ধ্রুব রাঠির ‘নমস্কার দোস্ত!’ মোদির জন্য কতটা চিন্তার?

· Prothom Alo

‘নমস্কার দোস্ত!’—শব্দ দুটি যেন তিনি দলিল করে নিয়েছেন। দুই হাতের তালু জোড় করে শব্দ দুটি তিনি যে ভঙ্গিতে উচ্চারণ করে আলাপ শুরু করেন, তাতে যেন তাঁর একেবারে নিজের জিনিস মনে হয়।

Visit mchezo.life for more information.

তাঁকে নিয়ে ভারতের মূলধারার সংবাদমাধ্যমে কখনোই তেমন হইচই হয়নি। অথচ তিনি বেশ কিছুদিন ধরেই পুরো ভারতে, এমনকি বাংলাদেশের রাজনীতি সচেতন শিক্ষিত তরুণ সমাজে এক পরিচিত মুখ।

ভারতে এখন সিইসি জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগ নিয়ে যে আন্দোলন হচ্ছে, তার অন্যতম প্রেরণাদাতা হিসেবে তাঁকে ভাবা হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সরকারের বড় ধরনের মাথা ব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছেন তিনি।

অথচ তিনি কোনো রাজনৈতিক দলের নেতা নন, সংসদ সদস্য নন, এমনকি প্রচলিত অর্থে কোনো সংবাদমাধ্যমের সম্পাদকও নন। তাঁর প্রধান শক্তি একটি ক্যামেরা, তথ্য ও যুক্তি সাজানোর দক্ষতা এবং বিপুলসংখ্যক দর্শকের কাছে পৌঁছানোর আশ্চর্য ক্ষমতা।

ভারতের, এমনকি বাংলাদেশেরও তরুণদের কাছে জনপ্রিয় হয়ে ওঠা এই নায়কের নাম ধ্রুব রাঠি।

ভিডিওতে দেখা যায়, অভিজিৎ দীপকে (বামে) দর্শকদের উদ্দেশে বলেন, তিনি সবার জন্য একটি সারপ্রাইজ রেখেছেন। এই বলে তিনি, সরে দাঁড়ান।

ককরোচ আন্দোলনের অন্যতম প্রেরণাদাতা এই ইউটিউবার এখন সরাসরি আন্দোলনের মাঠে। এটাই এখন ভারতের উদারপন্থী তরুণদের কাছে বড় খবর।

৭ অক্টোবর বুধবার দিবাগত রাতে ককরোচ জনতা পার্টির মুখপাত্র অভিজিৎ দিপকে যখন একটি ভিডিওর মাধ্যমে সবাইকে ধ্রুব রাঠির জার্মানি থেকে ভারতে ফেরার খবর জানিয়ে দেন, তখন থেকেই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে রাঠিকে নিয়ে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়।

ভিডিওতে দেখা যায়, অভিজিৎ দীপকে দর্শকদের উদ্দেশে বলেন, তিনি সবার জন্য একটি সারপ্রাইজ রেখেছেন। এই বলে তিনি, সরে দাঁড়ান।

তাঁর পেছনে দেখা যায়, ধ্রুব রাঠি একটি চেয়ারে বসা। ক্যামেরা তাঁর সামনে ধরতেই তিনি তাঁর সেই বিখ্যাত ‘সিগনেচার ডায়ালগ’ দেন—‘নমস্কার দোস্ত!’

এরপর থেকে নেটিজেনরা কয়েক দিন আগে তরুণদের উদ্দেশে মোদির ‘হাই ফ্রানড্স...!’ সম্বোধনের ভিডিও এবং রাঠির ‘নমস্কার দোস্ত!’ -এর ভিডিও পাশাপাশি জুড়ে দিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে দেন।

ভারতের নির্বাচনে ধ্রুব রাঠির প্রভাব কতটা কাজ করেছে‘নমস্কার দোস্ত!’ এবং ‘হাই ফ্রানড্স!’ -এর একটি তুলনামূলক চিত্র দাঁড় করিয়ে হয়তো তরুণদের কাছে তাঁরা এই প্রশ্ন ছুড়ে দিয়েছেন, ‘কে বেশি গ্রহণযোগ্য?’

‘নমস্কার দোস্ত!’ এবং ‘হাই ফ্রানড্স!’ -এর একটি তুলনামূলক চিত্র দাঁড় করিয়ে হয়তো তরুণদের কাছে তাঁরা এই প্রশ্ন ছুড়ে দিয়েছেন, ‘কে বেশি গ্রহণযোগ্য?’

পরদিন, অর্থাৎ আজ ৮ অক্টোবর বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় ধ্রুব রাঠি কর্ণাটকের বেঙ্গালুরুর ফ্রিডম পার্কে ককরোচ জনতা পার্টির আয়োজিত কর্মসূচিতে অংশ নেন।

সেখানে তাঁর উপস্থিতি তরুণদের মধ্যে যে চাঞ্চল্য ও উদ্দীপনার সৃষ্টি করেছে, তা যে কোনো রকস্টারের চেয়ে কম নয়।

শ্রীলঙ্কা, নেপাল ও বাংলাদেশের সরকারবিরোধী আন্দোলনের অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, তরুণদের বড় অংশ প্রথাগত রাজনীতিকদের ওপর আস্থা হারিয়ে ফেলেছে। তাঁদের ক্লিশে রাজনৈতিক বক্তব্য ও আলাপে তরুণেরা আর আকর্ষণ বোধ করেন না।

প্রচলিত রাজনৈতিক নেতাদের বাইরের কোনো তরুণ নেতৃত্ব যখন রাজনৈতিক কথা বলেন, তাতে তারা ভরসা পান এবং তাঁদের আন্দোলনের ডাকে সাড়া দেন।

এ কারণে ককরোচ আন্দোলনে রাঠির সশরীরে অংশগ্রহণ মোদি সরকারের জন্য বড় ধরনের চিন্তার বিষয় হবে, সন্দেহ নেই।

জ্ঞানেশেই কি গণেশ ওলটাবে মোদির?বেঙ্গালুরুর ফ্রিডম পার্কে বিক্ষোভ সমাবেশের মঞ্চে ধ্রুব রাঠি (বাঁ থেকে দ্বিতীয়)।

গত কয়েক বছরে ধ্রুব রাঠি ভারতের ক্ষমতাসীন দল ভারতীয় জনতা পার্টি এবং প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির নীতির অন্যতম পরিচিত সমালোচক হয়ে উঠেছেন।

তাঁর ভিডিওর মাধ্যমে ভারতের রাজনীতি, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান, নির্বাচন, নাগরিক অধিকার ও সরকারের জবাবদিহি নিয়ে যে আলোচনা তরুণদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়েছে, তা প্রচলিত রাজনৈতিক প্রচারের গণ্ডি ছাড়িয়ে গেছে।

এ কারণে তিনি নিজেকে যতই ‘অরাজনৈতিক’ বলে দাবি করুন, বাস্তবে তিনি এখন রাজনৈতিকভাবে খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

মোদি সরকারের কট্টর সমালোচক ধ্রুব রাঠি যে বিজেপি সরকারের আমলে ভারতে পা রাখতে পারবেন, সে কথা অনেকের কল্পনার বাইরে ছিল।

এ কারণে তাঁর ফেরার খবর অনেকের কাছেই প্রথম দিকে অবিশ্বাস্য ঠেকছিল। এখন অনেকেই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বলছেন, রাঠির উপস্থিতি ককরোচ আন্দোলনকে অনেক বেশি গতিশীল করবে এবং তা মোদি সরকারের জন্য বাড়তি চাপের কারণ হবে।

ধ্রুব রাঠির রাজনৈতিক গুরুত্ব বুঝতে হলে তাঁর উত্থানের পটভূমি মনে রাখা প্রয়োজন।

ভারতের ‘ককরোচ আন্দোলন’ কেন সফল হলো?২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে রাঠির ‘ইজ ইন্ডিয়া বিকামিং আ ডিক্টেটরশিপ?’ শিরোনামের ২৯ মিনিটের একটি ভিডিওটি ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করে।

২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনের আগে ভারতের মূলধারার টেলিভিশন সংবাদমাধ্যমের একটি বড় অংশ যখন মোদি সরকারের প্রতি অতিরিক্ত আনুগত্য দেখাচ্ছিল; মূলধারার মিডিয়া যখন জনপরিসরে ‘গোদি মিডিয়া’ হিসেবে আখ্যায়িত হচ্ছিল, ঠিক সেই পরিস্থিতিতে ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে রাঠির ‘ইজ ইন্ডিয়া বিকামিং আ ডিক্টেটরশিপ?’ শিরোনামের ২৯ মিনিটের একটি ভিডিওটি ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করে।

এতে তিনি গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান দুর্বল হয়ে পড়া, বিরোধী নেতাদের বিরুদ্ধে কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থার ব্যবহার এবং সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা সংকুচিত হওয়ার বিষয়গুলো সুনির্দিষ্ট তথ্য দিয়ে আলোচনা করেন।

ভিডিওটি কয়েক দিনের মধ্যে লাখ লাখ মানুষ দেখেন। রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ওই বছরের এপ্রিল নাগাদ এর দর্শকসংখ্যা ২ কোটি ৭০ লাখ ছাড়িয়ে যায়।

এরপর পশ্চিমবঙ্গ, বিহার, আসামসহ কয়েকটি রাজ্যে এসআইআর-এর মাধ্যমে ১৩ কোটির বেশি ভোটারকে বাদ দেওয়া নিয়ে রাঠি ভিডিও বানিয়েছেন।

সর্বশেষ সিইসি জ্ঞানেশ কুমারকে নিয়ে ‘ইটস ডান ব্রো’ শিরোনামে একটি ভিডিও তাঁর ইউটিউব চ্যানেলে প্রকাশ করেন।

ভারতের ককরোচ আন্দোলন বাংলাদেশকে যে বার্তা দিচ্ছেসর্বশেষ সিইসি জ্ঞানেশ কুমারকে নিয়ে ‘ইটস ডান ব্রো’ শিরোনামে একটি ভিডিও ইউটিউব চ্যানেলে প্রকাশ করেন ধ্রুব রাঠি।

গত ৯ দিনে ভিডিওটি ২ কোটির চেয়ে বেশিবার দেখা হয়েছে। ওই ভিডিওতে জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের বিষয়ে তিনি এত বিশ্বাসযোগ্য তথ্য দিয়েছেন যে, তা জ্ঞানেশ কুমারের গ্রহণযোগ্যতাকে বলা যায় ধসিয়ে দিয়েছে।

রাঠির সাফল্যের রহস্য শুধু তাঁর বক্তব্যে নয়, বক্তব্য উপস্থাপনের ধরনেও। জটিল রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক বিষয়কে তিনি সহজ হিন্দিতে ব্যাখ্যা করেন। তথ্য, ছবি, নথি, গ্রাফিকস ও সম্পাদনার সাহায্যে এমনভাবে বিষয়গুলো তুলে ধরেন, যাতে রাজনীতি নিয়ে আগে খুব বেশি আগ্রহী ছিলেন না, এমন দর্শকেরাও আলোচনায় যুক্ত হতে পারেন।

এই পদ্ধতিতে একজন তরুণ দর্শককে রাজনৈতিক বিশ্লেষণের জন্য সংবাদপত্রের দীর্ঘ প্রতিবেদন পড়তে হয় না। কয়েক মিনিটের ভিডিওতেই তিনি একটি বিষয়ে প্রাথমিক ধারণা পেতে পারেন।

এইভাবে ধ্রুব রাঠির ভিডিও শুধু ব্যক্তিগত মতামত প্রকাশের মাধ্যম থাকেনি। তা রাজনৈতিক আলোচনা ছড়িয়ে দেওয়ার একটি শক্তিশালী উপকরণে পরিণত হয়েছে।

বেঙ্গালুরুর কর্মসূচিতে রাঠির উপস্থিতি আন্দোলনটির প্রতি বাড়তি মনোযোগ আকর্ষণ করেছে। কোনো স্থানীয় সংগঠনের কর্মসূচি হয়তো নির্দিষ্ট শহরের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকত।

ধ্রুব রাঠির জনপ্রিয়তার আরেকটি উল্লেখযোগ্য দিক হলো বাংলাদেশে তাঁর দর্শকগোষ্ঠী। ভারতের রাজনীতি নিয়ে তাঁর বক্তব্য বাংলাদেশের মানুষের কাছেও আগ্রহের বিষয় হয়ে উঠেছে। এর পেছনে দুই দেশের রাজনৈতিক সম্পর্কের দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে। বিশেষ করে শেখ হাসিনা সরকারের সঙ্গে নরেন্দ্র মোদি সরকারের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বাংলাদেশের রাজনীতিতে দীর্ঘদিন ধরেই আলোচিত।

কিন্তু কোটি কোটি অনুসারী থাকা একজন পরিচিত ইউটিউবার সেখানে উপস্থিত হলে ঘটনাটি জাতীয় আলোচনায় জায়গা পাওয়ার সম্ভাবনা বাড়ে।

এখানে রাঠির প্রভাবের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক রয়েছে। তিনি নিজে কোনো নির্বাচনী এলাকার জনপ্রতিনিধি নন। তাঁর হাতে কোনো সরকারি ক্ষমতাও নেই।

কিন্তু তাঁর বক্তব্য ও উপস্থিতি একটি রাজনৈতিক ইস্যুকে মানুষের আলোচনায় নিয়ে আসতে পারে। আর গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় কোনো ইস্যু নিয়ে জনপরিসরে আলোচনা তৈরি হওয়াও রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের একটি উপায়।

ধ্রুব রাঠির জনপ্রিয়তার আরেকটি উল্লেখযোগ্য দিক হলো বাংলাদেশে তাঁর দর্শকগোষ্ঠী। ভারতের রাজনীতি নিয়ে তাঁর বক্তব্য বাংলাদেশের মানুষের কাছেও আগ্রহের বিষয় হয়ে উঠেছে। এর পেছনে দুই দেশের রাজনৈতিক সম্পর্কের দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে।

বিশেষ করে শেখ হাসিনা সরকারের সঙ্গে নরেন্দ্র মোদি সরকারের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বাংলাদেশের রাজনীতিতে দীর্ঘদিন ধরেই আলোচিত।

ভারতের পররাষ্ট্রনীতি, বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে নয়াদিল্লির ভূমিকা এবং দুই দেশের ক্ষমতাসীন নেতৃত্বের সম্পর্ক নিয়ে বাংলাদেশের মানুষের মধ্যে নানা মত রয়েছে।

২০২৪ সালের ২৫ জুলাই ‘বাংলাদেশ ইজ বার্নিং!’ শিরোনামে তিনি একটি ভিডিও প্রকাশ করেছিলেন। সেটিও তখন ব্যাপকসংখ্যক দর্শক দেখেছিলেন।

ফলে মোদি সরকারের সমালোচনা করা কোনো ভারতীয় কণ্ঠ বাংলাদেশের একাংশের কাছে বিশেষভাবে মনোযোগ পাওয়াই স্বাভাবিক।

কিন্তু ধ্রুব রাঠির বাংলাদেশ-সম্পর্কিত ভিডিওগুলোর গুরুত্ব শুধু এই জায়গায় সীমাবদ্ধ নয়। তিনি বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সংকট নিয়েও সরাসরি কথা বলেছেন।

২০২৪ সালের ২৫ জুলাই ‘বাংলাদেশ ইজ বার্নিং!’ শিরোনামে তিনি একটি ভিডিও প্রকাশ করেছিলেন। সেটিও তখন ব্যাপকসংখ্যক দর্শক দেখেছিলেন।

ভিডিওটির মূল আলোচনায় ছিল সরকারি চাকরিতে কোটা নিয়ে বিতর্ক, তরুণদের বেকারত্ব, শিক্ষার্থীদের আন্দোলন, পুলিশের দমন-পীড়ন এবং শেখ হাসিনা সরকারের বিরুদ্ধে কর্তৃত্ববাদী আচরণের অভিযোগ।

পাশাপাশি তিনি বাংলাদেশের ইতিহাস, পাকিস্তান আমলে পূর্ব বাংলার প্রতি বৈষম্য এবং মুক্তিযুদ্ধের পটভূমিও তুলে ধরেছিলেন। ভিডিওটির বিবরণে বেকারত্বের সংকট, কোটা ব্যবস্থা নিয়ে তরুণদের ক্ষোভ এবং সরকারের রাজনৈতিক পদক্ষেপের বিষয়গুলো বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়েছে।

ভিডিওটির শিরোনামই ছিল একটি রাজনৈতিক বার্তা—‘বাংলাদেশ জ্বলছে’। এটি কেবল একটি দেশের চলমান পরিস্থিতির বিবরণ নয়; বরং রাষ্ট্র ও তরুণ প্রজন্মের মধ্যে তৈরি হওয়া সংঘাতের প্রতি আন্তর্জাতিক দর্শকের দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা।

ভারতের নির্বাচনে ধ্রুব রাঠির প্রভাব কতটা কাজ করেছে

বাংলাদেশ নিয়ে ধ্রুব রাঠির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ভিডিও প্রকাশিত হয় ২০২৫ সালের ২৬ ডিসেম্বর। এর শিরোনাম ‘হোয়াই বাংলাদেশ ইজ হ্যাভিং অ্যান্টি-ইন্ডিয়া প্রোটেস্টস?’ —অর্থাৎ, বাংলাদেশে ভারতবিরোধী বিক্ষোভ হচ্ছে কেন?

ভিডিওটিতে বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্কের টানাপোড়েন এবং ভারতবিরোধী জনমতের পেছনের কারণগুলো নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে।

প্রকাশের পর ভিডিওটি প্রায় ৮০ লাখ বার দেখা হয়েছে। এই ভিডিওর তাৎপর্য হলো, বাংলাদেশে ভারতবিরোধী মনোভাবকে তিনি কেবল দুই দেশের কূটনৈতিক বিরোধ হিসেবে দেখেননি; বরং বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা ও ভারতের ভূমিকা নিয়ে মানুষের ধারণার সঙ্গে যুক্ত করে ব্যাখ্যা করেছেন।

রাঠি দেখিয়েছেন, বাংলাদেশে ভারতবিরোধী মনোভাবের পেছনে একাধিক কারণ কাজ করে।

শেখ হাসিনা সরকারের সঙ্গে ভারতের ঘনিষ্ঠতা, বাংলাদেশের রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহে নয়াদিল্লির ভূমিকা নিয়ে সন্দেহ, সীমান্তে হত্যাকাণ্ড, পানিবণ্টন এবং দুই দেশের মধ্যে অসম সম্পর্কের ধারণা—এসব বিষয় বিভিন্ন সময়ে জনমতকে প্রভাবিত করেছে। তবে সব বাংলাদেশির দৃষ্টিভঙ্গি এক নয়।

কাঠগড়ায় ভারতের নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতাভারত যেভাবে ফ্যাসিবাদের আঁতুড়ঘর হয়ে উঠছে

ভারত সম্পর্কে মানুষের মনোভাব রাজনৈতিক পরিচয়, ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা ও নির্দিষ্ট ঘটনার ওপর নির্ভর করে বদলায়।

রাঠির বাংলাদেশ-সম্পর্কিত ভিডিওগুলোর আরেকটি বিশেষ দিক হলো, তিনি ভারতীয় দর্শকের পাশাপাশি বাংলাদেশের দর্শকদের কাছেও পৌঁছাতে পেরেছেন।

ফলে তাঁর বক্তব্য দুই দেশের রাজনৈতিক আলোচনা ও জনমতের মধ্যে একটি যোগাযোগের ক্ষেত্র তৈরি করেছে।

ধ্রুব রাঠির প্রতি তরুণদের আকর্ষণ ব্যাখ্যা করতে গেলে তাঁর একটি নায়কোচিত ভাবমূর্তির কথাও বলতে হয়।

এই ভাবমূর্তি তৈরি হয়েছে মূলত তাঁর রাজনৈতিক অবস্থান, সরকারের সমালোচনা করার সাহসী উপস্থাপনা এবং প্রচলিত সংবাদমাধ্যমের বাইরে একটি বড় দর্শকগোষ্ঠী গড়ে তোলার মধ্য দিয়ে।

এখন তাঁর সেই ডিজিটাল পরিচয়ের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সরাসরি প্রতিবাদ কর্মসূচিতে অংশ নেওয়ার ঘটনা।

এত দিন দূর থেকে ভিডিওর মাধ্যমে রাজনৈতিক বক্তব্য তুলে ধরা একজন নির্মাতা এবার জনসমক্ষে এসে আন্দোলনকারীদের পাশে দাঁড়িয়েছেন। তাঁর অনুসারীদের কাছে এই দৃশ্য প্রতীকী গুরুত্ব বহন করতে পারে।

ভারতের বিরোধীদলীয় নেতা রাহুল গান্ধী (বাঁয়ে) ৭ অক্টোবর নয়াদিল্লিতে নির্বাচন কমিশনের প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে ইন্ডিয়া জোটের বিক্ষোভে এক পুলিশ সদস্যের সঙ্গে ধস্তাধস্তি করছেন। ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন (এসআইআর) নিয়ে অনিয়মের অভিযোগে এ বিক্ষোভ হয়।

ধ্রুব রাঠির প্রত্যাবর্তনের তাৎপর্য শেষ পর্যন্ত একজন ব্যক্তির জনপ্রিয়তার চেয়ে বড়। এটি ভারতের রাজনীতিতে যোগাযোগের বদলে যাওয়া বাস্তবতাকে সামনে এনেছে।

একসময় রাজনৈতিক বক্তব্যের প্রধান মাধ্যম ছিল সংবাদপত্র, টেলিভিশন এবং রাজনৈতিক দলের সভা-সমাবেশ। এখন একজন ডিজিটাল নির্মাতাও কয়েক কোটি মানুষের কাছে পৌঁছে যেতে পারেন।

ধ্রুব রাঠির সামনে এখন সেই প্রভাবেরই পরীক্ষা। তাঁর উপস্থিতি প্রতিবাদ কর্মসূচিকে কতটা বিস্তৃত করে, নির্বাচনী স্বচ্ছতা নিয়ে বিতর্ককে কতটা এগিয়ে নেয় এবং তরুণদের রাজনৈতিক অংশগ্রহণে কী ধরনের ভূমিকা রাখে, তা সময়ই বলে দেবে।

তবে একটি বিষয় ইতিমধ্যেই স্পষ্ট। ভারতের রাজনীতিতে এখন শুধু সংসদ, রাজনৈতিক দল কিংবা টেলিভিশনের পর্দায় লড়াই সীমাবদ্ধ নেই।

লড়াই চলছে মানুষের মনোযোগ, তথ্যের বিশ্বাসযোগ্যতা এবং রাজনৈতিক ব্যাখ্যার ওপর প্রভাব বিস্তার নিয়েও।

ধ্রুব রাঠির উত্থান সেই নতুন বাস্তবতারই একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ। তাঁর হাতে রাষ্ট্রক্ষমতা নেই, কোনো রাজনৈতিক দলের সাংগঠনিক শক্তিও নেই।

নমস্কার দোস্ত!’ কেবল একটি বাক্য নয়; এটি একধরনের সম্পর্কের চুক্তি। তিনি যেন প্রথমেই বলে নেন, তুমি আমার দর্শক নও, তুমি আমার ‘দোস্ত’। আর বন্ধুকে উদ্দেশ করে কথা বলার মধ্যে বক্তৃতার ঔদ্ধত্য থাকে না। থাকে বোঝানোর চেষ্টা, তর্কের আমন্ত্রণ, কখনো সতর্ক করার তাগিদ। এই জায়গাটিই তাঁকে প্রচলিত রাজনৈতিক বক্তাদের থেকে আলাদা করে।

কিন্তু তাঁর কণ্ঠস্বর কোটি মানুষের কাছে পৌঁছাতে পারে। আর গণতন্ত্রে ক্ষমতার জবাবদিহি নিয়ে প্রশ্ন তোলার ক্ষেত্রে কখনো কখনো এই কণ্ঠস্বরই হয়ে উঠতে পারে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ।

তাই ‘নমস্কার দোস্ত!’ অভিধানের বিচারে সাধারণ সম্ভাষণ হলেও এটি ধ্রুব রাঠির কণ্ঠে উচ্চারিত হলে আর সাধারণ থাকে না।

বহু ইউটিউবারের ভিডিও শুরু হয় সম্ভাষণে, কিন্তু রাঠির ক্ষেত্রে এই সম্ভাষণ যেন তাঁর কণ্ঠের স্বাক্ষর, তাঁর পর্দায় প্রবেশের নিজস্ব দরজা। তাঁকে দেখার আগেই কণ্ঠস্বর বলে দেয়-এই যে, ধ্রুব রাঠি এসেছেন।

তাঁর এই সম্ভাষণের আসল শক্তি শব্দের অর্থে নয়, সম্পর্ক তৈরির ভঙ্গিতে। তিনি দর্শকের ওপর বক্তৃতা চাপিয়ে দেন না; অন্তত তাঁর উপস্থাপনার ভঙ্গি এমন নয়। তিনি যেন সামনে বসা একজন পরিচিত তরুণের সঙ্গে কথা বলতে শুরু করেন।

রাষ্ট্র, সংবিধান, নির্বাচন, অর্থনীতি, যুদ্ধ, ধর্ম, বেকারত্ব কিংবা গণতন্ত্র-যে বিষয়ই হোক, তাঁর কণ্ঠের প্রথম দরজাটি থাকে ব্যক্তিগত। আগে মানুষ, পরে রাজনীতি।

এই কারণেই ‘নমস্কার দোস্ত!’ কেবল একটি বাক্য নয়; এটি একধরনের সম্পর্কের চুক্তি। তিনি যেন প্রথমেই বলে নেন, তুমি আমার দর্শক নও, তুমি আমার ‘দোস্ত’। আর বন্ধুকে উদ্দেশ করে কথা বলার মধ্যে বক্তৃতার ঔদ্ধত্য থাকে না। থাকে বোঝানোর চেষ্টা, তর্কের আমন্ত্রণ, কখনো সতর্ক করার তাগিদ। এই জায়গাটিই তাঁকে প্রচলিত রাজনৈতিক বক্তাদের থেকে আলাদা করে।

যে মানুষটি ‘দোস্ত’ বলে কথা শুরু করেন, তিনিই কয়েক মিনিট পর রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান, সরকারের নীতি কিংবা রাজনৈতিক প্রচারণার কঠোর সমালোচনা করেন।

ফলে সমালোচনার ধার আরও তীক্ষ্ণ হয়ে ওঠে। কারণ, সেটি কোনো দূরের রাজনৈতিক বক্তার আক্রমণ বলে মনে হয় না; মনে হয় পরিচিত কেউ এসে বলছে-‘শোনো, ব্যাপারটা এভাবে দেখেছ কি?’

এই জায়গায় ‘নমস্কার দোস্ত!’ হয়ে ওঠে তাঁর ব্র্যান্ডের মৌলিক সংকেত। ব্র্যান্ড বলতে আমরা সাধারণত কোনো লোগো, রং, পোশাক বা প্রতীক বুঝি।

কিন্তু সবচেয়ে শক্তিশালী ব্র্যান্ড কখনো কখনো কোনো দৃশ্যমান চিহ্ন নয়-একটি শব্দ, একটি স্বর, একটি অভ্যাস।

চার্লি চ্যাপলিনের টুপি ও লাঠি যেমন তাঁর উপস্থিতির সংকেত হয়ে উঠেছিল, তেমনি কিছু শিল্পীর কণ্ঠের নির্দিষ্ট ভঙ্গি তাঁদের আলাদা করে চিনিয়ে দেয়। রাঠির ক্ষেত্রে সেই সংকেতটি হলো-‘নমস্কার দোস্ত!’

এই কারণে ‘নমস্কার দোস্ত!’ সম্ভবত ধ্রুব রাঠির সবচেয়ে ছোট অথচ সবচেয়ে শক্তিশালী রাজনৈতিক বাক্য। এই বাক্য ভারতের রাজনীতিতে কতটা প্রভাব ফেলবে, তার আভাস শিগগিরই হয়তো মিলবে।

  • সারফুদ্দিন আহমেদ প্রথম আলোর সহকারী সম্পাদক।
    ইমেইল: [email protected]

Read full story at source