চার ঘণ্টার সবজির বাজারে এক দিনে বিক্রি প্রায় ৪০ লাখ টাকা
· Prothom Alo
সকাল পৌনে ছয়টা। চারদিকে কুয়াশা। বগুড়ার শেরপুরের ফুলবাড়ী পাইকারি সবজির বাজারে তখন ব্যস্ততা। কেউ ভ্যানভর্তি সবজি নিয়ে আসছেন, কেউ কাঁধে ঝুড়ি, কেউ আবার খেতের তাজা সবজি সাজিয়ে বসেছেন ক্রেতার অপেক্ষায়।
Visit asg-reflektory.pl for more information.
বাজারে লালশাক নিয়ে ঢুকলেন কৃষক রফিকুল ইসলাম (৪৫)। এবার ১৫ শতক জমিতে লালশাক চাষ করেছেন তিনি। প্রায় ১৫ দিন ধরে খেতের শাক নিয়ে আসছেন এই বাজারে। দিনে বিক্রি হচ্ছে ৭০০ থেকে ১ হাজার টাকার। ভালো দাম পেয়ে খুশি রফিকুল।
কিছু দূরে মুলা নিয়ে ক্রেতার অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে আছেন চকপাথালিয়া গ্রামের কৃষক জাফর হোসেন (৫০)। ২০ শতক জমিতে মুলা চাষ করেছেন। সপ্তাহে পাঁচ দিন এই বাজারে আসেন। এক দিনে ৮০ কেজি মুলা বিক্রি করেছেন এক হাজার টাকায়। গত শুক্রবার সকালে বাজারে গিয়ে এমন দৃশ্যই দেখা যায়।
রফিকুল ও জাফরের মতো প্রতিদিন কয়েক হাজার কৃষক ভোরে খেতের সবজি নিয়ে আসেন এই বাজারে। ভোর সাড়ে পাঁচটা থেকে সকাল সাড়ে নয়টা, মাত্র চার ঘণ্টা চলে কেনাবেচা। স্থানীয় মানুষের কাছে বাজারটি ‘চার ঘণ্টার সবজির বাজার’ নামে পরিচিত। সোমবার ও বৃহস্পতিবার ছাড়া প্রতিদিন ভোরে বসে বাজারটি।
কোথাও লালশাকের স্তূপ, কোথাও মুলা, বেগুন, ফুলকপি কিংবা বাঁধাকপি। কৃষকেরা দাম হাঁকছেন, পাইকারেরা দরদাম করছেন। কেউ সবজি বাছাই করছেন, কেউ দ্রুত গাড়িতে মাল তুলছেন।
শেরপুর উপজেলার উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা জি এম মাসুদ প্রথম আলোকে বলেন, ফুলবাড়ী বাজারে প্রতিদিন অন্তত চার হাজার কৃষক ৩০ থেকে ৪০ লাখ টাকার সবজি বিক্রি করেন। এবার উপজেলার ৭ হাজার ৫৫৮ একর জমিতে সবজির চাষ হয়। প্রতি একর জমিতে বছরে ৮ দশমিক ২৩ মেট্রিক টন সবজি উৎপাদন হয়ে থাকে। সবজি চাষের সঙ্গে জড়িত শেরপুরের ২২ হাজার ৬৭০ জন কৃষক।
ছয় ইউনিয়নের কৃষকদের ভরসা
শেরপুরের গাড়িদহ ইউনিয়নে করতোয়া নদীর পাশে ফুলবাড়ী খেলার মাঠসংলগ্ন এলাকায় বাজারটির অবস্থান। বাজারটি ঢাকা-বগুড়া মহাসড়কে উপজেলা পরিষদের প্রধান ফটক থেকে প্রায় দুই কিলোমিটার পূর্ব দিকে। কুসুম্বি, গাড়িদহ, খামারকান্দি, শাহবন্দেগি, মির্জাপুর ও খানপুর ইউনিয়নের কয়েক হাজার কৃষক এখানে সবজি নিয়ে আসেন। পাশের শাজাহানপুর ও ধুনট উপজেলার কৃষকেরাও আসেন।
বাজারে নানা রকম সবজি নিয়ে বসেছেন বিক্রেতারা। গত শুক্রবার সকালে শেরপুরের ফুলবাড়ী সবজি বাজারেস্থানীয় কৃষকদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে ২০০৬ সালে তৎকালীন উপজেলা প্রশাসন ও গাড়িদহ ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানের সহযোগিতায় বাজারটির যাত্রা শুরু হয়। সরকারি ১৫ শতক জায়গায় শুরু হলেও ক্রেতা-বিক্রেতার ভিড়ে এখন তা ছড়িয়ে গেছে পাশের ফুলবাড়ী হামিদীয়া দাখিল মাদ্রাসার মাঠেও। শুরুতে বাজারটি ছিল স্থানীয় কৃষক ও ব্যবসায়ীদের। এখন দূরদূরান্ত থেকে পাইকারেরা আসেন। এখানকার সবজি ট্রাক ও পিকআপে করে চলে যায় দেশের নানা প্রান্তে।
স্থানীয় কৃষক আতাউর রহমান ও ইনছান আলী বলেন, উপজেলার ছয় ইউনিয়নে সারা বছরই কমবেশি সবজি হয়। স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে সবজি যায় টাঙ্গাইল, সাভার ও ঢাকার বিভিন্ন বাজারে।
জি এম মাসুদ, উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা, শেরপুর উপজেলাফুলবাড়ী বাজারে প্রতিদিন অন্তত চার হাজার কৃষক সবজি বিক্রির জন্য আনেন। উপজেলায় ৭ হাজার ৫৫৮ একর জমিতে সবজির চাষ হয়। প্রতি একর জমিতে বছরে ৮ দশমিক ২৩ মেট্রিক টন সবজি উৎপাদিত হয়।শেরপুর পৌর শহরের শিশুপার্কের সবজি বিক্রেতা মিলন সরকার, বৈকাল বাজারের দুলাল সরকার ও নিপু মালাকার, বারদুয়ারী হাটের আলম হোসেন এবং দুবলাগাড়ী হাটের সাইদুল ইসলাম বলেন, এই বাজারের কারণে কৃষকেরা সবজি দ্রুত বিক্রি করতে পারছেন। পাশাপাশি উপজেলার ৩০টি ছোট বাজারে ২০০ থেকে ২৫০ জন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী সবজি বিক্রি করে সংসার চালাচ্ছেন।
শীতে বেচাকেনা ৩০ থেকে ৪০ লাখ টাকা
সারা বছরই বাজারে সবজি কেনাবেচা হয়। তবে নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি—এই চার মাস চিত্র বদলে যায়। সরবরাহ বাড়ায় ব্যস্ততা বাড়ে কয়েক গুণ। নির্ধারিত জায়গায় কুলায় না, তাই পাশের মাদ্রাসার মাঠেও বসে সবজির পসরা।
খেতের লালশাক নিয়ে বাজারে আসছেন এক কৃষক। গত শুক্রবার সকালে শেরপুরের ফুলবাড়ী সবজি বাজারেশাজাহানপুরের মারিয়া গ্রামের কৃষক মো. মামুন (৪০), ফুলবাড়ী গ্রামের আবদুর রাজ্জাক (৪৮), ফুলবাড়ী দক্ষিণপাড়ার ফরহাদ হোসেন (৫০), জোয়ানপুর গ্রামের বেলাল হোসেন এবং ফুলবাড়ীর পাইকারি ক্রেতা তামিম প্রামাণিক (৫৫) জানান, নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি প্রতিদিন ৩০ থেকে ৪০ লাখ টাকার সবজি কেনাবেচা হয় এই বাজারে। বছরের অন্য সময় তা থাকে ২০ থেকে ৩৫ লাখ টাকা।
বাজারে ঢুকলে চোখে পড়ে বিচিত্র কর্মযজ্ঞ। সারি সারি ভ্যান ও ভটভটি (তিন চাকার যান)। কোথাও লালশাকের স্তূপ, কোথাও মুলা, বেগুন, ফুলকপি কিংবা বাঁধাকপি। কৃষকেরা দাম হাঁকছেন, পাইকারেরা দরদাম করছেন। কেউ সবজি বাছাই করছেন, কেউ দ্রুত গাড়িতে মাল তুলছেন।
বদলেছে স্থানীয় কৃষি-বাণিজ্যের চিত্র
বাজারটির বড় সুবিধা হলো কৃষককে সবজি বিক্রির জন্য দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয় না। ভোরে খেতের সবজি এনে কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই বিক্রি করে তাঁরা বাড়ি ফিরে যান। পাইকারেরাও এক জায়গায় নানা ধরনের সবজি পেয়ে সহজেই পণ্য সংগ্রহ করতে পারেন। এতে কৃষকের পাশাপাশি উপকৃত হচ্ছেন পাইকারি ও খুচরা ব্যবসায়ী, পরিবহনশ্রমিকসহ নানা পেশার মানুষ।
ভ্যানে করে ফুলকপি নিয়ে বাজারে আসছেন কৃষক। গত শুক্রবার সকালে শেরপুরের ফুলবাড়ী সবজি বাজারেসকাল সাড়ে নয়টার দিকে বাজারে ব্যস্ততা কমতে শুরু করে। অনেক কৃষকের ঝুড়ি ও ভ্যান তখন প্রায় খালি। কেউ বিক্রির টাকা গুনছেন, কেউ বাড়ি ফেরার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। ভোরে খেতের ফসল নিয়ে আসা কৃষকদের মুখে তখন স্বস্তির ছাপ। দিনের একটি বড় কাজ শেষ।
চার ঘণ্টার এই বাজারে একদিকে যেমন কৃষকের খেতের ফসল বিক্রি হচ্ছে, অন্যদিকে সচল থাকছে স্থানীয় কৃষি ও ব্যবসা-বাণিজ্য। সকালের এই বেচাকেনার ওপরই নির্ভর করে হাজারো মানুষের জীবিকা।
প্রশাসনের পক্ষ থেকে বাজারটি নিয়মিত তদারক করা হয় বলে জানান শেরপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. সাইদুজ্জামান হিমু।