চা–বাগানের শিশুদের স্কুলব্যাগ-খাতা-পেনসিল উপহার
· Prothom Alo

সবুজ চা-বাগানের বুক চিরে সকালের নরম রোদ যখন ধীরে ধীরে উঁকি দিচ্ছিল গাছের পাতার ফাঁকে, উদালিয়া চা-বাগানের মেঠো পথ ধরে হেঁটে আসছিল কালাপানি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রথম শ্রেণির ছোট্ট শিশু প্রণব দাশ। পূজার ছুটির আনন্দ হয়তো ছিল, কিন্তু সেই আনন্দের পেছনে ছিল চা-শ্রমিক পরিবারের চিরচেনা এক করুণ নীরবতা। কিন্তু স্কুলের চত্বরে পা রাখতেই প্রণবের ছোট্ট পৃথিবীটা যেন এক লহমায় বদলে গেল।
Visit sportbet.reviews for more information.
তার ছোট্ট দুটো হাতের মুঠোয় তুলে দেওয়া হলো রঙিন একটি নতুন স্কুলব্যাগ, খাতা আর পেনসিল। বিস্ময়ে তাকিয়ে রইল সেই উপহারের দিকে, যেন নিজের ভাগ্যকেই বিশ্বাস করতে পারছিল না। কত দিন হয়তো সে ছেঁড়া ব্যাগে বই ভরেছে, আধভাঙা পেনসিলে লেখার চেষ্টা করেছে; আর আজ সেই ছোট্ট বুকে আছড়ে পড়ল অসীম এক আনন্দের ঢেউ। প্রণব এক হাতে ব্যাগটি বুকে চেপে ধরল, ঠিক যেমন মায়েরা পরম যত্নে তাঁদের সন্তানকে আগলে রাখেন।
প্রথম আলোর ২৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে ‘একটি ভালো কাজ’–এর অংশ ২৫ অক্টোবর চট্টগ্রাম বন্ধুসভার বন্ধুরা গিয়েছিলেন ফটিকছড়ি উপজেলার উদালিয়া চা-বাগানে অবস্থিত আলহাজ্ব মোস্তাফিজুর রহমান প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। সেখানে চিকনছড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়সহ মোট তিনটি বিদ্যালয়ের প্রায় ১০০ শিক্ষার্থীর মধ্যে নতুন স্কুলব্যাগ, খাতা, পেনসিল, রাবার, শার্পনার, স্কেল, পেনসিল বাক্স ইত্যাদি শিক্ষা উপকরণ তুলে দেন বন্ধুরা।
চট্টগ্রাম বন্ধুসভার একটি ভালো কাজ।বিতরণ অনুষ্ঠানের শুরুতে বন্ধুসভার বন্ধু ও জাহানারা মমতাজ বালিকা উচ্চবিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক পল্লবী খাস্তগীর বলেন, ‘সন্তানদের মধ্যে কোনো ধরনের বিভেদ থাকবে না। চা-শ্রমিকদের সন্তান বলে আলাদা কোনো ট্যাগ থাকবে না। এই কোমলমতি শিক্ষার্থীরা শুধু উদালিয়া চা–বাগানেই আলো ছড়াবে না, পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধা পেলে একদিন বড় হয়ে নিজেদের চিকিৎসক, প্রকৌশলী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করবে দেশজুড়ে।’
উদালিয়া চা-বাগানের সহকারী মহাব্যবস্থাপক নাদিম খান প্রথম আলো ও বন্ধুসভার উদ্যোগের প্রশংসা করেন। তিনি বলেন, ‘প্রথম আলোর ব্যাপ্তি সারা দেশে। দীর্ঘ এই সফল যাত্রার অংশ হিসেবে আজ শিশুদের জন্য উপহার নিয়ে এসেছেন বন্ধুসভার বন্ধুরা। এ জন্য প্রথম আলো ও বন্ধুসভাকে ধন্যবাদ। সামনের দিনগুলোতেও চট্টগ্রাম বন্ধুসভা এ ধরনের উদ্যোগ অব্যাহত রাখবে বলে আশা করি।’
ফটিকছড়ির জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক এস এম আক্কাছ প্রথম আলোর স্লোগান সবার মধ্যে তুলে ধরতে গিয়ে বলেন, ‘যা কিছু শুভ, সুন্দর ও ভালো তার সঙ্গে প্রথম আলো; যা কিছু অশুভ, অসুন্দর ও কালো, তার বিরুদ্ধে প্রথম আলো। পাহাড় সমতলের বিভেদ কাটিয়ে সবাইকে একই কাতারে দাঁড় করানোর জন্য প্রথম আলোর ভূমিকাকে সাধুবাদ জানাই।’
চট্টগ্রাম বন্ধুসভার একটি ভালো কাজ।‘সবুজ পাতার আড়ালে যে মানুষগুলো রোদে পুড়ে আর বৃষ্টিতে ভিজে গোটা জীবনটাই পার করে দেন, তাঁদের নীরব দীর্ঘশ্বাসের খবর কজনই–বা রাখে? দৈনিক মাত্র ১৮৭ টাকার হাড়ভাঙা শ্রমে যেখানে দুমুঠো ভাতের সংস্থান করতেই নাভিশ্বাস ওঠে, সেখানে ছোট সন্তানের হাতে একটা নতুন খাতা কিংবা পেনসিল তুলে দেওয়া যেন এক অসম্ভব বিলাসিতা।’ চট্টগ্রাম বন্ধুসভার বন্ধুদের কৃতজ্ঞতা জানাতে গিয়ে চা-বাগানের পঞ্চায়েত কমিটির সভাপতি আবেশ দাশ আরও বলেন, ‘এতে করে নতুনভাবে পড়াশোনা করার উৎসাহ–উদ্দীপনা ফিরে পাবে শিক্ষার্থীরা।’
কালাপানি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক বিক্রম দাশ বন্ধুসভার প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে বলেন, ‘শিক্ষার্থীরা উপহার পেয়ে খুশি হয়েছে। এখন তারা নিয়মিত স্কুলে আসার উৎসাহ খুঁজে পাবে।’
চিকনছড়া প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক মুন্নী রাণী দাশ বলেন, ‘এই উপহারগুলো শিক্ষার্থীদের মনে পূজার খুশিকে বাড়িয়ে দিয়েছে। সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের জন্য কিছু করতে পারা আনন্দের। আশা করি, এই পথচলায় ভবিষ্যতেও আমরা চট্টগ্রাম বন্ধুসভাকে পাশে পাব।’
চট্টগ্রাম বন্ধুসভার একটি ভালো কাজ।মোস্তাফিজুর রহমান প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মিঠু মুখার্জি বলেন, ‘আমার বাচ্চাগুলো খুব খুশি। বাবা-মায়ের সামর্থ্য না থাকায় তারা অনেক কিছু পায় না। আপনাদের এই উপহার তাদের সামনে এগিয়ে নিতে অনেক সাহায্য করবে।’
অনুষ্ঠানের সমাপনী বক্তব্যে চট্টগ্রাম বন্ধুসভার সহসভাপতি নুরুজ্জামান খান বলেন, ‘আজকের এই শিশুরাই আগামী দিনের সম্পদ। বন্ধুসভার পক্ষ থেকে এই বাচ্চাদের মধ্যে আলো ছড়িয়ে দিতে পেরে ভালো লাগছে।’
কর্মসূচিতে আরও উপস্থিত ছিলেন উদালিয়া চা-বাগানের ব্যবস্থাপক সমীরণ মৃধা, সহকারী ব্যবস্থাপক মুহাম্মদ ওমর ফারুক, চট্টগ্রাম বন্ধুসভার বন্ধু শাওন রায়, প্রান্তিকা ভৌমিক, সাঈদ আল সোহেল ও সামিয়া সুলতানা প্রমুখ। সঞ্চালনা করেন সাধারণ সম্পাদক ইরফাতুর রহমান।
প্রচার সম্পাদক, চট্টগ্রাম বন্ধুসভা