মেসির বাংলাদেশ ভ্রমণ এবং গৃহস্থালি মহাজোট
· Prothom Alo

বিশ্বকাপ জয়ের পর লিওনেল মেসির জীবনটা একদম বদলে গেছে, এমনটাই ভেবেছিলেন বিশ্বের কোটি কোটি ফুটবলপ্রেমী। কিন্তু বাংলাদেশে ঘুরতে এসে বন্ধু রবিনের নিজস্ব মহল্লা আর তার গিন্নি চাঁদনীর রান্নাঘরের কাছে ফিফা কিংবা ব্যালন ডি’অর—কোনোটারই যে বিশেষ পাত্তা নেই, তা মেসি হাড়ে হাড়ে টের পেলেন সেদিন বিকেলে।
বিশ্বকাপের ট্রফিটা দেখাতে এনেছিল বন্ধুদের। সেটি ড্রয়িংরুমের আলমারিতে তুলে রাখার পর চাঁদনী মেসিকে ডাক দিলেন, ‘লিও! একটু এদিকে এসো তো।’
মেসি মাঠের মতো তিনজনকে একসঙ্গে ড্রিবল করার ভঙ্গিতে হালকা চালে হেঁটে রান্নাঘরে গেলেন।
‘বলো, ভাবি।’
‘আলমারির ওপরের ট্রফিটায় নিচে ধুলা জমছে। আর হ্যাঁ, ফ্রিজে ডিম শেষ, টমেটোও নেই। স্পোর্টস ব্যাগটা কাঁধে নাও, জলদি সুপারশপ থেকে নিয়ে এসো। তোমার বন্ধুকে অন্য কাজ দিছি। ছুটির দিনে কই একটু রেস্ট করব, তোমারে দিল ডাক। এখন দুই বন্ধু মিলে আমাকে কাজে সাহায্য করো।’
মেসি একটু ভাবনায় ডুবে গেলেন। ভাবলেন, ‘আমি লিওনেল মেসি! আটটি ব্যালন ডি’অর, বিশ্বকাপজয়ী অধিনায়ক! আমার কিনা ডিম-টমেটোর বাজারে যেতে হবে?’
Visit amunra.help for more information.
কিন্তু দীর্ঘ ১৫ বছর বার্সেলোনায় থাকার সুবাদে মেসি একটি বিশেষ সত্য উপলব্ধি করেছেন, মাঠে যতই অফসাইড ফাঁদ এড়ানো যাক না কেন, বন্ধুর বাড়িতে এসে বন্ধুর গিন্নিকে এড়ানোর মতো ‘ভিএআর’ প্রযুক্তি এখনো আবিষ্কৃত হয়নি। বন্ধু বলেওছিল যেন ভাবিকে সামলে চলি।
মেসি বাধ্য ছেলের মতো স্পোর্টস ব্যাগ ঝুলিয়ে বাজারের দিকে হাঁটা দিলেন। মাথায় কাপ আর মুখে মাস্ক, যাতে কেউ চিনতে না পারে। কিন্তু সমস্যা হলো, লিওনেল মেসি তো আর সাধারণ মানুষ নন। বাজারে ঢুকে টমেটো বাছাইয়ের সময় তাঁর ভেতরের ফুটবলার সত্তা জেগে উঠল।
তিনি একটা টমেটো হাতে নিয়ে সেটির শেপ আর ব্যালান্স পরীক্ষা করতে লাগলেন। পাশে দাঁড়ানো এক বিক্রেতা অবাক হয়ে তাকিয়ে দেখল, এক ভদ্রলোক টমেটো হাতে নিয়ে বাঁ পায়ের পাতায় হালকা হালকা ‘জাগলিং’ করার চেষ্টা করছেন!
টমেটো বিক্রেতা চেঁচিয়ে উঠল, ‘আরে ভাই! টমেটো নিয়ে “টিকিটাকা” খেলছেন কেন? নষ্ট হয়ে যাবে তো!’
মেসি দ্রুত নিজের আবেগ সামলে নিয়ে বিড়বিড় করলেন, ‘সরি ভাই, ফার্স্ট টাচটা একটু ভারী হয়ে গিয়েছিল।’
ডিম আর টমেটো কিনে মেসি যখন ক্যাশ কাউন্টারে দাঁড়িয়েছেন, তখন কাউন্টারের ছেলেটি তাঁর দিকে একটু সন্দেহজনক চোখে তাকাল।
‘স্যার, আপনাকে খুব চেনা চেনা লাগছে। আপনি কি সেই ফ্রি-কিক স্পেশালিস্ট...’
মেসি ভয় পেয়ে মাস্কটা আরও ওপরে টেনে বললেন, ‘না না, আমি তো আর্জেন্টিনার এক সাধারণ বাসিন্দা। ঘুরতে এসেছি আপনাদের দেশে!’
ছেলেটি হেসে বলল, ‘আরে না ভাই! আমি ভাবছিলাম আপনি বোধ হয় আমাদের পাড়ার সেই টুর্নামেন্টের রেফারি জামাল ভাই! মাস্কে হুবহু এক লাগছে।’
মেসি মনে মনে স্বস্তির নিশ্বাস ফেললেন। ফুটবল–বিশ্ব তাঁকে চেনে শতাব্দীর সেরা খেলোয়াড় হিসেবে; কিন্তু টুপি আর মাস্ক পরলে বাংলাদেশের গলিঘরের মানুষ তাঁকে চেনে ‘জামাল ভাই’ হিসেবে!
বাড়ি ফিরে মেসি ব্যাগটা রবিনের হাতে দিল। চাঁদনী ডিমের খাঁচা আর টমেটো গুনে দেখে বললেন, ‘হুম, ঠিক আছে। তবে একটা টমেটো দেখলাম হালকা থ্যাবড়া হয়ে গেছে। নির্ঘাৎ ওটা নিয়ে ড্রিবল করার চেষ্টা করছিলে, তাই না?’
মেসি তখন নিষ্পাপ মুখে মুচকি হেসে বললেন, ‘ওটা আসলে প্রতিপক্ষের প্রেশারের কারণে একটু ডিফ্লেক্ট হয়ে গেছে, ভাবি!’
চাঁদনী চোখ কপালে তুলে বললেন, ‘বাজে বকা বন্ধ করো। যাও, এখন থালাবাসনগুলো ধুয়ে দাও। মনে রেখো, ড্রিবলিং দিয়ে রান্নাবান্নার তেল-মসলা মোছা যায় না!’
মেসি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বেসিনের দিকে এগিয়ে গেলেন বন্ধু রবিনকে নিয়ে। মনে মনে ভাবলেন, এমবাপ্পে বা নেইমারকে কাটানো যতটা সহজ, রোববারের বিকেলে গৃহস্থালি দায়িত্ব কাটানো তার চেয়েও কঠিন!