ফিলিস্তিন ইস্যুতে আরও স্পষ্ট হলো তারকাদের বিভাজন
· Prothom Alo

ফিলিস্তিনের পক্ষে প্রকাশ্যে কথা বলায় ‘লুপ ট্যুর’ থেকে বাদ পড়া মার্কিন র্যাপার ম্যাকলমোর ঘোষণা দিয়েছেন, এড শিরানের ট্যুর থেকে পাওয়া তাঁর ১০ লাখ ডলার তিনি ফিলিস্তিনিদের সহায়তায় দান করবেন। ম্যাকলমোরকে বাদ দেওয়ার প্রতিবাদে মার্কিন শিল্পী ফিনিয়াস, ড্যানিশ শিল্পী লুকাস গ্রাহাম, ব্রিটিশ-আইরিশ সংগীতশিল্পী অ্যারন রো এবং আইরিশ ব্যান্ড বিওগাও ট্যুর থেকে সরে দাঁড়ান। এসবের মধ্যেই ফিলিস্তিনিদের সহায়তায় বড় অঙ্কের অর্থ দানের এই ঘোষণা দিলেন ম্যাকলমোর।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গত বুধবার দেওয়া এক দীর্ঘ পোস্টে ম্যাকলমোর জানান, এড শিরানের ‘লুপ ট্যুর’ থেকে পাওয়া তাঁর পুরো ১০ লাখ ডলার ফিলিস্তিনিদের সহায়তায় দান করবেন। অর্থ যাবে ছয়টি সংগঠনের কাছে—প্যালেস্টাইন চিলড্রেনস রিলিফ ফান্ড, হিল প্যালেস্টাইন, গাজা স্যুপ কিচেন, মেডিক্যাল এইড ফর প্যালেস্টিনিয়ানস, ইউএনআরডব্লিউএ ইউএসএ ন্যাশনাল কমিটি ও আনেরা।
পোস্টে ম্যাকলমোর বলেন, গত ৪৮ ঘণ্টায় যা ঘটেছে, তারপর তিনি আলোচনাকে আবার ফিলিস্তিনের মানুষের কাছে ফিরিয়ে নিতে চান। তাঁর ভাষায়, ‘যে বিষয়েই আমাদের মতপার্থক্য থাকুক না কেন, অন্তত এ বিষয়ে আমরা একমত হতে পারি যে ফিলিস্তিনের মানুষের জীবন রক্ষা করা জরুরি। পৃথিবীর অন্য যেকোনো মানুষের জীবনের চেয়ে একজন ফিলিস্তিনির জীবনের মূল্য কম নয়।’ তিনি আরও বলেন, আলোচনার কেন্দ্রে তিনি নিজে থাকতে চান না। তাঁর মনোযোগ থাকবে সেই বাবা-মায়েদের দিকে, যাঁরা সন্তানদের নিয়ে হাসপাতালে ছুটছেন অথচ চিকিৎসার প্রয়োজনীয় সরঞ্জামও সেখানে নেই; চিকিৎসক, প্যারামেডিক, সাংবাদিক ও ত্রাণকর্মীদের দিকে, যাঁরা ঝুঁকি নিয়ে কাজ করে যাচ্ছেন।
Visit betsport.cv for more information.
ম্যাকলমোর শুধু নিজের অর্থ দানের ঘোষণা দিয়েই থামেননি। তিনি ম্যাসাচুসেটসের জিলেট স্টেডিয়াম ও আমেরিকান ফুটবল দল নিউ ইংল্যান্ড প্যাট্রিয়টসের মালিক রবার্ট ক্রাফটকেও সমপরিমাণ অর্থ দেওয়ার আহ্বান জানান। ম্যাকলমোরের এই আহ্বানের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ক্রাফটের পক্ষ থেকে নতুন ঘোষণা আসে। তাঁকে ফোন করে মানবিক সহায়তার জন্য ২০ লাখ ডলার দেওয়ার অনুরোধ করেছিলেন এড শিরান বলেও জানান ক্রাফট। শিরান ও ক্রাফট মিলে মোট ৪০ লাখ ডলার মানবিক সহায়তার ঘোষণা দিয়েছেন। তবে এই অর্থ কোন কোন সংগঠনের হাতে যাবে, তা ম্যাকলমোরের অনুদানের মতো নির্দিষ্ট করে জানানো হয়নি। ক্রাফট এক বিবৃতিতে বলেন, ‘আমি গভীরভাবে বিশ্বাস করি, সব মানুষের জীবন রক্ষা করা উচিত।’ ফিলিস্তিনিদের জন্য কাজ করা সংগঠনগুলোর প্রতি তাঁর দীর্ঘদিনের সমর্থনের কথাও জানান তিনি।
শিরানের সমালোচনায় রজার ওয়াটার্স
ম্যাকলমোরকে ঘিরে বিতর্কে মুখ খুললেন ব্রিটিশ ব্যান্ড পিঙ্ক ফ্লয়েডের সহপ্রতিষ্ঠাতা রজার ওয়াটার্স। ফিলিস্তিন ইস্যুতে দীর্ঘদিন ধরে সরব এই সংগীতশিল্পী সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি ভিডিও শেয়ার করে ম্যাকলমোরের অবস্থানের প্রতি সমর্থন জানিয়েছেন। ‘এড হু’ শিরোনামের ভিডিওতে এড শিরানের সমালোচনাও করেছেন তিনি। তাঁর ভাষায়, পৃথিবীতে দুই ধরনের মানুষ আছে। একধরনের মানুষ ‘সঠিক কাজটি করেন’, উদাহরণ হিসেবে তিনি ম্যাকলমোরের কথা বলেন। এরপর আছেন অন্য ধরনের মানুষ, যাঁরা ‘সঠিক কাজটি করতে পারেন না’। ‘সঠিক কাজটি করতে পারেন না’ বলে রজার শিরানের দিকে ইঙ্গিত করেন।
ফিলিস্তিন ইস্যুতে তারকাদের বিভাজন নতুন নয়
ম্যাকলমোরের ঘটনা নতুন করে আলোচনায় এলেও ফিলিস্তিন ইস্যুতে তারকাদের বিভাজন কয়েক বছর ধরেই স্পষ্ট। গাজা যুদ্ধ শুরুর পর হলিউড ও সংগীতাঙ্গনের বহু তারকা ফিলিস্তিনিদের পক্ষে কথা বলেছেন। কেউ যুদ্ধবিরতির আহ্বান জানিয়েছেন, কেউ গাজায় মানবিক সহায়তার দাবি তুলেছেন, আবার কেউ ইসরায়েলের নিরাপত্তার বিষয়টিও সামনে এনেছেন।
ফিলিস্তিনের পক্ষে অবস্থান নেওয়ার কারণে মেক্সিকান অভিনেত্রী মেলিসা বারেরাকে ২০২৩ সালের নভেম্বরে স্ক্রিম ৭ থেকে বাদ দেয় প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান স্পাইগ্লাস। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এক পোস্টে গাজাকে ‘কনসেনট্রেশন ক্যাম্প’ এবং ইসরায়েলের সামরিক কর্মকাণ্ডকে ‘গণহত্যা’ ও ‘জাতিগত নির্মূল’ বলার পর এই সিদ্ধান্ত আসে। স্পাইগ্লাস জানায়, তাদের ‘ইহুদিবিদ্বেষ ও ঘৃণাত্মক বক্তব্যের বিরুদ্ধে শূন্য সহনশীলতা’ নীতি রয়েছে। বারেরা অবশ্য বলেন, ফিলিস্তিনিদের অধিকারের পক্ষে কথা বলা আর ইহুদিবিদ্বেষ এক না। ঘটনাটি তখন হলিউডে বড় বিতর্ক তৈরি করে। কারণ, বারেরা ছিলেন ‘স্ক্রিম’ ফ্র্যাঞ্চাইজির নতুন প্রজন্মের অন্যতম প্রধান মুখ। তাঁর বাদ পড়ার পর পরিচালক ক্রিস্টোফার ল্যান্ডনও প্রকল্পটি ছেড়ে দেন।
অস্কারজয়ী অভিনেত্রী সুসান সারান্ডন বহু বছর ধরেই রাজনৈতিক ও মানবাধিকার ইস্যুতে সরব। ২০২৩ সালের নভেম্বরে নিউইয়র্কে ফিলিস্তিনপন্থী সমাবেশে বক্তব্য দেওয়ার পর তাঁর ট্যালেন্ট এজেন্সি ইউটিএ তাঁকে বাদ দেয়। তাঁর বক্তব্য নিয়ে ইহুদিবিদ্বেষের অভিযোগও ওঠে। সারান্ডন পরে নিজের একটি মন্তব্যের জন্য দুঃখ প্রকাশ করেছিলেন এবং ইহুদিবিদ্বেষ ও ইসলামোফোবিয়া—দুটিরই বিরোধিতা করার কথা বলেন। তবে তাঁর ক্ষেত্রে বিতর্ক সেখানেই থামেনি। সদ্য শেষ হওয়া ভেনিস চলচ্চিত্র উৎসবে সারান্ডন জানান, ফিলিস্তিনের পক্ষে অবস্থানের কারণে এখনো তিনি সিনেমার কাজ হারাচ্ছেন। তাঁর দাবি, হলিউডের বড় স্টুডিওগুলো ইসরায়েলের সমালোচনা করেন, এমন ব্যক্তিদের নিয়ে কাজ করতে অনীহা দেখাচ্ছে।
ফিলিস্তিন নিয়ে কথা বলার পর শুধু অভিনেতারাই পেশাগত চাপে পড়েননি।
হলিউডের অন্যতম প্রভাবশালী এজেন্সি সিএএর এজেন্ট মাহা দাখিলও বিতর্কে পড়েছিলেন। ২০২৩ সালে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গাজায় ইসরায়েলের কর্মকাণ্ডকে ‘গণহত্যা’ হিসেবে উল্লেখ করার পর তিনি ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়েন। পরে সিএএর নেতৃত্ব থেকে তাঁকে সরিয়ে দেওয়া হয় এবং তিনি তাঁর মন্তব্যের জন্য ক্ষমা চান।
ব্রিটিশ-আলবেনীয় পপ তারকা দুয়া লিপাও গাজায় ইসরায়েলি সামরিক অভিযানের সমালোচনা করেছেন এবং যুদ্ধবিরতির পক্ষে কথা বলেছেন। তাঁর বক্তব্যের পর ইসরায়েলপন্থী মহল থেকে সমালোচনা আসে।
ফিলিস্তিনি বংশোদ্ভূত মডেল বেলা হাদিদ দীর্ঘদিন ধরে ফিলিস্তিনের অধিকারের পক্ষে কথা বলে আসছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ফিলিস্তিনের মানুষের দুর্ভোগ, গাজায় মানবিক সহায়তা এবং যুদ্ধবিরতির পক্ষে কথা বলেছেন বেলা। ২০২৪ সালে কান চলচ্চিত্র উৎসবে ফিলিস্তিনি পাতাকার কেফিয়াহ পরে আলোচনায় আসেন। পরে বিভিন্ন সময়ে তাঁর ফিলিস্তিনপন্থী অবস্থান নিয়েও সমালোচনা হয়েছে।
সুসান সারান্ডন। এএফপিঅ্যাভেঞ্জার্স তারকা মার্ক রাফালোও গাজা নিয়ে প্রকাশ্যে কথা বলেছেন। তিনি যুদ্ধবিরতি ও ফিলিস্তিনিদের জন্য মানবিক সহায়তার পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন।
অভিনেতা ও কমেডিয়ান র্যামি ইউসুফও ফিলিস্তিনের পক্ষে সরব। ২০২৪ সালের অস্কারে তিনি ‘আর্টিস্ট ফর সিজফায়ার’ লেখা পিন পরে অনুষ্ঠানে উপস্থিত হন। ওই প্রচারণার মূল দাবি ছিল গাজায় যুদ্ধবিরতি।
স্প্যানিশ অভিনেতা হাভিয়ের বারদেম ২০২৪ সালের সান সেবাস্তিয়ান চলচ্চিত্র উৎসবে পুরস্কার গ্রহণের সময় গাজায় যুদ্ধবিরতি, ফিলিস্তিনিদের অধিকার এবং হামাসের হাতে থাকা জিম্মিদের মুক্তির আহ্বান জানান। পরেও বিভিন্ন চলচ্চিত্র উৎসবে অনেকবারই গাজায় ইসরায়েলি সামরিক অভিযানকে গণহত্যা হিসেবে উল্লেখ করেছেন তিনি।
‘ফ্রি প্যালেস্টাইন’ স্লোগান, তারপর এড শিরানের সফরে যা ঘটল‘ওয়েস্ট সাইড স্টোরি’ ও ‘স্নো হোয়াইট’ অভিনেত্রী র্যাচেল জেগলারও প্রকাশ্যে ফিলিস্তিনের পক্ষে কথা বলেছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একাধিকবার তিনি ‘ফ্রি প্যালেস্টাইন’ লিখেছেন। তাঁর এই অবস্থান বিশেষভাবে আলোচনায় আসে। কারণ, ‘স্নো হোয়াইট’-এ তাঁর সহশিল্পী ছিলেন ইসরায়েলি অভিনেত্রী গাল গ্যাদত।
ফিলিস্তিনপন্থী তারকাদের বিপরীতে বহু হলিউড তারকা প্রকাশ্যে ইসরায়েলের প্রতি সমর্থন জানান। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের হামলার পর সাত শতাধিক হলিউড অভিনেতা, নির্মাতা ও বিনোদনজগতের ব্যক্তিত্ব একটি খোলাচিঠিতে হামাসের হামলার নিন্দা এবং ইসরায়েলি জিম্মিদের মুক্তির দাবি জানান। এই তালিকায় ছিলেন গাল গ্যাদত, মাইকেল ডগলাস, মার্ক হ্যামিল, জেমি লি কার্টিস, হেলেন মিরেন, জেরি সাইনফেল্ড, ক্রিস পাইন, জ্যাকরি লেভিসহ আরও অনেকে। অভিনেত্রী-কমেডিয়ান অ্যামি শুমারও ইসরায়েলের প্রতি সমর্থন জানিয়েছেন।
বিবিসি, দ্য গার্ডিয়ান ও ভ্যারাইটি অবলম্বনে