সাজেকে টানা সাত দিন ধরে অবরোধ, বিপাকে কৃষক ও গাড়িচালকেরা

· Prothom Alo

রাঙামাটির সাজেকে সাত দিন ধরে অবরোধ চলছে। আজ বুধবারও সকাল থেকে সাজেক সড়কে কোনো ধরনের যান চলাচল করেনি। গত বৃহস্পতিবার থেকে চলা এ অবরোধে সাজেক এলাকায় নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সংকট দেখা দিয়েছে। এ ছাড়া ওই এলাকায় উৎপাদিত কৃষিপণ্য বাজারে নিতে না পেরে বিপাকে পড়েছেন জুমচাষিরা।

শুধু তা–ই নয়, যান চলাচল না করায় ধারদেনা করে সংসার চালাচ্ছেন পর্যটকদের পরিবহনে ব্যবহৃত কয়েক শ গাড়ির চালক ও সহকারী। ঋণের কিস্তি পরিশোধ নিয়েও দুশ্চিন্তায় পড়েছেন অনেক গাড়ির মালিক।

Visit casino-promo.biz for more information.

গত বৃহস্পতিবার থেকে সাজেক গণ অধিকার রক্ষা কমিটি ও সাজেক কার্বারি অ্যাসোসিয়েশনের ডাকে অনির্দিষ্টকালের অবরোধ চলছে। এটি এ দুই সংগঠনের তৃতীয় দফা অবরোধ। নিরাপত্তাঝুঁকি বিবেচনায় রাঙামাটি জেলা প্রশাসন সাজেক পর্যটনকেন্দ্র সাময়িকভাবে বন্ধ ঘোষণা করেছে। এ কারণে পর্যটকেরা এলাকা ছেড়ে গেছেন।

সাজেক ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) ২ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য অনিত্য ত্রিপুরা প্রথম আলোকে বলেন, এলাকার বাসিন্দারা ঘরে মজুত থাকা খাবার দিয়ে দিন কাটাচ্ছেন। রুইলুই পাড়ার পাঁচটি দোকানে থাকা নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যও শেষের পথে। অবরোধ আরও দু-এক দিন চললে এলাকায় খাদ্যসংকট দেখা দিতে পারে।

সাজেকের ১৬৯ নম্বর শিয়ালদাই মৌজার হেডম্যান ও ৯ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য জৌপেইথাং ত্রিপুরা বলেন, তাঁর ওয়ার্ডের ২২টি পাড়ার বাসিন্দাদের অধিকাংশ জুমচাষের ওপর নির্ভরশীল। অবরোধের কারণে তাঁরা মাচলং বাজারে যেতে পারছেন না। ফলে কলা, পেঁপে, আখ, মিষ্টিকুমড়া, চালকুমড়া ও কচুর মতো কৃষিপণ্য বিক্রি করতে না পেরে বিপাকে পড়েছেন। অনেক কৃষিপণ্য পেকে নষ্ট হচ্ছে। বাজারে নাপ্পি, শুঁটকি, প্রয়োজনীয় ওষুধসহ গৃহস্থালির পণ্যেরও ঘাটতি দেখা দিয়েছে।

সুনসান সাজেক, চতুর্থ দিনে গড়াল অবরোধ

ধারদেনায় চলছে সংসার

সাজেকে যান চলাচল বন্ধ থাকায় আয় হারিয়েছেন গাড়িচালক ও সহকারীরা। খাগড়াছড়ির মাটিরাঙ্গার তবলছড়ির বাসিন্দা ইসমাইল হোসেন দৈনিক মজুরিতে পিকআপ ভ্যান চালান। গাড়ি চালিয়ে প্রতিদিন এক থেকে দুই হাজার টাকা আয় করতেন তিনি। আট সদস্যের সংসারে অসুস্থ বাবা ও দাদির পাশাপাশি দুই ছোট ভাইয়ের দায়িত্বও তাঁর ওপর। কিন্তু টানা সাত দিন গাড়ি চালাতে না পেরে পরিচিত একজনের কাছ থেকে পাঁচ হাজার টাকা ধার নিয়ে সংসার চালাচ্ছেন তিনি।

ইসমাইল বলেন, এখন পর্যটনের মৌসুম। এ সময়ে প্রতিদিন গাড়ি চালানোর লাইন থাকত। বছরের এই কয়েক মাসই তাঁদের আয় করার সময়। এভাবে চলতে থাকলে কয়েক দিন পর না খেয়ে থাকতে হবে।

পিকআপের সহকারী মো. শাকিল খন্দকার বলেন, সাজেকে গাড়ি গেলে প্রতিদিন ৬০০ টাকা মজুরি পান তিনি। এ আয় দিয়ে ঘরভাড়াসহ চার সদস্যের সংসার চালাতে হয়। গাড়ি বন্ধ থাকায় এখন ধারদেনা করে চলছেন।

নিরাপত্তা বাহিনীর পাহারায় সাজেক থেকে ফিরেছেন পর্যটকেরা, হোটেল না পেয়ে ভোগান্তি

চাঁদের গাড়ির (পুরো জিপ) চালক অংগোজাই মগও আয় বন্ধ হয়ে যাওয়ায় পেশা পরিবর্তনের চিন্তা করছেন। তিনি বলেন, গাড়ি চালানোর আয় দিয়েই সংসার চলে। পরিস্থিতি এমন থাকলে দিনমজুরি করতে হবে। টাকার অভাবে প্রবারণা পূর্ণিমাও ভালোভাবে উদ্‌যাপন করতে পারেননি। সামনে কঠিন চীবর দান, কী করবেন বুঝতে পারছেন না।

সাজেক বন্ধ থাকায় গাড়ির মালিকেরাও পড়েছেন বিপাকে। নিজের জমানো টাকা ও আট লাখ টাকা ঋণ নিয়ে গত বছর একটি পিকআপ কিনেছিলেন মো. মুন্না। প্রতি মাসে তাঁকে ঋণের ৩২ হাজার টাকা কিস্তি দিতে হয়। মুন্না বলেন, গাড়ি বন্ধ থাকলে ঋণের কিস্তি কীভাবে দেবেন, তা নিয়ে দুশ্চিন্তায় আছেন।

খাগড়াছড়ির যানবাহন মালিক সমিতির সভাপতি আয়ুস চাকমা বলেন, তাঁদের সমিতিতে তালিকাভুক্ত গাড়ি রয়েছে ২৫০টি। জিপ মালিক সমিতির গাড়ি রয়েছে ৫০০টির বেশি। এ ছাড়া মাহিন্দ্র, চাঁদের গাড়ি, সিএনজিসহ প্রায় দেড় হাজারের বেশি যানবাহন সাজেকে চলাচল করে। অবরোধে এসব যানবাহনের চালক ও সহকারীদের আয় বন্ধ হয়ে গেছে। অনেক মালিক ঋণ নিয়ে গাড়ি কেনায় তাঁরাও কিস্তি পরিশোধে সমস্যায় পড়েছেন। সব মিলিয়ে জেলায় যানবাহন খাতে প্রতিদিন ৩০ থেকে ৪০ লাখ টাকা লোকসান হচ্ছে।

সাজেকে অবরোধ: মূল সমস্যা যেভাবে আড়ালে চলে যাচ্ছে

সাজেক গণ অধিকার রক্ষা কমিটির সদস্যসচিব বিজয় কান্তি চাকমা বলেন, দাবি না মানা পর্যন্ত অবরোধ চলবে। ১০ নম্বর হাজাছড়াসহ বিভিন্ন স্থানে অবরোধ সমর্থনে আজ বুধবার পিকেটাররা অবস্থান করছেন।

সাজেক গণ অধিকার রক্ষা কমিটি ও সাজেক কার্বারি অ্যাসোসিয়েশন তিন দফা দাবিতে ১১ অক্টোবর সাজেকে এক দিনের অবরোধ কর্মসূচি পালন করে। ১৫ অক্টোবর দ্বিতীয় দফায় আবার অবরোধের ডাক দেওয়া হয়। অবশ্য শারদীয় দুর্গাপূজার জন্য ১৬ থেকে ২১ অক্টোবর কর্মসূচি স্থগিত করা হয়। গত বুধবার দুটি সংগঠন এক বিজ্ঞপ্তিতে বৃহস্পতিবার থেকে অনির্দিষ্টকালের অবরোধের ঘোষণা দেয়।

এরপর নিরাপত্তাঝুঁকি বিবেচনায় সাজেক পর্যটনকেন্দ্র সাময়িকভাবে বন্ধ ঘোষণা করে রাঙামাটি জেলা প্রশাসন। নির্দেশনা অনুযায়ী, গত বৃহস্পতিবার সকাল থেকে পর্যটকেরা সাজেক ছাড়তে শুরু করেন। তবে ফেরার পথে উজো বাজার এলাকায় গোলাগুলি হয়। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী জানায়, ইউপিডিএফের সশস্ত্র সদস্যরা গুলি চালিয়েছেন। তবে এ অভিযোগ অস্বীকার করেছে ইউপিডিএফ।

সাজেকে অবরোধ চলাকালে হামলা, লাঠিপেটা এবং ঘরবাড়ি ও দোকানপাট ভাঙচুরের প্রতিবাদে এবং সাজেকবাসীর দাবির প্রতি সমর্থন জানিয়ে ‘ছাত্র-জনতার সংগ্রাম পরিষদ’ নামের একটি সংগঠন রাঙামাটি ও খাগড়াছড়িতে গত শনিবার অর্ধদিবস অবরোধ কর্মসূচি পালন করে।

অবরোধের বিষয়ে জানতে চাইলে সাজেক থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) তোফাজ্জল হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, অবরোধ এখনো চলছে। তবে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সতর্ক অবস্থানে রয়েছে।

Read full story at source