একাত্তরে চট্টগ্রাম বিদ্রোহের শ্বাসরুদ্ধকর অধ্যায়
· Prothom Alo

বাঙালি নিধনযজ্ঞের নীলনকশা অপারেশন সার্চলাইট মূলত দুই ভাগে বিভক্ত ছিল। এক ভাগে ছিল রাজধানী ঢাকা আর অপর অংশে ছিল পুরো বাংলাদেশে অভিযান পরিকল্পনা। এই দ্বিতীয় অংশের প্রধান পরিকল্পনা ছিল বন্দর নগরী চট্টগ্রাম ঘিরে। কারণ, ১৯৭১ সালে চট্টগ্রামে অষ্টম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট, ইস্ট পাকিস্তান রাইফেলসের পাশাপাশি বাঙালি সেনাদের প্রশিক্ষণ স্থাপনা ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টাল সেন্টারের (ইবিআরসি) অবস্থান ছিল। যেখানে দেড় হাজারের মতো বাঙালি রিক্রুট ছিলেন। তা ছাড়া এই সেন্টারের দায়িত্বে ছিলেন বাঙালি সেনা কর্মকর্তা ব্রিগেডিয়ার মাহমুদুর রহমান মজুমদার। তিনি ১৯৭১ সালে পূর্ব পাকিস্তানে কর্মরত বাঙালি সামরিক কর্মকর্তাদের মধ্যে জ্যেষ্ঠতম ছিলেন। তাঁকে নিয়ে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর বিশেষ শঙ্কা ছিল। আর ভৌগোলিক ও কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হওয়ায় অভিযানের শুরুতেই চট্টগ্রামের নিরঙ্কুশ দখল নিতে চেয়েছিল পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী। যদিও বাঙালি সেনাদের বীরত্বপূর্ণ প্রতিরোধে তা সম্ভব হয়নি। ১৯৭১ সালের অসহযোগ আন্দোলনে বিদ্রোহের প্রস্তুতি ও চূড়ান্ত মুহূর্তে বিদ্রোহের শ্বাসরুদ্ধকর ঘটনাপ্রবাহ নিয়েই ১৯৭১: চট্টগ্রাম বিদ্রোহ ও ব্রিগেডিয়ার মজুমদার গ্রন্থটি।
সেনা কর্মকর্তা মুহাম্মদ লুৎফুল হকের এই গ্রন্থের পরিধি ছোট—মাত্র ৯৬ পৃষ্ঠা। যদিও এর আধেয় ও বয়ান খুবই তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ, একজন সেনা কর্মকর্তা হিসেবে রণাঙ্গনে থেকে লেখক যুদ্ধদিনের শ্বাসরুদ্ধকর ঘটনা বর্ণনা করেছেন। যেগুলোর মধ্যে অন্যতম ছিল সোয়াত জাহাজের অস্ত্র খালাসের ঘটনাটি।
Visit somethingsdifferent.biz for more information.
বলার অপেক্ষা রাখে না, বাঙালি জাতির ওপর বর্বর গণহত্যা চালাতেই এসব অস্ত্র আনা হয়েছিল। আর যা খালাস করতে চাইছিলেন না বাঙালি সেনা কর্মকর্তা, এমনকি বন্দরের শ্রমিকেরা। এ বিষয়ে মুহাম্মদ লুৎফুল হক লিখেছেন, পাকিস্তানের নতুন সামরিক আইন প্রশাসক লে. জেনারেল টিক্কা খান ব্রিগেডিয়ার মজুমদারকে ফোন করেন এবং সোয়াত খালি করতে সাহায্য না করার জন্য গালমন্দ করেন।
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানি সমরাস্ত্রসহ সোয়াত জাহাজের অস্ত্র খালাসের বিষয়টি বিভিন্ন গ্রন্থে আলোচিত হয়েছে। এই গ্রন্থে লেখক সেই ঘটনাপ্রবাহের একটি সংক্ষিপ্ত বর্ণনা দিয়েছেন। তাঁর ভাষ্যমতে, কারচি থেকে প্রায় ৯ হাজার টন ভারী অস্ত্র, গোলাবারুদসহ পাকিস্তান ন্যাশনাল শিপিং করপোরেশনের জাহাজ সোয়াত ৩ মার্চ চট্টগ্রাম বন্দরের ১৭ নম্বর জেটিতে নোঙর করেছিল। তখন পুরো পূর্ব পাকিস্তানে অসহযোগ আন্দোলনে প্রায় অগ্নিগর্ভ পরিস্থিতি। ১৯৭০ সালের নির্বাচনে নিরঙ্কুশভাবে নির্বাচিত আওয়ামী লীগ নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নির্দেশেই চলছিল পূর্ব পাকিস্তানের প্রশাসন। সেনা কর্তৃত্বও প্রায় ভেঙে পড়েছিল। এমন সময় এই জাহাজের অস্ত্র খালাস নিয়ে জটিলতা তৈরি হয়। বলার অপেক্ষা রাখে না, বাঙালি জাতির ওপর বর্বর গণহত্যা চালাতেই এসব অস্ত্র আনা হয়েছিল। আর যা খালাস করতে চাইছিলেন না বাঙালি সেনা কর্মকর্তা, এমনকি বন্দরের শ্রমিকেরা। এ বিষয়ে মুহাম্মদ লুৎফুল হক লিখেছেন, পাকিস্তানের নতুন সামরিক আইন প্রশাসক লে. জেনারেল টিক্কা খান ব্রিগেডিয়ার মজুমদারকে ফোন করেন এবং সোয়াত খালি করতে সাহায্য না করার জন্য গালমন্দ করেন। লে. জেনারেল টিক্কা খান ব্রিগেডিয়ার মজুমদারকে খোঁটা দেওয়ার জন্য বলেন যে কাজটি সম্পন্ন করার জন্য একজন সুবেদারই যথেষ্ট। (পৃষ্ঠা: ৩৩)
উত্তাল অসহযোগ আন্দোলনের মধ্যে ২১ মার্চ চট্টগ্রামে আকস্মিক এক সফরে গিয়েছিলেন পাকিস্তানের সেনাপ্রধান জেনারেল হামিদ। যার সম্মানে চট্টগ্রামে সেনানিবাসে একটি মধ্যাহ্নভোজের আয়োজন করা হয়েছিল। এই মধ্যাহ্নভোজেই জেনারেল হামিদের সন্দেহজনক গতিবিধি অত্যন্ত নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করেছিলেন মেজর জিয়া।
১৯৭১ সালে অসহযোগ আন্দোলনের চূড়ান্ত দিনগুলোতে জ্যেষ্ঠ সেনা কর্মকর্তা ব্রিগেডিয়ার এম আর মজুমদার বিদ্রোহের পরিকল্পনা ও অগ্রগতি নিয়ে অতি গোপনে শেখ মুজিবুর রহমান ও কর্নেল (অব.) ওসমানীর সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করেছেন। লক্ষ্য ছিল যথাযথ পদক্ষেপের মাধ্যমে মুক্তিসংগ্রামকে এগিয়ে নেওয়া। লেখকের ভাষ্য অনুযায়ী, এই পরিকল্পনার অন্যতম প্রধান চরিত্র ছিলেন মেজর জিয়া, ক্যাপ্টেন রফিক ও লে. কর্নেল চৌধুরি। ১৭ মার্চেই তাঁরা পরিকল্পনা করেন ঝটিকা এক আক্রমণের মধ্য দিয়ে চট্টগ্রাম বিমানবন্দর, নৌঘাঁটি, নৌবন্দর, টেলিফোন এক্সচেঞ্জ ও রেডিও স্টেশন দখলে নেওয়া হবে। যার জন্য বিভিন্ন ইউনিট ও কর্মকর্তাদের মধ্যে চলছিল সমন্বয় পরিকল্পনা।
গ্রন্থটিতে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রেক্ষাপট আলোচিত হয়েছে। উত্তাল অসহযোগ আন্দোলনের মধ্যে ২১ মার্চ চট্টগ্রামে আকস্মিক এক সফরে গিয়েছিলেন পাকিস্তানের সেনাপ্রধান জেনারেল হামিদ। যার সম্মানে চট্টগ্রামে সেনানিবাসে একটি মধ্যাহ্নভোজের আয়োজন করা হয়েছিল। এই মধ্যাহ্নভোজেই জেনারেল হামিদের সন্দেহজনক গতিবিধি অত্যন্ত নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করেছিলেন মেজর জিয়া। এই ভোজ অনুষ্ঠানে জেনারেল হামিদ কথা বলছিলেন এবং অনেক ক্ষেত্রে নিম্নস্বরে কানাঘুষা করছিলেন চট্টগ্রামে দায়িত্বরত পাকিস্তানি অফিসারদের সঙ্গে। এমনই এক আলাপে ২০তম বালুচ রেজিমেন্টের কমান্ডিং অফিসার লে. কর্নেল ফাতমীকে সম্ভাব্য অভিযানের কথা বলেছিলেন জেনারেল হামিদ। যে আলোচনা শুনে ফেলেছিলেন মেজর জিয়া। যা থেকে পাকিস্তানি আক্রমণ সম্পর্কে চূড়ান্তভাবে নিশ্চিত হয়েছিলেন মেজর জিয়া ও চট্টগ্রামের বাঙালি সেনারা। (পৃষ্ঠা: ৪৫)
গ্রন্থটিতে যুদ্ধদিনে ব্রিগেডিয়ার মজুমদারের ওপর অকথ্য নির্যাতনের বর্ণনা আছে। উল্লেখ্য, ঢাকায় আটক করার পর ব্রিগেডিয়ার মজুমদারকে পশ্চিম পাকিস্তানে নেওয়া হয়েছিল। সেখানে বিদ্রোহ ও দেশদ্রোহের বিষয়ে পরিকল্পনা ও নানা অভিযোগ স্বীকার করে নিতে পাকিস্তানি বিভিন্ন বাহিনী তাঁর ওপর মধ্যযুগীয় বর্বরতা চালিয়েছিল; যা পাঠকের মনোযোগ আকর্ষণ করতে পারে।
মধ্যাহ্নভোজের সেই বার্তা মেজর জিয়া ব্রিগেডিয়ার মজুমদার ও আওয়ামী লীগ নেতা এম আর সিদ্দিকীর সঙ্গে বিনিময় করেছিলেন। অন্যদিকে ব্রিগেডিয়ার মজুমদারকে ঢাকার সেনা সদরে ডেকে পাঠায় পাকিস্তানি সেনা কর্তৃপক্ষ। সেনানিবাসে রিপোর্ট করার আগেই শেখ মুজিবুর রহমানকে পুরো পরিস্থিতি ও চট্টগ্রামের বিদ্রোহ প্রস্তুতির কথা জানান ব্রিগেডিয়ার মজুমদার। এরপর ২৫ মার্চ সকালে ব্রিগেডিয়ার মজুমদারকে হাজির করা হয়েছিল জেনারেল টিক্কা খানের সামনে। যেখানে তাঁকে সোয়াত থেকে অস্ত্র খালাস না করার জন্য ভর্ৎসনা করা হয়। এরপর ব্রিগেডিয়ার মজুমদার গিয়েছিলেন জয়দেবপুরে। সেখান থেকে ফেরার পর তিনি নিশ্চিত হন, আর সময় নেই। লাল ফিতা উড়িয়ে দেওয়ার (বিদ্রোহ ঘোষণার) এটাই চূড়ান্ত সময়।
গ্রন্থটিতে এরপর চট্টগ্রামে বিদ্রোহের শ্বাসরুদ্ধকর বিবরণ আছে। ২৫ মার্চ মধ্যরাতে ইপিআরে ক্যাপ্টেন রফিক এবং অষ্টম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টে মেজর জিয়া বিদ্রোহে নেতৃত্ব দেন। বিদ্রোহ হয় ইবিআরসি কেন্দ্রেও। যদিও সেখানে রাত একটার দিকেই ২০তম বালুচ রেজিমেন্ট ভারী অস্ত্রে সজ্জিত হয়ে আগেই হামলা চালায়। যাতে শহীদ হন লে. কর্নেল চৌধুরি।
গ্রন্থটিতে যুদ্ধদিনে ব্রিগেডিয়ার মজুমদারের ওপর অকথ্য নির্যাতনের বর্ণনা আছে। উল্লেখ্য, ঢাকায় আটক করার পর ব্রিগেডিয়ার মজুমদারকে পশ্চিম পাকিস্তানে নেওয়া হয়েছিল। সেখানে বিদ্রোহ ও দেশদ্রোহের বিষয়ে পরিকল্পনা ও নানা অভিযোগ স্বীকার করে নিতে পাকিস্তানি বিভিন্ন বাহিনী তাঁর ওপর মধ্যযুগীয় বর্বরতা চালিয়েছিল; যা পাঠকের মনোযোগ আকর্ষণ করতে পারে।
গ্রন্থটিতে সোয়াত জাহাজে অস্ত্র খালাসের অধ্যায়টি ছোট। সম্ভবত এ বিষয়ে পাঠকের জানার আগ্রহ আরও গভীর।
১৯৭১: চট্টগ্রাম বিদ্রোহ ও ব্রিগেডিয়ার মজুমদার
মুহাম্মদ লুৎফুল হক
প্রকাশক: প্রথমা প্রকাশন
প্রকাশ: এপ্রিল ২০২৫
প্রচ্ছদ: মাসুক হেলাল
পৃষ্ঠা: ৯৬; মূল্য: ২৮৫ টাকা