পৃথিবীর ৮টি বিখ্যাত ভুতুড়ে প্রাসাদ, যেখানে আজও ঘুরে বেড়ায় অশরীরীর গল্প

· Prothom Alo

সিনেমায় দেখা আর বইয়ের পাতায় পড়া প্রাচীন সব ক্যাসল, প্যালেস আর টাওয়ারে আজও ঘুরে বেড়ায় অশরীরীর গল্প। হ্যালোউইন উপলক্ষে চলুন ঘুরে আসি পৃথিবীর কিছু রহস্যময় স্থাপনা থেকে।

Visit grenadier.co.za for more information.

নির্জন করিডরে অজানা পায়ের শব্দ, বন্ধ ঘরে ভেসে আসা কান্না, অন্ধকার জানালায় রহস্যময় ছায়া! পৃথিবীর নানা প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা কিছু প্রাচীন প্রাসাদ, দুর্গ ও বাড়ি ঘিরে প্রচলিত রয়েছে এমনই সব ভৌতিক কাহিনি। কোথাও শিরশ্ছেদ হওয়া রানির আত্মা দেখার দাবি, কোথাও পরিত্যক্ত কক্ষে শিশুর কান্না, আবার কোথাও হত্যাকাণ্ডের স্মৃতি থেকে জন্ম নেওয়া অভিশপ্ত স্থাপনার গল্প। হ্যালোউইন উপলক্ষে চলুন ঘুরে আসি পৃথিবীর কিছু রহস্যময় স্থাপনা থেকে, যেগুলোর অন্ধকার ইতিহাস আর ভুতুড়ে কিংবদন্তি আজও মানুষের কৌতূহল জাগিয়ে রাখে।

১. টাওয়ার অব লন্ডন, ইংল্যান্ড: শিরশ্ছেদ করা রানির ছায়া

লন্ডনের টেমস নদীর তীরে অবস্থিত প্রাচীন টাওয়ার অব লন্ডন একসময় ছিল রাজপ্রাসাদ, দুর্গ ও কারাগার। রাজপরিবারের ষড়যন্ত্র, বন্দিত্ব এবং মৃত্যুদণ্ডের বহু ঘটনা এই স্থাপনার ইতিহাসের সঙ্গে জড়িয়ে আছে। এখানকার সবচেয়ে আলোচিত ভৌতিক কাহিনি অ্যান বোলিনকে ঘিরে।

এই কিংবদন্তি টাওয়ার অব লন্ডনকে পৃথিবীর সবচেয়ে আলোচিত ভুতুড়ে স্থাপনাগুলোর একটিতে পরিণত করেছে

ইংল্যান্ডের রাজা অষ্টম হেনরির দ্বিতীয় স্ত্রী অ্যান বোলিনকে ১৫৩৬ সালে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছিল। জনশ্রুতি রয়েছে, মৃত্যুর পরও তাঁর আত্মা দুর্গের প্রাঙ্গণে ঘুরে বেড়ায়। কখনো সাদা পোশাকে, কখনো মাথাবিহীন অবয়বে তাঁকে দেখা যাওয়ার গল্প প্রচলিত আছে। বাস্তব ইতিহাসের সঙ্গে মিশে থাকা এই কিংবদন্তি টাওয়ার অব লন্ডনকে পৃথিবীর সবচেয়ে আলোচিত ভুতুড়ে স্থাপনাগুলোর একটিতে পরিণত করেছে।

২. লিপ ক্যাসল, আয়ারল্যান্ড: রক্তাক্ত উপাসনাকক্ষের রহস্য

আয়ারল্যান্ডের লিপ ক্যাসলকে ঘিরে রয়েছে হত্যাকাণ্ড, পারিবারিক সংঘাত ও অশরীরীর উপস্থিতি নিয়ে নানা কাহিনি। দুর্গের একটি প্রাচীন উপাসনাকক্ষ পরিচিত ‘রক্তাক্ত উপাসনাকক্ষ’ নামে। প্রচলিত গল্প অনুসারে, সেখানে একসময় পরিবারের এক সদস্য অন্য এক সদস্যকে হত্যা করেছিলেন।

দুর্গটিকে ঘিরে আরও একটি রহস্যময় সত্তার গল্প রয়েছে, যাকে স্থানীয় কিংবদন্তিতে অশুভ অতিপ্রাকৃত উপস্থিতি হিসেবে বর্ণনা করা হয়। দুর্গের অন্ধকার কক্ষ, পুরোনো পাথরের দেয়াল এবং রক্তাক্ত অতীতের গল্প মিলিয়ে জায়গাটি ভৌতিক কাহিনিপ্রেমীদের কাছে বিশেষ আকর্ষণীয়। তবে এসব অতিপ্রাকৃত ঘটনার নির্ভরযোগ্য প্রমাণ নেই। ইতিহাস ও লোককথার মিশ্রণই লিপ ক্যাসলের রহস্যময় পরিচিতিকে দীর্ঘস্থায়ী করেছে।

৩. এডিনবরা ক্যাসল, স্কটল্যান্ড: হারিয়ে যাওয়া বাঁশিবাদকের গল্প

স্কটল্যান্ডের রাজধানী এডিনবরার উঁচু পাথুরে ভূমিতে অবস্থিত এডিনবরা ক্যাসল বহু যুদ্ধ, অবরোধ ও বন্দিত্বের সাক্ষী। এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে এক বাঁশিবাদকের রহস্যময় অন্তর্ধানের কিংবদন্তি। কথিত আছে, দুর্গের নিচে থাকা গোপন সুড়ঙ্গ অনুসন্ধানের জন্য এক বাঁশিবাদককে পাঠানো হয়েছিল।

তিনি সুড়ঙ্গের ভেতর দিয়ে এগিয়ে যাওয়ার সময় বাঁশি বাজাচ্ছিলেন, যাতে বাইরে থাকা লোকজন তাঁর অবস্থান বুঝতে পারেন। কিন্তু একসময় বাঁশির শব্দ থেমে যায়। এরপর তাঁকে আর খুঁজে পাওয়া যায়নি। আজও এই গল্প এডিনবরা ক্যাসলের পরিচিত ভৌতিক কিংবদন্তিগুলোর একটি। দুর্গের অন্ধকার পথ ও প্রাচীন স্থাপত্য গল্পটিকে আরও রহস্যময় করে তুলেছে।

৪. হ্যাম্পটন কোর্ট প্যালেস, ইংল্যান্ড: করিডরে ছুটে বেড়ানো রানির আত্মা

ইংল্যান্ডের হ্যাম্পটন কোর্ট প্যালেস রাজপরিবারের ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে আছে। রাজা অষ্টম হেনরির পঞ্চম স্ত্রী ক্যাথরিন হাওয়ার্ডের করুণ পরিণতির সঙ্গে এই প্রাসাদের একটি ভৌতিক কিংবদন্তি জড়িয়ে রয়েছে। ক্যাথরিন হাওয়ার্ডকে ১৫৪২ সালে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়।

জনশ্রুতি অনুসারে, মৃত্যুর আগে তাঁকে প্রাসাদে আটকে রাখা হয়েছিল। কথিত আছে, তিনি নিজের নির্দোষিতা জানাতে রাজার কাছে ছুটে যাওয়ার চেষ্টা করেছিলেন। পরবর্তী সময়ে প্রাসাদের একটি করিডরে তাঁর আত্মাকে ছুটে বেড়াতে দেখা যায় বলে গল্প ছড়িয়ে পড়ে।প্রাসাদের দীর্ঘ করিডর ও রাজকীয় ইতিহাস এই কিংবদন্তিকে আরও জীবন্ত করে তুলেছে। তবে আত্মার উপস্থিতির দাবি প্রমাণিত নয়।

৫. চিলিংহাম ক্যাসল, ইংল্যান্ড: নীল পোশাকের শিশুর কান্না

ইংল্যান্ডের নর্থাম্বারল্যান্ডের চিলিংহাম ক্যাসলকে ঘিরে রয়েছে নীল পোশাক পরা এক শিশুর ভৌতিক কাহিনি। প্রচলিত গল্প অনুযায়ী, দুর্গের একটি কক্ষে রাতের বেলা শিশুর কান্না শোনা যেত। কখনো রহস্যময় নীলচে আলো দেখা যাওয়ার কথাও বলা হয়েছে। এই কিংবদন্তি ‘নীল বালক’ নামে পরিচিত।

দুর্গের সংস্কারকাজের সময় দেয়ালের ভেতর থেকে শিশুর দেহাবশেষ পাওয়া গিয়েছিল বলে কিছু বিবরণে উল্লেখ রয়েছে। সেই আবিষ্কারের সঙ্গে পরবর্তী সময়ে ভৌতিক গল্পটি জুড়ে দেওয়া হয়। তবে দেহাবশেষের পরিচয় এবং কিংবদন্তির সঙ্গে এর সম্পর্ক নিশ্চিত নয়। প্রাচীন দেয়াল, নির্জন কক্ষ আর শিশুর কান্নার গল্প সব মিলিয়ে চিলিংহাম ক্যাসল হ্যালোউইনের জন্য এক শিহরণ জাগানো গন্তব্য।

৬. ব্রিসাক ক্যাসল, ফ্রান্স: সবুজ পোশাকের রহস্যময় নারী

ফ্রান্সের লোয়ার উপত্যকার কাছে অবস্থিত ব্রিসাক ক্যাসল তার রাজকীয় স্থাপত্যের জন্য বিখ্যাত। কিন্তু এই দুর্গের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা সবুজ পোশাকের এক নারীর কিংবদন্তি এর পরিচিতিতে যোগ করেছে ভৌতিক মাত্রা। জনশ্রুতি অনুসারে, শার্লট দ্য ব্রেজে নামের এক নারীর মৃত্যুকে ঘিরেই এই গল্পের সূত্রপাত।

কথিত আছে, তাঁর আত্মাকে দুর্গের বিভিন্ন কক্ষে দেখা যায়। সবুজ পোশাক পরা এই নারীর মুখমণ্ডল ও চোখের অস্বাভাবিক বর্ণনা কিংবদন্তিটিকে আরও ভয়ংকর করে তুলেছে। তবে এসব বর্ণনা লোককথার অংশ, প্রমাণিত অতিপ্রাকৃত ঘটনা নয়। তবু প্রাসাদের নীরব করিডর আর পুরোনো ইতিহাসের সঙ্গে মিশে থাকা এই গল্প দর্শনার্থীদের কৌতূহল বাড়ায়।

৭. উইনচেস্টার মিস্ট্রি হাউস, যুক্তরাষ্ট্র: রহস্যময় সিঁড়ি, বন্ধ দরজা আর অদ্ভুত স্থাপত্য

যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ার সান হোসেতে অবস্থিত উইনচেস্টার মিস্ট্রি হাউস পৃথিবীর সবচেয়ে অদ্ভুত বাড়িগুলোর একটি। এর নির্মাণকাজ দীর্ঘদিন ধরে চলেছিল, আর বাড়িটির ভেতরে রয়েছে এমন সব সিঁড়ি, যা ছাদে গিয়ে শেষ হয়েছে; এমন দরজা, যা খুললে সামনে দেয়াল; এমন জানালা, যার অবস্থান দেখে বিস্মিত হতে হয়। বাড়িটির মালিক সারাহ উইনচেস্টারকে ঘিরে প্রচলিত রয়েছে নানা রহস্যময় গল্প।

লোককথা অনুসারে, তিনি নাকি অতিপ্রাকৃত শক্তির পরামর্শে বাড়িটির নির্মাণ অব্যাহত রেখেছিলেন। তবে এই গল্পগুলোর ঐতিহাসিক সত্যতা নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। বাড়িটির অস্বাভাবিক নকশা, দীর্ঘ নির্মাণপর্ব এবং রহস্যময় পরিবেশ একে ভৌতিক স্থাপনা হিসেবে জনপ্রিয় করে তুলেছে। বাস্তবে এটি একটি ঐতিহাসিক বাড়ি ও পর্যটনকেন্দ্র, যেখানে দর্শনার্থীরা এর স্থাপত্য ও কিংবদন্তি সম্পর্কে জানতে পারেন।

৮.  ব্রান ক্যাসল, রোমানিয়া: ড্রাকুলার রহস্যময় দুর্গ

রোমানিয়ার ট্রান্সিলভানিয়া অঞ্চলের ব্রান শহরের কাছে পাহাড়ের চূড়ায় দাঁড়িয়ে থাকা ব্রান ক্যাসলকে বিশ্বজুড়ে অনেকে ‘ড্রাকুলার প্রাসাদ’ নামে চেনেন। পাথুরে পাহাড়, সরু প্রবেশপথ, উঁচু মিনার আর মধ্যযুগীয় স্থাপত্য দুর্গটিকে রহস্যময় চেহারা দিয়েছে। ব্রাম স্টোকারের বিখ্যাত উপন্যাস ড্রাকুলা প্রকাশিত হয় ১৮৯৭ সালে। উপন্যাসের রক্তপায়ী ভ্যাম্পায়ার কাউন্ট ড্রাকুলা কাল্পনিক চরিত্র।

ব্রান ক্যাসলকে উপন্যাসের দুর্গের সঙ্গে যুক্ত করা হলেও, লেখক এই নির্দিষ্ট দুর্গটিকেই ড্রাকুলার বাসস্থান হিসেবে ব্যবহার করেছিলেন এমন প্রমাণ নেই। ড্রাকুলার চরিত্রের সঙ্গে ওয়ালাচিয়ার ঐতিহাসিক শাসক তৃতীয় ভ্লাদ বা ভ্লাদ দ্য ইমপেলারকে প্রায়ই যুক্ত করা হয়। তবে তিনি ব্রান ক্যাসলে বসবাস করতেন এমন নির্ভরযোগ্য ঐতিহাসিক প্রমাণও নেই।তা সত্ত্বেও দুর্গটির গথিক স্থাপত্য, ট্রান্সিলভানিয়ার রহস্যময় পরিচিতি এবং ড্রাকুলার কিংবদন্তি একে হ্যালোউইন প্রেমীদের অন্যতম আকর্ষণীয় গন্তব্যে পরিণত করেছে।

ভয়, ইতিহাস আর রহস্যের সীমানায়

পৃথিবীর এই সাতটি প্রাসাদ ও বাড়ির গল্পে বারবার ফিরে আসে মৃত্যু, বিচ্ছেদ, বন্দিত্ব, বিশ্বাসঘাতকতা ও অজানার ভয়। কোনো স্থাপনার অতীত সত্যিই রক্তাক্ত, কোনো জায়গার ভৌতিক পরিচিতি মূলত লোককথার ওপর নির্ভরশীল, আবার কোনো বাড়ির অদ্ভুত স্থাপত্যই মানুষের কল্পনাকে উসকে দেয়। এসব স্থানে অশরীরীর উপস্থিতির দাবির বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই। তবু শতাব্দী পেরিয়ে টিকে থাকা গল্পগুলো আমাদের দেখায়, ইতিহাসের সঙ্গে মানুষের ভয় ও কল্পনা মিশে কীভাবে একটি জায়গাকে রহস্যময় করে তুলতে পারে।

হ্যালোউইনের রাতে তাই আলো নিভিয়ে ভাবুন পুরোনো কোন প্রাসাদের দীর্ঘ করিডরে যদি হঠাৎ পায়ের শব্দ শোনা যায়, আর ফিরে তাকিয়ে কাউকে দেখা না যায়, তাহলে সেটিকে কিভাবে ব্যাখ্যা করবেন? হয়তো সেটি বাতাসের শব্দ, হয়তো আলো-আঁধারির খেলা। কিন্তু অন্ধকারে দাঁড়িয়ে থাকা সেই প্রশ্নটুকুই ভৌতিক গল্পের আসল আকর্ষণ।

ছবি: ইন্সটাগ্রাম

Read full story at source