থাকে। তাই আমি এদের সংস্পর্শে থাকতে চাইনি, চাইনি কেউ আমাকে খাটো করুক। কিন্তু ঈশ্বরের ইচ্ছা হয়তো অন্য রকম ছিল। পিঠের চোটের কারণে ’৯০-এর দশকের শুরুতে রেডিওতে একটু কাজ করার সুযোগ পাওয়া, আর খেলা ছাড়ার পর সেটাই নতুন দরজা খুলে দিয়েছিল।

সেটিও ঘটনাচক্রে। ইংল্যান্ড থেকে আসা একজন ফুটবল এজেন্টের (যিনি আমার এক বন্ধুর বন্ধু ছিলেন) সঙ্গে ত্রিনিদাদে দেখা হলে তিনি জানান, চ্যানেল ফোর ২০০০ সালের সিরিজের জন্য একজন ওয়েস্ট ইন্ডিয়ান কমেন্টেটর খুঁজছে। তাকে বিদায় করে দেওয়ার জন্যই একটা ডেমো রেকর্ড করে দিয়েছিলাম। কিন্তু পরে তিনি এসে জানালেন যে তাঁরা আমাকেই নিতে চান—যার পেছনে মূল অনুঘটক ছিলেন মাইকেল হোল্ডিং! প্রায় ১৫ বছর পর আমি জানতে পারি যে মাইকিই আমার নাম প্রস্তাব করেছিলেন। মাইকেল হোল্ডিং আমার ক্যারিয়ারে অভিভাবকতুল্য এবং বড় ভাইয়ের মতো ছিলেন। দারুণ মানুষ!

আপনি আপনার প্রিয় ধারাভাষ্যকারদের কথা বললেন—বেনো, কোজিয়ার, হোল্ডিং...

ইয়ান বিশপ: ওই তিনজন শুধু আমার প্রিয়ই ছিলেন না, শুনে শুনে শেখার ক্ষেত্রে তাঁরাই ছিলেন আমার সেরা শিক্ষক। রিচি ধারাভাষ্যে বিরতি বা নীরবতার গুরুত্ব বুঝতেন, যা আমার নিজস্ব ধারণার সঙ্গে মিলে যায়। মাইকিও (হোল্ডিং) সেই ধারারই ছিলেন; প্রতিটি বলের পরেই মন্তব্য করার প্রয়োজন মনে করতেন না। টনি কোজিয়ারের বিষয়টা একটু ভিন্ন ছিল। কারণ, তাঁর মূল ভিত্তি ছিল লেখালেখি ও রেডিও। আমার এক বন্ধু ফাজির মোহাম্মদ ধারাভাষ্য, রেডিও এবং লেখালেখি মিলিয়ে টনিকে ব্রডকাস্টিংয়ের ‘সেরা অলরাউন্ডার’ বলে ডাকতেন। আমার নীতি খুব সোজা—কথা বলার প্রয়োজন না থাকলে আমি বলি না।

বেনো, কোজিয়ার ও হোল্ডিংকে ধারাভাষ্যের সর্বকালের সেরা শিক্ষক মানেন বিশপ।

এই তিনজনের মধ্যে বেনো ও কোজিয়ার এখন প্রয়াত, হোল্ডিংও অবসর নিয়েছেন। আমি যদি আপনাকে বর্তমান সময়ে সক্রিয় আছেন, এমন কোনো ধারাভাষ্যকারের নাম বলতে বলি, যাঁকে শুনতে আপনার ভালো লাগে?

ইয়ান বিশপ: ওহ, অনেকেই আছেন! তবে সমস্যা হলো নির্দিষ্ট একজনের নাম বললে বাকি সহকর্মীরা কাজের জায়গায় আমাকে বাঁকা চোখে দেখবে! তাই আমি এটা এড়িয়ে চলি। বিশেষ কারও নাম বলাটা ঝুঁকিপূর্ণ, তবে বর্তমানে এমন বেশ কয়েকজন আছেন যাঁরা আমার চেয়েও অনেক গুণ ভালো কাজ করছেন। যেমন...না, থাক। নির্দিষ্ট নাম বলতে গেলে আমি বিপদে পড়ে যাব (হাসি)!

২০১৯ বিশ্বকাপে চরম নাটকীয়তার পর ইংল্যান্ড যখন চ্যাম্পিয়ন হলো সেই মুহূর্তে ধারাভাষ্য কক্ষে ছিলেন ইয়ান বিশপ

বিশেষ কোনো ম্যাচ বা মুহূর্তের কথা মনে পড়ে, যখন কমেন্ট্রি বক্সে থাকতে পেরে নিজেকে ভাগ্যবান মনে হয়েছে? উদাহরণ হিসেবে যদি ২০১৬ সালের টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ ফাইনালের সেই ‘ব্রাফেট মোমেন্ট’–এর কথা বলি...

ইয়ান বিশপ: কোনো নির্দিষ্ট মুহূর্তে কমেন্ট্রি বক্সে থাকার কারণে নিজেকে আমি আলাদাভাবে ভাগ্যবান ভাবি না। কারণ, সেখানে আমি দায়িত্ব পালন করতে যাই। তবে বিশেষ তিনটি মুহূর্তের কথা কখনোই ভুলব না।

১. ২০১৬ টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ ফাইনাল—যখন ওয়েস্ট ইন্ডিজ জিতল ও ডেভিড লয়েড মাইক্রোফোনটি আমার হাতে তুলে দিলেন, যেটা আমি নিতে চাইনি।

২. ২০১৬ অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপ—যেখানে ওয়েস্ট ইন্ডিজ প্রথমবারের মতো চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল। সেটা এই মাঠেই (মিরপুর)।

৩. ২০১৯ সালের লর্ডসে অনুষ্ঠিত ওয়ানডে বিশ্বকাপ ফাইনাল—যখন ইংল্যান্ড শেষ পর্যন্ত বিজয়ী হলো এবং আমি নাসের হুসেইন ও ইয়ান স্মিথের মাঝে বসে দুই মহিরুহকে নিখুঁতভাবে দর্শকের সামনে অবিশ্বাস্য এক ম্যাচ কথায় ফুটিয়ে তুলতে দেখছিলাম।

যখন মাইক্রোফোনের সামনে বসেন, তখন কি নিজেকে একজন ওয়েস্ট ইন্ডিয়ান ভাবেন, নাকি একজন নিরপেক্ষ আন্তর্জাতিক ধারাভাষ্যকার?

ইয়ান বিশপ: ওয়েস্ট ইন্ডিয়ান কখনোই নয়। এই একটা বিষয়ে কিছু মানুষের ওপর আমার খুব রাগ হয়। অনেকেই এটা বোঝে না, ধারাভাষ্য দেওয়া মানে নিজের দেশের প্রতিনিধিত্ব করা নয়। কখনোই না। পমি মবংওয়া, নাসের হুসেইন কিংবা ইয়ান স্মিথ—ওঁরা কেউ জিম্বাবুয়ে, ইংল্যান্ড বা নিউজিল্যান্ডকে প্রতিনিধিত্ব করতে ওখানে বসেন না। তাঁরা বসেন একজন বিশ্লেষক হিসেবে দৃষ্টিভঙ্গি শেয়ার করতে। ইয়ান বিশপ যেহেতু ওয়েস্ট ইন্ডিজের হয়ে খেলেছেন, তিনি ওখানকার ক্রিকেট–সংস্কৃতির প্রেক্ষাপট তুলে ধরতে পারেন, কিন্তু তার মানে এই নয় যে তিনি কমেন্ট্রি বক্সে ওয়েস্ট ইন্ডিজের পতাকা ওড়াবেন। বাংলাদেশ, নিউজিল্যান্ড কিংবা ওয়েস্ট ইন্ডিজ—যে দলই জিতুক বা হারুক, আমার কণ্ঠের সুর ও নিরপেক্ষতা সব সময় একই থাকা উচিত।

রিজওয়ানকে বোল্ড করা নাহিদ রানার সেই বল এবং আরও গল্প ইয়ান বিশপ কমেন্ট্রিকে নিয়ে গেছেন অন্য মাত্রায়

কিন্তু ধারাভাষ্যকারদের মধ্যে কেউ কেউ তো কমেন্ট্রি বক্সে নিজের দেশের সমর্থক হয়ে যান, সেই দেশের লোকজনও এটাকে খুব সাধুবাদও জানায়...

ইয়ান বিশপ: ক্যারিবিয়ান বা বিশ্বজুড়েই সমর্থকেরা কখনো কখনো বলেন—‘তিনি নিজ দেশের পক্ষে যথেষ্ট বলছেন না।’ কিন্তু আমি যা বুঝি, সাংবাদিকতার মতো ব্রডকাস্টিংয়েও আপনাকে যতটা সম্ভব নিরপেক্ষ থাকতে হবে। পক্ষপাতিত্ব বা ‘পতাকা ওড়ানো’ কোনো ব্রডকাস্টিং হতে পারে না—ওটা মানহীন কাজ। এটা করেননি বলেই রিচি, মাইকি কিংবা টনিরা জাতীয়তার সীমানা ছাড়িয়ে বৈশ্বিক ভালোবাসা পেয়েছিলেন।

লম্বা একটা সময় ধরে টনি কোজিয়ার ছিলেন ‘ভয়েস অব ক্যারিবিয়ান ক্রিকেট’। অথচ এখন টিভি কমেন্ট্রিতে সাবেক খেলোয়াড় নন, এমন কোনো প্রথাগত সাংবাদিক বা ধারাভাষ্যকার প্রায় দেখাই যায় না। একমাত্র ব্যতিক্রম সম্ভবত হার্শা ভোগলে। আপনার কি মনে হয়, এটাই ঠিক আছে?

ইয়ান বিশপ: কোনটা সঠিক আর কোনটা ভুল—তার কোনো নির্দিষ্ট নিয়ম নেই। এখানে একটা ভারসাম্য থাকা দরকার। টনি কোজিয়ার কিংবা হার্শা ভোগলের মতো মানুষেরা মাঠের ক্রিকেটের বাইরেও জীবনকে দেখেছেন—ব্যবসা-বাণিজ্য নিয়ে লিখেছেন, সামাজিক জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে দৃষ্টিভঙ্গি এনেছেন। অন্যদিকে সাবেক ক্রিকেটাররা অনেক সময় প্রশিক্ষণ আর খেলার একটা নির্দিষ্ট গণ্ডির মধ্যে বসবাস করেন। তাই সাবেক ক্রিকেটার, নারী কমেন্টেটর এবং অ-ক্রিকেটারদের সংমিশ্রণ থাকলে ব্রডকাস্টিংয়ের মান সবচেয়ে ব্যালান্সড ও সমৃদ্ধ হয়।

ম্যাচের আগে খেলোয়াড়দের ব্যাকগ্রাউন্ড ও পরিসংখ্যান নিয়ে গভীর গবেষণা করেন বিশপ।

ধারাভাষ্য নিয়ে আপনার প্রস্তুতি নিয়ে অনেক কিছু শুনি। আপনার কাছে জানতে চাই, কোনো সিরিজ বা টুর্নামেন্টের আগে আপনি কীভাবে প্রস্তুতি নেন?

ইয়ান বিশপ: প্রতিটি ধারাভাষ্যকারের প্রস্তুতির নিয়ম আলাদা। আমি তথ্য নিয়ে গবেষণা করতে ভালোবাসি। যেমন হাসান মাহমুদ বা নাহিদ রানার মতো তরুণ খেলোয়াড়দের শুধু পরিসংখ্যান নয়, তাদের উঠে আসার পেছনের গল্পটাও জানার চেষ্টা করি। সিরিজ শুরুর আগে আমি গভীর রাত পর্যন্ত প্রতিটি খেলোয়াড়ের ব্যাকগ্রাউন্ড আর পরিসংখ্যান নিয়ে পড়াশোনা করি। তরুণ ধারাভাষ্যকারদের জন্য আমার পরামর্শ থাকবে—নিজেকে চিনুন, স্বকীয়তা বজায় রাখুন, কাউকে অনুকরণ করবেন না এবং নিজের কণ্ঠ হয়ে উঠুন।

টেপ টেনিস থেকে ক্রিকেট বল: নাহিদ রানার উত্থানের সেই সব দিন

এবার ধারাভাষ্যের বাইরে একটু অন্য প্রসঙ্গ—ওয়েস্ট ইন্ডিজ ক্রিকেট। একটা সময় ওয়েস্ট ইন্ডিজ ক্রিকেট–বিশ্ব শাসন করত। কিন্তু এখন বাংলাদেশও নিয়মিত ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিরুদ্ধে সমানতালে লড়াই করে। এটা যখন দেখেন, ধারাভাষ্য দেওয়ার সময় আপনার কি কষ্ট হয় না?

ইয়ান বিশপ: ইয়ান চ্যাপেল একবার বলেছিলেন, খেলা ছেড়ে দেওয়ার পর অস্ট্রেলিয়াকে নিয়ে আবেগ ছাড়া নিরপেক্ষভাবে কথা বলাটা তাঁকে শিখতে হয়েছে। একজন ওয়েস্ট ইন্ডিয়ান হিসেবে ক্লাইভ লয়েড, জর্জ হেডলি, ফ্র্যাঙ্ক ওরেল ও ভিভ রিচার্ডসদের গড়ে তোলা সেই গৌরবময় সাম্রাজ্যকে সব সময় সফল দেখতে চাওয়ার একটা ইচ্ছা তো থাকেই। তবে একজন খ্রিষ্টান ও বিশ্বনাগরিক হিসেবে আমি বাংলাদেশের সাফল্যও মন থেকে কামনা করি। কোনো ভণ্ডামি ছাড়া খেলাটাকে আমি স্রেফ খেলা হিসেবেই দেখি।

ইয়ান বিশপ যখন খেলোয়াড়

ওয়েস্ট ইন্ডিজ ক্রিকেটের অধোগতি সম্পর্কে আপনার পর্যবেক্ষণ কী? সব দলই তো উত্থান-পতনের চক্রের মধ্য দিয়ে যায়, কিন্তু ওয়েস্ট ইন্ডিজের খারাপ সময়টা এত দীর্ঘ সময় ধরে চলছে যে, এটাকে সেই চক্রের ব্যাপার মনে হচ্ছে না...

ইয়ান বিশপ: এটা স্রেফ উত্থান-পতনের কোনো চক্র নয়, মূল সমস্যাটি অর্থনৈতিক। ওয়েস্ট ইন্ডিজ কী? ইংরেজিভাষী ক্যারিবীয় অঞ্চলজুড়ে ছড়িয়ে থাকা ছোট ছোট কিছু দ্বীপরাষ্ট্রের সমষ্টি। যাদের মোট জনসংখ্যা মাত্র ৬০ থেকে ৮০ লাখের মতো—যা বাংলাদেশ, ভারত, ইংল্যান্ড বা অস্ট্রেলিয়ার জনসংখ্যার তুলনায় খুবই নগণ্য। আমাদের টিভি সম্প্রচারের রাজস্ব তাই অনেক সীমিত। স্কাই, চ্যানেল নাইন বা স্টার স্পোর্টসের কাছ থেকে যেমন পাওয়া যায়, তেমন আর্থিক সুবিধা পাওয়ার সুযোগ নেই। ভালো অবকাঠামোও নেই। ফলে আন্তর্জাতিক ফ্র্যাঞ্চাইজি লিগগুলোর সঙ্গে টেক্কা দিয়ে সেরা খেলোয়াড়দের ধরে রাখা আমাদের বোর্ডের জন্য কঠিন হয়ে পড়েছে। একমাত্র নিউজিল্যান্ডের সঙ্গে হয়তো তুলনা চলে। ওদের জনসংখ্যা প্রায় আমাদের মতোই। ওদের মডেলটা আলাদা।

তাহলে আশির দশকের সেই ওয়েস্ট ইন্ডিজ দলটি কীভাবে এমন অবিশ্বাস্য সাফল্য পেয়েছিল, সেটি কি একসঙ্গে অনেক গ্রেট খেলোয়াড়ের জন্ম হয়েছিল বলে, নাকি অন্য কোনো কারণ, যেমন কাউন্টি ক্রিকেটে খেলা...

ইয়ান বিশপ: এমন বেশ কিছু কারণ ছিল। খেলোয়াড়েরা কাউন্টি ক্রিকেট খেলে নিজেদের দক্ষতাকে নিখুঁত করেছিলেন, দলে দারুণ সব শারীরিকভাবে শক্তিশালী অ্যাথলেট ছিল, জেতার অদম্য ইচ্ছা ও আগ্রাসন ছিল। বিশ্বমঞ্চে নিজস্ব এক ক্যারিবীয় পরিচয় প্রতিষ্ঠিত করার এক তীব্র তাড়নাও তাদের মধ্যে কাজ করত। এখন তো এটা নেই, থাকার কথাও নয়।

নাহিদ রানাকে খুঁজে পাওয়ার গল্প, নাহিদ রানা হয়ে ওঠার গল্প

Read full story at source