সুন্দরবনের সুরক্ষা ও পানির সংকট নিরসনে বরাদ্দের দাবি

· Prothom Alo

সুন্দরবনের সুরক্ষা ও সুপেয় পানির সংকট নিরসনে জাতীয় বাজেটে বাগেরহাটের জন্য বিশেষ বরাদ্দের দাবি জানিয়েছেন নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা। তাঁরা বলেন, লবণাক্ততা, নদীভাঙন, প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঝুঁকি বিবেচনায় এ জেলার জন্য বিশেষ উন্নয়ন পরিকল্পনা প্রয়োজন। একই সঙ্গে শিক্ষা, চিকিৎসা ও যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়ন, মোংলা বন্দর, ইপিজেড ও বিসিক শিল্পনগরী আধুনিকায়ন এবং পর্যটনের সম্ভাবনা কাজে লাগাতে বাজেটে বরাদ্দ বাড়ানোর কথা বলেন তাঁরা।

Visit moryak.biz for more information.

গতকাল বৃহস্পতিবার বাগেরহাট শহরের দশানী এলাকার ধানসিঁড়ি মিলনায়তনে ‘জাতীয় বাজেটে নাগরিক সমাজের প্রত্যাশা অন্তর্ভুক্তিকরণ’ শীর্ষক গোলটেবিল সংলাপে এ দাবি জানানো হয়। ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) সহযোগিতায় একশনএইডের সুশীল প্রকল্প ও প্রথম আলোর আয়োজনে সংলাপটি অনুষ্ঠিত হয়।

সুপেয় পানির সংকট নিরসনের দাবি

সুপেয় পানির সংকট নিরসনে মোল্লাহাট উপজেলার মধুমতী নদী থেকে পাইপলাইনের মাধ্যমে পানি এনে সরবরাহের ওপর গুরুত্ব দেন বাগেরহাট জেলা বিএনপির সদস্যসচিব বীর মুক্তিযোদ্ধা মোজাফফর রহমান আলম। তিনি বলেন, বাঁধ দিয়ে কিছু জমি রক্ষা পেলেও পানির কোনো ব্যবস্থা হয়নি। সুপেয় পানি এখানে প্রধান সংকট। এখানে বরাদ্দ বাড়াতে হবে। সংকট মেটাতে মধুমতী (নদী) থেকে পানি নেওয়া হচ্ছে খুলনায়; কিন্তু তাঁরা বঞ্চিত। তাঁদের এখানে এ ধরনের উদ্যোগ নেওয়া দরকার।

বাগেরহাটের চারটি উপকূলীয় উপজেলায় লবণাক্ততার প্রভাব সবচেয়ে বেশি উল্লেখ করে জেলা জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি শেখ ইউনুস আলী বলেন, এখানে কাঁচা মাটি দিয়ে বেড়িবাঁধ তৈরি করা হয়; কিন্তু এগুলো স্থায়ী হচ্ছে না। অনেক এলাকায় এখনো বাঁধ নেই। জোয়ারের পানিতে শহর ও লোকালয় তলিয়ে যায়। মোংলা ইপিজেডে কয়েক হাজার শ্রমিক কাজ করছেন। যাঁদের বেশির ভাগ নারী; কিন্তু তাঁদের যাতায়াতব্যবস্থা অত্যন্ত নাজুক ও ঝুঁকিপূর্ণ। মোংলা, মোরেলগঞ্জে নদীতে দ্রুত সেতু নির্মাণ করা দরকার। সেতু না থাকায় একটি অঞ্চল পিছিয়ে পড়েছে।

পর্যটন, শিক্ষা, চিকিৎসা ও সুন্দরবনের গুরুত্বের কথা তুলে ধরেন বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) বাগেরহাট জেলা কমিটির সদস্য বেলাল হোসাইন। তিনি বলেন, বাগেরহাট একটি অনন্য জেলা। এক জেলায় দুটি বিশ্ব–ঐতিহ্য—একদিকে সুন্দরবন, অন্যদিকে ঐতিহাসিক মসজিদ। প্রাকৃতিক ও প্রত্নপর্যটনের এই তীর্থস্থানকে কাজে লাগাতে দরকার সঠিক বিনিয়োগ ও সমন্বিত পরিকল্পনা। এখানে নদীকেন্দ্রিক দারুণ সম্ভাবনা রয়েছে। তবে বিশ্ববিদ্যালয় ও মেডিক্যাল কলেজ না থাকায় বাগেরহাট অনেক পিছিয়ে রয়েছে—এসব বিবেচনায় নিয়ে বাজেটে বরাদ্দ দিতে হবে।

যে গাছের নামে সুন্দরবন, লবণাক্ততার কারণে সেই গাছই হারিয়ে যাচ্ছে বলে উল্লেখ করেন সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) বাগেরহাট শাখার সম্পাদক এস কে এ হাসিব। তাঁর ভাষ্য, আগামরা রোগের কারণে সুন্দরবন থেকে সুন্দরীগাছ হারিয়ে যাচ্ছে। লবণের প্রভাব কৃষি, চিংড়ি চাষসহ সব ক্ষেত্রে; কিন্তু এই অঞ্চলে এসব সংকট নিরসনে কখনোই বাড়তি নজর দেওয়া হচ্ছে না।

উপকূলীয় জেলা হিসেবে শিক্ষার মানোন্নয়নে বাজেটে অগ্রাধিকারের দাবি জানিয়ে বাগেরহাট বহুমুখী কলেজিয়েট স্কুলের অধ্যক্ষ ফারহানা আক্তার বলেন, জেলায় বাল্যবিবাহের হার বেশি। ঝরে পড়া রোধে তাই বিশেষ উদ্যোগ দরকার।

মো. সোহেল পারভেজ, সমাজসেবা কর্মকর্তা, বাগেরহাট সদর উপজেলা এখানে সবার আগে দরকার সুপেয় পানি। লবণাক্ততা ও জলবায়ু পরিবর্তনের ব্যাপক প্রভাব রয়েছে এখানে। বাগেরহাটে দেশের অন্য অনেক এলাকার চেয়ে ক্যানসার, কিডনি, লিভার সিরোসিস, প্যারালাইসিস, হৃদ্রোগ, থ্যালাসেমিয়া বা লিউকেমিয়ার রোগী বেশি। প্রতিবন্ধীর সংখ্যাও বেশি এখানে। তাই গবেষণা ও উন্নয়ন বাজেটে এই অঞ্চলের জন্য বিশেষ বরাদ্দ প্রয়োজন।

‘রামপালে কয়লাবিদ্যুৎকেন্দ্র নিয়ে একসময় আমরা আন্দোলন করেছি; কিন্তু তা উপেক্ষা করেও নির্মাণ করা হচ্ছে। এখন আবার সুন্দরবনের মধ্যে এলএমজি টার্মিনালের কথা শোনা যাচ্ছে। এই অঞ্চলের যেকোনো ভাবনায় সবার আগে সুন্দরবনকে আগ্রাধিকার দিতে হবে। না হলে তা আমাদের জন্য ভয়ংকর সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।’ কথাগুলো বলেন বাগেরহাট সরকারি উচ্চবিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষক শেখ মুজিবুর রহমান।

বাগেরহাট উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা মো. সোহেল পারভেজ বলেন, এখানে সবার আগে দরকার সুপেয় পানি। লবণাক্ততা ও জলবায়ু পরিবর্তনের ব্যাপক প্রভাব রয়েছে এখানে। বাগেরহাটে দেশের অন্য অনেক এলাকার চেয়ে ক্যানসার, কিডনি, লিভার সিরোসিস, প্যারালাইসিস, হৃদ্রোগ, থ্যালাসেমিয়া বা লিউকেমিয়ার রোগী বেশি। প্রতিবন্ধীর সংখ্যাও বেশি এখানে। তাই গবেষণা ও উন্নয়ন বাজেটে এই অঞ্চলের জন্য বিশেষ বরাদ্দ প্রয়োজন।

শিল্প ও কর্মসংস্থানে বিনিয়োগ বাড়ানোর দাবি

বৈঠকে ব্যবসা–বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক নানা সমস্যা তুলে ধরে বক্তব্য দেন বাগেরহাট চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির পরিচালক হাওলাদার মনিরুজ্জান। তিনি বলেন, বিসিক শিল্পনগরী ধ্বংসের পথে। অনেক শিল্পকারখানা বন্ধ। দেশের দ্বিতীয় সমুদ্রবন্দর মোংলাও সেভাবে জাতীয় অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারছে না। ইপিজেডে আরও শিল্পায়ন ও কর্মসংস্থানের সুযোগ আছে। এসব কাজে লাগানো যাচ্ছে না। জাতীয় বাজেটে তাই মোংলা বন্দর, ইপিজেড ও বিসিক শিল্পনগরী আধুনিকায়নের জন্য বিশেষ বরাদ্দের মাধ্যমে বিনিয়োগ আকর্ষণে পদক্ষেপ নিতে হবে।

বাগেরহাট জেলা দীর্ঘদিন ধরে অবহেলিত বলে উল্লেখ করেন বাগেরহাট প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক হেদায়েত হোসাইন।

যুবকদের জন্য প্রশিক্ষণকেন্দ্র গড়ে তোলার দাবি জানিয়ে বেসরকারি সংস্থা আইআরবির সমন্বয়কারী কাজী জাভেদ খালিদ বলেন, সবকিছু সমান্তরালভাবে দেখলে হবে না। এখানে সংকট ভিন্ন, চাহিদা ভিন্ন। তাই উন্নয়ন চিন্তা ও বরাদ্দে বিশেষ মনোযোগ দিতে হবে।

লবণাক্ততা ও দুর্যোগপ্রবণ প্রতিকূল পরিবেশে বসবাসকারী এ অঞ্চলের মানুষের মনের বিশেষ যত্ন নেওয়ার তাগিদ দেন সংস্কৃতিকর্মী জ্যোৎস্না দেবনাথ।

গোলটেবিল সংলাপে ধারণাপত্র উপস্থাপন করেন বেসরকারি সংস্থা ‘সমষ্টি’র গবেষণা পরিচালক রেজাউল হক। স্বাগত বক্তব্য দেন প্রথম আলোর বাগেরহাট প্রতিনিধি ইনজামামুল হক। সংলাপ সঞ্চালনা করেন প্রথম আলোর সহকারী সম্পাদক ফিরোজ চৌধুরী।

সংলাপে আরও বক্তব্য দেন বাগেরহাটের পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপসহকারী প্রকৌশলী শুভ হাওলাদার, মহিলাবিষয়ক অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. সাইফুল ইসলাম, সাংবাদিক তানজীম আহমেদ, জাগ্রত মহিলা সংস্থার সুমা খানম, সিএসও (সিভিল সোসাইটি অর্গানাইজেশন) হাব সম্পাদক নাইমা সেলিম ও সদস্য কাকলী জামান।

Read full story at source