মুম্বাইয়ে তারকাদের দুর্গাপূজা: ঐতিহ্যের আঙিনায় গ্ল্যামারের আলো

· Prothom Alo

কলকাতার বাইরে বাঙালির দুর্গোৎসবের আরেক বর্ণময় ঠিকানা মুম্বাই। এখানে ঢাকের শব্দ, ভোগের ঘ্রাণ আর সাবেকি প্রতিমার পাশে জ্বলজ্বল করে বলিউডের তারকা উপস্থিতি। ঐতিহ্য, বাঙালিয়ানা ও গ্ল্যামার মিলিয়েই এই মায়ানগরীর পূজার গল্প।

দুর্গাপূজা বাঙালির কাছে কেবল ধর্মীয় আচার নয়, শিকড়ে ফেরার উৎসব, স্মৃতি আর মিলনমেলার এক অনন্য উপলক্ষ। কলকাতার মতো মুম্বাইয়েও সারা বছর এই কটা দিনের অপেক্ষায় থাকেন প্রবাসী বাঙালিরা। উৎসবের আবহে বদলে যায় শহরের চেনা ছন্দ। কোথাও সাবেকি প্রতিমা, কোথাও সৃজনশীল মণ্ডপসজ্জা, আবার কোথাও গান, নাটক আর নাচে মুখর হয়ে ওঠে পূজাপ্রাঙ্গণ।

Visit mchezo.life for more information.

মুম্বাইয়ের দুর্গাপূজা

তবে মুম্বাইয়ের দুর্গোৎসবের কথা উঠলে বলিউড তারকাদের উপস্থিতি নিয়ে কৌতূহল থাকেই। পর্দার ঝলমলে দুনিয়ার মানুষগুলো যখন অঞ্জলি দেন, ভোগ পরিবেশন করেন কিংবা পরিবারের সঙ্গে মণ্ডপে ঘুরে বেড়ান, তখন গ্ল্যামারের আড়ালেও দেখা মেলে এক চেনা বাঙালিয়ানার। এই পূজাগুলোর শিকড় অবশ্য তারকাদের জনপ্রিয়তার চেয়ে অনেক গভীরে—বহু দশকের ঐতিহ্য, পারিবারিক উত্তরাধিকার আর প্রবাসে নিজের সংস্কৃতিকে আগলে রাখার নিরন্তর প্রয়াসে।

১৬ অক্টোবর থেকে শুরু হয়েছে এ বছরের দুর্গাপূজার মূল পর্ব। তার আগে থেকেই প্রস্তুতিতে ব্যস্ত ছিল মায়ানগরীর পূজা কমিটিগুলো। চলুন, জেনে নেওয়া যাক মুম্বাইয়ের কয়েকটি পরিচিত দ্যূতি ছড়ানো দুর্গোৎসবের গল্প।

নর্থ বোম্বে সর্বজনীন দুর্গাপূজা: মুখার্জি পরিবারের বনেদিয়ানা

মুম্বাইয়ের দুর্গাপূজার প্রসঙ্গ উঠলেই যে নামটি প্রথমে মনে আসে, সেটি নর্থ বোম্বে সর্বজনীন দুর্গাপূজা। মুখার্জি পরিবারের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে থাকা এই আয়োজনের সূচনা ১৯৪৮ সালে। চলচ্চিত্র প্রযোজক শশধর মুখার্জি ও তাঁর স্ত্রী সতীরানী মুখার্জির উদ্যোগে শুরু হয়েছিল এই দুর্গোৎসব। সময়ের স্রোত পেরিয়ে আজ এটি মুম্বাইয়ের বাঙালি সংস্কৃতির অন্যতম পরিচিত ঠিকানা।

মন্ডপে কাজল

রানী মুখার্জি, কাজলসহ মুখার্জি পরিবারের সদস্যদের উপস্থিতি এই পূজাকে বলিউডের অনুরাগীদের কাছেও বিশেষ আকর্ষণীয় করে তুলেছে। তবে তারকাদের আনাগোনাই এর একমাত্র পরিচয় নয়। উৎসবের মূল সুরে রয়েছে সম্প্রীতি, মানুষের সঙ্গে আনন্দ ভাগ করে নেওয়া এবং বাঙালির চিরচেনা ভোগের আয়োজন।

এবারের মণ্ডপসজ্জার ভাবনায় রয়েছে কেরালার বিখ্যাত গুরুভায়ুর শ্রীকৃষ্ণ মন্দির। দক্ষিণ ভারতীয় মন্দির স্থাপত্যের আদলে সাজানো হচ্ছে মণ্ডপ। বাঙালির দুর্গোৎসবের আঙিনায় এভাবে মিলেমিশে যাচ্ছে ভারতের দুই অঞ্চলের শিল্প ও ঐতিহ্য। প্রতিমা গড়তে এসেছেন কলকাতার শিল্পীরা। গত কয়েক বছর ধরে জুহুর এসএনডিটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণে বসছে এই পূজার আসর।

এই আয়োজনের অন্যতম প্রাণভোমরা ভোগ। খিচুড়ি, লাবড়া, বেগুনি, চাটনি, পায়েস আর রসগোল্লার স্বাদে পূর্ণ হয় উৎসবের আমেজ। পূজার দিনগুলোতে হাজারো মানুষ একসঙ্গে বসে ভোগ খান। মুখার্জি পরিবারের সদস্যদের নিজের হাতে ভোগ পরিবেশনের দৃশ্যও এই আয়োজনের পরিচিত অনুষঙ্গ।

প্রতিবছরই এই মণ্ডপে দেখা যায় বলিউডের পরিচিত মুখদের। কারণ, অমিতাভ বচ্চন, জয়া বচ্চন, অজয় দেবগন, আলিয়া ভাট, রণবীর কাপুর ও ক্যাটরিনা কাইফসহ অনেকে বিভিন্ন সময়ে এসেছেন এখানে। অতীতে গুরু দত্ত ও বাপ্পি লাহিড়ীর মতো শিল্পীদের উপস্থিতিও এই পূজার স্মৃতির অংশ। তবে এ বছর কোন তারকা কোন দিন আসবেন, তা আগাম বলা কঠিন।

তারকারা আসেন, ক্যামেরার ঝলকানি বাড়ে; কিন্তু উৎসব শেষে থেকে যায় মানুষের সঙ্গে মানুষের সংযোগ। সম্ভবত এ কারণেই এত বছর পরও মুখার্জি পরিবারের পূজা কেবল তারকাদের মিলনক্ষেত্র নয়, মুম্বাইয়ের বাঙালির আবেগেরও একটি বড় ঠিকানা।

নতুন পল্লি সর্বজনীন দুর্গোৎসব: স্মৃতির মঞ্চে সুরের উত্তরাধিকার

বান্দ্রার নতুন পল্লি সর্বজনীন দুর্গোৎসবের পরিচয় শুধু পূজার আচার কিংবা প্রতিমার ঐতিহ্যবাহী রূপে সীমাবদ্ধ নয়। এই আয়োজনের পরতে পরতে মিশে আছে বাংলা সংগীত, চলচ্চিত্র ও সংস্কৃতির এক সমৃদ্ধ ইতিহাস। সংগীতকার রাহুল দেববর্মন, সুরকার সলিল চৌধুরী, চলচ্চিত্র নির্মাতা শক্তি সামন্ত ও বাসু চ্যাটার্জির মতো বিশিষ্ট ব্যক্তিত্বদের স্মৃতি জড়িয়ে রয়েছে এই পূজার সঙ্গে।

নতুন পল্লীর অন্যতম আকর্ষণ ‘মুক্ত মঞ্চ’। নামের মধ্যেই যেন লুকিয়ে আছে এর দর্শন—শিল্পের জন্য উন্মুক্ত একটি পরিসর, যেখানে প্রতিষ্ঠিত শিল্পীদের পাশাপাশি নতুন প্রতিভারাও নিজেদের প্রতিভা প্রকাশের সুযোগ পান। একসময় মান্না দে, শ্যামল মিত্র ও ধনঞ্জয় ভট্টাচার্যের মতো শিল্পীদের পরিবেশনায় মুখর হয়ে উঠত এই মঞ্চ। গান, কবিতা, নাটক—বিভিন্ন শিল্পমাধ্যমের চর্চা পূজাটিকে দিয়েছে স্বতন্ত্র সাংস্কৃতিক পরিচিতি।

এখানে সাবেকিয়ানা শুধু প্রতিমার অবয়বে নয়; পূজার আচার, পুরোহিত ও ঢাকিদের দীর্ঘদিনের যোগসূত্র এবং সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের ধারাবাহিকতার মধ্যেও তার প্রকাশ। প্রবাসে থেকেও বাংলা সংস্কৃতির সঙ্গে সম্পর্ক অটুট রাখার যে আকাঙ্ক্ষা, নতুন পল্লির আয়োজন যেন তারই এক জীবন্ত প্রতিচ্ছবি।

অতীতে অভিনেতা সুনীল দত্তের নিয়মিত উপস্থিতির কথাও উঠে আসে এই পূজার স্মৃতিচারণায়। অষ্টমীর সন্ধিপূজায় অভিনেত্রী সুস্মিতা সেনের উপস্থিতিও একসময় বাড়িয়েছিল আয়োজনের আকর্ষণ।

এখানে তারকাদের উপস্থিতি স্মরণীয় হয়ে থাকে ঠিকই; কিন্তু পূজার প্রকৃত ঐশ্বর্য যেন সেই মুক্তমঞ্চেই—যেখানে প্রজন্মের পর প্রজন্ম শিল্প, সংস্কৃতি আর বাঙালির সম্মিলিত স্মৃতি নতুন করে প্রাণ পায়।

বিশ্বজিৎ চ্যাটার্জির পূজা: দেবীর সাজে সোনালি আভা

মুম্বাইয়ের দুর্গোৎসবের আরেক পরিচিত নাম অভিনেতা বিশ্বজিৎ চ্যাটার্জির উদ্যোগে শুরু হওয়া জুহুর পূজা। এই আয়োজনের বিশেষত্ব দেবী দুর্গার সোনালি সাজ। সোনালি মুকুট, অলংকার আর ডাকের সাজে দেবীর প্রতিমায় ফুটে ওঠে ঐতিহ্যবাহী শিল্পরীতির আভিজাত্য।

উদ্যোক্তাদের কাছে প্রতিমার চেনা রূপ অক্ষুণ্ণ রাখা বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। বিশ্বজিৎ চ্যাটার্জির স্ত্রী ইরা চ্যাটার্জি জানিয়েছেন, বছরের পর বছর দেবীর সাজে কিছু পরিবর্তন এলেও প্রতিমার মূল অবয়ব ধরে রাখার চেষ্টা করা হয়েছে। যেন সময় বদলালেও উৎসবের পরিচিত মুখটি হারিয়ে না যায়।

ভোগের আয়োজনেও রয়েছে বাঙালির চেনা স্বাদ—খিচুড়ি, লাবড়া, বেগুনি, পোলাও, চাটনি, পায়েস ও মিষ্টি। পূজার আচার, দেবীদর্শন আর একসঙ্গে বসে খাওয়ার আনন্দে এখানে প্রবাসী বাঙালিরা খুঁজে পান ফেলে আসা দিনের পরিচিত আবহ।

চলচ্চিত্রজগতের একাধিক পরিবারের সঙ্গেও এই পূজার যোগাযোগ রয়েছে। বিভিন্ন বছরে রাকেশ রোশন, হৃতিক রোশন, বিদ্যা বালান ও জ্যাকি শ্রফের মতো তারকারা এসেছেন এই আয়োজনে। বিশ্বজিতের পুত্রবধূ অর্থাৎ অভিনেতা প্রসেনজিৎ চ্যাটার্জির স্ত্রী অর্পিতাও কখনো কখনো এই পূজার দায়িত্ব সামলেছেন।

তারকাদের উপস্থিতি এই পূজার পরিচিতিকে আরও বিস্তৃত করেছে; কিন্তু সোনালি অলংকারে সজ্জিত দেবীমূর্তি, ভোগের সুবাস আর সাবেকি আয়োজনের মধ্যেই লুকিয়ে রয়েছে এর আসল আবেদন। মুম্বাইয়ের ব্যস্ত জীবনে এই পূজা যেন বাঙালির স্মৃতি ও শেকড়ের কাছে ফিরে যাওয়ার একটি আপন ঠিকানা।

লোখন্ডওয়ালা দুর্গোৎসব: অভিজিতের পূজায় ঢাকের তালে বাঙালিয়ানা

আন্ধেরির লোখন্ডওয়ালা এলাকার দুর্গোৎসব সংগীতশিল্পী অভিজিৎ ভট্টাচার্যের নামের সঙ্গে এতটাই জড়িয়ে যে অনেকের কাছে এটি ‘অভিজিতের পূজা’ হিসেবেই পরিচিত। ১৯৯৬ সালে শুরু হওয়া এই আয়োজন মুম্বাইয়ের বাঙালি উৎসবের অন্যতম পরিচিত নাম। থিমনির্ভর জাঁকজমকের বদলে এখানে গুরুত্ব পায় ঐতিহ্যবাহী প্রতিমা, পূজার আচার আর বাঙালির নিজস্ব সংস্কৃতি।

এই পূজার বিশেষত্ব দীর্ঘদিন ধরে যুক্ত পুরোহিত, ঢাকি ও প্রতিমাশিল্পীদের সঙ্গে সম্পর্ক ধরে রাখা। মুর্শিদাবাদ থেকে আসা ঢাকিদের বাদ্যে মুখর হয়ে ওঠে পূজাপ্রাঙ্গণ। কখনো কখনো অভিজিৎ নিজেও ঢাকিদের সঙ্গে ঢাক বাজিয়ে উৎসবে যোগ দেন। সন্ধ্যারতি, ধুনুচি নাচ আর ঢাকের ছন্দে মণ্ডপে তৈরি হয় চেনা বাঙালি দুর্গোৎসবের আবহ।

সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানও এই আয়োজনের অন্যতম আকর্ষণ। কলকাতা ও মুম্বাইয়ের শিল্পীদের পরিবেশনায় পূজার সন্ধ্যাগুলো হয়ে ওঠে সুরময়। ভোগের পাতেও থাকে বাঙালির পরিচিত পদ, যা উৎসবের আনন্দকে আরও পূর্ণ করে।

পূজার আনন্দের পাশাপাশি সামাজিক দায়বদ্ধতার কথাও উঠে আসে এই আয়োজনের প্রসঙ্গে। পূজা থেকে সংগৃহীত অর্থ সমাজসেবামূলক কাজে ব্যবহারের উদ্যোগের কথা জানা যায়। উৎসব যখন আনন্দের পাশাপাশি মানুষের পাশে দাঁড়ানোর উপলক্ষ হয়ে ওঠে, তখন তার তাৎপর্য মণ্ডপের সীমানা ছাড়িয়ে যায়।

লোখন্ডওয়ালার পূজায় তাই গ্ল্যামার থাকলেও তা উৎসবের মূল সুরকে আড়াল করে না। বরং ঢাকের আওয়াজ, ধুনুচির ধোঁয়া আর বাঙালির সম্মিলিত উচ্ছ্বাসে মুম্বাইয়ের বুকে গড়ে ওঠে একটুকরা বাংলার আবহ।

তারকাদের আলো পেরিয়ে, মানুষের উৎসব

মুম্বাইয়ের দুর্গাপূজাকে শুধু বলিউড তারকাদের উপস্থিতি দিয়ে বিচার করলে এর প্রকৃত সৌন্দর্যের অনেকটাই অদেখা থেকে যায়। এই পূজাগুলোর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে প্রবাসী বাঙালির স্মৃতি, কয়েক প্রজন্মের শ্রম, শিল্পীদের সৃজনশীলতা এবং নিজেদের সাংস্কৃতিক পরিচয় ধরে রাখার নিরন্তর চেষ্টা।

সবার অংশগ্রহণে টিকে আছে ঐতিহ্য

কোনো মণ্ডপে হাজারো মানুষ একসঙ্গে ভোগের পাত পেতে বসেন। কোথাও নতুন শিল্পীরা মুক্ত মঞ্চে নিজেদের প্রতিভা তুলে ধরেন। আবার কোথাও দেবীর চিরচেনা রূপকে আগলে রেখে এগিয়ে চলে পারিবারিক ঐতিহ্য। প্রতিটি আয়োজনের গল্প আলাদা, অথচ তাদের অন্তর্লীন সুর এক—শিকড়ের সঙ্গে সম্পর্ক অটুট রাখা।
বহুভাষিক, বহুসাংস্কৃতিক মুম্বাইয়ে দুর্গাপূজা তাই কেবল একটি সম্প্রদায়ের উৎসব নয়; এটি শহরের সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যেরও উদ্‌যাপন। তারকাদের উপস্থিতি উৎসবকে দেয় বাড়তি আকর্ষণ, আর মানুষের অংশগ্রহণ তাকে দেয় প্রাণ।

ঢাকের আওয়াজ, অঞ্জলির মন্ত্র, ধুনুচির ধোঁয়া আর ভোগের সুবাসে যখন মণ্ডপ ভরে ওঠে, তখন মুম্বাইয়ের ব্যস্ত নগরজীবনের মধ্যেও যেন মুহূর্তের জন্য ফিরে আসে বাংলার চেনা আবহ। ঐতিহ্য আর গ্ল্যামারের এই সহাবস্থানই মায়ানগরীর দুর্গোৎসবকে করে তোলে স্বতন্ত্র—যেখানে তারকারা উৎসবের অংশ; কিন্তু উৎসবের আসল নায়ক মানুষ, সংস্কৃতি আর সম্মিলিত আনন্দ।
ফাইল ছবি: লেখক

Read full story at source