মালয়েশিয়া ভ্রমণ: কালের যাত্রাধ্বনি-৫

· Prothom Alo

মালাক্কা থেকে পেনাংয়ে যাওয়ার ডোমেস্টিক ফ্লাইট নেই। হয় কুয়ালালামপুর ফিরে ফ্লাইট ধরে যেতে হবে, নয়তো বাস কিংবা ট্যাক্সি। আমরা ট্যাক্সি নিয়েই বেরিয়ে পড়লাম।

Visit betsport.cv for more information.

রাতের অন্ধকারে গাড়ি এগিয়ে চলল উত্তরের দিকে। পেনাংয়ে যাওয়ার পথটা বেশ দীর্ঘ। প্রায় পাঁচ শ কিলোমিটার। আমাদের সারথি (ট্যাক্সিচালক) সিম্বে দা জানালেন, বিরতি ও যানজটের ওপর নির্ভর করে ছয় ঘণ্টা বা তারও বেশি সময় লাগতে পারে।

রাতের যাত্রায় বাইরের দৃশ্য খুব একটা চোখে পড়ে না। জানালার ওপারে অন্ধকার, এদিকে সারা দিন ঘোরাঘুরির ক্লান্তি। কখন যে রাত পেরিয়ে ভোর হয়ে এল, বুঝতেই পারিনি। সকালে পেনাংয়ে পৌঁছে কোপিতিয়ামে কায়া টোস্ট, আধা সেদ্ধ ডিম আর কফি দিয়ে নাশতা সেরে নিলাম।

মন্দিরের ভেতরে সারি সারি বুদ্ধের মুখ। ছবি: লেখক

এবার আমাদের গন্তব্য কেক লোক সি মন্দির। সকালবেলায় মন্দির দেখতে যাওয়ার মধ্যে আলাদা একটা স্বস্তি ছিল। দিনের ব্যস্ততা তখনো শুরু হয়নি। মন্দিরের বিশাল চত্বরজুড়ে চীনা বৌদ্ধ স্থাপত্যের নিদর্শন। বাঁকানো ছাদ, রঙিন কারুকাজ আর বুদ্ধমূর্তিতে সাজানো প্রার্থনাকক্ষগুলোর মধ্যে ঘুরতে ঘুরতে চোখ আটকে গেল সাততলা প্যাগোডাটিতে। চীনা, থাই ও বার্মিজ স্থাপত্যরীতির মিশেলে তৈরি এই স্থাপনার প্রত্যেকটা স্তরের গড়ন আলাদা। আরও ওপরে করুণার বোধিসত্ত্ব গুয়ানইনের বিশাল ব্রোঞ্জমূর্তি। এত বৈচিত্র্যময় স্থাপত্য একই মন্দিরচত্বরে পাশাপাশি দেখে মনে হচ্ছিল, পেনাংয়ের ইতিহাসে ভিন্ন ভিন্ন সংস্কৃতির যে মেলবন্ধন, কেক লোক সি যেন তারই অপূর্ব প্রকাশ।

জর্জ টাউনের বন্দরগুলোতে এলে চোখে পড়ে দারুণ জেটি। ছবি: লেখকের সৌজন্যে

মন্দির দেখা শেষ হলে সিম্বে দা আমাদের নিয়ে গেলেন তাঁর পরিচিত এক মালয় বাড়িতে। জায়গাটির নাম এয়ার ইতাম। পাহাড়ঘেরা এই জনপদে কৃষিকাজ ও ফলের বাগানের পুরোনো ঐতিহ্য রয়েছে। মালয় পরিবারটি আতিথেয়তার কোনো কমতি রাখল না। গোলাপি পেয়ারা আর ভেষজ পাতার একটি পানীয় দেওয়া হলো। নাম জানি না, তবে দারুণ ছিল খেতে। পরে কলাপাতায় পরিবেশিত হলো মালয়েশিয়ার ঐতিহ্যবাহী খাবার নাসি লেমাক। নারকেলের দুধে রান্না করা সুগন্ধি ভাতের সঙ্গে সাম্বাল, ডিম, চিনাবাদাম আর ছোটমাছ। পেনাং শহরকে চেনার পাশাপাশি মালয় পরিবারের আতিথেয়তা এক অনন্য অভিজ্ঞতা।

বিশ্রাম শেষে এবার বেরিয়ে পড়লাম জর্জ টাউনের উদ্দেশে। আমাদের সঙ্গে মালয় পরিবারটির দুজন সদস্য যোগ দিলেন। সকালে মন্দিরে যে অভিজ্ঞতা হয়েছিল, বিকেলের দিকে শহর ঘুরে দেখার অভিজ্ঞতা একেবারে অন্য রকম।

মালয়েশিয়া ভ্রমণ: কালের যাত্রাধ্বনি-১কোপিতিয়ামে কায়া টোস্ট, আধা সেদ্ধ ডিম, কফি। পেনাংয়ের ঐতিহ্যবাহী খাবার। ছবি: লেখক

১৭৮৬ সালে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি পেনাংয়ে বাণিজ্যিক ঘাঁটি তৈরি করার পর শহরটির উপযোগিতা বাড়তে থাকে। বন্দরের টানে চীনা ও ভারতীয় ব্যবসায়ীরা এখানে আসেন। মালয় অধিবাসীদের সঙ্গে তাঁদের জীবন ও কাজের যোগাযোগ তৈরি হয়।

আজকের পেনাং বন্দর অবশ্য সেই পুরোনো জেটি আর পালতোলা জাহাজের জগতে আটকে নেই। মালাক্কা প্রণালির পাশে আধুনিক কনটেনার টার্মিনাল, পণ্যবাহী জাহাজ, ফেরি ও ক্রুজ টার্মিনাল মিলিয়ে এটা উত্তর মালয়েশিয়ার বাণিজ্যিক প্রবেশদ্বারগুলোর একটি। বন্দরের কার্যক্রম দ্বীপের জর্জ টাউনেই সীমাবদ্ধ নয়। কার্গো টার্মিনালের বড় অংশ মূল ভূখণ্ডের বাটারওয়ার্থ ও প্রাই এলাকায়।

পেনাং বন্দরকে শুধু পণ্য ওঠানামার জায়গা বললে ভুল হবে। এই দ্বীপে কারা এসেছে, কারা বসতি গড়েছে, আর কীভাবে ভিন্ন ভিন্ন ভাষা-সংস্কৃতির মানুষ একই শহরের অংশ হয়ে উঠেছে, এটা সেই দীর্ঘ ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।

তানজুং রু, যেখানে সমুদ্র নিজেই মেলে ধরে বালির পথ। ছবি: লেখক

পরদিন পেনাংয়ের ফোর্ট কর্নওয়ালিস, চিয়ং ফাট জে ব্লু ম্যানশন আর ক্ল্যান জেটি দেখে আমরা রওনা দিলাম কুয়ালা পেরলিসের দিকে। সেখান থেকে ফেরি ধরে যাব লংকাউই।

মালয়েশিয়া আসার পর থেকে পুরোটা সময় ছোটমামা আর সিম্বেদা আমাদের সঙ্গে ছিলেন। ছোটমামা খুব ভালো মালয় বলেন। তাই স্থানীয় মানুষের সঙ্গে কথা বলা, কোথাও যাওয়ার জন্য পথঘাট বুঝে নিতে আলাদা কোনো অসুবিধে হয়নি। কুয়ালা পেরলিসে এসে সেই সঙ্গের ইতি টানতে হলো।

মামা আর সিম্বেদার কাছে থেকে বিদায় নিয়ে লংকাউইগামী যাত্রীবাহী ফেরিতে উঠলাম। মন খারাপ হলে দূর দিগন্তে তাকিয়ে থাকতে ভালো লাগে। মামাকে ছেড়ে, পেরলিসের উপকূল পেছনে রেখে এগোতে থাকলাম লংকাউইয়ের দিকে। স্থলপথের সঙ্গে সমুদ্রযাত্রার একটা মৌলিক পার্থক্য আছে। এখানে রাস্তার বাঁক ধরে গন্তব্যের দিকে যাওয়া যায় না। জলরাশির বিস্তারের মধ্যে ধীরে ধীরে বদলে যেতে থাকে দিগন্ত। ঘণ্টা দেড়েক পর কুয়াহ বন্দর চোখে পড়ল।

মালয়েশিয়া ভ্রমণ: কালের যাত্রাধ্বনি–২তানজুং রু দ্বীপে লেখক। ছবি: লেখকের সৌজন্যে

বন্দরে নেমে প্রথমেই গেলাম ইগল স্কয়ারে। সমুদ্রের কাছে বিশাল বড় ভাস্কর্য। লংকাউইয়ের নামটা এই ঈগলের কাছে ঋণী। মালয় ভাষায় ‘হেলাং’অর্থ ঈগল। আর ‘কাউই’হলো লালচে-বাদামি রং।

কুয়াহ শহর ঘুরে ঘুরে দেখলাম বন্দরকেন্দ্রিক জনপদের বাণিজ্যিক রূপ। একসময় কুয়াহতে ছিল মৎস্যজীবী জেলেদের বসতি। সমুদ্রপথে যোগাযোগ সহজ বলে পরবর্তী সময়ে এখানে বন্দরনগরী গড়ে ওঠে। ১৯৮৭ সালের লংকাউইকে শুল্কমুক্ত দ্বীপ ঘোষণা করা হয়। তারপর থেকে পর্যটন ও ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসারে কুয়াহ হয়ে ওঠে লংকাউই দ্বীপপুঞ্জের প্রধান বাণিজ্যকেন্দ্র।

লংকাউইয়ের অসংখ্য দ্বীপের মধ্যে থাকার জন্য পছন্দ তানজুং রু। কুয়াহতে জনপরিবহন খুব একটা নেই। অগত্য গ্রাব নিয়েই পৌঁছে গেলাম রিসোর্টে। একটু জিরিয়ে বেরিয়ে পড়লাম সমুদ্রসৈকতের উদ্দেশে। লংকাউইয়ের উত্তর প্রান্তে এসে চোখে পড়ে বিস্তৃত বালুকাবেলা, নীল সমুদ্র আর দূরে নীলাভ জলে ভেসে থাকা দ্বীপগুলো।

সমুদ্রের বুকে ভেসে থাকা পাহাড়গুলো নীল দিগন্তের নিজস্ব স্বাক্ষর। ছবি: লেখক

যদিও দ্বীপপুঞ্জটির শিলা ও ভূপ্রকৃতি পৃথিবীর প্রাচীন ইতিহাস ধরে রেখেছে। তানজুং রুসহ উত্তর-পূর্ব লংকাউইয়ের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে চুনাপাথরের কার্স্ট দেখা যায়। সমুদ্রে জমে থাকা ক্যালসিয়াম কার্বনেট পলির সঙ্গে মিশে দীর্ঘ ভূতাত্ত্বিক প্রক্রিয়ায় চুনাপাথরে পরিণত হয়েছে। পরে ভূত্বকের পরিবর্তন, উত্থান, জল ও আবহাওয়ার দীর্ঘ ক্ষয় সেই শিলাগুলোকে ভিন্ন ভিন্ন আকৃতি দিয়েছে। কোথাও তৈরি হয়েছে গুহা, কোথাও খাড়া পাহাড়ি দেয়াল, আবার কোথাও সমুদ্রের মধ্যে বিচ্ছিন্ন দ্বীপ।

আকাশছোঁয়া স্কাইব্রিজ। পাহাড়ের মাথায় দাঁড়িয়ে মেঘ, বন আর সমুদ্রকে একসঙ্গে দেখা যায়। ছবি: লেখক

বেলাভূমিতে দাঁড়িয়ে এসব কথা ভাবলে দৃশ্যটা আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। চোখের সামনে যেসব পাথুরে দ্বীপ, সেগুলো প্রাগৈতিহাসিক সাক্ষী। দীর্ঘ সময় সমুদ্রে কাটিয়ে সন্ধের সূর্যকে বিদায় দিয়ে ঘরে ফিরলাম। ততক্ষণে রিসোর্টে রাতের খাবার তৈরির ধুম পড়ে গেছে। খাবারের নামগুলো বেশ মজার। মি গুলং, ইকান বাকর, পেক ঙা। সর্বোপরি রয়েছে মালয়েশিয়ায় সিগনেচার আইটেম ‘কোকোনাট স্টিকি রাইস’।

মালয়েশিয়া ভ্রমণ: কালের যাত্রাধ্বনি–৩ দীর্ঘ সময় সমুদ্রে কাটিয়ে সন্ধের সূর্যকে বিদায় দিয়ে ঘরে ফিরলাম। ছবি: লেখক

রাত কাটল তানজুং রু রিসোর্টে। ঘরের জানালা দিয়ে সমুদ্র দেখা যায়। দিনের বেলায় সমুদ্রের সামনে দাঁড়িয়ে যে অসীম বিস্তার দেখেছি, রাতে দেখলাম ঘরের ভেতর থেকে, জানালার ফ্রেমে। দেখার জায়গা বদলেছে, সমুদ্র রয়ে গেছে একই। তবু রাতের দৃশ্যটা আলাদা করে মনে থাকল।

পরদিন সকালে লংকাউই স্কাই ব্রিজের কোল ঘেষে পৌঁছে গেলাম পদাং মাতসিরাত বিমানবন্দরে। কুয়ালালামপুরের উড়ান ধরবার আগে দ্বীপটির সঙ্গে পরিচয়পর্ব এখানেই শেষ হলো।

অল্প সময় ঘুরে যতটুকু বুঝেছি, দ্বীপটির ভূপ্রকৃতি সবচেয়ে স্পষ্ট হয়ে ধরা দিয়েছিল তানজুং রুতে। সমুদ্রে ভেসে থাকা চুনাপাথরের দ্বীপ, পায়ের কাছে নেমে আসা নীল জল আর দীর্ঘ বালুকাবেলা। লংকাউইকে মনে রাখার জন্য এই দৃশ্যই যথেষ্ট। শেষ

*অমৃতা ইশরাত: ব্যাংকার ও লেখক

মালয়েশিয়া ভ্রমণ: কালের যাত্রাধ্বনি–৪লংকাউইয়ের নামটা এই ইগলের কাছে ঋণী। ছবি: লেখক

Read full story at source