বেহেশতে কি নারী-পুরুষ আলাদা থাকবে

· Prothom Alo

বেহেশতের প্রকৃতি সম্পর্কে চিন্তা করার সময় আমরা প্রায়ই পার্থিব জীবনের নিয়মকানুনের সঙ্গে পরকালের অলৌকিক জগতকে গুলিয়ে ফেলি।

পৃথিবীতে আমরা যেসব সামাজিক নিয়ম, পর্দার বিধান কিংবা নারী-পুরুষের মেলামেশার নির্দিষ্ট সীমা মেনে চলি, তার সবই মূলত আমাদের শারীরিক ও নৈতিক সুরক্ষার জন্য নির্ধারিত পরীক্ষা।

Visit newsbetting.cv for more information.

কিন্তু বেহেশত পরীক্ষার কোনো জায়গা নয়; তা হলো ইমানদার বান্দাদের জন্য পার্থিব ভালো কাজের চূড়ান্ত পুরস্কারের আবাস।

বেহেশতের জগত হলো সম্পূর্ণ অদৃশ্যের জগত বা ‘গাইব’। পৃথিবীর ভৌত নিয়ম, সামাজিক বাধ্যবাধকতা বা বায়োলজিক্যাল সীমাবদ্ধতা দিয়ে সেই জগতের স্বাধীন পরিবেশকে পরিমাপ করা সম্ভব নয়।

অনেক মানুষের মনেই প্রশ্ন জাগে, বেহেশতে কি নারী ও পুরুষকে আলাদা রাখা হবে? নারীরা কি শুধু নিজ ঘরে বন্দি থাকবেন নাকি তারাও তাঁদের পরিবার, বন্ধুবান্ধব ও সমাজের অন্যান্য মানুষের সঙ্গে স্বাধীনভাবে দেখা-সাক্ষাৎ ও সময় কাটাতে পারবেন?

বেহেশতের প্রতিদান লিঙ্গবৈষম্যহীন

কোরআনে বেহেশতের পুরস্কারের বর্ণনায় পুরুষ ও নারীর মধ্যে কোনো ধরনের পার্থক্য করা হয়নি। পরকালের বিচারে মহান আল্লাহ বিশ্বাসী নারী ও পুরুষ উভয়কেই সমান অধিকার ও মর্যাদা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।

কোরআনে বলা হয়েছে, পুরুষ কিংবা নারীর মধ্যে যে কেউ ইমানদার অবস্থায় সৎকাজ করবে, আমি নিশ্চয়ই তাকে পবিত্র ও সুন্দর জীবন দান করব এবং তাদের কাজের শ্রেষ্ঠ পুরস্কার দান করব। (সুরা নাহল, আয়াত: ৯৭)

অন্য আয়াতে একইভাবে ঘোষণা করা হয়েছে, পুরুষ কিংবা নারীর মধ্যে যারা ইমানদার হিসেবে সৎকাজ করবে, তারা বেহেশতে প্রবেশ করবে এবং সেখানে তাদের হিসাব ছাড়া রিজিক দেওয়া হবে। (সুরা গাফির, আয়াত: ৪০)

ইমাম ইবনে কাসির উল্লেখ করেছেন যে আল্লাহর কাছে ইমান ও আমলের বিচারে নারী-পুরুষের ভেদাভেদ নেই; পরকালে উভয় পক্ষই তাদের সৎকাজের পূর্ণ প্রতিদান লাভ করবে এবং বেহেশতের অনাবিল আনন্দ উপভোগ করবে। (ইবনে কাসির, তাফসিরুল কুরআনিল আজিম, ৪/৫৮৫, দারুল ফিকর, বৈরুত, ১৯৯৪)

সুতরাং পুরুষরা বেহেশতে যেসব আত্মিক ও মানসিক আনন্দ পাবে, নারীরাও হুবহু একই ধরনের স্বাধীনতা, সম্মান ও আনন্দ উপভোগ করবেন।

কেউ মনে করেন, বেহেশতে নারীদের ঘরোয়া পরিবেশেই থাকতে হবে এবং তারা পরিবার বা বন্ধুদের সঙ্গে দেখা করতে পারবেন না। এটা সঠিক নয়। এই আয়াতটি মূলত রাজকীয় সম্ভ্রম, মর্যাদা ও একান্ত ব্যক্তিগত সুরক্ষার রূপক বর্ণনা
বেহেশতে কি আমাদের জীবনসঙ্গী একই থাকবে

পর্দার বাধ্যবাধকতা কোথায়

অনেক সময় সুরা রহমানের একটি আয়াতের কারণে ভুল বোঝাবুঝির সৃষ্টি হয়, যেখানে তাবু বা প্রাসাদে অবস্থানকারী সঙ্গীদের কথা বলা হয়েছে। (আয়াত: ৭২)

কেউ কেউ মনে করেন, বেহেশতে নারীদের ঘরোয়া পরিবেশেই থাকতে হবে এবং তারা পরিবার বা বন্ধুদের সঙ্গে দেখা করতে পারবেন না। এটা সঠিক নয়। এই আয়াতটি মূলত রাজকীয় সম্ভ্রম, মর্যাদা ও একান্ত ব্যক্তিগত সুরক্ষার রূপক বর্ণনা; এটি কোনো সীমারেখা নির্দেশ করে না।

বেহেশতে ‘মাহরাম’ (যাদের সঙ্গে বিবাহ হারাম) বা ‘গাইরে মাহরাম’ (যাদের সঙ্গে দেখা করা নিষিদ্ধ) ধরনের বিধান কার্যকর থাকবে না। কারণ বেহেশত ইবাদত বা বিধি-নিষেধের স্থান নয়।

সেখানে যেকোনো ইমানদার নারী তাঁর ইচ্ছামতো নিজের পরিবার, আত্মীয়স্বজন, নারী বান্ধবী কিংবা বিশ্ব ইতিহাসের সেরা পুণ্যবতী নারী যেমন মারয়াম (আ.) বা খাদিজা (রা.)-এর সঙ্গে স্বাধীনভাবে দেখা করতে পারবেন এবং গল্পগুজব করতে পারবেন।

ইমাম নববি লিখেছেন, বেহেশতের জীবন পার্থিব বিধিনিষেধ থেকে পুরোপুরি মুক্ত; সেখানে কোনো ধরনের অবৈধ মেলামেশার ধারণা নেই, ফলে সেখানে ইমানদারদের পারস্পরিক দেখা-সাক্ষাৎ ও কুশল বিনিময়ে কোনো বাধা থাকবে না। (ইমাম নববি, আল-মিনহাজ শারহু সহিহ মুসলিম, ১৭/১৬৮, দার আল-ইহইয়া আত-তুরাস আল-আরাবি, বৈরুত, ১৯৯৫)

নারী-পুরুষের হৃদয়ের পরিশুদ্ধি

পৃথিবীতে নারী-পুরুষের মেলামেশার ক্ষেত্রে যেসব কড়াকড়ি থাকে, তার পেছনে প্রধান কারণ হলো মানুষের ভেতরের মন্দপ্রবৃত্তি, দৃষ্টির পাপাচার এবং হিংসা-বিদ্বেষের আশঙ্কা। কিন্তু বেহেশতে প্রবেশের আগেই ইমানদারদের অন্তর থেকে সমস্ত কলুষতা পুরোপুরি ধুয়ে-মুছে পরিষ্কার করে দেওয়া হবে।

বেহেশতে গেলেও যে আমলের আফসোস রয়ে যাবেসহিহ মুসলিম, হাদিস: ২৮২৪পুণ্যবান বান্দাদের জন্য এমন সব নেয়ামত প্রস্তুত করে রেখেছি, যা কোনো চোখ কখনো দেখেনি, কোনো কান কখনো শোনেনি এবং কোনো মানুষের অন্তরে তার কল্পনাবোধও জাগ্রত হয়নি।

কোরআনে বেহেশতিদের অন্তরের মানসিক অবস্থা চমৎকারভাবে বর্ণনা করে বলা হয়েছে, আর আমি তাদের অন্তরে যে হিংসা-বিদ্বেষ ছিল তা দূর করে দেব; তারা ভাই ভাই হিসেবে মুখোমুখি তখতে বা আসনে হেলান দিয়ে বসবে। (সুরা হিজর, আয়াত: ৪৭)

এই আয়াতের ব্যাখ্যায় ইমাম ফখরুদ্দিন রাজি লিখেছেন, বেহেশতে মানুষের মনস্তত্ত্ব সম্পূর্ণ বদলে যাবে; সেখানে কারও মনে কোনো বদনজর, কামভাবের পাপাচার, হীনমন্যতা বা ঈর্ষা থাকবে না। (আর-রাজি, মাফাতিহুল গাইব, ১৯/১৬২, দারুল ফিকর, বৈরুত, ১৯৮১)

ফলে বেহেশতে মেলামেশা বা কথাবার্তা বলার মধ্যে কোনো কলুষতা থাকবে না। সেখানে পুরুষেরা যেমন তাঁদের বন্ধুদের সঙ্গে কুশল বিনিময় করবেন, নারীরাও তেমনি আনন্দঘন পরিবেশে নিজ স্বজন ও সঙ্গীদের সঙ্গে সময় কাটাতে পারবেন।

কোরআনে বলা হয়েছে, বেহেশতিরা সেদিন পরম আনন্দে ব্যস্ত থাকবে। (সুরা ইয়াসিন, আয়াত: ৫৫)

শেষ কথা

মহান আল্লাহ বলেছেন, আমি আমার পুণ্যবান বান্দাদের জন্য এমন সব নেয়ামত প্রস্তুত করে রেখেছি, যা কোনো চোখ কখনো দেখেনি, কোনো কান কখনো শোনেনি এবং কোনো মানুষের অন্তরে তার কল্পনাবোধও জাগ্রত হয়নি। (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২৮২৪)

তাই বেহেশতে কে কীভাবে থাকবে বা কার সঙ্গে সময় কাটাবে—তা নিয়ে অহেতুক সংশয় প্রকাশ না করে আমাদের প্রধান লক্ষ্য হওয়া উচিত সেই কাঙ্ক্ষিত স্থানে পৌঁছানোর জন্য নিজের ইমান ও আমলকে মজবুত করা।

বেহেশতের দরজা বন্ধ হওয়ার আগে

Read full story at source