আলোর সাহায্যে কীভাবে মস্তিষ্ক নিয়ন্ত্রণ করা যায়, জানালেন নোবেলজয়ী বিজ্ঞানী কার্ল ডাইসারোথ
· Prothom Alo

২০২৬ সালের চিকিৎসাবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন তিন বিজ্ঞানী কার্ল ডাইসারোথ, পিটার হেগেম্যান এবং গেওর্গ নাগেল। অপটোজেনেটিকস নিয়ে যুগান্তকারী গবেষণার জন্য তাঁদের এই পুরস্কার দেওয়া হয়েছে। এটি স্নায়ুবিজ্ঞানের এমন একটি শাখা, যেখানে মস্তিষ্কের প্রতিটি আলাদা কোষের কাজ খেয়াল করে দেখা হয়, আমাদের একেকটা আচরণের পেছনে কোন কোষটি দায়ী।
Visit asg-reflektory.pl for more information.
নোবেল পাওয়ার খবরটি শোনার ঠিক পরপরই কার্ল ডাইসারোথের একটি চমৎকার সাক্ষাৎকার নেন যুক্তরাষ্ট্রের ‘হেয়ার অ্যান্ড নাউ’ নামে একটি রেডিও অনুষ্ঠানের সঞ্চালক রবিন ইয়াং। স্ট্যানফোর্ড ইউনিভার্সিটির বায়োইঞ্জিনিয়ারিং এবং সাইকিয়াট্রির এই অধ্যাপকের কাছে রবিন ইয়াংয়ের প্রথম প্রশ্নই ছিল তাঁর অনুভূতি নিয়ে।
যুক্তরাষ্ট্রের বোস্টনে জন্ম নেওয়া ডাইসারোথ হাসতে হাসতে বললেন, ‘পুরো ব্যাপারটা আমার কাছে একদম ঘোরের মতো লাগছিল! আমি একটু নিশাচর স্বভাবের মানুষ। অনেক রাত পর্যন্ত কাজ করে সবেমাত্র বিছানায় গিয়েছি। পুরোপুরি ঘুমিয়ে যায়নি, আবার পুরোপুরো জেগেও নেই; এমন একটা অবস্থায় আমার ফোনটা বেজে উঠল। সত্যি বলতে, আমার মনে হচ্ছিল আমি কোনো স্বপ্ন দেখছি কি না!’
এরপর রবিন ইয়াং সদ্য নোবেলজয়ী এই বিজ্ঞানীকে ৪টি প্রশ্ন করেন। চলুন, সেই প্রশ্নের উত্তরগুলো জানি ডাইসারোথের ভাষায়।
রবিন ইয়াং: অপটোজেনেটিকস আসলে কী?
কার্ল ডাইসারোথ: সহজ কথায় বলতে গেলে, আমরা আলো দিয়ে মস্তিষ্কের কোষগুলোকে নিয়ন্ত্রণ করার উপায় বের করেছি। সাধারণত আলোকে আমরা কোনো কিছু দেখার বা ছবি তোলার মাধ্যম হিসেবে ভাবি, কিন্তু এখানে ব্যাপারটা একদম আলাদা। আমরা আলোকে ব্যবহার করছি কোনো কাজ করানোর জন্য! অর্থাৎ আলো দিয়ে আমরা মস্তিষ্কের কোষগুলোকে অন বা অফ করতে পারি। আর এই কাজটা আমরা এমন একটা প্রাণীর মস্তিষ্কের অনেক গভীরে করতে পারি, যে দিব্যি চলাফেরা করছে এবং সাধারণ জীবনযাপন করছে।
ব্যাপারটা এত জাদুকরি হওয়ার পেছনের কারণটা বলি। আমরা এককোষী শৈবাল থেকে একটা বিশেষ জিন নিয়ে মস্তিষ্কের কোষে ঢুকিয়ে দিই। এই জিনের একটা অদ্ভুত ক্ষমতা হলো, এটা আলোর প্রতি সংবেদনশীল। যখনই আলো পড়ে, তখন এর ভেতর দিয়ে চার্জযুক্ত কণা বা বিদ্যুতের একটা প্রবাহ তৈরি হয়। সোজা কথায়, আমরা ঠিক যে কোষটিতে ওই জিন দিয়েছি, আলো ফেলে সরাসরি সেই কোষেই বিদ্যুৎ তৈরি করতে পারি! অর্থাৎ, অনেকটা রিমোট কন্ট্রোল করে টিভির চ্যানেল পাল্টানোর মতো আলো দিয়ে মস্তিষ্কের কোষ নিয়ন্ত্রণ করা!
অনেক জায়গায় কাজ করে ও শিখে নিজের মস্তিষ্ককে প্রস্তুত করেছি—রসায়নে নোবেলজয়ী সুসুমু কিতাগাওয়াসাধারণত আলোকে আমরা কোনো কিছু দেখার বা ছবি তোলার মাধ্যম হিসেবে ভাবি। কিন্তু এখানে ব্যাপারটা একদম আলাদা। আমরা আলোকে ব্যবহার করছি কোনো কাজ করানোর জন্য!
রবিন ইয়াং: এর মাধ্যমে কি মস্তিষ্কের স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া বদলে দেওয়া সম্ভব?
কার্ল ডাইসারথ: হ্যাঁ, উদাহরণ দিয়ে বলি। আমরা ধরেই নিই ক্ষুধা, তৃষ্ণা বা সন্তানকে আদর করা মানুষের একদম জন্মগত স্বভাব। দরকার হলে আমরা ঠিকই এগুলো করি।
বিজ্ঞানী কার্ল ডাইসারোথকিন্তু বাস্তবের গল্পটা অন্যরকম। আমাদের এই সব কাজ ও অগ্রাধিকারগুলো মস্তিষ্কের কিছু কোষ ঠিক করে দেয়। কোষগুলো নিজেদের মধ্যে রীতিমতো তর্কবিতর্ক ও প্রতিযোগিতা করে সিদ্ধান্ত নেয়, এখন কোন কাজটা করতে হবে। অপটোজেনেটিকস আমাদের সেই বিতর্কের জট খোলার সুযোগ করে দিয়েছে। এখন আমরা বুঝতে পারি—‘আচ্ছা, এই কারণে মানুষটা এমন আচরণ করছে, এই কারণে সে এই কাজটাকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে, বা ঠিক এভাবেই চাইলে তার আচরণটা বদলে দেওয়া সম্ভব।’ আমরা কেন একটা নির্দিষ্ট কাজ করি, সেটা একদম শুরু থেকে বুঝতে পারার আনন্দটাই অন্যরকম।
‘আমাদের ডজনখানেক সদস্যকে পোষা পশুর সঙ্গে একটি ছোট্ট ঘরে থাকতে হতো’—রসায়নে নোবেলজয়ী ওমর ইয়াঘিআমাদের এই সব কাজ ও অগ্রাধিকারগুলো মস্তিষ্কের কিছু কোষ ঠিক করে দেয়। কোষগুলো নিজেদের মধ্যে রীতিমতো তর্কবিতর্ক ও প্রতিযোগিতা করে সিদ্ধান্ত নেয়, এখন কোন কাজটা করতে হবে।
রবিন ইয়াং: আপনি তো একজন মনোরোগ বিশেষজ্ঞ। আমরা শুনেছি, রোগীদের কষ্টের আসল কারণ বোঝাতে পারতেন না বলে আপনি খুব হতাশ হতেন। আপনার এই আবিষ্কারের পেছনে কি সেই হতাশা কাজ করেছে?
কার্ল ডাইসারথ: হ্যাঁ, একদম তাই। চিকিৎসার অন্য যেকোনো শাখার চেয়ে সাইকিয়াট্রিতে এই ‘কেন’ উত্তরটা সবচেয়ে বেশি দরকার। কেন রোগীর এমন অদ্ভুত আচরণ হচ্ছে? এর পেছনের জৈবিক কারণটা কী? বিজ্ঞানীরা যে চেষ্টা করেননি তা নয়। কিন্তু আসল সমস্যা হলো, মানুষের মস্তিষ্ক বড্ড জটিল, সূক্ষ্ম এবং ভীষণ ঠুনকো। একে নিয়ে গবেষণা করা রীতিমতো ঘাম ছুটিয়ে দেওয়ার মতো কাজ।
অপটোজেনেটিকস আমাদেরকে মস্তিষ্কের এই জটিল জাল কেটে ভেতরে ঢোকার হাতিয়ার দিয়েছে। মস্তিষ্ক যেমন চোখের পলকে কাজ করে, অপটোজেনেটিকসও ঠিক ততটাই দ্রুত ও নিখুঁতভাবে কাজ করতে পারে। তাই আমরা এখন মস্তিষ্কের গতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে কাজ করতে পারি। একজন মনোরোগ বিশেষজ্ঞ হিসেবে এটা ভাবতেই আমার শিহরণ জাগে যে, এই পথ ধরে আমরা হয়তো একদিন নিজেদেরকেই আরও গভীরভাবে চিনতে পারব।
‘নোবেল জয়ের খবর শুনেও স্ত্রী আমাকে ঘুম থেকে জাগায়নি’—পদার্থবিজ্ঞানে নোবেলজয়ী জন মার্টিনিসমস্তিষ্ক যেমন চোখের পলকে কাজ করে, অপটোজেনেটিকসও ঠিক ততটাই দ্রুত ও নিখুঁতভাবে কাজ করতে পারে। তাই আমরা এখন মস্তিষ্কের গতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে কাজ করতে পারি।
রবিন ইয়াং: মানুষের চিকিৎসায় এই আবিষ্কার কীভাবে কাজে লাগানো যেতে পারে?
কার্ল ডাইসারথ: এরই মধ্যে অন্ধ মানুষদের ওপর এর সফল পরীক্ষা হয়েছে। রেটিনাইটিস পিগমেন্টোসা (Retinitis pigmentosa) নামে একটা রোগ আছে, যেখানে কোষ নষ্ট হয়ে যাওয়ার কারণে মানুষ ধীরে ধীরে অন্ধ হয়ে যায়। অপটোজেনেটিকস ব্যবহার করে সেই রোগীদের চোখে আবার আলোর প্রতি সংবেদনশীলতা ফিরিয়ে আনা হয়েছে। ফলে তাঁরা এমন অনেক কিছু দেখতে পেয়েছেন, যা আগে পারতেন না। এটা তো শুধু একটা উদাহরণ! ভবিষ্যতে আরও অনেক কিছু করা সম্ভব হবে।
রেটিনাইটিস পিগমেন্টোসা নামে একটা রোগ আছে, যেখানে কোষ নষ্ট হয়ে যাওয়ার কারণে মানুষ ধীরে ধীরে অন্ধ হয়ে যায়সাইকিয়াট্রিতে এতদিন আমাদের সবচেয়ে বড় অভাব ছিল, আমরা জানতামই না কোন কোষগুলোর জন্য সমস্যা হচ্ছে। একবার যদি আপনি বুঝতে পারেন যে ঠিক কোন কোষটা খামখেয়ালি করছে, তখন আপনি যেকোনো ধরনের চিকিৎসা বের করে ফেলতে পারবেন। আপনি এমন একটা ওষুধ বানাতে পারবেন, যেটা অন্ধকারে ঢিল না ছুঁড়ে সরাসরি ওই নির্দিষ্ট কোষটাকেই নিশানা করবে। অপটোজেনেটিকসের আসল শক্তিটা এখানেই। এটি একদম আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়, আসল সমস্যাটা ঠিক কোথায় লুকিয়ে আছে।
‘অক্টোবরে যে নোবেল দেয়, তা মনেই ছিল না’—পদার্থবিজ্ঞানে নোবেলজয়ী মিশেল দ্যভোরে